Golpo romantic golpo প্রণয়ে গুনগুন

প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ২৮


প্রণয়ে_গুনগুন

পর্ব_২৮

মুন্নিআক্তারপ্রিয়া


চোখের পলকের সঙ্গে সঙ্গে সময় খুব দ্রুত চলে যাচ্ছিল। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল গুনগুন ও প্রণয়ের সফলতা। এতটাও তারা আশা করেনি। কিছু সময় আল্লাহ্ না চাইতেও অনেক কিছু দিয়ে দেয়। দুহাত ভরে দেয়। এই যেমন প্রণয় ও গুনগুনকে দিয়েছে।

প্রণয়ের সেই ছোট্ট স্বপ্ন রেস্টুরেন্ট দেওয়ার ইচ্ছেটা অবশেষে পূরণ হতে চলেছে। টাকা-পয়সা গুছানো শেষ, রেস্টুরেন্টের ডেকোরেশন চলছে এখন। কিছুদিন পর ওপেনিং হবে। ডেকোরেশন চাইলে দ্রুত শেষ করা যায়। কিন্তু গুনগুনের পরীক্ষা ছিল এতদিন। আর একটা পরীক্ষা বাকি আছে। ঐটা শেষ হলেই রেস্টুরেন্ট উদ্ভোদন করবে।

গুনগুন সকালে ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়ে, প্রণয়কে উঠিয়েছে। ওকে মজসিদে নামাজ পড়তে পাঠিয়ে সকালের নাস্তা বানাতে রান্নাঘরে গেল। আজকাল গুনগুন ঘরের কাজ বেশি করছে। প্রণয় প্রথম প্রথম রাজি হতে চায়নি। তবে গুনগুনের রাগের কাছেও টিকতে পারেনি। গুনগুনের হঠাৎ এত দায়িত্বশীলতার পেছনেও কারণ আছে। প্রণয় খুব ব্যস্ত থাকে এখন। এতদিক একসাথে সামলাতে পারে না। অন্যদিকে গুনগুনের তো পড়াশোনা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই। তাই সে বাড়ির সমস্ত কাজের দায়িত্ব নিজে নিয়েছে। প্রণয় একবার বুয়া রাখার কথা বলেছিল। গুনগুন এটাতেও রাজি হয়নি। প্রণয় বেচারা তখন আর কী করবে? তবে হ্যাঁ, বাসায় থাকলে সে সর্বদা গুনগুনকে কাজে সাহায্য করে।

প্রণয় নামাজ পড়ে আসতে আসতে গুনগুনের চা বানানো শেষ। প্রণয় এক কাপ চা খেয়ে গুনগুনকে বলল,

“বলো কী করতে হবে?”

“কী করতে হবে মানে?”

“কাজে সাহায্য করব তোমায়।”

“কোনো দরকার নেই। আপনি গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন।”

গুনগুন রুটি বানাচ্ছিল। প্রণয় গুনগুনের হাত থেকে বেলন নিয়ে বলল,

“দুপুরে তোমার পরীক্ষা আছে। তুমি একটা ন্যাপ নাও। তারপর উঠে আবার পড়তে বসো। শেষ পরীক্ষা কোনোভাবেই খারাপ হওয়া যাবে না। কথায় আছে, শেষ ভালো যার সব ভালো তার। যাও, যাও।”

গুনগুন হেসে বলল,

“ঠিক আছে। রেস্টুরেন্ট কবে ওপেন করছেন?”

“আগামী পরশু। আজ তোমার পরীক্ষাটা ভালোই ভালো শেষ হোক। সময় কত দ্রুত চলে যায় তাই না?”

“সময় দ্রুত গেল নাকি?”

“তাই তো। এইযে অনার্স শেষ তোমার। কিছুদিন পর রেজাল্ট দেবে। গ্রাজুয়েট হয়ে যাবে আমার বউ। তাড়াতাড়ি বড়ো হয়ে যাচ্ছ।”

গুনগুন শব্দ করে হেসে ফেলল। হাসতে হাসতে বলল,

“আমি আগেও বড়ো ছিলাম, মিস্টার। আপনার সাথে যখন আমার দেখা হয়, পরিচয় হয় তখন আমি অনার্স ফাইনাল ইয়ারেই ছিলাম। কোনো বাচ্চা ছিলাম না।”

“কী রাগি ছিলে তখন তুমি!”

