প্রণয়ে_গুনগুন
পর্ব_২৪
মুন্নিআক্তারপ্রিয়া
প্রণয় আবার দা তুলেছে কো’প দেওয়ার জন্য। সেই মুহূর্তে বিপ্লব দৌঁড়ে এসে পেছন থেকে প্রণয়কে জাপটে ধরল। মাসুদও এলো তখন।অনেক ধস্তাধস্তি করে ওর হাত থেকে দা-টা নিয়ে মাটিতে ফেলে দিয়েছে। প্রণয়ের তবুও থামার কোনো নাম নেই। ও ইচ্ছেমতো মাটিতে পড়ে থাকা ছেলেটিকে লা’ত্থি দিচ্ছে। ছেলেটার হাত থেকে গলগল করে তাজা র’ক্ত পড়ছে। চারপাশে অজস্র মানুষ জড়ো হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। প্রায় প্রতিটা মানুষের হাতে ফোন। সবাই ভিডিয়ো করছে।
গুনগুন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মাথা ঘুরাচ্ছে ওর। ওর দুচোখে পানি। কী থেকে কী হলো কিছুই বুঝতে পারছে না সে। কুলসুম এসে তখন গুনগুনকে ধরল। গুনগুন কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“ওকে থামান!”
কথাগুলো যেন তার নিজের কানেই পৌঁছাল না ঠিক করে। খুব হইচই হচ্ছে এখানে। মানুষের ভিড় আরো অস্বস্তিতে ফেলে দিচ্ছে ওকে। প্রণয়ের রাগ, পাগলামি কমেনি এখনো। গুনগুন নিজেই এগিয়ে গেল প্রণয়ের কাছে। বিপ্লব ও মাসুদের সাথে সেও প্রণয়ের হাত ধরে টানছে আর মা’র’তে নিষেধ করছে। ডাব নিয়ে আসার সময় যখনই দেখেছে ছেলেটা গুনগুনকে স্পর্শ করেছে, তখনই ডাব রেখে প্রণয় দা নিয়ে দৌঁড়ে এসেছে। এত সহজে তার রাগ কমবে না। সে উন্মাদের মতো বলছে,
“আমাকে তোমরা ছাড়ো। ওর হাত শরীর থেকে আলাদা করতে না পারলে আমি শান্তি পাব না। এই বা’স্টা’র্ড আমার বউয়ের গায়ে হাত দিয়েছে!”
মেলার আয়োজন খুব বড়োসড়ো করে করা হয়েছে বলে এখানে পুলিশও ছিল দায়িত্বে। হইচই ও মানুষজন জড়ো হতে দেখে তারাও চলে এসেছে। মাটিতে শুয়ে হাত নিয়ে ছেলেটা র’ক্তা’ক্ত অবস্থায় কাতরাচ্ছে। পুলিশের একজন এসে তখন প্রণয়কে অ্যারেস্ট করল। মাসুদ এবং বিপ্লব তাদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করলে অন্য পু্লিশ বলল,
“কিছু বলার থাকলে থানায় গিয়ে বইলেন।”
পাশ থেকে গুনগুন চিৎকার করে বলল,
“ওর কোনো দোষ নাই। ও কিছু করে নাই।”
পুলিশ গুনগুনের কথায় কোনো কান দিচ্ছে না। গুনগুন প্রণয়কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। এজন্য পুলিশ প্রণয়কে টেনেও নিয়ে যেতে পারছে না। অবশেষে পরাস্ত হয়ে বিপ্লবকে বলল,
“উনি কে? ওনাকে বলেন আমাদের কাজে কোনো বাঁধা না দিতে।”
বিপ্লব গুনগুনকে শান্ত করে বলল,
“আমি দেখছি বিষয়টা, গুনগুন। প্রণয়ের কিছু হবে না। তুমি ছাড়ো এখন ওকে।”
গুনগুনের চোখে পানি ও রাগ। সে কিছুতেই প্রণয়কে ছাড়বে না। সে আরো জোরে চিৎকার করে বলল,
“না! আমার প্রণয় কিছু করে নাই। আপনি ওদেরকে বলেন, আমার প্রণয়কে ছেড়ে দিতে। যা করার ঐ জা’নো’য়া’র করছে। আমাকে বাজেভাবে টাচ করছে। আমার প্রণয় কিচ্ছু করে নাই, কিচ্ছু না।”
