প্রণয়ে_গুনগুন
পর্ব_২০
মুন্নিআক্তারপ্রিয়া
ফোন টেবিলের ওপর রেখে চুপচাপ বসে আছে গুনগুন। প্রণয় নাস্তা নিয়ে এসে বলল,
“তোমাকে না বললাম দেখো কয়টা বাজে?”
গুনগুন নিরুত্তর। প্রণয় আর এই ব্যাপারে কোনো কথা না বলে গুনগুনকে খাইয়ে দিতে গেল। মুখের সামনে ধরে রাখা খাবারটুকু সরিয়ে গুনগুন বলল,
“আমি নিজের হাতে খেতে পারব।”
প্রণয় বিস্ময় ও কিছুটা সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকাল গুনগুনের দিকে। গুনগুনের অবশ্য কোনো ভাবাবেগ নেই। সে কোনো কথা বলছে না। প্রণয়ের দিকে তাকাচ্ছেও না। কেবল নিজের মতো করে চুপচাপ খাচ্ছে। নিরবতার মাঝে গুনগুনের চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে অদৃশ্য রহস্য। মনে হচ্ছে, কিছু একটা লুকাচ্ছে সে।
কিছুক্ষণ ঝিম মেরে বসে থেকে প্রণয় জিজ্ঞেস করল,
“আমার হাতে খাচ্ছ না কেন আজ?”
“এতকাল যখন নিজের হাতে খেতে পেরেছি, এখনো পারব। সেদিন আবেগের বশে কী না বলে ফেলেছি, সেটা ধরে সারাজীবন বসে থাকলে তো হবে না।”
“কী হয়েছে? একটু আগেও তুমি স্বাভাবিক ছিলে।”
“আমি এখনো স্বাভাবিক আছি।”
“আমি কি কিছু ভুল করেছি?”
“না।”
“তাহলে কেন রেগে আছো আমার ওপর?”
“আমি রাগ কেন করব? আমি রাগের সময় কেমন আচরণ করি আপনার জানা নেই? অযথা চিন্তা না করে, আপনিও খেয়ে নিন।”
প্রণয় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে গুনগুনকে পর্যবেক্ষণ করছে। খাবার মুখে নিয়েও গলা দিয়ে নামছিল না। তখনই গুনগুন বলল,
“আজ দুপুরে আমরা কোথাও বের না হই? শরীরটা হঠাৎ খারাপ লাগছে। মাথা-ব্যথা করছে ভীষণ। মনে হচ্ছে ঘুমটা পুরোপুরি হয়নি।”
প্রণয় একের পর এক অবাক হচ্ছে গুনগুনের হঠাৎ এরকম পরিবর্তিত আচরণ রেখে। তবে সে গুনগুনকে জোর না করে বলল,
“আচ্ছা।”
খাবার শেষ না করে প্রণয় উঠে যাচ্ছিল হাত ধোয়ার জন্য। তখন ফোনটা বেজে উঠল। ফোনের স্ক্রিনে আবারও ‘হিয়া’ নামটি ভেসে উঠেছে। গুনগুন একবার ফোনের দিকে তাকিয়ে আবারও চুপচাপ খেতে লাগল। প্রণয় ফোন রিসিভ করে কথা বলতে বলতে বেসিনে গেল হাত ধুতে। হিয়া ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে বলল,
“আপনি এখনো আসছেন না কেন? সেই কখন থেকে অপেক্ষা করেছি।”
“তোমাকে আজ আগের সময়েই পড়াব।”
“কেন? আপনি না বললেন দুপুরে আজ আপনার কাজ আছে? এজন্য দুপুরের আগে পড়াবেন। আমি তো এজন্যই রেডি হয়ে বসে আছি।”
“তোমাকে রেডি হয়ে বসে থাকতে বলেছে কে?”
হিয়া ঐপাশ থেকে নিঃশব্দে হেসে বলল,
“আপনি বুঝবেন না। শুনুন না, আপনার কাজ না থাকলে আপনি এখনই চলে আসুন। দুপুরে আজ মা আবার বাসায় থাকবে না। আপনি তো আবার খালি বাসায় পড়াবেন না আমাকে। এর আগেও একদিন আম্মু বাড়িতে ছিল না বলে আমাকে না পড়িয়েই চলে গিয়েছিলেন মনে নেই?”
প্রণয় কয়েক সেকেন্ড নিরব থেকে বলল,
“ঠিক আছে। আসছি। রাখো এখন।”
হিয়া কল কাটার পর প্রণয় ফোনটা প্যান্টের পকেটে রাখল। রুমে গিয়ে টিস্যু দিয়ে হাত মুছে বলল,
“তুমি রেস্ট নাও। আমি আসছি।”
গুনগুন ছোট্ট করে বলল,
“হু।”
প্রণয় চলে যাওয়ার পর মুখের খাবারটুকু মুখে রেখেই দরজার দিকে তাকিয়ে আছে গুনগুন। চোখ দুটো টলমল করছে। সে জানে না, কে এই হিয়া। তবে এতটুকু জানে যে, প্রণয় এখন সেই হিয়ার কাছেই যাচ্ছে। হঠাৎ করে বুকের মাঝে যেন তীব্র ঝড় শুরু হয়েছে। মনে ঢুকেছে অজানা ভয়। বাবার বলা কথাটি মনে পড়ছে বারংবার। তবে কি সে সত্যিই প্রণয়কে বিশ্বাস করে ভুল করেছে?
হিয়াদের বাড়িতে গিয়ে কলিংবেল বাজানোর পর দরজা খুলে দিল হিয়া নিজেই। লাল একটা থ্রি-পিস পরেছে। ঠোঁটে লাল লিপস্টিক, কপালে ছোট্ট লাল টিপ। দুহাতে লাল রঙের কাচের চুড়ি। প্রণয় ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। হিয়া লাজুক হাসি দিয়ে বলল,
“ভেতরে আসুন।”
প্রণয় সোজা হিয়ার রুমে চলে গেল। হিয়া দরজা লাগিয়ে রান্নাঘরে গেল আগে। প্রণয়ের জন্য চা বানিয়ে তারপর নিজের রুমে গেল। ট্রে হাতে হিয়াকে রুমে আসতে দেখে প্রণয় জিজ্ঞেস করল,
“আন্টি কোথায়?”
“ঘরে। ঘুমাচ্ছে। আপনি চা নিন।”
“রাখো।”
প্রণয় আইসিটি বইয়ের ম্যাথগুলো দেখছে যে, আজ কোনটা করাবে। হিয়া ওর সম্মুখের চেয়ারে বসে তাকিয়ে আছে প্রণয়ের দিকে। সে এত সুন্দর করে সেজে বসে আছে, অথচ প্রণয় একটাবারের মতো ফিরেও তাকাচ্ছে না। এতটা আনরোমান্টিক কোনো ছেলে মানুষ কি হতে পারে? হ্যাঁ, পারে তো। সামনের মানুষটাই তো তার জলজ্যান্ত প্রমাণ।
প্রণয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হিয়া হাতটা বারবার নাড়াচ্ছিল, যার দরুণ কাচের চুড়িগুলো অদ্ভুত রিনিকঝিনিক শব্দ তুলছিল নিরব রুমটিতে। প্রণয় বিরক্ত হয়ে বলল,
“কী সমস্যা?”
“কই কী সমস্যা?”
“এত হাত নাড়াচ্ছ কেন?”
“আপনি তাকাচ্ছেন না কেন?”
“মানে কী? চুড়িগুলো খুলে রাখো।”
“আপনি এরকম নিষ্ঠুর আর আনরোমান্টিক কেন বলুন তো? আপনার জন্য এত সুন্দর করে সেজে বসে আছি। আর আপনি বলছেন চুড়ি খুলে ফেলতে?”
“তুমি এরকম বউ সেজে কেন বসে আছো আমি তো সেটাই বুঝতে পারছি না।”
“বললাম তো আপনার জন্য। এখন বলুন আমায় কেমন লাগছে?”
প্রণয় কয়েক সেকেন্ড হিয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে শব্দ করে বইটা বন্ধ করল। দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
“জঘন্য লাগছে।”
হিয়া আশাহত হয়ে তাকিয়ে আছে। প্রণয় বলল,
“তুমি যদি তোমার এসব উলটা-পালটা আচরণ বন্ধ না করো, তাহলে আমি কিন্তু তোমার বাবা-মায়ের কাছে বিচার দেবো। এবং এই টিউশনিটাও আমি আর করাব না।”
“আপনি সবসময় কেন এমন করেন আমার সাথে?”
প্রণয় আর রাগ ধরে রাখতে না পেরে বলল,
“তোমার মাথায় কি সমস্যা আছে কোনো? বোঝো না তুমি আমার কথা? আমার বউ আছে। আমি বিবাহিত।”
“জানি আমি।”
“জানার পরও এসব আচরণ কেন করতেছ?”
“কারণ আপনাকে আমার ভালো লাগে। ভালোবাসি আমি আপনাকে। আমি আপনার দ্বিতীয় বউ হতেও রাজি আছি।”
প্রণয় বিস্ময়ে যেন কথা বলতেই ভুলে গিয়েছে। কোনো সুস্থ-স্বাভাবিক মস্তিষ্কের মেয়ে জেনে-শুনে দ্বিতীয় বউ হতে চায়? প্রণয় উঠে দাঁড়াল। বলল,
“তোমাকে পড়ানো আমার পক্ষে আর সম্ভব নয়।”
হিয়াও তখন উঠে দাঁড়াল। প্রণয়ের সামনে পথরোধ করে দাঁড়িয়ে বলল,
“আপনি এভাবে আমাকে প্রত্যাখান করে চলে যেতে পারেন না।”
“সামনে থেকে সরে দাঁড়াও বলছি।”
“না।”
“ভালোমতো কথা শুনবা নাকি তোমার মাকে ডাকব এখন আমি?”
“বাসায় এখন কেউ নেই। শুধু আপনি আর আমি।”
প্রণয় এবার আরো অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। হিয়া তাকে মিথ্যা বলেছে!
“ইফ ইউ ওয়ান্ট, উই ক্যান স্লিপ উইথ ইচ আদার বিফোর ম্যারেজ। ডু ইউ ওয়ান্না?”
প্রণয় দাঁত-মুখ খিঁচে বলল,
“একটা থা’প্প’ড় দেবো বে’য়া’দব মেয়ে। তোমাকে আমি খুব ভালো মনে করতাম। কিন্তু এখন তো দেখছি তোমার মাথার সাথে সাথে চ’রি’ত্রেও সমস্যা আছে।”
“মাথায় তো আগে সমস্যা ছিল না। আপনাকে দেখার পর থেকে হয়েছে।”
প্রণয় ওকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে যেতে চাইলে হিয়া ওর পা পেঁচিয়ে ধরে বলল,
“আপনি যদি আর এক পা সামনে আগান তাহলে কিন্তু আমি চিৎকার করব। তখন কী হবে বুঝতে পারছেন তো? সবাইকে বলব বাড়িতে একা পেয়ে আপনি আমাকে রে’ই’প করার চেষ্টা করেছেন।”
প্রণয় থম মেরে দাঁড়িয়ে আছে। বুঝতে পারছে যে, সে ফাঁদে আটকা পড়ে গেছে। এখান থেকে রাগারাগি করে বের হওয়া যাবে না। মাথাও গরম করা যাবে না। যা করার বুদ্ধি দিয়ে, কৌশলে, মাথা ঠান্ডা রেখে করতে হবে। প্রণয়কে নিশ্চুপ দেখে হিয়ার ঠোঁটে জয়ের হাসি ফুটে উঠল। সে বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে প্রণয়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলল,
“এরচেয়ে ভালো যা হওয়ার দুজনের আপোসেই হোক, কী বলেন স্যার?”
প্রণয় নিশ্চুপ। হিয়া প্রণয়ের গলায়, বুকে হাত বুলিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“কতরাত আপনাকে নিয়ে আমি স্বপ্ন দেখে কাটিয়েছি আপনি জানেন না। আপনাকে একটু ছোঁয়ার জন্য, কাছে পাওয়ার জন্য, আদর করার জন্য আমার মনটা উতলা হয়ে গেছে। আমার সারা শরীর, মন আপনার জন্য উন্মাদ হয়ে গেছে। এখন আর কোনো ছেলেকে আমার ভালো লাগে না। আমার… আমার শুধু আপনাকে চাই, আপনার আদর চাই!”
কথা বলতে বলতে হিয়া প্রণয়ের ঠোঁটে চুমু খেতে গেলে প্রণয় বাঁধা দিল। তবে এবার রাগ দেখিয়ে নয় বরং হাসিমুখে বলল,
“সব কি এখানেই হবে? নাকি রুমে যেতে পারব আমরা?”
খুশিতে ঝলমল করে উঠল হিয়ার চোখ-মুখ। সে আনন্দিত কণ্ঠে বলল,
“অবশ্যই পারি। কেন পারব না? আসুন।”
হিয়া প্রণয়ের হাত ধরে রুমে নিয়ে যাচ্ছে। প্রণয় বাঁধা দিল না। রুমে যেতে যেতে পকেট থেকে ফোন বের করে দ্রুত অডিয়ো রেকর্ডারে ঢুকে রেকর্ডার অন করে ফোনটা হাতে রাখল। হিয়া প্রণয়কে বিছানায় বসিয়ে নিজেও পাশে বসল। প্রণয় তখন ফোনটা বিছানার ওপর ফোনটাকে উপুড় করে রেখে হিয়ার দিকে তাকাল। প্রণয় জিজ্ঞেস করল,
“আমাকে কবে থেকে ভালোবাসো?”
“প্রথমদিন থেকেই।”
“যখন জানলে আমি বিবাহিত এরপরও ভালোবাসতে?”
“হ্যাঁ। আপনার বউকে নিয়ে আমার কোনো সমস্যা নেই। চাইলে তাকে রাখতে পারেন অথবা ডিভোর্সও দিতে পারেন। শুধু আমাকে একটু ভালোবাসেন, একটু আদর করেন।”
হিয়া প্রণয়কে জড়িয়ে ধরতে গেলে প্রণয় কৌশলে বাঁধা প্রদান করে হিয়ার দু হাত ধরল। হাতের পিঠে আলতো করে স্লাইড করে বলল,
“তোমার মা আজ বাসায় নেই। এরপরও আমাকে মিথ্যে বলে কেন আনলে?”
“কেন আবার? আমি তো জানি, সত্যিটা বললে আপনি আসবেন না। এই যুগে এত সৎ থাকলে হয়? আচ্ছা আপনার কখনো আমাকে দেখে মনে কোনো ইচ্ছে জাগেনি? আদর করতে মন চায়নি?”
রাগে প্রণয়ের মাথার রগ দপদপ করছিল। ইচ্ছে করছিল এখানেই হিয়াকে খু’ন করে ফেলতে। গুনগুন যদি ওর জীবনে না থাকত তাহলে হয়তো সত্যিই প্রণয় ওকে খু’ন করার জন্য দ্বিতীয়বার ভাবত না। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। তাই দাঁতে দাঁত চেপে সব সহ্য করে প্রণয় বলল,
“তুমি কি সৎ নও? আমার আগেও অন্য কাউকে ভালোবাসতে? এভাবে আদর চাইতে?”
“এসব নিয়ে কিছু বলব না। আপনার শুনতে ভালো লাগবে না।”
“না, না সমস্যা নেই বলো। নতুন জীবন শুরু করার আগে দুজনের ব্যাপারেই দুজনের জেনে নেওয়া ভালো। আমার ব্যাপারে তো তুমি সবই জানো। কিন্তু তোমার ব্যাপারে তো আমি কিছুই জানি না।”
“উমম… ঠিক আছে। বলছি। আপনার আগেও আমার এক ছেলের সাথে সম্পর্ক ছিল।”
“এখন নেই কেন?”
“এখন আমরা কেউ কাউকে আর পছন্দ করি না তাই।”
“ওহ। তোমরা ই’ন্টি’মে’ট হয়েছিলে?”
“হ্যাঁ, তিনবার।”
“আচ্ছা এখন আমি তোমাকে কীভাবে বিশ্বাস করি বলো তো? আমাকে বিয়ে করার পর তুমি যদি আবার কারো সাথে সম্পর্কে জড়াও তখন কী হবে?”
“না, একদম না। আপনাকে পাওয়ার পর আমি সব ছেড়ে দেবো।”
“তুমি যে বলো, তুমি আমাকে ভালোবাসো। অথচ তুমি আমাকে একটু আগে ব্ল্যাকমেইল করলে। তোমার প্রস্তাবে আমি রাজি না হলে, তুমি চিৎকার করবে। মানুষ জড়ো করবে। এতে আমার রেপুটেশন নষ্ট হতো। তখন সবার চোখে আমি খারাপ হয়ে যেতাম। মা’র খেতাম। তোমার কি এসব ভালো লাগত? ভালোবাসলে তো এসব করতে পারার কথা নয়।”
হিয়া এবার জড়িয়ে ধরল প্রণয়কে। প্রণয় হাত মুষ্ঠিবদ্ধ করে চোখ বন্ধ করল। দাঁতে দাঁত পিষে রাগ কন্ট্রোল করার চেষ্টা করছে সে। হিয়া বলল,
“কী করব বলুন? আপনাকে পাওয়ার নেশায় যে আমি পাগল হয়ে গেছি। কথা দিচ্ছি, একবার শুধু আমার হয়ে যান। তারপর আপনি যা বলবেন তা-ই শুনব আমি।”
“তুমি এখন কী চাচ্ছ?”
হিয়া মাথা তুলে তাকাল। আবেশিত কণ্ঠে বলল,
“আপনাকে বিয়ে করতে চাই। আর এখন চাই, আপনি আমাকে আদর করেন।”
প্রণয় জোরপূর্বক মেকি হাসি দিয়ে এক হাতে হিয়ার চুলগুলো নেড়েচেড়ে বলল,
“কিন্তু বিয়ের আগে তো আমি কোনো শারীরিক সম্পর্কে জড়াতে পারব না, হিয়া।”
“কেন পারবেন না?”
“কারণ এসব পাপ।”
হিয়া জেদ ধরল। উতলা হয়ে বলল,
“এত পাপপুণ্য আমি জানিনা কিছু। আপনাকে আমার এখনই চাই মানে চাই। আর যদি আমার কথা না শোনেন, তাহলে কিন্তু আমি সত্যিই চিৎকার করব।”
প্রণয় বুঝল এই মেয়ে খুব চতুর। তবে সে নিশ্চয়ই প্রণয়ের থেকে বেশি চতুর নয়। প্রণয় হিয়ার মাথাটা ওর বুকে নিয়ে, বাম হাত দিয়ে রেকর্ডার অফ করে দিল। হেসে বলল,
“ঠিক আছে, বেবিগার্ল। তুমি যা বলতে তা-ই হবে। তাছাড়া আমি এতটাও সুপুরুষ নই যে, তোমার মতো এরকম হ’ট, সুন্দরী একটা মেয়েকে একা কাছে পেয়েও নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারব। আমি তো ফার্স্টে শুধু তোমার বাবা-মায়ের ভয়ে পিছিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু এখন আর আমি নিজেও থাকতে পারছি না।”
হিয়া আনন্দে ঝলমল করে জামা খুলতে গেলে প্রণয় বাঁধা দিয়ে বলল,
“উম, না! এভাবে না। তুমি একটু আগে না বললে আমি নাকি আনরোমান্টিক? আজ তোমাকে দেখাব, আমি কতটা রোমান্টিক। এত ইজিলি সব হয়ে গেলে রোমান্স আর থাকল কোথায় বলো?”
“তাহলে?”
“তোমার নাইট ড্রেস নেই?”
“আছে তো।”
“যাও পরে আসো।”
হিয়া খুশি হয়ে লাজুক হাসি দিয়ে বলল,
“ঠিক আছে।”
“বেশি দেরি করবে না কিন্তু। তাড়াতাড়ি আসবে।”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ যাব আর আসব।”
হিয়া আলমারি থেকে নাইট ড্রেস নিয়ে ওয়াশরুমে যেতেই, এই সুযোগে প্রণয় ফোন নিয়ে বাইরে চলে গেল। হিয়া ভাবতেও পারেনি, প্রণয় যে ওর সাথে এরকম নিঁখুত অভিনয় করবে।
বাড়ি থেকে বের হয়ে প্রণয় যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। নোটিফিকেশন ক্লিয়ার করতে গিয়ে দেখতে পেল হিয়ার মেসেজটি। তখনই খটকা লাগল যে, গুনগুন কি এই মেসেজটা দেখেই আপসেট হয়ে গিয়েছিল? প্রণয় বিরক্তিতে স্বগতোক্তি করে বলল,
“শি’ট!”
বাসায় গিয়ে দরজায় নক করার পর গুনগুন দরজা খুলে দিল। চোখ-মুখ ফুলে আছে। লালও হয়ে আছে কিছুটা। কেঁদেছে নিশ্চয়ই। দরজা খুলে দিয়ে গুনগুন চলে যাওয়ার সময় প্রণয় পেছন থেকে ওর হাত চেপে ধরল। গুনগুন কিছু বলার পূর্বেই প্রণয় ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। এতটা শক্ত করে ধরেছে যে, গুনগুন নড়তেও পারছে না। নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। এতক্ষণ যেই মানসিক অত্যাচারের মধ্যে ছিল প্রণয়, তা যেন ধীরে ধীরে নিঃশেষ হচ্ছে গুনগুনকে জড়িয়ে ধরার পর। হিয়া যখন জড়িয়ে ধরেছিল, তখন গুনগুনের ইচ্ছে করছিল ওকে খু’ন করে ফেলতে, অথচ গুনগুনকে জড়িয়ে ধরার পর মনে হচ্ছে, দুনিয়ায় এরচেয়ে প্রশান্তির আর কিচ্ছু নেই।
গুনগুন হাঁসফাঁস করে বলল,
“ছাড়ুন! নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।”
প্রণয় ছাড়ল না। তবে কিছুটা হালকা করল দুহাতের বাঁধন। জড়িয়ে ধরেই বলল,
“তুমি ছাড়া পুরো দুনিয়া আমার কাছে অন্ধকার। এত মানুষ থাকতেও, আমার শুধু তোমাকেই প্রয়োজন। তোমায় ছাড়া আমি অস্তিত্বহীন। তুমি আমার জীবনে মরুর বুকে একফোটা বৃষ্টির মতোন। তোমায় আমি ভালোবাসি। ভীষণ ভালোবাসি, বিশ্বাস করো গুনগুন।”
গুনগুন এবার বেশ অবাক হলো। প্রণয়কে এতটা আবেগপ্রবণ তো ইতোপূর্বে কখনো সে দেখেনি। কী হয়েছে হঠাৎ? গুনগুন আলতো করে প্রণয়ের পিঠে দুহাত রাখল। গুনগুনের স্পর্শ পেয়ে আবারও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল প্রণয়। এবার আর গুনগুন ছাড়তে বলল না। বরং কিছুটা ভরসা মিশিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে আপনার?”
“কিচ্ছু না। ব্যস এইভাবে আমায় একটু জড়িয়ে ধরে রাখো।”
গুনগুন কথা বলল না আর। কিছু জিজ্ঞেসও করল না। প্রণয়ের ফোন বাজছে একটু পরপর। প্রণয় কোনো রেসপন্স করছে না দেখে গুনগুন এবার বলল,
“ফোনটা ধরছেন না কেন?”
“দরকার নেই।”
“প্রয়োজনীয় কোনো কলও তো হতে পারে।”
“আমার জীবনে প্রয়োজনীয় কেউ থাকলে সে হচ্ছো তুমি, আমার বউ। এখন আমার কাছেই আছো।”
গুনগুন দীর্ঘশ্বাস নিয়ে জোরপূর্বক প্রণয়ের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করল,
“সত্যি করে বলুন, কী হয়েছে? কী লুকাচ্ছেন আমার থেকে?”
“তুমি দূরত্ব কেন তৈরি করছ?”
“আমি কখন দূরত্ব তৈরি করলাম?”
“সকালে। তুমি হিয়ার মেসেজ দেখে আমার ওপর রাগ করে ছিলে তাই না?”
গুনগুন নিশ্চুপ। প্রণয় বলল,
“তুমি একটাবার তো জিজ্ঞেস করতে পারতে, কে এই হিয়া। সেই অধিকার তো তোমার আছে। তাহলে কেন জিজ্ঞেস করোনি? একটাবার জিজ্ঞেস করতে, প্রয়োজনে আমাকে মা’র’তে, গা’লি দিতে আমি কিচ্ছু বলতাম না। কিন্তু আমার থেকে নিজেকে এভাবে দূরে সরিয়ে নিচ্ছিলে কেন গুনগুন?”
একটু থেমে প্রণয় ওর হাত ধরে বলল,
“সম্পর্কে কখনো ভুল বুঝাবুঝির মতো সিচুয়েশন এলে, সেই ভুল ভাঙতে হয়, ভাঙাতে হয়। অপরপাশের মানুষটাকেও ভুল ধারণা ভাঙানোর সুযোগ দিতে হয়। দূরত্ব বাড়াতে হয় না। দূরত্ব সম্পর্ক নষ্ট করে ফেলে।”
“কে এই হিয়া? এখনো যে আপনার ফোন বাজছে, আমার মনে হচ্ছে ঐ মেয়েই কল দিচ্ছে। আপনি কল ধরছেন না কেন?”
“হিয়া আমার স্টুডেন্ট। আজ দুপুরে তোমায় নিয়ে লাঞ্চ করতে যাব বলে ওকে সকালে পড়ানোর কথা ছিল। তাই মেসেজটা দিয়েছিল।”
“পড়াতে গিয়েছিলেন?”
“হুম।”
“এখন কি ঐখান থেকেই এলেন?”
“হুম।”
“সব বুঝলাম। কিন্তু কী লুকাচ্ছেন আমার থেকে?”
“কিছুই না।”
“মেয়েটা আপনাকে ভালোবাসে?”
প্রণয় নিরুত্তর। গুনগুন বলল,
“বলুন?”
“ভালোবাসা পবিত্র একটা শব্দ। ওর মতো অপবিত্র মেয়ে কখনো কাউকে ভালোবাসতে পারে না।”
“কী করেছে?”
প্রণয় ফোন বের করল। একটু পরপর হিয়া কল করেই যাচ্ছে। প্রণয় ব্লক করতে গেলে গুনগুন বলল,
“উঁহুম! ব্লক না। আগে শুনব কী হয়েছে। চাইলে আপাতত ফোন এরোপ্লেন মোডে রাখতে পারেন।”
প্রণয় তা-ই করল। অডিয়ো রেকর্ড অন করতে করতে বলল,
“পুরোটা শুনে আবার আমাকে ভুল বুইঝো না। আমি কিন্তু কিছু করিনি। চলে এসেছি।”
গুনগুন অডিয়ো রেকর্ড শোনার পর জিদ্দে শেষ হয়ে যাচ্ছিল। আ’গু’ন জ্বলছিল দুচোখে। বাসায় যাওয়ার পর থেকে যা যা হয়েছে সব বলল প্রণয় গুনগুনকে। গুনগুন রাগ কন্ট্রোল করে বলল,
“কথাগুলো রেকর্ড করে ভালো করেছেন। পরে আবার কখনো ব্ল্যাকমেইল করতে এলে কাজে দেবে। শেষের কথাগুলো কেটে দিতে হবে। আপনি আমার স্বামী, তাই আপনাকে আমি বিশ্বাস করি। কিন্তু অন্যরা তো নাও করতে পারে। ব্যস ওর যে সম্পর্ক ছিল, ই’ন্টি’মে’ট হয়েছিল অন্য ছেলের সাথে, আপনাকে মিথ্যা বলে নিয়ে গিয়েছিল, ব্ল্যা’কমেইল করেছিল এতটুকু রেকর্ডই যথেষ্ট।”
“আমি আর কখনো ওকে পড়াব না। খু’ন করতে পারলে ভালো লাগত। কিন্তু তা তো আর সম্ভব নয়। বেশি তিড়িংবিড়িং করলে এই অডিয়ো ওর বাবা-মাকে পাঠিয়ে দেবো।”
“আচ্ছা।”
গুনগুন খুব শান্ত রইল। প্রণয়ের সাথে আগের চেয়েও ভালো ব্যবহার করছে আজ। বিকেলে দুজনে হাঁটতেও বের হয়েছে। রাতে প্রণয়ের জন্য নিজে রান্না করেছে। সারাক্ষণ টুকটাক কিছু না কিছু করেছেই। প্রণয় রাতে হাত ধরে বলল,
“এখন রাখো না সব কাজ। বসো একটু আমার পাশে।”
গুনগুন বসল। প্রণয় ওর কোলে মাথা রেখে বলল,
“চুলে হাত বুলিয়ে দাও।”
কোনো বাকবিতণ্ডায় না গিয়ে গুনগুন আলতো হাতে প্রণয়ের চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। আরাম পেয়ে প্রণয় ঘুমিয়ে যায়। তখন ওর ফোন থেকে অডিয়ো ক্লিপটা নিজের ফোনে নিয়ে নেয় গুনগুন।
সকাল ১০:৩৫ মিনিট
কিছুক্ষণ আগেই প্রণয় ফাইভের বাচ্চা মেয়েটাকে প্রাইভেট পড়াতে গিয়েছে। গুনগুনও ক্লাসের উদ্দেশে গিয়েছে ভার্সিটিতে। তখন মাসুদের কল আসে ওর ফোনে। রিসিভ করার পর মাসুদ বলল,
“ছেমড়ি আজকে বাসায় নাই। কলেজে গেল দেখলাম।”
“ঠিক আছে। আপনি এখন কোথায়?”
“ওর বাসার সামনেই। কী করমু এহন?”
“আপনার বন্ধু-বান্ধবগুলো আপনার সাথে আছে না?”
“হ।”
“ঐ মেয়ের কলেজের সামনে চলে যান। আমিও আসতেছি।”
“ঠিক আছে।”
“আর খবরদার! প্রণয় যেন এখনই কিছু জানতে না পারে।”
“হুনো গুনগুন, হইতে পারে তুমি আমার শ’ত্রু। কিন্তু দিনশেষে আমার বন্ধুর প্রাণপ্রিয় প্রিয়তমা বউ তুমি। তুমি আমারে একটা কাম দিছ বিশ্বাস কইরা, তাই কইরা দিতাছি। তোমার বিশ্বাসও ভাঙমু না, আর প্রণয়ও কিছু জানব না। চিন্তা কইরো না।”
গুনগুন নিঃশব্দে হেসে বলল,
“ঠিক আছে।”
কল কেটে রাধিকাকে বলল,
“চল।”
“এখন কি ঐ মাইয়্যার কলেজে যাবি?”
“হ্যাঁ। কথা বলব। আইডি কার্ড গলায় না ঝুলিয়ে ব্যাগে রাখ এখন।”
“কথা বলবি ভালো কথা, তাইলে প্রণয় ভাইয়ার বন্ধু-বান্ধবরে পাঠাইছিস কেন?”
“আশ্চর্য! সেইফটির দরকার নেই? ঐ মেয়ের এলাকায় গিয়ে আমি একা কথা বলতাম? পরে কোনো ঝামেলা করলে? অডিয়ো শুনে বুঝিসনি এই মেয়ে কতটা সাংঘাতিক?”
“হুম, তাও অবশ্য ঠিক বলেছিস।”
দশ মিনিটের মধ্যেই রাধিকাকে নিয়ে হিয়ার কলেজে পৌঁছে গেল গুনগুন। গতকাল রাতে কথায় কথায় প্রণয়ের থেকেই হিয়ার বাড়ির ঠিকানা ও কলেজের নাম, ব্যাচ জেনেছিল। এরপর রাতে যখন প্রণয় ঘুমিয়ে পড়েছিল, তখন গুনগুন মাসুদকে কল করে বলেছিল সকালের দিকে হিয়ার বাসার সামনে থাকতে। কারণ প্রণয়ের কাছে শুনেছিল, হিয়া নিয়মিত ক্লাস করে না। আজও ক্লাস করবে নাকি বাসায় থাকবে এটা জানার জন্যই সকালে মাসুদকে ওর বাড়ির সামনে যেতে বলেছিল।
মাসুদ ছেলেপেলে নিয়ে মেইন গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। গুনগুন গুনে দেখল মাসুদসহ মোট নয়জন এসেছে। এত মানুষও আশা করেনি গুনগুন। অবশ্য খারাপ না, এতে ভালোই হয়েছে। মাসুদ বলল,
“এহন কী করতে হইব?”
“বলছি। রাধিকা গিয়ে খবর পাঠিয়ে হিয়াকে ডেকে নিয়ে আসবে। আর আপনারা সবাই খেয়াল রাখবেন, কোনো ঝামেলা যদি হয়ে যায় তাহলে যেন কেউ কোনো ভিডিয়ো করতে না পারে। যদি দেখেন কেউ ভিডিয়ো করছে সাথে সাথে ফোন নিয়ে ভেঙে ফেলবেন।”
মাসুদ মাথা নাড়িয়ে বলল,
“আচ্ছা।”
গুনগুনের কথামতো রাধিকা গিয়ে দপ্তরির মাধ্যমে হিয়ার কাছে খবর পাঠাল। ক্লাস ছিল দুই তলায়। রাধিকা নিচ তলায় অপেক্ষা করছিল। হিয়া নিচে এসে বলল,
“আপনি আমায় ডেকে পাঠিয়েছেন?”
রাধিকা বলল,
“হ্যাঁ। তুমি হিয়া?”
“জি। কিন্তু আপনাকে তো আমি চিনি না।”
“সমস্যা নাই। চিনে যাবা। ক্যান্টিনে গিয়ে বসি আমরা?”
“ক্যান্টিনে? আচ্ছা তাহলে আমি ক্লাসটা শেষ করে আসি? এই ক্লাস শেষেই টিফিনের সময়।”
“ঠিক আছে। সমস্যা নেই। আমি ক্যান্টিনে অপেক্ষা করছি।”
রাধিকা গিয়ে গুনগুনকে হিয়ার বলা কথাগুলো বলার পর গুনগুন বলল,
“আচ্ছা, সমস্যা নেই।”
ক্যান্টিন এখন একদম ফাঁকা। রাধিকা আর গুনগুন একটা টেবিল দখল করে বসল। অন্যান্য টেবিলে দুজন, তিনজন করে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসল বাকিরা। পনেরো মিনিট পর ঘণ্টা বাজার শব্দ হলো। টিফিনের সময় হয়েছে তাহলে। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে হিয়া এলো। মাসুদ তখন গুনগুনের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। হিয়াকে আসতে দেখে বলল,
“ঐযে আইতাছে। দেহো কামডা, সবাই পরছে কলেজের ইউনিফর্ম। আর এই ছেড়ি নীল জামার লগে লাল লিবিস্টিক পইরা আইছা। দেইখা মনে হইতাছে একটা হারপিকের বোতল।”
রাধিকা ফিক করে হেসে বলল,
“ভাইয়া, লিবিস্টিক না। লিপস্টিক হবে।”
“ঐ হইলো আরকি!”
হিয়া একদম কাছাকাছি চলে আসার পর মাসুদ কাউন্টারে গিয়ে বলল,
“ঐ ভাই,আপনেরে না কইলাম আমারে দুইডা সিঙ্গারা দিতে? দ্যান।”
রাধিকা উঠে গুনগুনের পাশে বসে বলল,
“বসো।”
হিয়া এতক্ষণ গুনগুনের পিঠের পেছনে ছিল। এবার মুখোমুখি বসতেই হাসি হাসি মুখটায় অন্ধকার নেমে এলো। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,
“আপনাকে কেমন যেন চেনা চেনা লাগছে!”
গুনগুন চোখ-মুখ শক্ত করে বলল,
“আমি গুনগুন। প্রণয়ের ওয়াইফ।”
হিয়া টেবিলের ওপর দুহাত দিয়ে জোরে শব্দ করে হেসে বলল,
“ফা’ক! তুই সেই মেয়ে তাহলে!”
রাধিকা কিছু বলতে গেলে গুনগুন ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“আমি তোমার সাথে ভদ্রভাবে কথা বলছি।”
“তো?”
“তো তুমিও ভদ্রতা বজায় রাখো। আফটারঅল, এটা তোমারই কলেজ। কিছু হলে বদনাম তোমারই হবে।”
“তুই আমাকে ভয় দেখাচ্ছিস?”
“আমি ভয় দেখাই না। ভয় পাওয়াই।”
“মা* কী করবি তুই? বল কী করবি? তুই জানস আমি কে? কী করতে পারি?”
গুনগুন চোখের পলকেই বসা থেকে উঠে হিয়ার দুই গালে পরপর ছয়টা থা’প্প’ড় দিয়ে চুলের মুঠি ধরে বলল,
“প্র’স্টি’টিউ’ট, তুই জানিস আমি কে? এসেছিলাম তোকে ভালোভাবে বোঝাতে। সাবধান করতে। কিন্তু তুই আমার ভালো ব্যবহার ডিজার্ভ করিস না।”
ক্যান্টিনের বাকি সবাই হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। গুনগুন আরো একটা থা’প্প’ড় দিয়ে বলল,
“শরীরের জ্বা’লা যদি খুব বেশি হয় তাহলে প’তি’তা’লয়ে গিয়ে জ্বা’লা মিটিয়ে আয়। অন্যের স্বামীর পেছনে ঘুরিস কেন?”
হিয়া গুনগুনকে মারতে গেলে ওর দুই হাতই মুচড়ে ধরল গুনগুন। সমস্ত রাগ, জেদ মাথায় চ’ড়ে বসেছে এখন। যেভাবে পারছে ইচ্ছেমতো মা’র’ছে হিয়াকে। মা’র’তে মা’র’তে মাসুদকে ডেকে বলল,
“ওর যত মেসেজের সস, অডিয়ো রেকর্ড আপনাকে পাঠিয়েছিলাম সব কলেজের হেডস্যারকে গিয়ে দিন। প্রত্যেকটা টিচারকে দেখান। আমিও দেখব ও কোন পাওয়ার দিয়ে এই কলেজে পড়ে। এতকিছুর পরও যদি ওকে কলেজ থেকে বহিষ্কার না করে, তাহলে আমি সরাসরি সোশ্যাল মিডিয়ায় জানাব যে, ওর মতো একটা প্র’স্টি’টিউ’ট যে কিনা এই কলেজে পড়ে।”
মাসুদ মাথা নাড়িয়ে বলল,
“ওকে।”
শেষ আরো দুটো থা’প্প’ড় দিয়ে হিয়াকে ছুঁড়ে চেয়ারে ফেলে, ক্যান্টিনে অবস্থিত সবার উদ্দেশে বলল,
“এর থেকে সবাই দূরে থেকো। তোমাদেরই ভালো হবে।”
এরপর হিয়াকে বলল,
“আমাকে রাগিয়ে কাজটা ঠিক করিসনি। একই তো তুই আমার স্বামীর দিকে নজর দিয়েছিস, তারওপর আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছিস। এখন আবার আমাকে হুমকি দিচ্ছিস? তোর কোন বাপকে নিয়ে আসবি আসিস। আমিও দেখতে চাই, তুই কে আর কী করতে পারিস? তোর এসব কুকর্ম তোর পরিবার পর্যন্তও চলে যাবে চিন্তা করিস না। আর কখনো যদি, আমার প্রণয়ের আশেপাশে তোকে দেখি তাহলে সেদিন তোকে আমি জানে মে’রে ফেলব।”
টেবিলের ওপর থেকে ব্যাগ নিয়ে গুনগুন মাসুদকে বলল,
“মাসুদ ভাই, ক্যান্টিনের সিসিটিভি ফুটেজ থেকে এই সময়টুকু ডিলিট হওয়া চাই।”
মাসুদ মাথা নাড়িয়ে বলল,
“হয়ে যাবে।”
গুনগুন বাঘিনীর মতো বেরিয়ে এলো কলেজ থেকে। অনেকগুলো বিস্মিত চোখ গুনগুনকে দেখছে আর ভাবছে, কতটা পার্থক্য দুজনের মধ্যে। অথচ দুজনই নারী। একজন আত্মসম্মানহীন, আরেকজন আত্মমর্যাদাসম্পন্ন। কোনো নারী হোক বা বউ; তাকে এমনই তো হতে হবে, ঠিক গুনগুনের মতো।
চলবে…
Share On:
TAGS: প্রণয়ে গুনগুন, মুন্নি আক্তার প্রিয়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১৮ (২য় অংশ)
-
তুমি অজান্তেই বেঁধেছ হৃদয় গল্পের লিংক
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৭
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৬
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ২৪
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৮
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ২
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১০
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১৩
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ২৬