“এখন রাগি নই?”

“এখনো রাগি। তবে এখন রাগের মধ্যেও ভালোবাসা খুঁজে পাই।”

“ভালোবাসা খুঁজে পাওয়ার তো কারণ আছে।”

“কী কারণ?”

“আপনিও তো আগের থেকে কত পরিবর্তন হয়েছেন। নিজের পরিবর্তন দিয়েই তো আমার মন জয় করেছেন।”

“হাহ্! সেই দুঃখের কথা আর বোলো না! যাই হোক, অনার্সের পর কী করবে?”

“মাস্টার্স করব।”

“ঠিক আছে। তারপর তোমার স্বপ্ন কী?”

“উমম! এখন বলব না। পরীক্ষা শেষ হলে বলব।”

“ঠিক আছে।”

“আপনি রেস্টুরেন্টের নাম কী ঠিক করেছেন বললেন না তো?”

প্রণয়ও ভ্রু উঁচিয়ে গুনগুনের মতো করে বলল,

“উমম! এখন না, যেদিন ওপনিং হবে সেদিন বলব।”

“আপনি খুবই খারাপ!”

“হ্যাঁ, প্রথম থেকেই। এখন ঘুমাতে যাও।”

“ঠিক আছে।”

রাত জেগে পড়েছে বলে গুনগুনের চোখেও ঘুম ছিল। তাই আর সে কথা না বাড়িয়ে ঘুমাতে চলে গেল।


সকালে গুনগুন ঘুম থেকে উঠে রেডি হয়ে নিল। প্রণয় ঘুমাচ্ছে দেখে গুনগুন আর ডাকল না। নিজেই নাস্তা করে সাড়ে এগারোটার দিকে চলে গেল ভার্সিটিতে। আজ বের হতে একটু দেরি হয়ে গেছে। এখন ঠিক সময়ে পৌঁছাতে পারলেই হয়।

কিন্তু গুনগুনের ভাগ্য মোটেও সহায় হলো না। মাঝ রাস্তায় রিকশা ন’ষ্ট হয়ে গেল।রিকশাওয়ালা খুবই দুঃখী দুঃখী কণ্ঠে বলল,

“আম্মা, অন্য রিকশায় যান।”

কান্না পাচ্ছিল গুনগুনের। এই মাঝরাস্তায় সে আদৌ ফাঁকা, খালি রিকশা কি পাবে? তবুও আশাবাদী হয়ে রিকশা থেকে নেমে সে পথের দিকে তাকিয়ে ছিল। একটু পরপর ঘড়িতে সময়ও দেখছিল। সময় যতটা দ্রুত চলে যাচ্ছে ততটা দ্রুত হয়তো গাড়িও চলছিল না। উপায়ন্তর-হীন হয়ে গুনগুন যখন প্রণয়কে কল করবে ভাবল, তখন একটা সাদা রঙের প্রাইভেট কার এসে ওর সামনে থামল। জানালার কাচ নামতেই দেখতে পেল শোয়েব শিকদারকে। গুনগুনের গলায় আইডি কার্ড ঝোলানো দেখে তিনি জিজ্ঞেস করলেন,

“ভার্সিটিতে যাচ্ছ?”

গুনগুন মাথা নাড়িয়ে সালাম দিল আগে। বলল,

“আসসালামু আলাইকুম, আঙ্কেল। হ্যাঁ, ভার্সিটিতেই যাচ্ছিলাম। মাঝরাস্তায় রিকশাটা নষ্ট হয়ে গেল।”

শোয়েব শিকদার গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে বললেন,

“ওঠো। তোমাকে পৌঁছে দিচ্ছি।”

গুনগুন আগেপিছে আর না ভেবে গাড়িতে উঠে বসল। শোয়েব শিকদার গুনগুনের চিন্তিত মুখ দেখে জিজ্ঞেস করলেন,

“তোমাকে এত চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন?”

“আমার আজ পরীক্ষা আছে! ভয় হচ্ছে সময়মতো পৌঁছাতে পারব কিনা!”

“টেনশন করো না।”

বলে শোয়েব শিকদার বড়ো ছেলে সায়েমকে বললেন,

“গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে দাও, সায়েম।”

গুনগুন বলল,

“ওহ! এটা সায়েম ভাইয়া? খেয়ালই করিনি! ভাইয়া, ভালো আছেন?”