উপস্থিত অনেকে তখন প্রণয়ের পক্ষ নিয়ে বলতে লাগল,
“দেশে আইন যখন নাই, তখন নিজের বিচার নিজেরই করা লাগে। আপনারা কী হয়েছে তা না শুনে আগেই একজনকে তো অ্যারেস্ট করতে পারেন না।”
পুলিশ কোনোভাবেই সামনে আগাতে পারছিল না। প্রণয় তখন জোর করে গুনগুনকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,
“তুমি কোনো চিন্তা কোরো না। আমি ফিরে আসব।”
গুনগুনকে ছাড়ানোর পর দুজন পুলিশ প্রণয়কে নিয়ে যাচ্ছিল। বাকি দুজন আহত ছেলেটাকে ধরে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল। রাগে-জিদ্দে গুনগুন তখন মাটিতে পড়ে থাকা দা নিয়ে পেছন থেকে আহত ছেলেটাকে কো’প দিতে গেলে বিপ্লব গিয়ে পেছন থেকে গুনগুনকে ধরে ফেলল। নিজেকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে গুনগুন বলতে লাগল,
“আমাকে ছাড়েন! এই কু’ত্তার বা’চ্চাকে আমি জানে মে’রে ফেলব।”
“শান্ত হও গুনগুন প্লিজ!”
পুলিশের গাড়িটা প্রণয়কে নিয়ে চোখের আড়াল হতেই গুনগুন চিৎকার করে উঠল। কিছু মানুষজন এগিয়ে এসে বলল,
“চিন্তা কইরেন না। আমরাও যাব আপনাদের সাথে থানায়।”
বিপ্লব নিষেধ করল না। বরং এতে ভালোই হয়েছে আরো। স্থানীয় মানুষজন পাশে থাকলে প্রণয়কে ছাড়াতে আরো সহজ হবে। গুনগুনকে বাসায় রেখে আসতে চাইলে গুনগুন মোটেও রাজি হয়নি। তাই বাধ্য হয়ে ওকে সাথে নিয়েই সবাই মিলে থানায় গেল।
পথিমধ্যে বিপ্লব ফোনে পরিচিত এক উকিলের সাথে কথাও বলেছে। তবে তিনি এই মুহূর্তে আসতে পারবেন না। আগামীকাল সকালে দেখা করবেন। বিপ্লব এটাও জানে যে, এখন ওরা যে থানায় যাচ্ছে এতেও খুব একটা লাভ হবে না। তবে একটা চেষ্টা তো করাই যায়। গুনগুনের দিকে তাকালেই ভীষণ খারাপ লাগছে ওর। কীভাবে এখনো মেয়েটা কেঁদেই যাচ্ছে!
থানায় পৌঁছানোর পর ওসি তানিম শিকদারের সাথে দেখা হলো। বয়স খুব বেশি বলা যাবে না। মোটামুটি একটা বয়স। দেখতে ভালো, সুদর্শন বলা যায়। তবে কথাবার্তা গা ছাড়া স্বভাবের। ওদের সামনে চেয়ারে বসে দুলসে। গুনগুনকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“উনি কে?”
গুনগুন এখন আর কাঁদছে না। চোখের পানি শুকিয়ে গালে লেপ্টে চিটচিটে হয়ে আছে। চোখমুখ শক্ত। গম্ভীর কণ্ঠে গুনগুন নিজেই বলল,
“আমি প্রণয়ের ওয়াইফ।”
“প্রণয় কে? আসামি যে?”
গুনগুন প্রতিবাদী কণ্ঠে বলল,
“আসামি না। সে আমার স্বামী। একজন স্বামী হিসেবে তার বউয়ের জন্য যেরকম পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন ছিল, সে ঐ পদক্ষেপটাই নিয়েছে। কোনো অন্যায় করেনি।”
ওসি তানিম শিকদার হাসলেন। সোজা হয়ে বসে টেবিলের ওপর দুহাত রেখে বললেন,
“ম্যাডাম, আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য তো আমরা ছিলাম। নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়া কি ঠিক হয়েছে?”
