প্রণয়ের_রূপকথা (৬৯)
গান শেষ হলেও, কুহুর ধ্যান দীপ্র ভাইয়ের দিকে। ওর চোখ দুটো মানুষটাকে দেখে চলেছে। একই ভাবে দেখে চলেছে দীপ্রও। সবাই যখন হৈ হৈ করে উঠল, তখন কুহুর ধ্যান ভাঙল। ও চোখের দৃষ্টি নামাল। আবির এগিয়ে এল মঞ্চে।
“এত সুন্দর গান গাইতে পারিস, আর আমরা জানতাম ও না।”
দীপ্রর নজর তখনো কুহুর দিকে। ও কণ্ঠের খাদ নামিয়েও বলল,”এটা স্পেশাল কারো জন্য।”
“ও হো, আমরা বুঝি স্পেশাল হলাম না?”
“না, হলি না।”
বলে উঠে দাঁড়াল দীপ্র। নজর ঘুরিয়ে বলল,”শালা, তোদের তো খুব মজা চলছে। বিয়ে করেই বউ নিয়ে সুখে শান্তিতে সংসার করবি। আর আমার তো প্রেমটাও হলো না ঠিক ঠাক।”
আবির ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে। দীপ্রর কানের কাছে এসে বলে,”ভাই, তোর কপাল কিন্তু আরো ভালো। কুহুকে যেভাবে ইচ্ছে, সেভাবেই ম্যানেজ করতে পারবি। আর আমাদের কপাল, একটু কিছু হলেই খেয়ে ফেলবে।”
দীপ্র মৃদু হাসল। দেখতে পেল কুহু জায়গাটি থেকে সরে যাচ্ছে। ও বলল,”আমি যাচ্ছি।”
“কোথায়?”
“যেখানে যাওয়ার কথা।”
বলেই লাফিয়ে নেমে গেল দীপ্র। আয়ানা একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল। ওর আর সহ্য হচ্ছে না। ও পেছন পেছন ছুট দিল। কিছু দূর যেতেই ডাক পড়ল। দীপ্র পেছন ফিরে চাইল। আয়ানা এল সামনে। মুখের বিরক্তি সরিয়ে চোখে মুখে আনল অন্য রকম দ্যুতি।
“আমাকে কেমন লাগছে?”
খানিকটা এগিয়ে এসে বলল ও। দীপ্রর চোখ দুটো আয়ানার মুখ বরাবর। ও নজর সরাচ্ছে না। অথচ আয়ানা চাচ্ছে দীপ্র নজর সরাক। ওকে ভালোভাবে দেখুক।
“বলো, কেমন লাগছে?”
“হুম, সুন্দর।”
“কুহুর থেকেও?”
এই পর্যায়ে দীপ্রর চোয়াল ভারী হলো। ও এক পা এগিয়ে এসে বলল,”শাট আপ আয়ানা। কখন কী প্রশ্ন করতে হয় এই বোধটুকু আজও হলো না তোর!”
ও ভয় পেল না। বরং কাছে এগোল। ফট করেই দীপ্রর বুকে হাত রাখল। দীপ্রর চোখ দুটো রক্তিম হলো।
“কখন আর বলব? বলো, তুমি কখন শুনতে চাও। আমি তখন, সেভাবেই তোমার কাছে আসব। তুমি যা চাইবে….
দীপ্রর এত রাগ হলো। ও হাতটা উঁচু করেও থেমে গেল। আয়ানা অবশ্য দমল না।
“মা রবে? মা রো, মা রো প্লিজ। তবু আমার হয়ে যাও। আমার হয়ে যাও। আমি জানি, আমি জানি কুহুর সাথে তোমার কোনো ভালোবাসার সম্পর্ক নেই। ওর সেই যোগ্যতাই নেই। ওর মতন মেয়ে তোমাকে কীভাবে বুঝবে? আমি জানি তো সব। তুমি, তুমি….
কুহু যেতে যেতে থেমে গিয়েছিল। ও দেখেছিল দীপ্র ভাই আসছেন। যখন দেখল আর দেখা যাচ্ছে না তখন ফিরত এসেছিল পেছনের দিকে। ঠিক তখনই এসে এই ঘটনা চোখে পড়ল। কথা গুলো কানে যেতেই কুহুর বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল। ও পেছন ফিরতে গিয়ে, একটি ইটের সাথে আঘাত খেল। ব্যাথায় উহ বলে শব্দ করতেই পেছন ফিরল দীপ্র। দেখতে পেল কুহুকে। ও ‘কুহু’ বলে ডাকতেই কুহু দ্রুত উঠে গিয়ে স্থানটি ত্যাগ করল। আয়ানা পুনরায় দীপ্রকে চেপে ধরল। দীপ্র এবার নিজের রাগটি সামাল দিতে ব্যর্থ হলো। আয়ানাকে এক ধাক্কায় সরিয়ে দিল। চোয়াল শক্ত করে বলল,”আই সয়ার আয়ানা। যদি না তুই আমার কাজিন হতি, ছোট থেকে তোকে আদরে না রাখতাম, তোকে চ ড় দিতে আমি দু বার ভাবতাম না। তোর আর কুহুর মাঝের ডিফারেন্ট এই জায়গাতেই। ও তোর মতন নির্লজ্জ নয়। নিজেকে শো অফ করে না কখনো। ঠিক এই কারণেই, এই কারণেই কুহুকে আমি ভালোবাসি। ভালোবাসি আমি কুহুকে। যে আমার স্ত্রী।”
দীপ্র বড়ো বড়ো কদমে স্থানটি ত্যাগ করল। আয়ানা ঠায় দাঁড়িয়ে। ওর দু চোখে জল চিকচিক করছে। ও দীপ্র’র যাওয়ার পানে চেয়ে বলল,”আমি আর সহ্য করব না। আর করব না। তোমরা প্রত্যেকে এর ফল ভোগ করবে। প্রত্যেকে ফল ভোগ করবে।”
কিছু দূর গিয়ে কুহুর দেখা পেল দীপ্র। মেয়েটি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে। দীপ্র ডেকে উঠল।
“কুহু।”
ও তাকাল না। ওভাবেই হাঁটতে লাগল। দীপ্র কিছুটা দৌড়ের মতন করে ওর সামনে এল। মেয়েটি নজর ঘুরিয়ে ফেলতেই দীপ্র বলল,”বেশি লেগেছে?”
“না, ঠিক আছি।”
কুহুর চোখে জল। এই জল দুটো কারণেই। দীপ্র বুঝল। তবে ওর ব্যস্ততা মেয়েটির পা নিয়ে। ও পায়ের দিকে নজর ফেরাতেই দেখল লাল রঙের তরল দেখা যাচ্ছে। ওর বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল।
“র ক্ত বের হচ্ছে।”
“ঠিক আছি আমি।”
“ঠিক আছিস? আসলেই ঠিক আছিস?”
কুহুর র ক্তে ভয়। অথচ আজ মেয়েটি কেমন ভয়কে জয় করে নিয়ে চলছে। দীপ্র ওকে টেনে পাশের একটা বেঞ্চে বসিয়ে দিল। কুহু আবারো বলল,”আমি ঠিক আছি। এটা তেমন কিছু না।”
“হুস। দেখতে দে।”
বলে মেয়েটির পায়ের কাছে বসল। কুহু শুরুতেই ঘটনা বুঝল না। দীপ্র যখন ওর পা ধরতে যাবে ওমনি ও পা সরিয়ে নিল।
“এটা না প্লিজ।”
“কী?”
“পা ধরবেন না।”
“কেন?”
“এমনি।”
“চুপচাপ বসে থাক।”
“না, শোনেন…
“চুপ করতে বলেছি তো।”
বলে মেয়েটির পা ধরল দীপ্র। কুহু চোখ দুটো মুদিত করে ফেলল। পায়ের জুতা খুলে দীপ্র দেখল, বুড়ো আঙুলে অনেকটা আ ঘা ত লেগেছে। সেখান থেকে র ক্ত ঝড়ছে। কুহু পুনরায় বলল,”ঘরে গিয়ে দেখে নেব। আপনি পা ধরবেন না আর।”
“বড়ো বেশি কথা বলিস।”
পকেট থেকে রুমাল বের করল দীপ্র। সেটা দিয়ে লাল তরল মুছল প্রথমে। তবে খুব একটা লাভ হচ্ছে না। পুনরায় লাল হয়ে যাচ্ছে পায়ের আঙুল। দীপ্র শুধাল,”খুব ব্যাথা হচ্ছে?”
“না।”
“মিথ্যে বলছিস কেন?”
“সত্যিই ব্যাথা হচ্ছে না।”
“আর কোথাও ব্যাথা পেয়েছিস?”
কুহু মাথা নাড়িয়ে না বোঝাল। দীপ্র উঠতে গিয়ে দেখল, ওর হাঁটুর কাছের পোশাক ছিড়ে গিয়েছে। নজর লক্ষ্য করে কুহু বলল,”আর কোথাও ব্যাথা পাই নি।”
“দেখতে দে।”
“না, এটা না প্লিজ।”
দীপ্র মানল না কথাটা। কুহু তীব্র অস্বস্তিতে চোখ বন্ধ করে ফেলল। দীপ্র পোশাকটি সামান্য উঁচু করতেই মেয়েটির মোলায়েম পা এসে ঝলক দিল। দীপ্র বুঝল কুহুর অস্বস্তি বেশি। তাই আর ঘাটাল না। সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটিকে কোলে তুলে নিল। ঘটনার আকস্মিকতায় কুহু বোকা বনে গেল। নজরে ঠেকল দীপ্রর মুখটা। ওর চাহনি দেখে দীপ্র বলল,”শুধু তোর অস্বস্তিই না, আমি নিজেও কন্ট্রোল হারাতে পারি। তাই আর ঘাটালাম না।”
ওর দৃষ্টি দীপ্রর মুখের ওপর ছিল। এবার তা ঘুরিয়ে ফেলল ও। ব্যালেন্স করতে হাত খানা রাখল দীপ্রর ঘাড়ে।
“আমি সরি।”
“সরি কেন?”
“আমার জন্য কথা গুলো শুনতে হলো আপনাকে।”
“কোন কথা গুলো?”
“আয়ানাপুর কথা গুলো।”
দীপ্র বুঝল কুহু কী বোঝাতে চাইছে। মেয়েটির চোখে মুখে ভয়ানক কান্না। দীপ্র আদুরে ভাবে বলল,”ও কে আমাদের মাঝে বলার? আমরা কী করব না করব তা ওর বলার মাঝে সীমাবদ্ধ থাকবে?”
কুহুর সত্যিই খুব কান্না পাচ্ছে। ও কেঁদে ফেলল এবার। কাঁদতে কাঁদতে মাথাটা রাখল বুকে। দীপ্র’র বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল যেন। এই মেয়েটি এত আদুরে। হাজারটা ভুল থাকলেও দীপ্র বেশি রাগতে পারে না। কান্নার সাথে সাথে ওর বুকে নাক ঘষতে শুরু করেছে কুহু। দীপ্র আদুরে সুরে ডাকল।
“কুহু।”
এত আবেগ, এত স্নেহ, এত ভালোবাসা এই ডাকে। কুহু শুধু কেঁদেই যায়। জীবনের প্রতিটা পদে সে ভুল করে এসেছে। বাবার মৃ ত্যু র সেই ভুল ছুঁয়ে আকাশে। দীপ্র পুনরায় বলল,”তুই কেন কাঁদছিস বোকা?”
কান্নাটা কোনো মতে গিলে মিনমিনে সুরে কুহু বলল,”আমার জন্যই সবটা হয়েছে। শুরু থেকে আমি দায়ী। সবকিছু…
“হুস। তুই কোনো কিছুর জন্য দায়ী না কুহু। সবটা তোর পরিস্থিতি। তোর মানসিক অবস্থা। আমি তো বুঝি জান।”
কুহুর এই মুহূর্তে চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। এই মানুষটাকে ও একটা সময় ভুল বুঝেছিল। এই মানুষটাকে ভুল বুঝেছিল! যে ওকে প্রতিটা মুহূর্ত আগলে রাখে। বোঝে ওর সবটা। কি বোকা ও তাই না?
কুহু বসে আছে দীপ্রর কক্ষে। ও গিয়েছে ব্যান্ডেজ আনতে। বুকের ভেতর জমে থাকা কান্না এবার থেমেছে। এই কক্ষে ছড়িয়ে আছে দীপ্রর সুবাস। খানিক বাদে দরজা মেলে দীপ্র এল। কুহু নিজেও নড়েচড়ে বসল। দীপ্র পুনরায় ওর পা ছুঁতেই কুহু চোখ দুটো মুদিত করে ফেলল। তবে আর বাঁধা দিল না। ও জানে আর লাভ নেই। দীপ্র যত্ন নিয়ে পা পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ করে দিল। তারপর বলল,”হাঁটুতে ঔষধ লাগিয়ে নেয়।”
ঔষধ নিয়ে কুহু বসে। অস্বস্তির এক অনুভূতি। দীপ্র বুঝল যখন তখনই অন্যপাশ ফিরল। কুহু এবার পোশাকটা উঁচু করল। হাঁটুতে ব্যাথা সামান্যই। দীপ্র যদিও ওপাশ ফিরে ছিল, তবে পাশের আয়নাটিতেই ওদেরকে দেখা যাচ্ছিল। এতে করে মেয়েটির কোমল পা না চাইতেও ওর চোখে দৃশ্যমান হলো। দীপ্র নজর ফিরাতে গিয়েও ফেরাল না। মলম লাগিয়ে কুহু বলল,”আমি ঘরে যাই।”
“না গেলে হয় না?”
ফট করেই বলে ফেলল দীপ্র। কুহু কী বলবে বুঝল না। দীপ্র বলল,”ভয় পাচ্ছিস? আমি কিছু করব না।”
কুহু ফের কথা হারায়। মিনমিনে সুরে বলে,”সবাই কী ভাববে।”
“কেউ কিছু ভাববে না। কেউ জানবেও না। আর জানলেই বা কী?”
এই কথার পর আর কথা পেল না কুহু। দীপ্র ফের বলে,”রাত্রির ও প্রাইভেসি দরকার। হাজার হোক, আজ বাদে কাল ওর বিয়ে। অরণ্যর সাথে ওর আলাদা কথা থাকতে পারে গার্লফ্রেন্ড হিসেবে। তোর সামনে হয়তো অস্বস্তি হবে।”
এই যুক্তিতে কুহু পুরোপুরি হেরে গেল। দীপ্র বলল,”আমি জামা কাপড় এনে দিচ্ছি। তুই ফ্রেশ হয়ে নে।”
দীপ্র তৎক্ষণাৎ জামা কাপড় ও এনে দিল। কুহু ভারী জামাকাপড় ছেড়ে পাতলা একটা জামা পরে নিল। দীপ্র ও ফ্রেশ হয়ে এল। এসে দেখল কুহু বিছানার এক পাশে বসে আছে। ওর চোখে মুখে দোমনা। দীপ্র চুল গুলো ঠিক ঠাক করে এসে বলল,”শুয়ে পড়।”
কুহু বোধহয় ভীষণ অবাকই হলো। ও তাকিয়ে রইল ফ্যালফ্যাল করে। এ চোখ হয়তো অন্য কিছুই ভেবেছিল। সায় জানাতেও চাচ্ছিল। দীপ্র ওর চোখের দৃষ্টি পড়তে পারল। গাল ছুঁয়ে বলল,”তুই আগে সুস্থ হ। আমি এতটাও ধৈর্য হারা হইনি জান।”
চলবে….
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি
Share On:
TAGS: প্রণয়ের রূপকথা, ফাতেমা তুজ নৌশি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৪
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩৯
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১৬
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৫৩
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৯
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৩
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২১
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪৭
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪৮
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৬৭