সায়েম লুকিং গ্লাসে গুনগুনের দিকে তাকিয়ে বলল,

“ভালো। তুমি?”

“আলহামদুলিল্লাহ্‌।”

গুনগুনের ডিরেকশন অনুযায়ী সায়েম ওকে ভার্সিটিতে পৌঁছে দিল। এত তাড়াহুড়োর মধ্যে ছিল যে, গুনগুন ঠিকমতো ধন্যবাদও দিতে পারল না। কোনোরকম বিদায় নিয়েই এক্সাম হলে চলে গিয়েছে।

দশ মিনিট লেট হলেও গুনগুনের পরীক্ষা ভালো হয়েছে। সবগুলো প্রশ্নের উত্তরও করতে পেরেছে সে। পরীক্ষা শেষ করে রাধিকার সাথে কথা বলতে বলতে যখন হাসিমুখে ভার্সিটি থেকে বের হচ্ছিল, তখন প্রণয়কে দেখতে পেল। বাইকে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

প্রণয়কে দেখে গুনগুন আরো খুশি হয়ে গেল। রাধিকাকে বিদায় দিয়ে প্রণয়ের কাছে গিয়ে বলল,

“আপনি এখানে?”

“তোমাকে নিতে এলাম।”

বলে একটা জুসের বোতল বাড়িয়ে দিল গুনগুনের দিকে। গুনগুন হেসে বলল,

“থ্যাঙ্কিউ।”

“সকালে ডাক দাওনি কেন? আমি না বললাম তোমাকে দিয়ে যাব?”

“আপনাকে আরাম করে ঘুমাতে দেখে আর ডাকতে ইচ্ছে হয়নি।”

“ডাকা উচিত ছিল। এরকম আর করবে না।”

প্রত্যুত্তর না করে গুনগুন মাথা নাড়াল। এরপর প্রণয় বাইক স্টার্ট দিল। গুনগুন বাইকে উঠে শোয়েব শিকদারের কথা বলল, সাহায্য করার কথা বলল। প্রণয়ের বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। একদম স্বাভাবিক। না রাগ, আর না কিছু জানার কোনো আগ্রহ। অবশ্য এটাই তো স্বাভাবিক। সবকিছু তো আর চাইলেই হুট করে ঠিক হয়ে যায় না। তবে গুনগুনকে অনেকদিন বাদে আজ বেশ প্রাণোচ্ছল লাগছে। তার কণ্ঠে খুশির রেশ। কথা বলছিল খুব উচ্ছাস নিয়ে। প্রণয়ের খুব ভালো লাগছিল ওর কথাগুলো শুনতে। এক পর্যায়ে বলল,

“মনে হচ্ছে আজ তুমি খুব খুশি?”

গুনগুন উচ্ছাস ধরে রেখেই বলল,

“ভীষণ! পরীক্ষা শেষ হওয়ার মতো শান্তি আর কিছুতে নেই।”

“এরপর প্ল্যান কী? পরীক্ষা শেষ হলে বলবে বলেছিলে।”

“আইইএলটিসের প্রিপারেশন নেব এখন।”

প্রণয় কিছুটা থমকাল। ভুল শুনেছে ভেবে আবার জিজ্ঞেস করল,

“কী করবে?”

গুনগুন পূণরায় বলল,

“আইইএলটিসের প্রিপারেশন নেব। আইইএলটিস দেবো।”

প্রণয় বিস্ময়ের সহিত জিজ্ঞেস করল,

“কেন!”

“কেন মানে? আমার মায়ের ইচ্ছে ছিল দেশের বাইরে পড়ার। কিন্তু সেই স্বপ্ন তো তার পূরণ হয়নি। তাই এতদিন মায়ের অপূর্ণ স্বপ্ন আমি বুকে লালন করে এসেছি। এবার সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার পালা। দেশের বাইরে যাব আমি মাস্টার্স করতে।”

সঙ্গে সঙ্গে প্রণয় বাইক থামিয়ে ফেলল।

চলবে…

[বিঃদ্রঃ ছোটো পর্ব বলে কেউ অভিযোগ কইরেন না। আগামীকাল আমার দুটো ক্লাস টেস্ট আছে। লেখার একদম সময় পাব না আজ। তাই যতটুকু এখন লিখতে পেরেছি পোস্ট করে দিলাম।]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply