প্রণয়ের_রূপকথা (৭৯)
কণার কিছুই ভালো লাগে না। দুদিন ধরে রাগীবকে ব্লক লিস্টে রেখেছে সে। পরীক্ষা সামনে। পড়াশোনাতেও মন নেই। ও বসেছিল উদাস হয়ে। সেই সময়েই কুঞ্জ এসে বলল,”চলো না কিছু খেলি।”
কণা চাইল। কিছু সময় নিয়ে কুঞ্জর বাহুতে হাত রাখল। বলল,”কী খেলবি?”
“কিছু একটা।”
“আচ্ছা। লডু নিয়ে আয়।”
কুঞ্জ ছুটে গেল লডু আনতে। কণা নিজের ফোনটি বের করে রাগীবের নাম্বারটি দেখতে লাগল। একবার মনে হলো ব্লকটা খোলা দরকার। কিন্তু পরমুহূর্তেই মনে হলো, কী দরকার?
কণার যে মন নেই, তা বেশ ভালোই বুঝতে পারে কুঞ্জ। ও এবার বিরক্ত হয়। বসা থেকে উঠে যায়।
“তুমি খেলছ না কণাপু।”
“খেলছি তো।”
“না। খেলছ না। তোমার মন ই নেই।”
“কুঞ্জ, আমি….
ঠিক সেই সময়েই আয়ানার আগমন হলো। আয়ানা বলল,”কুঞ্জ, এদিকে আয়। আমি খেলব।”
বিষয়টা আকাশ থেকে পড়ার মতন হলো। আয়ানা এসব বিষয়ে একদমই আগ্রহী না। আজ নিজ থেকেই বলছে। কুঞ্জ কণার সামনে থেকে লডু পেপার তুলে নিয়ে চলে আসে আয়ানার নিকট। কণা চেয়ে চেয়ে দেখে। দেখে, ওর হারিয়ে ফেলা সব কিছু।
কুহু কল করেছে। ভিডিও কল। কথা বলতে বলতে আসছিল রাত্রি। কণাকে দেখে বলল,”এই কণা, এই যে দেখ। কুহু কেনাকাটা করছে।”
কণার মনটা ভালো নেই। ও তবু ফোনের দিকে এগোল। লেহেঙ্গার দোকানে আছে কুহু। ও সব লেহেঙ্গা ধরে ধরে দেখাচ্ছে। কুঞ্জ খেলা ফেলেই উঠে এল। আয়ানা তাকিয়ে রইল রাগ নিয়ে। এই বাড়ির সবাই ওর নিকট বিষ। সবাই মানে সবাই।
“কুহুপু,আমার জন্য চকলেট এনো।”
হেসে ওপাশ থেকে মেয়েটি বলল,”না আনলে হয় না?”
“উহু। হয় না। দীপ্র দাদাভাইকে দাও।”
দীপ্র দোকানদারের সাথে কথা বলছিল। কুঞ্জর কথা শুনে কুহুর পেছনে এসে দাঁড়াল। এখন দুজনকেই এক ফ্রেমে দেখা যাচ্ছে।
“দাদাভাই, আমার চকলেট আনবে কিন্তু।”
“আনব, আনব। সব মনে আছে।”
“কুহুপু বলছিল আনবে না।”
“মজা করেছে। তুই টেনশন করিস না।”
এরই মধ্যে জেবা এলেন। রাত্রি ফোন তুলে দিল তার হাতে। ফোনের স্ক্রিনে চেয়ে জেবা বললেন,”তোরা দুটো এমন শুকিয়ে গেছিস কেন?”
এই হলো মা। এদের কাছে, সন্তান কখনোই মোটা হয় না। একটু চোখের আড়াল হলেই বলবে শুকিয়ে গিয়েছিস। দীপ্র বলল,”তোমার কাছে কখনোই আমরা মোটা হব না।”
“মোটা হলে তবেই না বলব মোটা হয়েছিস।”
“বড়ো মা, আমি কিন্তু মোটা হয়েছি। এই যে দেখো।”
জেবা মুখটা ওমনই রাখলেন। বললেন,”খুব মোটা হয়েছিস। শোন, দুজনকেই বলি। ভালো মতন খাওয়া দাওয়া করবি। খাওয়ায় কোনো অবহেলা নেই।”
কুহু মাথা দোলাল। জেবা ফের বললেন,”কুহু, মা তুই ছেলেটার খেয়াল রাখিস তো। কাজে থাকলে নিজের যত্ন নেয় না কখনোই।”
কুহু মিষ্টি করে হাসল। বলল,”রাখব।”
জেবা স্বস্তির শ্বাস ফেললেন। তারপর চেয়ে রইলেন ফোনের স্ক্রিনে। দুটিকে কি সুন্দর লাগছে। কি দারুণ মানিয়েছে। একদম সুখী দম্পতি যাকে বলে।
আয়ানা ঘরে ফিরে একচোট রাগারাগি করল। আবিদা এবার বিরক্ত হলেন। বললেন,”আর কী করতে বলছিস? তোর জন্য তো সম্পত্তিতেও হাত দিয়েছি। আর কী করব?”
“কী করবে সেটা বুঝো না? রাত্রিপুর জন্য, আজ কুহু দীপ্র দাদাভাইয়ের সাথে। ওরা ওখানে নিশ্চয়ই বসে থাকবে না। ওরা এক ঘরেই থাকবে।”
ভাবতেই আয়ানার সব ধ্বংস করতে ইচ্ছে করে। আবিদা বলেন,”ওরা স্বামী-স্ত্রী। একসাথে তো থাকবেই।”
“এই সব কিছু তোমাদের দোষে হয়েছে। তোমাদের জন্যই হয়েছে।”
বলে বিছানায় শুয়ে পড়ল আয়ানা। আবিদা বললেন,”আর কী করতে বলছিস?”
“জানি না। আমার মাথা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমি বি ষ খেয়ে নিতেও পারি।”
এ কথায় আবিদা চমকালেন। ধমকে বললেন,”কী বলছিস এসব!”
“বললাম তো আমার মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে মা।”
আবিদার হৃদয়ে ভয় ঢুকে গেল। তিনি মেয়ের পাশে বসলেন। বাহুতে হাত রেখে বললেন,”তোর বাবার সাথে কথা বলব। দীপ্রর থেকেও অধিক যোগ্য ছেলের সাথে তোর বিয়ে দিব।”
আয়ানা একটু সময় নেয়। তারপর বলে,”সে তো আমি করবই। তার আগে, আরো একটা কাজ শেষ করতে হবে।”
মা-মেয়ের কথার মাঝেই দরজায় নক পড়ল। আবিদা বললেন,”কে?”
“খালাম্মা, আমি।”
জেসমিন এসে দাঁড়িয়েছে দরজায়। আবিদা বললেন,”কী দরকার?”
মুখটা গোমড়া করে জেসমিনের প্রবেশ ঘটল। এই মেয়েটিকে সহ্য হয় না আয়ানার। ও চোখ মুখ শক্ত করে রইল।
“খালাম্মা, আমি আর এখানে থাকতাম না।”
“কেন? এখানে থাকলে কী সমস্যা?”
জেসমিন প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে যায়। বলে,”আপনে তো জানতেন, সাগরের লগে আমার একটা সম্পর্ক ছিল।”
“তো? তাতে কী হয়েছে এখন?”
“হারামির পুত, বিয়া করব। আমি যদি জেসমিন হই, ওর বউ নাকি গোলাপ হইব। আমার থেকে সুন্দর বিয়া করব।”
কথার আগা মাথা বুঝে না আবিদা। চেয়ে থাকেন। আয়ানা ধমকে বলেন,”তোর মাথায় কী সমস্যা?”
জেসমিন বিড়বিড় করে বলে,”মনে হয়। আপনার লগে থাকতে থাকতেই এই উন্নয়ন।”
আবিদা এবার বলেন,”যা, তোরে পাঠিয়ে দিব। এখন মাথা নষ্ট করিস না।”
জেসমিন বেরিয়ে যায়। আবিদা বলেন,”তখন কী বলছিলে? কী কাজ করবে তুমি?”
আয়ানা জবাব না দিয়ে হাসে। বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। বিড়বিড় করে বলে,”যখন করব, তখনই না হয় দেখবে।”
আজ রাতে একটা মিটিং রয়েছে। অফলাইনে। কুহুকে হোটেলে রেখে যেতে মন চাচ্ছে না। তাই দীপ্র ঠিক করল সাথে নিয়ে যাবে। কুহু তৈরি হতে হতে বলল,”আমাকে সবার সামনে নিয়ে যাবেন, আনইজি লাগবে না?”
“আনইজি লাগবে কেন?”
“না মানে, আমি আর আপনি তো আকাশ-পাতাল।”
এ কথায় ছেলেটি ভ্রু কুঞ্চিত করল। দূরত্ব কমিয়ে বলল,”এসব কী কথা? এত বেশি বুঝিস কেন?”
কুহু মিনমিনে সুরে বলল,”আমি দেখেছি, বেশ কজন মেয়েও আসবে। তার খুব সুন্দর, স্মার্ট।”
দীপ্র হতাশ হয়ে পড়ে। এই মেয়ে জাতির একটি সমস্যা, সে যতই সুন্দর হোক, পুরুষ জাতিকে নিয়ে একটু আধটু ভয় থাকবেই।
কুহু বলে,”আমি না যাই। সেটাই বরং ভালো হবে।”
দীপ্র এবার জবাব দেয়। বলে,”দীপ্র দেওয়ানের চোখে, একমাত্র সুন্দর নারী কুহু দেওয়ান। পৃথিবীর আর কোনো নারীর সাধ্য নেই, সে দীপ্র দেওয়ানের চোখে তোর থেকে বেশি সুন্দর হবে।”
এ কথায় কুহুর অধরে হাসি আসে। এই কথাটাই সে শুনতে চাচ্ছিল। তাই তো সেই কথা গুলো তুলল। আর কৌশলে শুনেও নিল।
কুহু বোধহয় কিছুটা অস্বস্তিতেই। সে সুন্দর একটা কামিজ পরেছে। চুল গুলো ছেড়ে রাখা। তাকে মিষ্টি লাগছে। তবু, সামনের নারী গুলোকে দেখে ওর কেমন যেন লাগছে। সেটা বুঝেই দীপ্র তার হাত খানা মেয়েটির বাহুতে ঠেকাল। ইষৎ চাপে নিজের সাথে মেশাতেই সামনে থাকা নারী গুলো একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। হাই হ্যালোর এক পর্যায়ে একটি অল্প বয়সী মেয়ে বলল,”গার্লফ্রেন্ড নাকি?”
দীপ্র হাসল। চাইল কুহুর দিকে। তারপর বলল,”উহু, গার্লফ্রেন্ড নয়। আমার বউ।”
কুহু তাকাল চমকে। এই প্রথম, এই প্রথম দীপ্র ভাইয়ের মুখ থেকে আমার বউ শব্দটি শুনল ও। একটা তীব্র ভালো লাগায় মেয়েটি বুদ হয়ে রইল। মনে হলো, পৃথিবীর সব কিছু সুন্দর। সব মানে সব।
চলবে…
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি
Share On:
TAGS: প্রণয়ের রূপকথা, ফাতেমা তুজ নৌশি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৫
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩১
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৫২
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৭৮
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪৫
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩২
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৬
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৭৭
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৮
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩৫