প্রণয়ে_গুনগুন
পর্ব_১২
মুন্নিআক্তারপ্রিয়া
গুনগুন কিছুক্ষণ পর রুমে এলো। কুলসুম তখনও প্রণয়ের সাথে কলে কথা বলছিল। গুনগুনকে দেখে কল না কেটেই কাছে গিয়ে বলল,
“তোমাকে দেখতে এসেছিল?”
গুনগুনের চোখমুখ শক্ত ও মলিন। মনে হচ্ছে কোনো প্রাণ নেই। কুলসুমের দিকে তাকালোও না একবার। দৃষ্টি অন্যদিকে রেখে নিস্তেজ কণ্ঠে বলল,
“হুম।”
“কাকে বিয়ে করছ?”
“চিনি না।”
কুলসুম কিছুটা না বরং অনেকটাই অবাক হলো। শুরুতে ভেবেছিল, গুনগুনের যার সাথে সম্পর্ক আছে তারাই দেখতে এসেছে। কিন্তু চিনি না বলল কেন গুনগুন?
কুলসুম স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
“আমি যতটুকু জানি, তুমি রিলেশনশিপে আছো। এই ছেলে সে নয়?”
গুনগুন এবার চোখ তুলে তাকাল কুলসুমের দিকে। লাল হয়ে আছে চোখ দুটো। মনে হচ্ছে কিছুক্ষণ আগেও কেঁদেছে মেয়েটা। হঠাৎ হাসল গুনগুন। হাসিতে তাচ্ছিল্য স্পষ্ট। হেসেই বলল,
“ভালোবাসার মানুষকে পেতে ভাগ্য লাগে, আপু। আমি ততটাও ভাগ্যবতী নই।”
কথাটা কুলসুমের বুকে গিয়ে লাগল। সে গুনগুনের হাত চেপে ধরে জিজ্ঞেস করল,
“সবকিছু ঠিক আছে গুনগুন?”
“আমার পুরো জীবনটাই এলোমেলো হয়ে গেছে!”
গুনগুন এবার কেঁদে ফেলল। ঠোঁট কামড়ে ধরে অনেকক্ষণ কান্না আটকে রাখার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। কুলসুম গুনগুনকে জড়িয়ে ধরল। কিন্তু কান্না করতে নিষেধ করল না। নিষেধ করেও লাভ নেই। হৃদয়ের র’ক্তক্ষরণ যার হয়, সে বোঝে বুকে কতটা কষ্টের সাগর বয়ে বেড়াতে হয়। গুনগুন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলল,
“এক বিশ্বাসঘাতককে বিশ্বাস করেছিলাম, ভালো বেসেছিলাম। বিনিময়ে বাজেভাবে ঠকলাম। একটাবার যদি আমাকে বলত,’ গুনগুন, এই সম্পর্ক রাখা সম্ভব না। আমি তোমাকে বিয়ে করব না।’ বিশ্বাস করো, আমি কখনোই ওকে আটকাতাম না। যেতে দিতাম। কোনো অভিযোগও রাখতাম না। অন্তত একটা রেসপেক্ট থাকত ওর প্রতি আমার। কিন্তু ও আমাকে শুধু ঠকায়ইনি, তিলে তিলে কষ্ট দিয়েছে। আমাকে পুরো শেষ করে দিয়েছে, আপু। বাবার কাছে মুখ দেখাতে পারছি না লজ্জায়। সৎ মা উঠতে বসতে কথা শোনাচ্ছে। খোঁটা দিচ্ছে। আমি আর পারছি না বিশ্বাস করো। তোমরা সবাই ভাবো,আমি খুব শক্ত মনের মেয়ে। কিন্তু দিনশেষে আমিও মানুষ, আপু। আমারও কষ্ট হয়। বুকে অসম্ভব ব্যথা হয়। শক্ত খোলসে নিজেকে আটকে রাখতে পারি না। এইযে এখনো পারছি না। শুধু ভেতরে ভেতরে শেষ হয়ে যাচ্ছি আমি।”
কুলসুমের চোখে পানি চলে এসেছে। সে গুনগুনকে জড়িয়ে রেখেই মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
“আমাদের জীবনে কিছু মানুষ শিক্ষা হয়ে আসে। তোমার প্রাক্তনও তোমার লাইফে একটা লেসন। কিন্তু এভাবে ভেঙে পড়লে তো চলবে না, গুনগুন। নিজেকে শক্ত রাখতে হবে। তুমি একজন প্রতারককে হারিয়েছ। আর ঐ ছেলে হারিয়েছে তোমার মতো একজন মেয়েকে। আক্ষরিকভাবে ভেবে দেখো, তুমি হেরে গিয়েও জিতে গিয়েছ। আর সে এখন জিতলেও এটা আসলে জেতা নয়। হেরে যাওয়াই। তুমি নিজে শক্ত থাকো।”
কুলসুমকে ছেড়ে দিয়ে গুনগুন চোখের পানি মুছতে মুছতে বলল,
“শক্ত আছি বলেই হয়তো এখনো বেঁচে আছি।”
“রিসেন্ট এমন একটা ঘটনার সাথে সাথেই তুমি অন্য কাউকে বিয়ে করছ কেন? আগে নিজেকে হিল করো। সময় দাও নিজেকে।”
“বিয়ে করছি না। করতে বাধ্য হচ্ছি।”
“কে বাধ্য করছে? তোমার বাবা-মা?”
“সেসব তো তোমার জানার প্রয়োজন নেই।” রুমে ঢুকতে ঢুকতে বললেন সুমনা বেগম। কুলসুমের শেষ কথাটা তিনি শুনেছেন।
পাত্রপক্ষ বিদায় নেওয়ার সাথে সাথেই তিনি গুনগুনের রুমে চলে এসেছেন। কুলসুমের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“হঠাৎ এই বাড়িতে এসেছ কেন?”
কুলসুম হাসিমুখে বলল,
“পিঠা নিয়ে এসেছিলাম গুনগুন আর শিহাবের জন্য।”
সুমনা বেগম কর্কশকণ্ঠে বললেন,
“কেন? তোমার কি মনে হয় আমি ওদের পিঠা বানিয়ে খাওয়াই না? এসব আদিখ্যেতা দেখাতে আসবে না একদম। আর এই বাড়িতেও যেন কখনো তোমাকে না দেখি। এমনিই ওর মাথা ঠিক নেই। আবার এসেছ আমাদের নামে বি’ষ ঢালতে?”
গুনগুন চোখমুখ শ’ক্ত করে বলল,
“নিজের সীমা পার কোরো না। আপুর সাথে এরকম বাজে ব্যবহার করছ কেন তুমি?”
সুমনা বেগম ধমক দিয়ে বললেন,
“এক থা’প্প’ড় দেবো গালে। মুখে মুখে তর্ক করবি না। আবার চোখ রাঙাচ্ছিস কাকে তুই? লজ্জা করে না, না? এখনো আবার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতেছিস। নি’র্ল’জ্জ মেয়ে মানুষ! তোর জায়গায় আমি থাকলে লজ্জাতেই কবে গলায় দ’ড়ি দিতাম। ম’র’বি তো না তুই। আমাদের মা’রা’র জন্য এক পা বাড়িয়ে রাখিস সবসময়। তোর বাপে এবার তোর জন্য ভালো ছেলে দেখেছে। বিয়ে করে বিদায় হয় অ’প’য়া একটা!”
গুনগুনের জবাব দেওয়ার মতো অনেক কথাই ছিল। তবুও সে নিরব, নির্বাক। চোখের কোটর থেকে দুফোটা পানি গড়িয়ে পড়ল। মাহবুবের বিয়ের কথাটা জানার পর থেকেই সৎ মা তাকে প্রতিটা দিন, প্রতিটা সময় এভাবেই কথা শোনাচ্ছে। যেখানে নিজের আপন বাবা-ই কথা শোনাতে ছাড় দেয় না সেখানে সৎ মা এরকম ব্যবহার করবে এটাই তো স্বাভাবিক।
সুমনা বেগমের এসব কথা শুনে গা গুলাচ্ছে কুলসুমের। সে বিস্ময় নিয়ে প্রতিবাদের কণ্ঠে বলল,
“এভাবে কেন বলছেন আন্টি? মানুষ মাত্রই ভুল করে। তাছাড়া গুনগুন তো কোনো ভুলও করেনি। ভালোবেসেছিল, বিশ্বাস করেছিল। এখন কোনো অ’মানুষ যদি ওর বিশ্বাস ভাঙে তাহলে সেটা নিশ্চয়ই ওর অপরাধ না।”
সুমনা বেগম এবার আরো বেশি তেলে-বেগুনে জ্ব’লে উঠলেন। কটমট করে তাকিয়ে বললেন,
“ওর ওকালতি করা লাগবে না তোমার। ও এক খারাপ, তুমি হচ্ছো আরেক খারাপ। এজন্যই ওর এত সাফাই গাইতেছ। দুজনই ন’ষ্ট মেয়ে তোমরা।”
গুনগুন আর চুপ থাকতে পারছে না। সে চিৎকার করে বলল,
“মুখ সামলে কথা বলো! আমাকে যা ইচ্ছে বলতেছ বলো। কিন্তু আপুকে একদম উলটা-পালটা কথা বলবে না।”
সুমনা বেগম খপ করে গুনগুনের চুলের মুঠি ধরে বললেন,
“বা’ন্দির বাচ্চা আমার সাথে চিল্লাইয়া কথা বলস তুই!”
