প্রণয়ের_রূপকথা (৮০)
কুহুরা বাড়ি ফিরেছে আজ তিনদিন। তবে মেয়েটির চোখ থেকে ঘুম যেন যাচ্ছেই না। এদিকে বিয়ের দিন যত আগায় মাথায় চাপ তত বাড়তে থাকে। রাত্রিকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে ওঠাতে। তবে কয়েকবার ডেকেও লাভ হলো না। রাত্রি এবার ঠোঁট কামড়ে বলল,”দীপ্র ভাইকে পাঠাব?”
দীপ্রর নাম শুনে মুখ তুলে চাইল মেয়েটি। চোখ পিটপিট করে শুধাল,”তিনি এসেছেন?”
দিল্লি থেকে ফিরে একদিনের বিরতি দিয়ে ফের কক্সবাজার গিয়েছে ছেলেটি। এবার আর কুহুর যাওয়ার সুযোগ হয়নি। কুহু হতাশ হয়ে বিছানা ছাড়ল। রাত্রি বলল,”মন খারাপ করলি নাকি?”
“না। মন খারাপ করিনি।”
না বলতে চাইলেও রাত্রি বুঝল মেয়েটির মন খারাপ হয়ে গেছে।
“শোন না কুহু, মুখটা ওমন করে রাখিস না। চলে আসবে।”
“হুম।”
বলে নিজেকে ঠেলে ঠুলে ওয়াশরুমে গেল ও। রাত্রি তখনই গেল না। ও বরং বিছানা গোছাতে লাগল। কুহু ওয়াশরুম থেকে বের হলে রাত্রি বলল,”লেট করিস না। দ্রুত নিচে আয়। সবার খাওয়া শেষ। তোর ই বাকি।”
রাত্রি চলে গেলে নিজেকে আয়নায় দেখল কুহু। তারপর ফোন তুলে দীপ্রর নাম্বারে কল করল। রিসিভ হতেই কুহু বলল,”আপনি আমাকে একদিন ও কল করেননি।”
মেয়েটার খুব অভিমান হচ্ছে। দীপ্র নিঃশব্দে হাসল। বলল,”মিস করিস আমায়?”
“না করি না।” বলে ফের বলে,”তো মিস করব না?”
ও এমন ভাবে জবাব দিল যেন মিস করাটা ওর অধিকার। অবশ্য অধিকারই বটে। দীপ্র বলল,”তুই তো শুধু মিস করিস। আমি তো পাগল হয়ে যাই। তোকে না দেখে আমার যে খুব কষ্ট হয় কুহু। কাজে মন বসে না। কিচ্ছু ভালো লাগে না। তাই দূরে এলে আরো দূরত্ব বাড়াই। নিজেকে শাসন করি। আটকে রাখি। যাতে কাজে মনটা বসে।”
কুহু এসব কথায় গলে না। ও ঠোঁট কামড়ে বলে,”দূরত্ব বাড়াতে আপনার ভালোই লাগে। ঠিক আছে রাখেন দূরত্ব। এর জন্যই বলে ভালোবাসা দেখাতে নেই। প্রকাশ করতে নেই। প্রকাশ করলেই মানুষের আসল রূপ দেখা যায়।”
কুহু কলটা কেটে দিল। দীপ্র ফোনের স্ক্রিনে চেয়ে মুচকি হাসল।
কুহু খাবার খেতে বসেছে। তবে ওর মন নেই খাবারে। আকাশ মেঘলা। জেবা এসে বসলেন পাশে। আদরের সহিত বললেন,”চোখ মুখ শুকিয়ে আছে। খাবারটা শেষ কর মা।”
“খেতে ইচ্ছে করছে না বড়ো মা।”
“না খেলে তো শরীর খারাপ করবি। তখন বিয়ের অনুষ্ঠানের কী হবে?”
“কী আর হবে? কিছুই না। আমার আর বিয়ের অনুষ্ঠান করতে ইচ্ছে হয় না বড়ো মা।”
বলে ও চেয়ারের সাথে হেলান দেয়। তখনই কুঞ্জ হৈ হৈ করতে করতে আসে। কারণ দীপ্র ভাই এসেছেন। এক গাদা জিনিসপত্র এনেছেন সাথে। জেবা উঠে যান ছেলের দিকে। কুহুর চোখ দুটো হাবুলের মতন সামনে চেয়ে।
“এই কুহু, উঠে আয়। ব্যাগ গুলো নিতে সাহায্য কর।”
দীপ্র নিজেই সব জিনিসপত্র হাতে নিয়ে প্রবেশ করল। জেবা কিছু ব্যাগ নিয়ে সোফায় রাখলেন। কুহুও সঙ্গ দিতে এগোল। দীপ্রর হাত থেকে দুটো ব্যাগ নিয়ে মিনমিনে সুরে বলল,”এত খারাপ আপনি। আসছেন জানাননি অবধি।”
দীপ্র শুধুই হাসল। জবাব দিল না। কুঞ্জ হৈ হৈ করে ব্যাগ পত্র খুলতে শুরু করেছে। দীপ্র অনেক জিনিসপত্র এনেছে।
দুপুরের কিছু সময় আগে ববিতা ফিরলেন। সাথে আছে সাগর ও। ছেলেটার একটু চুরির স্বভাব থাকলেও মানুষ খারাপ না। ববিতাকে খুব সাহায্য করে। ববিতা বললেন,”শরবত খেয়ে যা সাগর।”
“অন্য এক সময় খাব চাচি। আজ যাই।”
“রোদ পেরিয়ে এসেছিস। না খেয়ে যাস না।”
সাগর বসল আরাম করে। নরম সোফাতে। এই সোফা সেট নতুন আনা হয়েছে। বাড়িতে বেশ অনেক ফার্নিচারেই পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এই যে যেমন বাগানের টেবিল চেয়ার গুলো রং করা হচ্ছে।
“সাগর ভাই। কী খবর?”
কণা এসে বলতেই দাঁত কেলিয়ে হাসল সাগর। বলল,”ভালো,ভালো। তোমার কী খবর?”
“আমার তো ভালোই।”
বলে একটু থামল ও। আশেপাশে চাইল। সর্তক হলো। ও শুনেছে, সাগরের বন্ধু রাগীবদের বাড়িতে চাকরি নিয়েছে। রাগীবের সাথে যোগাযোগ নেই আজ কতগুলো দিন। কণার ভালো লাগে না। কিছুতেই মাথা থেকে সরাতে পারে না।”
“সাগর ভাই…
বলতে বলতে সাগরের পাশে গিয়ে বসল ও। সাগরের তখন ঘাম শুকিয়েছে মাত্র। কণা ছোট ছোট সুরে বলল,”একটা কথা জিজ্ঞেস করি, কাউকে আবার বোলো না।”
ও বুঝল কথাটা গোপন। তাই মাথায় হাত দিয়ে বলল,”আল্লাহর কসম, কাউরে বলব না।”
“কসম কাটতে হবে না। তুমি কথা দিলেই হলো।”
“তাইলে কথাই দিলাম।”
ভরসা পেয়ে কণা বলল,”সাগর ভাই, তোমার এক বন্ধু তো শিকদার বাড়িতে চাকরি করে। ও বাড়ির এক ছেলে যার সাথে রাত্রিপুর বিয়ের কথা ছিল, তার কি আবার বিয়ের আয়োজন হচ্ছে?”
সাগর হাবলার মতন চাইল কতক্ষণ। তারপর বলল,”আমি তো এটা জানি না।”
“খোঁজ এনে দিতে পারবে?”
