প্রণয়ের_রূপকথা (৭১)
ভোর বেলা দরজায় এসে নক করল কুহু। রাত্রি কোনো মতে ঘুম থেকে উঠে দ্বার খুলল। ঘুমুঘুমু চোখে যখন কুহুকে দেখল ও চ্যাঁচিয়ে বলল,”কুহু! তুই এসেছিস। জানিস কী হয়েছে,রাতে ছোট মামি এসে তোর খোঁজ করছিল। আমি যে কীভাবে ম্যানেজ করেছি।”
“মা খোঁজ করছিল?”
ঘরে প্রবেশ করে করতে শুধাল কুহু। রাত্রি বলল,”হ্যাঁ।”
“ইস, কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল হয়তো।”
“না,মনে হয়। এমনি তোকে দেখতে এসেছিল। তবে….
বলে রাত্রি একটু থামল। কুহু ভেতরে চলে এসেছে। গায়ের উড়নাটা রেখেছে বিছানায়। রাত্রি মুচকি হেসে কুহুর গলার কাছে এসে থামল। কুহু তখনো বুঝেনি বিষয়টা। রাত্রি বলল,”দ্রুত গোসল করে নে।”
এ কথায় এত লজ্জা লাগল কুহুর। ও অন্যপাশ ফিরে বলল,”একটু পরে করে নেব রাত্রিপু।”
“জি না। এখনই করবেন। এখনই করতে হবে।”
কুহু লজ্জায় কেমন রঙিন হয়ে যাচ্ছে। রাত্রি এগিয়ে এসে বোনের বাহু টেনে ধরল। কুহু চোখ তুলে তাকাতে পারছে না। রাত্রি ওকে জাপটে ধরে বলল,”কুহু, বোন বিশ্বাস কর, তুই হয়তো নিজেও জানিস না তোর লাইফে কে এসেছে।”
কুহু জবাব দেয় না। তবে মনে মনে বলে,”এই জন্যই তো এত ভয় হয় রাত্রিপু। অযোগ্য আমি এমন যোগ্য মানুষকে পেয়ে গেছি যে, এখন আমার প্রতি পদক্ষেপেই চিন্তা হয়।”
কুহু খুব ছোটোছুটি করেই ঘর থেকে চলে গেছে। দীপ্র চাইলে অবশ্য আটকাতে পারত, তবে ওর লজ্জায় নুয়ে পড়া দেখে শেষমেশ ছাড়তে বাধ্যই হলো। ও এখন তোয়ালে দিয়ে চুল মুছে নিচ্ছে। সামনেই বড়ো আয়না। সেখানে দেখা যাচ্ছে ওর অর্ধ উন্মুক্ত দেহখানা। পেটানো শরীরে বিন্দু বিন্দু জল জমে আছে। সেটা তোয়ালে দিয়ে মুছে নিয়ে দীপ্র অন্যপাশ ফিরল। বিছানায় তাকাতেই ওর মনটা উদাস হয়ে গেল। একটু আগেও তো এখানে ছোট্ট একটা দেহ ছিল। যে ওর বুকের সাথে মিশে ছিল সমস্ত রাত। দীপ্রর বড়োই হতাশ লাগে। এতদিন এই লুকোচুরি ভালোবাসাটা মজা লাগলেও, আজকের পর থেকে এটা বেশ ভোগাবে দীপ্রকে।
আজ প্রায় সকলেই খুব ভোর ভোর উঠেছে। সবাই এসেছে খাবার খেতে। দীপ্র একটু লেট করে এলো। ও আসতেই অরণ্য বলল,”ভাই, বেঁচে আছিস?”
“বেঁচে কেন থাকব না?”
“রাতে কতবার কল করেছি।”
“দেখেছি।”
“আশ্চর্য! দেখেও রিসিভ কেন করলি না?”
অরণ্যর চোয়াল নেমে আসে। দীপ্র চেয়ারে বসতে বসতে বলে,”রিসিভ করিনি কারণ আই ওয়াজ বিজি উইথ ভ্যারি ইম্পর্ট্যান্ট ওয়ার্ক অ্যাট দ্যাট টাইম।”
এ কথার পরপরই কুহুর কাশি উঠে যায়। সকলের নজর যায় ওর দিকে। দীপ্র পানির গ্লাস এগিয়ে দিয়ে বলে,”আস্তে। আমি এমন কিছু বলিনি যাতে কাশি উঠতে হবে।”
কুহু দ্রুত পানির গ্লাস থেকে পানি পান করে। এমনিতেই ও লজ্জায় মাথা উঠাতে পারছিল না, আর এই লোকটা এসেই শুরু করেছে! কুহু না তাকালেও দীপ্রর নজর ওরই দিকে। ও চেয়ে আছে এক দৃষ্টিতে। অরণ্য ওদের এই কাহিনী দেখে চাইল রাত্রির দিকে। রাত্রি চোখ পাকিয়ে বোঝাল,’তুমি এত বলদ কেন অরণ্য?’
খাবার খাওয়ার সময় কুহু একটিবার ও দীপ্রর দিকে তাকাল না। একটিবার ও না। দীপ্র তাই সুযোগ পেয়েই মেয়েটিকে চেপে ধরল। কুহু চিৎকার করতে গিয়েও থেমে গেল। নজর নামিয়ে বলল,”কেউ আসবে।”
“আমি ভয় পাই নাকি?”
“সেটা বলিনি।”
“কী বলেছিস তাহলে? আমার বউ, আমি চেপে ধরেছি, তাতে কার কী?”
কুহু আর পারে না। দীপ্র ওর থুতনি ধরে উঁচু করে। চোখে চোখ রেখে বলে,”এত লজ্জা, এখনো?”
মেয়েটির বুকের ভেতর কম্পন তৈরি হয়ে যায়। দীপ্র আরেকটু এগোয়। ফিসফিসিয়ে বলে,”অথচ, তখন তুই আরো….
কুহু হাত দিয়ে দীপ্রর মুখ আটকে ধরে। মিনমিনে সুরে বলে,”প্লিজ, আর বলবেন না।”
“কেন বলব না? তখন তো আরো…
“প্লিজ।”
দীপ্র থেমে যায়। ওর ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি এসে আটকায়। ও বলে,”আচ্ছা আর বলব না। তবে আমার কিছু চাই।”
কুহু দৃষ্টি উঠিয়ে শুধায়,”কী?”
দীপ্রর থেকে জবাব আসে না। ও এগিয়ে যায় মেয়েটির কানের কাছে। পর মুহূর্তেই কানের লতিতে ঠোঁট ছোঁয়ায়। কুহুর সমস্ত শরীরে শিরশির হাওয়া বয়ে যায়। দীপ্র হেসে ফিসফিসিয়ে বলে,”এই সামান্য ছোঁয়াতেই এখন এভাবে কাঁপুনি ধরছে। অথচ সমস্ত রাত আমার বুকে মিশে ছিলি জান।”
কথায় আছে মানুষ যা দেখতে চায় না, তাই বার বার চোখে ধরা দেয়। দীপ্র-কুহুর এই মুহূর্তটা আয়ানার সামনে এসেই ধরা দিল। ও আর থাকতে পারল না। পিছিয়ে গেল। দু চোখে আগুন জ্বলতে লাগল। ওর এই আগুন গিয়ে পড়ল কুহুর জামার উপর। লুকিয়ে মেয়েটির ঘরে গিয়ে আজকের জন্য সিলেক্ট করা ওর পুরো জামাটাই কেটে ফেলল। কুহু ঘরে পৌঁছে দেখল, আয়ানা এই কাজ করে চলেছে। ও চ্যাঁচিয়ে উঠল।
“আয়ানাপু।”
ও একটু চমকালেও, খুব বেশি ভয় পেল না। বরং একটা ভাব চলে এলো শরীরে। কুহু এগিয়ে এসে ওর হাত থেকে ছিনিয়ে নিল জামাটা। তারপর মেলে ধরল। দেখল, পুরো জামাটার বেহাল দশা। আয়ানা হেসে বলল,”সরি রে কুহু। আমি না একদমই বুঝতে পারিনি।”
আয়ানার মনটা এবার শান্ত হয়েছে। ও ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি নিয়ে ঘর ছাড়ল। আর ওর যাওয়ার পানে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল কুহু।
আয়ানা সেজেগুজে তৈরি হয়েছে। আজকেও তাকে অপ্সরার মতন লাগছে। ও নিজের মতন ঘুরঘুর করছিল। বিয়ের আসর মাত্রই জমতে শুরু করেছে। খানিক বাদে বর বউদের নিয়ে আসা হবে। বিয়ে পড়ানো হবে। দীপ্র সামনেই দাঁড়িয়ে। ফোনে কথা বলছে। এত কিছুর পর ও আয়ানার শিক্ষা হয় না। ও হাসি হাসি মুখে দীপ্রর দিকে এগোতে যাচ্ছিল ঠিক তখনই কুহু ডেকে উঠল “আয়ানাপু” বলে। আয়ানা পেছন ঘুরতেই কুহু একটা ইটের সাথে পা লেগে পড়তে পড়তে গিয়ে পড়ল আয়ানার শরীরে। ওর হাতে ছিল শরবতের গ্লাস। যা আয়ানার শরীর গিয়ে পড়ল। সকলের দৃষ্টি পড়ল ওদের দিকে। কুহু ব্যস্ত হয়ে বলল,”সরি, সরি। কীভাবে যে পড়লাম।”
এই বলে একটা টিসু নিয়ে আয়ানার ড্রেস পরিষ্কার করতে এলো কুহু। আয়ানা নির্বিকারভাবে তাকানো। কী থেকে কী হলো তাই বোধগম্য হচ্ছে না। কুহু সুযোগ বুঝে ফিসফিস করে বলল,”ইট মা র লে পাটকেল তো খেতেই হবে আয়ানাপু। সামনে আর এক পা ও এগোবে না। এটা তোমার জন্য আমার ছোট্ট সর্তক বার্তা। সব মেনে নিলেও, ঐ মানুষটার দিকে নজর আমি আর মানব না।”
“কুহু।”
দাঁত চিবিয়ে চিবিয়ে বলল আয়ানা। কুহু তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে গলার স্বর উঁচু করল। বলল,”ইস রে। পুরো জামাটাই তো নষ্ট হয়ে গেছে আয়ানাপু। খুবই সরি বুঝলে। তুমি বরং জামাটা চেঞ্জ করে নাও। বিয়ে বাড়িতে দু একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা তো হয় ই বলো?”
রাগে আয়ানার মাথা ফেঁটে যাবার উপক্রম হলো। তবে ও একটা কথাও বলতে পারল না। চেয়ে রইল অগ্নি দৃষ্টি নিয়ে।
কুহু যে ইচ্ছে করেই ঘটনাটা ঘটাল তা আর কেউ না দেখলেও দেখেছে দীপ্র। ও এগিয়ে যেতে গিয়ে মানুষটার মুখোমুখি পড়ল। দৃষ্টি নামিয়ে ফেলতেই দীপ্র এগিয়ে এসে ওর বরাবর দাঁড়াল। কুহু মিনমিনে সুরে বলল,”সকালে আয়ানাপু আমার ড্রেস কেটে ফেলেছে। তাই আমি….
দীপ্র আলগোছে হাত বাড়িয়ে দিল ওর গালে। হালকা চাপে মুখটা উঁচু করে শুধাল,”কবে থেকে এমন শোধ নিতে শুরু করলি তুই?”
“জানি না। রাগ হয়েছিল তাই করে ফেলেছি। বেশি ভুল করে ফেলেছি দীপ্র ভাই?”
ওর বলার ভঙ্গিমায় দীপ্র হেসে ফেলল। বুড়ো আঙুল দিয়ে গালটা হাল্কা ঘঁষে দিয়ে প্রশ্রয় ও দুষ্টুমি সুরে বলে,”না। খুব বেশি ভুল করিসনি তুই। বরং রাতের ডোজে কাজ হয়েছে। আমার আদর পেয়ে জেলাসির মাত্রা বেড়েছে। আই লাইকড ইট জান।”
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি
চলবে….
Share On:
TAGS: প্রণয়ের রূপকথা, ফাতেমা তুজ নৌশি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১৪
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২২
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১০
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১১
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৫১
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪২
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৫৩
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১২