ঘটনার আকস্মিকতায় কুলসুম চমকে গিয়েছে। গুনগুনকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। ধস্তাধস্তির শব্দ শুনে শিহাব দৌঁড়ে এসেছে ড্রয়িংরুম থেকে। সে কান্না করে সুমনা বেগমের হাত ধরে টানছে আর বলছে,
“আপুকে ছাড়ো আম্মু, আপুকে ছাড়ো। আপু ব্যথা পাচ্ছে।”
ওসমান গণি নিচে গিয়েছিলেন পাত্রপক্ষদের এগিয়ে দিতে। বাসায় এসে কলিংবেল চাপার পর শিহাব দৌঁড়ে গিয়ে দরজা খুলে দিল। কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“আম্মু আপুকে মারতেছে, আব্বু!”
ওসমান গণি তৎক্ষণাৎ দৌঁড়ে গেলেন গুনগুনের রুমে। শিহাবও বাবার সাথে দৌঁড় দিয়েছে।
“আরে! কী হচ্ছে এসব?” ভেতরে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন ওসমান গণি।
সুমনা বেগম তখনও গুনগুনকে ছাড়েননি। কখনো চুল টে’নে ধরছেন তো, কখনো হাত টেনে ধরছেন, গলা চে’পে ধরছেন। কুলসুমের সাথেও তার তুমুল ধস্তাধস্তি হচ্ছে। সুমনা বেগম চিৎকার করে বললেন,
“এই অ’প’য়া’র বা’চ্চা আমার সাথে চিল্লাইয়া কথা বলে। গা’লা’গা’লি করে।”
ওসমান গণি সুমনা বেগমকে হাত ধরে টেনে সরালেন। কুলসুম গুনগুনকে শক্ত করে ধরে রেখেছে। সুমনা বেগম সরে গেলেও, মুখ থামালেন না। বানিয়ে বানিয়ে বলতে লাগলেন,
“আমাকে খারাপ ভাষায় গা’লা’গালি করছে। আমার গায়ে হাতও তুলছে। ওর জন্য কি আমি কম করছি? ওর নাগরে ওরে ঠকাইছে এই ঝাল ওয় আমার ওপর মিটাইব ক্যান? লগে আবার এই মেয়ে আছে। দুইজনে মিলে আমারে যা নয় তা বলে গা’লি দিছে।”
কুলসুম অবাক হয়ে বলল,
“এসব আপনি কী বলতেছেন? এত মিথ্যা কথা!”
গুনগুন এতকিছুর মাঝেও হেসে বলল,
“তুমি যদি শুধু শিহাবের মা না হতে বিশ্বাস করো খোদার কসম করে বলতেছি, তোমার জিভ আমি টেনে ছিঁ’ড়ে ফেলতাম। যেই হাত তুমি আজ আমার গায়ে তুলেছ, ঐ হাত আমি ভে’ঙে তোমারই পেটে ঢুকিয়ে দিতাম। শুধু শুকরিয়া আদায় করো যে, তুমি শিহাবের মা, আর শিহাব আমার ভাই, আমার জান। ওর সামনে ওর মাকে মা’র’লে ও কষ্ট পাবে। আমি তো ওকে ভালোবাসি, আদরের ভাইকে কষ্ট দিতে পারব না। নয়তো তোমাকে ছিঁ’ড়ে দুই টুকরা করে ফেলতাম এখন।”
ওসমান গণি সঙ্গে সঙ্গে গুনগুনের গালে থা’প্প’ড় বসালেন। চেঁচিয়ে বললেন,
“বে’য়া’দব মেয়ে!”
গুনগুন কুলসুমকে ধরে ওয়ারড্রবের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সে এবার রাগে, জিদ্দে ওয়ারড্রবের ওপর থেকে ফুলদানিটা নিয়ে ফ্লোরে ছুঁ’ড়ে ফেলার আগেই ড্রয়িংরুম থেকে ভাঙচুরের শব্দ কানে ভেসে এলো। সুমনা বেগম, ওসমান গণি দৌঁড়ে গেলেন বাইরে। গুনগুন দরজার কাছে গিয়ে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে দেখল প্রণয় বড়ো বড়ো লাঠি নিয়ে সব জিনিসপত্র ভাঙচুর করতেছে। ওর সাথে মাসুদসহ আরো অনেকগুলো ছেলে আছে। মেইন গেইট খোলা। শিহাবের দরজা লাগাতে মনে ছিল না ঐ সময়। তাই বিনা বাঁধাতেই প্রণয়রা ভেতরে ঢুকতে পেরেছে।
ওসমান গণি প্রণয়কে বললেন,
“কী করতেছ তুমি এসব!”
সুমনা বেগম বললেন,
“তুমি পুলিশরে ফোন দাও না ক্যান?”
প্রণয় হাতের লাঠিটা ফ্লোরে শব্দ করে ছুঁ’ড়ে ফেলল। এগিয়ে এসে আঙুল তুলে শাসিয়ে শাসিয়ে সুমনা বেগমকে বলল,
“ঐ মহিলা চুপ! একদম চুপ। গুনগুন শিহাবের জন্য আপনাকে কিছু না বললেও আমি বলব। আমি আপনাকে ছেড়ে দেবো, এটা ভাববেন না। প্রয়োজনে মেয়ে মানুষ নিয়ে এসে আপনার ঐ হাত আমি ভা’ঙ’ব। গুনগুন ওর ভাইকে ভালোবাসে বলে, আপনাকে ছেড়ে দিয়েছে। চুপ থেকেছে। কিন্তু আমি ছাড়ব না কারণ ভালোবাসি আমি গুনগুনকে। আপনি আমার ভালোবাসার মানুষের গায়ে হাত তুলছেন, ওর চুলে হাত দিছেন আপনি। ওরে নোং’রা কথা বলছেন! ইচ্ছে তো করছে এখানেই মে’রে পুঁ’তে দেই আপনাকে।”
প্রণয়ের রাগে ঘাড়ের রগ ফুলে গেছে। রাগে চোখমুখও লাল হয়ে গেছে। প্রণয়ের বলা কথাগুলো শুনে সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। এসব কথা তো প্রণয়ের জানার কথা না? একটু আগে কী হয়েছে এসব প্রণয় জানল কী করে? কুলসুমের হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়তেই সে তার হাতের ফোনটার দিকে তাকাল। প্রণয় কলে! এখনো কল কাটা হয়নি।
প্রণয় এবার ওসমাণ গণির সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“আপনাকে আর কী বলব আমি? আপনি তো বাবা না। একটা মেয়ের বাবা কখনো এমন হতে পারে না। আপনি একটা মেরুদণ্ডহীন জ’ন্তু।”
“প্রণয়!” চিৎকার করে উঠলেন ওসমান গণি।
প্রণয় দ্বিগুন চিৎকার করে বলল,
“চুপ! একদম চেঁচাবেন না আমার সাথে। ভালো হয়ে গিয়েছি বলে, অতীত ভুলে যাইয়েন না আমার। সত্যি শুনতে এখন তেঁতো লাগছে তাই না? পুলিশের কাছে যাবেন? যান। মান-সম্মান, জানের ভয় না থাকলে যান। পুলিশ তো আমি সামলাই নিব। কিন্তু এরপর নিজেরে বাঁচাবেন কেমনে? আমাকে খারাপ হতে বাধ্য কইরেন না। গুনগুনের জন্য আমি সব করতে পারব। প্রয়োজনে খারাপ হতে হলে, আমি আবারও খারাপ হবো। তবুও ওর গায়ে একটা আঁচড় লাগতে দেবো না। ওর দিকে যে হাত বাড়াবে তার হাত আমি ভে’ঙে ফেলব। আমি গুনগুন না, আমার অত মায়া নাই। আমি প্রণয়। মানুষকে মারতে আমার হাত কাঁপলেও কোনো অ’মানুষকে মা’র’তে আমার হাত কাঁপে না।”
সবশেষে প্রণয় এখন গুনগুনের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। চোখে-মুখে এখনো রাগের ব’হ্নি’শি’খা যেন দাউদাউ করে জ্ব’ল’ছে। গুনগুন এই প্রণয়কে আগে কখনো দেখেনি। এতটা ভা’য়ো’লে’ন্ট প্রণয়কে আগে কখনো হতে দেখেনি। যখন ওর সাথে ঝামেলা হয়েছিল, তখনও প্রণয় নরম ছিল। এই নরম রূপটা কি তবে শুধু গুনগুনের জন্যই ছিল তখন? আর এরপর তো প্রণয় নিজেকে আমূল বদলে ফেলল। নিজেকে পুরোটা বদলে ফেলা এতটাও সহজ নয়। কিন্তু প্রণয় বদলিয়েছিল। খুব সহজভাবেই। সেই বদলানোটাও কি তবে শুধু গুনগুনের জন্যই? আর প্রণয়ের অকপটে করা আজকের স্বীকারোক্তি ‘ভালোবাসি আমি গুনগুনকে’। কবে থেকে? এত কাছে থেকেও গুনগুন একটাবার বুঝতে পারল না? নাকি কখনো বোঝার চেষ্টাই করেনি? তা-ই হবে হয়তো। না হলে এটা তো অন্তত তখনই বুঝে যাওয়ার কথা, যেদিন প্রণয় ওকে লাল শাড়িতে দেখে মেসেজ করেছিল ‘লাল শাড়িতে তোমাকে লাল টুকটুকে বউ লাগছিল’। গুনগুন বোঝেনি। কিচ্ছু বোঝেনি তখনও। ঐযে বোঝার চেষ্টাই যে করেনি!
গুনগুনের টলমল করা চোখের দৃশ্যপটে অতীতের কথাগুলো বারবার যেন ভাসছিল। দুইয়ে দুইয়ে চার মেলানোর প্রচেষ্টা করছে সে। কানে তখন ভেসে এলো প্রণয়ের গম্ভীর, রাগ মেশানো ভরাট কণ্ঠটি,
“যেই ছেলে আজ তোমাকে দেখতে এসেছিল তাকে কি তুমি ভালোবাসো?”
গুনগুন নিরুত্তর। কেবল নিষ্পলক তাকিয়ে দেখছে প্রণয়কে। কয়েক সেকেন্ড পর প্রণয় নিজেই বলল,
“কথা বলো। ভালোবাসো ঐ ছেলেকে?”
গুনগুন যন্ত্রের মতো উত্তর দিল,
“না।”
“ভালো তো তুমি আমাকেও বাসো না। ঐ ছেলেকেও না। তাহলে তাকে বিয়ে না করে আমাকে কেন করছ না? আমাকে বিয়ে করো, গুনগুন। বিয়ে করবে আমায়?”
গুনগুন নিশ্চুপ। প্রণয়ও সময় নিল। পুরো বাড়িতে এত মানুষ। তবুও পিনপতন নিরবতা বিরাজ করছে। এলোমেলো বাড়িটা যেন মরুভূমির ন্যায় ধূধূ করছিল। প্রণয় মাথা নত করে কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ থেকে গুনগুনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি তোমায় জোর করছি না। করবও না। শুধু একবার যদি তুমি কোনোভাবে আমায় একটু আশ্বাস দাও যে, তুমি আমার হবে তাহলে তোমার জন্য পুরো দুনিয়ার সাথে লড়ব আমি।”
কথা শেষ করেও জবাবের আশায় প্রণয় তাকিয়ে থাকে গুনগুনের দিকে। গুনগুন নিরুত্তর। প্রণয় হতাশ হয়ে চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত হলে, গুনগুন তখন পেছন থেকে প্রণয়ের হাত টেনে ধরে। প্রণয় অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে ফিরে তাকায়। গুনগুনের টলমল করা চোখ দুটোতে শুধু আশ্বাস দেওয়ার প্রয়াসই নেই বরং আশ্বাস চাওয়ারও যেন আকুতি রয়েছে। অ’গ্নির মতো জ্ব’ল’তে থাকা প্রণয়ের চোখদুটো হঠাৎ করেই যেন শীতল হয়ে গেল। আনন্দে চোখে জড়ো হয়েছে কিছু অশ্রুকণা। ঠোঁটে মিষ্টি রোদের মতো ঝলমল করা এক টুকরো হাসি। কুলসুমও হাসছে। ওর চোখেও পানি চলে এসেছে অদ্ভুত! ওসমান গণি এবং সুমনা বেগম গম্ভীর হয়ে তাকিয়ে আছেন শুধু। বাকি সবাই খুশি। সবার মুখে হাসি। মাসুদ নিজেও হাসছে। প্রাণপ্রিয় বন্ধুর সাথে শ’ত্রু গুনগুনকে এক হতে দেখেও তার আনন্দ লাগছে। আচমকা সবকিছু ভুলে গিয়ে সবার সামনেই প্রণয় গুনগুনকে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
চলবে…
Share On:
TAGS: প্রণয়ে গুনগুন, মুন্নি আক্তার প্রিয়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৩
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১১
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৭
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৫
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৪
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ২
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৬
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১০
-
প্রণয়ে গুনগুন গল্পের লিংক