“খোঁজ? হ্যাঁ, তা তো পারব বোধহয়।”
“তাহলে ঠিক আছে তুমি বরং…
বলতে বলতে ও থামল। জেসমিন এসেছে। হাতে শরবতের গ্লাস। সাগরকে দেখেই দাঁত বের করে হাসল। সাগর চোখ মুখ শক্ত করল। নজর ফিরিয়ে নিল।
দুপুরে চায়ের তৃষ্ণা পেয়েছে দীপ্র ভাইয়ের। সেটা আবার ম্যাসেজ করে জানিয়েছে। কুহু একবার ভেবেছিল আনবে না। কেন আনবে? এই লোকটা কক্সবাজার গিয়ে তাকে কল করেনি। সকালে কলে কথা হলো তখন ফেরার কথাও বলেনি। এই অভিমান নিয়ে চা বানানো যায় না। কিছুতেই না। কিন্তু মেয়ে মানুষের মন। ভালোবাসার মানুষ, তার ওপর আবার স্বামী। না নিয়েও উপায় নেই। মনটা শেষমেশ হার বানল। চা বানিয়ে দীপ্র ভাইয়ের রুমের কাছে এল ও। মাথা বাড়িয়ে উঁকি দিতেই দেখল দীপ্র ভাই কাবাড খুলে কী সব করছেন। কুহুকে কথা বলতে হলো না। দীপ্র নিজেই বলল,”আয়।”
আশ্চর্য! এই লোক তো পেছনে তাকায়নি। তবে দেখল কীভাবে? কে জানে। মাঝে মাঝে ওর মনে হয়, লোকটার সাথে ভূত আছে। ও চায়ের কাপ রাখতেই পেছন ফিরল দীপ্র। কুহু মুখ ফিরিয়ে নিল।
“বোস, চা খেয়ে যা।”
এমন ভাব যেন, চা টা দীপ্র দেওয়ান নিজেই বানিয়েছেন। কুহু প্রতিউত্তরে বলল,”ভর দুপুরে চা খাই না। আপনিই খান।”
“অহ।”
বলে চায়ের কাপ তুলল দীপ্র। কুহু আড়ে আড়ে চাইল। দীপ্র বলল,”আড়চোখে না চেয়ে, ভালোভাবে চা।”
ধরা পড়ে গিয়ে ও বলল,”কই কী? আমি কি তাকিয়েছিলাম নাকি? আপনার চোখে নেবা হয়েছে দীপ্র ভাই। আজকাল কী সব দেখেন।”
“হুম, তাই ই বোধহয়। আজকাল কী সব দেখি…..
বলে একটা সুর তুলতেই কুহু চোখ বড়ো বড়ো করল। দ্রুত কাধের উড়না টেনে নিয়ে বলল,”ভারী নির্লজ্জ তো।”
দীপ্র হাসল। আরাম করে বসে বলল,”নির্লজ্জ? তুই দেখাবি আর আমি দেখলেই দোষ?”
কুহুর কান ঝালিয়ে যায়। ফিরেই শুরু করেছেন! ও কথা বাড়ায় না আর। দীপ্রই বলে,”বোস, একটা জিনিস দেখানোর আছে?”
“কী দেখাবেন?”
বলে ফিরে চাইল কুহু। মেয়েটির মাথায় দুষ্টুমি আসলো। ও ঠোঁট হাসিয়ে ভ্রু নাচাল। দীপ্র খুব ভালোই বুঝল ওর চাল। মেয়েটি কায়দা করে তাকে অপ্রস্তুত করতে চাচ্ছে। তবে দীপ্র দেওয়ান এত সহজে অপ্রস্তুত হবে না। ও একই ভাবে হাসল। বলল,”তুই যা দেখতে চাস।”
কুহুর দম ফুরোল। হার মানল মন। ও নজর ফিরিয়ে বলল,”উফ, আর পারছি না।”
“কী পারছিস না?”
কথার টোনে ফের দুষ্টুমি। কুহু চোখ বন্ধ করে। দম নেয়। তারপর বলে,”আপনি বলেন কী বলবেন। না হয় গেলাম।”
দীপ্র এবার থামল। বলল,”বোস আগে।”
কুহু গিয়ে বসল বিছানায়। দীপ্র ফের উঠল। কুহু একবার মাথা ঘুরিয়ে পুরো বিছানাটা দেখে নিল। আর মাত্র কটা দিন। তারপরই ওর ঘর পরিবর্তন হবে। এই ঘরটাই ওর ঘর বলে ঠাঁই মিলবে। দীপ্র ল্যাপটপ খুলে আঙুলের সাহায্যে কি বোর্ডে কী সব করতে শুরু করেছে। কুহুর অত আগ্রহ হলো না। ও ঘরময় চোখ বুলাচ্ছে। এমনি দীপ্র ভাই খুব গোছানো। খুব মানে খুব। তবু ওর মন মনে মনে ঘরটাকে নতুন ভাবে সাজানোর জন্য মড়িয়া হয়ে যাচ্ছে।
দীপ্র বলল,”তাকা।”
না তাকিয়েই কুহু বলল,”হু?”
“এদিকে তাকা।”
কুহু নজর ফেরাল। দীপ্র ল্যাপটপ ঘুরিয়ে দিতেই স্ক্রিনে কিছু একটা ভেসে উঠল। ও ফ্যালফ্যাল করে কিছু সময় চাইতেই বুঝে গেল একটা অ্যানিমেশন ভিডিও। ধীরে ধীরে পুরো ভিডিওটা অন হতেই কুহুর চোখ দুটো ঝলমল করে উঠল। দীপ্র মুচকি হেসে বলল,”ছোট বেলায়, আমাদের একটা গোরু ছিল। সেই গোরুটা ছিল তোর আদরের। তোর কাছের। সেবার অসুখ করে গোরুটা মারা গেল। তুই কি যে কান্নাকাটি করলি। ভাত খাবি না বলে দুদিন পার করেছিলি। আমি জোর করে খাইয়েছিলাম। বলেছিলাম তোকে একটা খামার করে দেব। সেখানে অনেক গোরু থাকবে। সেই কথায় তুই আশা ফিরে পেয়েছিলি। কুহু, তখন কথার কথা বললেও আজ সেটা সত্যি করে দিলাম। খুব দ্রুতই আমি একটা খামার করব। শুধু তোর জন্য। সেই ছেলেবেলার প্রতিশ্রুতি রক্ষার জন্য।”
কুহুর বুকের ভেতরটা যেন কেমন করে উঠল। ওর চোখ দুটোও ছলছল করছে। এই শখটা কুহু ছেলেবেলাতে নয়, বড়ো বেলাতেও দেখেছে। বাবার উপার্জন সীমিত হলেও বাবা বলেছিলেন একদিন খামার করবেন। কুহু জানত এই উপার্জনে সেটা সম্ভব নয়। তবু শুনতে ভালো লাগত। দীপ্র হাত বাড়িয়ে ওর গাল ছুঁয়ে দিতেই কুহু ঝড়সমান গতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল দীপ্রর বুকে। আচমকা আক্রমণে তাল সামলাতে পারল না দীপ্র। মেয়েটিকে বুকে নিয়েই পিঠ ঠেকল বিছানায়। খানিকটা চাপ অনুভব করলেও, ওঠে দাঁড়ানোর প্রয়াস করল না। বরং মেলে রাখা দুটো হাত কুহুর পিঠ আড়াআড়ি করে জাপটে ধরল। বাঁধন দিয়ে বোঝাল তোর সব শখ, আহ্লাদ আমি পূরণ করব। আমি দীপ্র দেওয়ান কথা দিচ্ছি তোকে।
চলবে..
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি
Share On:
TAGS: প্রণয়ের রূপকথা, ফাতেমা তুজ নৌশি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৫৯
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩৭
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১৫
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৭২
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৯
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪৪
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৫
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৬
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩৯