প্রণয়ে_গুনগুন
পর্ব_২২
মুন্নিআক্তারপ্রিয়া
বিপ্লব কল করেছিল প্রণয়কে। এই শুক্রবারেই কুলসুমের সাথে ওদেরকে সিলেট যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে আবার। ‘দেখি’ বলে কল রাখার পর প্রণয় যখন গুনগুনের দিকে তাকাল তখন গুনগুন বলল,
“আমি সিলেট যেতে চাই।”
“ঠিক আছে। তাহলে তো আর কোনো কথাই নেই। আমরা সিলেটে ঘুরতে যাচ্ছি।”
“আপনি আগে কখনো গিয়েছিলেন?”
“হ্যাঁ, কলেজ লাইফে একবার গিয়েছিলাম। তুমি?”
“উঁহুম! কখনো যাইনি।”
“তোমার ঘুরতে ভালো লাগে না?”
“আমি আসলে ঐভাবে কখনো কোথাও ঘুরিনি। আমার ফ্রেন্ড সার্কেলও খুব ছোটো ছিল। ওদের সাথে আমার বন্ধুত্ব ছিল স্কুল আর কলেজের গণ্ডি পর্যন্তই। এরপর ভার্সিটিতে উঠে রাধিকার সাথে পরিচয় হলো। কীভাবে যেন ওর সাথে ভাইব ম্যাচ করে গিয়েছিল। তাই এখন আমাদের এত ভালো বন্ধুত্ব। মাকে হারানোর পর আমি ছোটোবেলা থেকে পড়াশোনা নিয়েই ব্যস্ত থাকতাম। কলেজে ওঠার পর টিউশনি করাতাম। এটুকুই ছিল আমার জীবন।”
প্রণয় গুনগুনের ভেতরের আক্ষেপটুকু স্পষ্ট টের পাচ্ছে। কত না বলা কথা, অভিযোগ, না পাওয়া যে এই মেয়েটাকে এতটা জেদি বানিয়েছে তা এখন একটু একটু করে প্রণয় বুঝতে পারছে। সবাই শুধু বাইরের রাগটুকু দেখে, ভেতরের দহনটুকু কেউ দেখে না। জানতেও চায় না কোনো কারণ। প্রণয় গুনগুনের হাত ধরে বলল,
“সমস্যা নেই। পুরো বাংলাদেশ তো তোমাকে ঘুরাবই। এমনকি আল্লাহ্ চাইলে ওয়ার্ল্ড ট্যুরও দেবো তোমায় নিয়ে।”
গুনগুন মৃদু হেসে বলল,
“আল্লাহ্ কবুল করুক।”
চুলায় চা বসিয়েছিল প্রণয়। চা কতটুকু হয়েছে দেখার জন্য রান্নাঘরে গেল তাই। আজকাল গুনগুন চা খাওয়া শুরু করেছে। এখন আর রাতে ঘুম নিয়ে চিন্তা করতে হয় না। প্রণয় প্রতিদিন চুলে হাত বুলিয়ে বিলি কেটে দেয়। কখন যে আরামে গুনগুন ঘুমিয়ে যায় টেরও পায় না। এক কাপ কেন, এখন বালতি ভরে চা খেলেও গুনগুন রাতে ঘুমাতে পারে। এখন চা-ই বরং গুনগুনকে ভয় পায়; গুনগুন নয়।
প্রণয় চুলার আঁচ কমিয়ে রুমে ফিরে এসে দরজার সামনে দাঁড়াল। রেড ওয়াইন রঙের ড্রেসে জানালার পাশে বসে আছে গুনগুন। বিকেলের আলো এসে লালচে আভা ফেলেছে তার গালজুড়ে। চুলগুলো নরম ঢেউ তুলে কাঁধ ছুঁয়ে নেমে এসেছে। চারপাশ যেন থেমে আছে, শুধু প্রণয়ের দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে গুনগুনের ওপর।
প্রণয় এমনভাবে তাকিয়ে আছে, যেন প্রথমবার দেখছে তাকে। সেই চাহনিতে মুগ্ধতা আছে, বিস্ময় আছে, আর গভীর এক অধিকারবোধও আছে। গুনগুন টের পায়, ওর বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত কাঁপন উঠছে। হাতের আঙুলগুলো অকারণে জড়িয়ে যাচ্ছে। লজ্জায় চোখ নামিয়ে নেয় সে, তবু ঠোঁটের কোণে লাজুক হাসি ফুটে ওঠে। নিজের অস্থিরতাটুকু আড়াল করতে হালকা হেসে বলল,
“কী দেখছেন ওভাবে?”
প্রণয় একটু এগিয়ে এল। চোখ সরাল না এক মুহূর্তও। নিচু স্বরে বলল,
“আমার বউপাখিকে। দেখছি আর ভাবছি।”
‘বউপাখি’ শব্দটা গুনগুনের বুকের ভেতর নরম করে ছুঁয়ে গেল। বুকের অন্তরালে এক গভীর অনুভূতির স্পর্শ টের পেল সে। মুহূর্তেই গাল আরও লাল হয়ে উঠল। সে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল,
“কী ভাবছেন?”
প্রণয় মৃদু হেসে বলল,
“ভবিষ্যতে তোমায় নিয়ে একটা বই লিখব।”
গুনগুন অবাক হয়ে তাকাল। চোখে কৌতূহল, ঠোঁটে চাপা হাসি। চাপাস্বরে জিজ্ঞেস করল,
“বই?”
প্রণয় ধীরে ধীরে তার কাছে এসে দাঁড়াল। আঙুলের ডগা দিয়ে আলতো করে গুনগুনের গালে ছুঁয়ে মুচকি হেসে বলল,
“হ্যাঁ। আর শুরুটা কেমন হবে জানো?”
গুনগুনের গলা শুকিয়ে আসছে। তবুও সে বিস্ময় নিয়ে জানতে চাইল,
“কেমন?”
প্রণয় নিজের গালে হাত রেখে মুচকি হেসে বলল,
“সোনালি চুলের একটা মেয়ে। নাম তার গুনগুন। সে যখন হাসে, চারপাশে বসন্ত নেমে আসে। সে যখন অভিমান করে, আকাশটাও মেঘলা হয়ে যায়। আর আমি এক বখাটে প্রেমিক, তার সেই হাসির জন্য যু’দ্ধ করি প্রতিদিন।”
গুনগুনের চোখ ভিজে ওঠে অকারণে। বুকের ভেতরটা কেমন শীতল হয়ে গেছে। সে আস্তে করে প্রণয়ের শার্টের কলার আঁকড়ে ধরে বলল,
“তাহলে বইটা শেষ হবে কীভাবে?”
প্রণয় গুনগুনের কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বলল,
“শেষ হবে না তো! কারণ আমাদের গল্পের কোনো শেষ নেই। যতদিন আমার বউপাখি থাকবে, ততদিন বইটা চলতেই থাকবে।”
গুনগুন মাথা নাড়িয়ে বলল,
“বেশ তো! আমি অপেক্ষায় থাকব আপনার বইয়ের জন্য।”
“আর আমি থাকব আমার বউয়ের মনটা একটুখানি গলার জন্য। কবে যে আমায় একটু কৃপা করবে সে!”
গুনগুন ঠোঁট টিপে হেসে বলল,
“কী জানি! চেষ্টা করতে থাকেন। হতে পারে খুব শীঘ্রই আপনার ইচ্ছে পূরণ হবে।”
আনন্দে ও খুশিতে প্রণয়ের চোখদুটো চকচক করে উঠল। সে লাফ দিয়ে গিয়ে গুনগুনের পাশে বসে বলল,
“কী বললে?”
গুনগুন প্রণয়ের বুকে শাহাদাৎ আঙুল দিয়ে হালকা ধাক্কা দিয়ে বলল,
“যা বলার একবারই বলেছি। বারবার রিপিট করতে পারব না।”
“কেন? কেন? বলো না আরেকবার?”
“উঁহুম! গুনগুন কথা রিপিট করতে পছন্দ করে না।”
প্রণয় মাথা দুলিয়ে হাসতে হাসতে বলল,
“তোমার এই এটিটিউডটাই আমি পছন্দ করি।”
প্রত্যুত্তরে গুনগুন মাথা নত করে মুচকি হাসল।
শুক্রবারে সিলেট যাওয়ার কথা থাকলেও ওরা রওনা দিয়েছে বৃহস্পতিবার রাতেই। কারণ দিনে যানজট অনেক বেশি থাকে। জার্নি করতে কষ্ট হয়ে যাবে। সায়েদাবাদ পৌঁছে মাসুদ গোমড়ামুখে বলল,
“শুধু শুধু আমারে লগে নিয়া যাইতাছস।”
কুলসুম বলল,
“শুধু শুধু আবার কী? তোর ভাইয়া বারবার করে বলেছে তোকে সাথে নিয়ে যেতে।”
“তা তো বলবই। তোমরা কাপলরা মিইল্যা ঘুরবা, আর আমি অসহায়ের মতো তাকাইয়া দেখুম।”
প্রণয় ওর কাঁধে হাত রেখে বলল,
“আরে চিল! একটা সিলেটি পুরী খুঁজে দেবো তোর জন্য এবার।”
মাসুদ রাগ দেখিয়ে কাঁধ থেকে প্রণয়ের হাত সরিয়ে দিয়ে বলল,
“হ, হইছে থাক। আমারে এহন ভুজুংভাজুং বুঝাইতে হইব না। চিল কইয়া কইয়া নিয়া যাইবি, পরে দেখুম একটা কাউয়াও জুটতাছে না।”
গুনগুন ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কেন? জুটবে না কেন? নিজের প্রতি আপনার একটুও কনফিডেন্স নেই?”
“প্রণয়, তোর বউরে কইস আমার পায়ে পাড়া দিয়া যেন ঝগড়া করতে না আহে। আমি কিন্তু…”
প্রণয় জিজ্ঞেস করল,
“তুই কিন্তু কী?”
“আমি কিন্তু ওরে ডরাই।”
কুসুম হেসে বলল,
“হা’রাম’জা’দা একটা!”
মাসুদ বলল,
“আমি সিরিয়াস। প্রণয় বাসে তুই আমার লগে বইবি।”
প্রণয় ব্যাগ হাতে নিয়ে বলল,
“হ, আমার তো আর খেয়ে-দেয়ে কাজ নাই। তুই কুলসুমের সাথে বসবি।”
মাসুদ নাক-মুখ কুঁচকে কুলসুমকে বলল,
“এই হা’লা’য় এমন বউপাগল হইল কেমনে আমি এইডাই বুঝতে পারলাম না অহনো।”
গুনগুন বাসে ওঠার আগে পিঞ্চ মেরে বলল,
“এটা বুঝতে হলে আগে বিয়ে করতে হবে। চেষ্টা করে দেখেন আপনাকে কেউ বিয়ে করতে রাজি হয় কিনা। তখন আপনিও বুঝতে পারবেন, প্রণয় কেন এরকম বউপাগল হলো।”
মাসুদ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। গুনগুন ততক্ষণে বাসে উঠে গেছে। কুলসুম বলল,
“কীরে গা’ধা যাবি না?”
“খাড়া। ওয় কি আমারে খোঁচা মারল দোস্ত?”
কুলসুম দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল,
“মাথামোটা একটা!”
মাসুদ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে মাথায় হাত রাখল। কুলসুম বাসে উঠে গেছে দেখে সেও উঠতে উঠতে বলল,
“ঐ দাঁড়া, আমার মাথা মোটা কই? ঠিকই তো আছে।”
গুনগুন জানালার পাশে বসেছে। ওর পাশে প্রণয়। ওদের অপজিট সিটে মাসুদ ও কুলসুম বসেছে। প্রণয় কতগুলো খাবার কুলসুমকে দিল। এরপর গুনগুনকে বলল,
“চিপস, চকোলেট, আচার, সফট্ ড্রিঙ্কস সব আছে। যখন মন চায় খেয়ে নিবা।”
“এত খাবার কে নেয়? মাঝখানে তো ব্রেক দিবেই।”
“সমস্যা নাই। তখন দরকার হলে আবার নিব।”
“পাগল!” মৃদু হেসে বলল গুনগুন।
বাসে যেন গুনগুন আরাম করে ঘুমাতে পারে তাই নেক পিলো কিনে দিয়েছে প্রণয়। ঘণ্টাখানেক পরই গুনগুনের দুচোখে ঘুম ভর করে। জার্নি করলেই তার ঘুম পায়। বেশিক্ষণ জেগে থাকতে পারে না। প্রণয় একদম দুহাত বগলদাবা করে আঁটশাট হয়ে সিটের সাথে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে আছে। মনে হচ্ছে পাশে কোনো পর-নারী বসে আছে। গুনগুন ওর এরকম ব্যবহারে একটু বিরক্তই হলো। অনেকক্ষণ হাঁসফাঁস করে প্রণয়কে ডাকতে লাগল,
“এই? শুনছেন?”
প্রণয় চোখ খুলে বলল,
“হ্যাঁ, বলো।”
“নেক পিলোটা মনে হচ্ছে খুব শক্ত।”
“কই? দেখি?”
গুনগুনের থেকে নেক পিলো নিজে নিল, এবং নিজেরটা গুনগুনকে দিল। ঘাড়ে রেখে বলল,
“কোথায়? দুইটা বালিশই তো খুব নরম।”
গুনগুনের এবার আরো রাগ লাগছে। হঠাৎ করে এই রোমান্টিক মানুষটা বোকারাম, নিরামিষ হয়ে গেল কী করে? গুনগুন প্রণয়ের আগের বলা কথাগুলো রিপিট করে বলল,
“তাই? তাহলে আমার মাথা বোধ হয় বালিশের সাথে এডজাস্ট করতে পারছে না। আপনার কাঁধ চাচ্ছে। আমি কি আপনার কাঁধে একটু মাথা রাখতে পারি?”
মুহূর্তেই প্রণয় ফ্ল্যাশব্যাক খেল। চোখ-মুখ শক্ত করে বলল,
“না!”
গুনগুন আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। অপমানে থমথমে হয়ে আছে টুকটুকে সুন্দর মুখটা। চোখে জল এসে জড়ো হয়েছে। এই বুঝি কেঁদে ফেলবে। প্রণয় হেসে কাছে এগিয়ে বলল,
“আমি চাই, তুমি আমার বুকে মাথা রাখো। আমার বুকে আদরে মিশে থাকো।”
চলবে…
Share On:
TAGS: প্রণয়ে গুনগুন, মুন্নি আক্তার প্রিয়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১৬
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ২১
-
তুমি অজান্তেই বেঁধেছ হৃদয় গল্পের লিংক
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১৫
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১২
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১১
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১৪
-
প্রণয়ে গুনগুন গল্পের লিংক
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১৩
-
তুষারিণী পর্ব ৭