প্রণয়ের_রূপকথা (৮)
দীপ্র গাড়িতে হেলান দিয়ে। ওর খুব ছোট সময়ের কথা মনে হচ্ছে। তখনকার পরিবেশ ভিন্ন ছিল। ছিল আনন্দ। এখন সব পানসে। দীপ্র একদম গ্রামের ছেলে। ছেলেবেলায় নদীতে ঝাঁপ,গাছে ওঠা, মাছ ধরা সহ শখের বসে ধান কাটার মতন কাজটিও করা হয়েছে তার। তারপর বিদেশের মাটিতে চলে যাওয়া। সেই কালচার গায়ে মাখানো। তাই বলে কি গ্রামকে ভুলেছে সে? না তো। ভুলেনি। ওর ইচ্ছে ছিল এখানে আসার। স্থায়ী ভাবে থাকার। আসা হয়েছে। তবে স্থায়ী হওয়াটা অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করছে। দীপ্র ভারী অবাক হয়, যখন দেখে এত বছরেও এলাকাটা তেমন উন্নয়ন হয়নি। অথচ একদম শহরের পাশের এলাকা। এর পেছনে যে রাজনৈতিক শক্তি কাজ করছে, তা আর আলাদা করে বলতে হয় না। দীপ্র ছোট করে নিশ্বাস ফেলে। অদূরে দাঁড়িয়ে সবাই। ছবি তোলা হচ্ছে। দীপ্র যায়নি। এখানেই দাঁড়িয়ে আছে। এদিকে সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। ও এবার ডাকার প্রয়োজন বোধ করল।
“হলো তোদের?”
কণা প্রায় দশ মিনিট ধরে একটা রিলস বানানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু হচ্ছে না মনের মতন। আয়ানা নিজেও সোশ্যাল মিডিয়া পার্সন। তাই দুজনের এই বিষয়ে ভালোই বনেছে। একে অপরকে সাহায্য করছে। রাত্রি আর কুঞ্জ একসাথে। কুঞ্জর হাজারটা প্রশ্ন। বাচ্চাটা যে গ্রামীণ পরিবেশের সাথে একদমই পরিচিত নয়। তাই তার সব প্রশ্নের জবাব দিতে হচ্ছে মেয়েটিকে। এদিকে কুহু। একদম একা দাঁড়িয়ে। হালকা বাতাসে ওর ওড়নার এক পাশ উড়ে যাচ্ছে। মনোযোগ সামনের ক্ষেত গুলোর দিকে। খুব ভালো ভাবে তাকালে বোঝা যায়, এই ক্ষেতের ঠিক শেষ মাথা থেকেই নদী বয়ে চলেছে। আর সেই নদীর পাশেই মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে স্কুলটি। যেই স্কুলের প্রাণ ছিলেন কুহুর বাবা কাদের দেওয়ান। কুহু আনমনেই সবটা ভাবছিল। তখনই রাত্রি এসে ওর পাশে দাঁড়াল।
“মামার কথা ভাবছিস?”
না তাকিয়ে কুহু বলল,”বাবার কথা তো,মাথা থেকে যায়ই না রাত্রিপু। নতুন করে কী আর ভাবব?”
“তুই মেনে নিতে শিখ বোন। মামা চলে গেলেন কতদিন হলো।”
“কীভাবে মানব? বাবার সব স্বপ্ন, সব কিছু চোখের সামনে শেষ হয়ে যাচ্ছে। স্কুলের খবর তো জানো। বাবা চলে যেতেই যে যার মতন ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে। অনিয়মে যা তা অবস্থা। ছোট ছোট বাচ্চাদের মাথায় নষ্ট রাজনীতি ঢোকানো হচ্ছে।”
কুহুর কথায় রাত্রির মনটাও বড়ো বিষণ্ণ হয়ে গেল। ও কিছু বলার পূর্বেই অদূর থেকে দীপ্রর গলা,”রাত্রি, লেট হয়ে যাচ্ছে।”
পেছন ফিরে চাইল রাত্রি। দীপ্র ভাই ভ্রু কুঞ্চিত করে তাকিয়ে।
“আসছি।”
“দ্রুত কর। এভাবে সময় নষ্ট করার মতন সময় নেই।”
কুহু এক পলক তাকাল। দীপ্র চোখে সানগ্লাস পরে নিয়েছে। রাত্রি বলল,”চল।”
“আমার বোধহয় এখানে আসা ঠিক হয়নি।”
“কেন রে?”
“সবার মাঝে বোঝা মনে হচ্ছে।”
“যা তা বলিস না তো। চল এখন।”
বলেই কুহুর হাত খানা চেপে আগাতে লাগল রাত্রি। আয়ানা দারুণ একটা রিলস বানিয়েছে। সেটাই দেখাচ্ছে দীপ্রকে। দীপ্র হতাশ হয়ে বলে,”তোরা দুজন এভাবেই সোশ্যাল মিডিয়ায় নেচে বেড়াস?”
নেচে বেড়ানোর কথায় আয়ানার মুখটা একটু অন্ধকার হলো। কণা চোখ ছোট ছোট করে বলল,”এটা ট্রেন্ড দীপ্র ভাইয়া।”
“শুধু ট্রেন্ডে গা ভাসালে চলবে? পড়াশোনা ও করতে হবে।”
পড়াশোনার বিষয়টি আসায় আয়ানা আর কথা বলল না। এই ব্যাপারে একেবারেই কাঁচা মেয়েটি। রাত্রি আর কুহু আসতেই কুঞ্জ বলল,”চলো, আমাদের যাত্রা শুরু।”
এ কথায় হেসে কুঞ্জর মাথার চুল গুলো নাড়িয়ে দিল দীপ্র। তারপর তাকাল কুহুর দিকে। মেয়েটির চেহারায় বিষণ্নতা লেপ্টে আছে।
গ্রামীণ রাস্তায় হেঁটে চলেছে ওরা। আয়ানা বুঝেছে, দীপ্র ভাই গ্রামকে খুব ভালোবাসেন। তাই ও একটু বাড়তি কথা যোগ করে বলে,”ইস, আগে গ্রাম এত ভালো লাগেনি। মনে হচ্ছে সব দীপ্র দাদাভাইয়ের ম্যাজিক।”
এই যে। মেয়েটি দীপ্রকে তেল দেওয়ার চেষ্টা করল। সেটা সবাই বুঝল। তবে কেউ কোনো কথা বলতে চাচ্ছিল না। কুহুর কেন যেন দীপ্রর প্রশংসা শুনতে ইচ্ছে করে না। অন্য কোনো বিষয় হলে সে পাত্তাও দিত না। কিন্তু এই লোক প্রশংসার যোগ্য না। সেটা সত্য প্রশংসা হোক কিংবা মিথ্যা। ও পাশ থেকে বলল,”কোনো কিছুই ম্যাজিক না আয়ানাপু। তুমি আগে এভাবে তো ঘোরাঘুরি করোনি। তাই নতুন জিনিসে আকর্ষণ পাচ্ছ।”
কথাটা আয়ানার পছন্দ হলো না। আজ কুহু একটু বেশিই কথা বলছে। অথচ মেয়েটিকে ও বোকাসোকা বলেই জানে।
“ঠিক আছে,ঠিক আছে। এখন কথা বাদ দিয়ে পা চালা। এই ওদিকটায় ভাজার দোকান আছে। চল খাই।”
রাত্রি উচ্ছ্বাস নিয়ে বলতেই আয়ানা বিরোধ করে বলল,”একদম না। এগুলা আমি খাবই না। শেষে আমার ব্রণ ওঠবে।”
“একদিন খেলে কিছু হবে না আয়ানা।”
“তোমরা খাও রাত্রিপু। আমি খুবই হেল্থ কনসাস।”
বলেই মুখ ঘুরিয়ে নিল আয়ানা। ওকে আর কেউ টানল না। দোকানের সামনে আসতেই ভাজার ঘ্রাণে পেটে ইঁদুরের নাচানাচি শুরু হলো। কুঞ্জ পেটুক স্বভাবের। ও সবার আগে বলল,”আমি কিন্তু অনেক গুলো খাব।”
আয়ানা বড়ো বিরক্ত হলো। বলল,”এত খাই খাই করিস কেন তুই?”
বোনের কথায় কুঞ্জর মুখটা ছোট হয়ে গেল। আপু সব সময় এমন করে! ওর মুখের ভঙ্গি দেখে দীপ্র বলল,”এভাবে বলছিস কেন আয়ানা? ও খেতে ভালোবাসে। সেটা তো জানিসই।”
“না মানে। তাই বলে সব সময়….”
বলে বিড়বিড় করে থেমে গেল আয়ানা। কথাটা দীপ্র একদমই পছন্দ করেনি। খাওয়া নিয়ে কথা শোনানো তার ভারী অপছন্দেল। কুঞ্জর মুখটা তখনো অন্ধকারে ছেয়ে আছে।
“কুঞ্জ, একটা প্রতিযোগিতা করবি?”
“কী প্রতিযোগিতা দাদাভাই?”
“দেখব, কে বেশি খেতে পারে। তুই নাকি আমি।”
কুঞ্জর মুখটায় হাসিতে ভরে ওঠল। বলল,”তুমি তো বেশি খাবে দাদাভাই।”
“দেখি না। কে জিতে। তোর নিজের ওপর ভরসা নেই?”
“আছে, কিন্তু তুমি তো বড়ো।”
“উম ঠিক আছে। তোর একটা সমান আমার তিনটা। এবার খুশি তো?”
“ওকে, ওকে। তাহলে পারব।”
বলেই কুঞ্জ দোকানটার ভেতরে চলে গেল। আয়ানার মুখটা তখনো শুকনো। ও দাঁড়িয়ে। কুহু বলল,”বাহিরে দাঁড়িয়ে আছ কেন?”
“তোরা যা। আমি যাব না।”
দীপ্র কিন্তু কুঞ্জর সাথে সাথেই চলে গিয়েছে। আয়ানা না যেতে চাওয়ায় আর কেউ জোর করল না। ওরা ও ভাজার দোকনটায় চলে গেল। আয়ানার একটু আশা ছিল দীপ্র ভাই হয়তো তাকে ডাকবেন। কিন্তু তেমন কিছু ই হলো না। দীপ্র ব্যস্ত কুঞ্জ আর কণাকে নিয়ে। কণা নিজেও খেতে ভীষণ ভালোবাসে। ও জানিয়েছে এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে। সেটা শুনে কুঞ্জর উচ্ছ্বাস বেড়েছে। তবে কুঞ্জ ভীষণ কঠোর ভাবে বলে দিয়েছে, কণাপু যেহেতু বড়ো তাই, কুঞ্জর একটা সমান কণার দুইটা ধরতে হবে। কণা প্রথমে একটু ওর সাথে তর্ক করলেও শেষে কিন্তু মেনে নিয়েছে। সেই অনুযায়ীই খাবার অর্ডার চলছে। কুহুর কাছে জানতে চাওয়া হলো সে কী খাবে। ও অন্য মনস্ক ছিল। একটু চমকাল। তারপর বলল,”আমি কিছু খাব না।”
“এটা কেমন কথা? খাবি না কেন?”
“এমনি। তোমরা খাও।”
“আজব তো। এমনি আবার কী কথা? একটা কিছু খা।”
“ভালো লাগছে না। শরীরটাও খারাপ রাত্রিপু।”
এ কথার পর দীপ্র মুখ খুলল। বলল,”কেউ না খেতে চাইলে জোর করিস না রাত্রি।”
কুহু তাকাল আড় চোখে। দীপ্রর কথার পিঠে রাত্রি বলল,”তাই বলে কিছুই খাবে না?”
“না খেতে চাইলে খাবে না। চাইলে বাইরে গিয়েও দাঁড়াতে পারে। সেটাই বরং ভালো হয়।”
কুহু আসলে বাইরে দাঁড়াতে চায়নি। বসতেই চেয়েছিল। তবে দীপ্র’র বলা শেষ কথাটা ওর গায়ে লাগল। এ একদম বসা থেকে ওঠে দাঁড়াল।
“এই কুহু। না খেলে,বসে থাক।”
“না রাত্রিপু। আমি বাইরে যাই। আয়ানপু্ও তো ওখানে।”
বলেই পা বাড়াল কুহু। দীপ্র নিস্তেজ চোখে তাকাল। ইচ্ছে করেই মেয়েটিকে রাগাল ও। এতে ওর কোনো খারাপ লাগা নেই। কুহু নিজেও তো দীপ্রকে রাগিয়েছে। তাই সমানে সমান দাঁড়াল।
| প্লটটা বড়ো। অনেক চরিত্র নিয়ে। তাই মনে হতে পারে ধীরে আগাচ্ছে। তবে এই রকম বড়ো গল্প একটু বিস্তারিত ভাবে লিখলেই আমার মনে হয়, বেশি মনে ধরবে। আপনারা একটু ধৈর্য নিয়ে পড়বেন প্লিজ। আমি একটু একটু করে লেখার চেষ্টা করি রোজ। নানান ব্যস্ততায় রোজ দেওয়া না হলেও, আমি যত দ্রুত পারা যায়, গল্প দেওয়ার চেষ্টা করব। আপনাদের ভালোবাসায় রাখবেন। |
চলবে…
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি
Share On:
TAGS: প্রণয়ের রূপকথা, ফাতেমা তুজ নৌশি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৫
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১০
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১৫
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৯
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৯
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৫
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১৮
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১৭
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৭