“আপনার বউকে আপনার সামনেই কেউ বাজেভাবে টাচ করলে আপনি কী করতেন? আইনের অপেক্ষায় থাকতেন? পুলিশের অপেক্ষায় থাকতেন?”
তানিম শিকদারের হাসিটা মিলিয়ে গেল। তীক্ষ্ণ চোখে এখন সে গুনগুনকে পরখ করছে। মেয়েটার মধ্য তেজ, অদম্য জেদ দুটোই আছে। সাথে আছে বুক ভরা সাহস। তিনি আবার হাসলেন। উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,
“সব শুনলাম, বুঝলাম। কিন্তু আপাতত এখন আর এ নিয়ে কথা বলতে পারছি না। বাসায় ফিরতে হবে আমার। কাল আপনাদের পক্ষের উকিলকে নিয়ে আসবেন। ছেড়ে দেওয়া সম্ভব হলে ছেড়ে দেবো, নয়তো কোর্টে চালান করে দেবো।”
বিপ্লব অবাক হলো না। সে জানত এরকম কিছুই হবে। গুনগুন কিছু বলতে গেলে, বিপ্লব ওর হাতের ওপর হালকাভাবে হাত রেখে, চোখ দিয়ে ইশারা করল কিছু না বলার জন্য। কারণ বেশি চাপাচাপি করলে তখন ওসি পুরো কেসটাকে আরো ঘেটে দিতে পারে। গুনগুন তাই চুপ হয়ে গেল।
ফ্লোরে বসে খাটের সাথে হেলান দিয়ে আছে গুনগুন। মাথায় শুধু আজকের ঘটনাই ঘুরছে। ওসি তানিম শিকদার চলে যাওয়ার পর ওদেরকেও বাধ্য হয়ে চলে আসতে হয়েছে।আসার সময় প্রণয়ের সাথে গুনগুন দেখা করেনি। কারণ সে নিজেকে সামলাতে পারবে না। প্রণয়কেও এভাবে দেখতে পারবে না। বিপ্লব আর মাসুদ গিয়ে প্রণয়ের সাথে দেখা করে এসেছে এবং কোনো চিন্তা করতে নিষেধ করেছে। কিন্তু তখনো প্রণয়ের নিজের জন্য কোনো চিন্তা ছিল না। নিজের জন্য সে কোনো ভয় পায় না। বিপ্লবকে বলেছিল,
“আমার জন্য আপনাদের কোনো চিন্তা করতে হবে না। আপনারা আমার গুনগুনকে দেখে রাইখেন। ওর খেয়াল রাইখেন।”
কুলসুম শুকনো মুখে রুমে এলো। হাতে খাবারের প্লেট। নিঃশব্দে গুনগুনের পাশে বসল। কয়েক সেকেন্ড নিরবতা দুজনের মধ্যেই বিরাজ রইল। এরপর হঠাৎ-ই কুলসুম কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“আমাকে তুমি ক্ষমা করে দাও, গুনগুন! আজ যা হয়েছে সব আমার জন্যই হয়েছে। সব দোষ আমার। আমি যদি মেলায় যাওয়ার জেদ না করতাম, তাহলে আজ এসব কিছুই হতো না।”
গুনগুন দীর্ঘশ্বাস নিল। সোজা হয়ে বসে কুলসুমের হাত ধরে বলল,
“নিজেকে কেন দোষারোপ করছেন? বিশ্বাস করেন, এখানে আপনার কোনো দোষ নেই আপু। প্রথমবার যখন প্রণয়কে আমার জন্য বেপরোয়া হতে দেখেছিলাম, তখন আমিও আপনার মতোই আমাকে দোষারোপ করেছিলাম বারবার। আসলে নিয়তি ভাগ্যে লেখা থাকে। হাতে না। আমাদের সাথে যা হয়, তার পেছনে কিছু না কিছু কারণ তো অবশ্যই থাকে। আজ যা হয়েছে তার পেছনেও নিশ্চয়ই কোনো নো কোনো কারণ আছে। আমার আল্লাহর ওপর ভরসা আছে। তিনি সব ঠিক করে দেবেন। সাময়িক সময়টা শুধু খারাপ যাচ্ছে আমাদের। এটুকু সময়ও কেটে যাবে ইন-শা-আল্লাহ্। আপনি শুধু শান্ত হোন। আপনার ওপর আমার কোনো রাগ, অভিমান কিছু নেই। বরং এসব বলে আপনি আমাকে আরো লজ্জিত করছেন।”
কুলসুম গুনগুনের মাথায় হাত রেখে বলল,
“তুমি খুব স্ট্রং গুনগুন খুব। এবং অবশ্যই খুব ভালো মনের একটা মেয়ে। আল্লাহ্ কখনোই তোমার কোনো খারাপ করবে না ইন-শা-আল্লাহ্।”
গুনগুন মনে মনে হাসল। বিষাদের হাসি। সে কতটা স্ট্রং বাইরে থেকে দেখাচ্ছে তা সে জানে না। কিন্তু ভেতরে ভেতরে যে সে প্রণয়ের জন্য গুমড়ে গুমড়ে ম’র’ছে এটা সে খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে।
“এখন অল্পটুকু খেয়ে নাও।” বলল কুলসুম।
গুনগুনের চোখে পানি টলমল করছে। চোখের কর্ণারে থাকা পানিটুকু মুছে বলল,
“না, আপু। প্রণয়কে ছাড়া আমার গলা দিয়ে খাবার নামবে না। খেলে আমি ও আসার পরই খাব। ওর হাতেই খাব।”
কুলসুমের দুচোখ জলে ভরে উঠল। বোকা একটা মেয়ে! মুখে মুখে বলে প্রণয়কে ভালোবাসে না, অথচ মেয়েটা যে প্রণয়কে নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসতে শুরু করেছে তা সে নিজেও জানে না!
থানায় আজ নাইট ডিউটির দায়িত্বে আছেন সেলিম শিকদার। অনেক বছর ধরে তিনি কনস্টেবলের কাজ করছেন। ভীষণ ভালো মানুষ। প্রণয়কে থানায় আনার পর তিনি সবটাই দেখেছেন ও শুনেছেন বাকিদের থেকে। গুনগুনকেও দূর থেকে দেখেছেন তিনি। প্রণয়ের খাবার নিয়ে এসে বললেন,
“তোমার খাবার।”
প্রণয় হাঁটুর ওপর দুহাত রেখে মাথা নত করে বসে ছিল। কনস্টেবলের ডাক শুনে মাথা তুলে বলল,
“খাব না। নিয়ে যান।”
“কেন খাবে না?”
প্রণয় কোনো জবাব দিল না। সেলিম তালুকদার বললেন,
“যার হাতে কোপ দিয়েছ, ওর হাত পুরোপুরি কে’টে পড়ে না গেলেও ঐ হাত অচল হয়ে গেছে। ঐ হাত দিয়ে আর কিছু করতে পারবে না।”
“ভুল হয়ে গেছে আমার।”
সেলিম তালুকদার হকচকিয়ে গেলেন। প্রণয় কি তবে ভয় পেয়েছে? তা-ই হবে নিশ্চয়ই। তখন হয়তো রাগ কন্ট্রোল করতে পারেনি। আর এখন মাথা ঠান্ডা হওয়ার পর নিজের ভুলটা বুঝতে পেরেছে। কিন্তু এখন আর ভুল বুঝেই বা লাভ কী? সমস্যা তো যা হওয়ার হয়েই গেছে।
সেলিম তালুকদার এখনো প্রণয়ের দিকে তাকিয়ে আছেন। প্রণয় বসা থেকে উঠে তার দিকে এগিয়ে এসে বলল,
“আমার উচিত ছিল ওর গলায় কো’প দেওয়া। তাহলে পুরো দেহটাই অচল হয়ে যাইত।”
চলবে…
Share On:
TAGS: প্রণয়ে গুনগুন, মুন্নি আক্তার প্রিয়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
তুষারিণী পর্ব ৭
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ২০
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ২৫
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৩
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৫
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৬
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৯
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১৭
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৮
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ২১