প্রণয়ের_রূপকথা (৬৬)
কদিন ধরেই ভারী মন খারাপ ছিল কণার। আজ একটু ভালো লাগছে। সবাই মেহেদি পরেছে। নিজেদের প্রিয় মানুষের নাম লিখেছে। কণা নিজেও পরেছে। তবে নামের জায়গাটা খালি রেখেছে। ইচ্ছে করেই রেখেছে। ও এখন মেহেদির কোণ নিয়ে বসল। এই জায়গাটায় কেউ নেই। সবাই অন্যপাশে। কণা বুক ভরে দম নিল। দম নিয়ে লিখতে লাগল একটি বিশেষ নাম। ঠিক তখনই কুহু এসে বলল,”মেহেদির কোণ নিয়ে কী করছিস?”
কণা চমকাল। থমকে রইল কিছু সেকেন্ড। তারপর বলল,”এমনি, ঠিক করছিলাম।”
“কী আবার নষ্ট হলো। দেখি?”
কুহু যখন এগোতে চাইল, কণা পিছিয়ে গেল। বলল,”দেখতে হবে কেন?”
ওর আচরণে কুহুর খটকা লাগল। ও বলল,”মেহেদি দেখতে চেয়েছি। তাই বলে এমন করছিস কেন?”
“সবকিছু তোকে কেন বলতে হবে? আমার প্রাইভেসি নেই?”
কুহু ভীষণ রকমের আশ্চর্য হলো। মেহেদির সাথে প্রাইভেসির কী সম্পর্ক? কণা এবার আরো বেশি রেগে গেল। চ্যাঁচিয়ে বলল,”তোরা তো যে যার মতন আছিস। আমি আমার মতন থাকতে চাইলে কেন সমস্যা করছিস?”
“কণা! তোর মাথা ঠিক আছে?”
“নেই। সর তো।”
বলে কুহুকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল কণা। কুহু থমকে রইল। কণার আবার কী হলো?
হাতের মেহেদি শুকিয়ে গেছে। কিন্তু কুহুর মন খারাপ যে যায় না। ও উদাস ভাবে বসেছিল। ঠিক তখনই দীপ্র এসে ওর পাশে বসল। মানুষটা আসতেই ও ধ্যান থেকে বের হলো। কিছুটা অস্বস্তি অনুভব হলো। ও পালাতে চাইলেই খপ করে ওর হাতটা ধরে ফেলল দীপ্র।
“পালাচ্ছিস কেন?”
“পালাই না তো। আমি তো এমনি…
“এমনি উঠে যাচ্ছিলি?”
“হুম।”
“তাই?”
বলে মেয়েটাকে কিছুটা টেনে কাছে আনল ও। কুহু নজর ফিরিয়ে বলল,”কেউ আসবে।”
“কে আসবে?”
“যে কেউ।”
“তো?”
কুহু কি বলবে বুঝে না। ও মৌন থাকে। দীপ্র দেখে ওর হাতের মেহেদি শুকিয়েছে।
“শুকিয়ে গেছে। ওঠিয়ে দিচ্ছি।”
কুহু বসে থাকে। দীপ্র ভাই সময় নিয়ে ওর হাতের মেহেদি উঠিয়ে দেয়। এত চমৎকার রং এসেছে। দীপ্র হেসে বলে,”প্রচলিত কথায় আছে, মেহেদির রং যত গাঢ়, বর তত বেশি ভালোবাসে। তোকে আমি খুব ভালোবাসব কুহু। খুব ভালোবাসব।”
শেষ বাক্যটা একদম কানের কাছে এসে বলে দীপ্র। কুহুর সমস্ত শরীরে উষ্ণতা ছড়িয়ে যায়। ও বলে,”আমি এখন উঠি।”
“কেন? আরেকটা হাত বাকি আছে তো।”
অন্য হাতটি মুষ্টিবদ্ধ করে রেখেছে কুহু। দীপ্র বলে,”ওঠিয়ে দেই ওটাও।”
“ওটা আমি ওঠাতে পারব।”
“আচ্ছা।”
“আমি যাচ্ছি।”
“না। আমার সামনেই ওঠা।”
“পরে ওঠাব। শুকায় নি তো।”
“কই দেখি।”
কুহু এবারো হাতের মুষ্টি নরম করে না। দীপ্র ভ্রু কুঁচকে ফেলে। বলে,”দেখাচ্ছিস না কেন?”
কুহু পড়ে যায় বিপাকে। কি এক ঝামেলায় পড়া গেল। ও মোচড়াতে থাকে। দীপ্র বলে,”দেখি।”
“না, প্লিজ। আমি যাই? ছাড়েন না দীপ্র ভাই।”
আবারো দীপ্র ভাই! দীপ্র তাকিয়ে থাকে ওর দিকে। এই মেয়ে তাকে ভাই ছাড়া ডাকতে পারে না নাকি? কুহু তখনো মোচড়াচ্ছে।
“তোকে বলেছি না, দীপ্রর সাথে ভাই ডাকবি না।”
“সবসময় তো ডেকে এসেছি।”
“এখন আর সবসময় এক হলো?”
কুহু আবারো মোচড়াচ্ছে। দীপ্র বলে,”একটা ডিল করি?”
“কী?”
“ভাই বাদ দিয়ে ডাক। তাহলে ছেড়ে দেব।”
ওর কথায় ফ্যালফ্যাল করে তাকায় কুহু। দীপ্র আবারো বলে,”বল।”
“পারব না। প্লিজ যেতে দেন।”
“উহু। আগে ডাকবি, তারপর যেতে দেব।”
“এটা ছাড়া অন্যকিছু বলেন।”
“নো। এটাই তোর টাস্ক।”
কুহু বিপদের মুখে পড়ে আলুর মতন চেয়ে থাকে। দীপ্র ফের বলে,”হাতে কিছু আছে নাকি? এভাবে লুকিয়ে কেন রাখতে চাচ্ছিস। দেখি তো।”
দীপ্র এবার কিছুটা জোর খাটিয়ে ওর হাতের মুষ্টি খুলতে চাইল। কুহু চ্যাঁচিয়ে উঠল,”দীপ্র। ডেকেছি, এবার ছাড়েন।”
ওর এহেন কাহিনীতে দীপ্র তাজ্জব বনে গেল। কুহু ফের বলে,”ডাকলাম তো। এবার ছাড়েন।”
হাত নরম করে দীপ্র। সে সুযোগে হাত ছাড়িয়ে নেয় কুহু। ঝড় সম গতিতে পালাতে পালাতে বলে,”আমি যাচ্ছি দীপ্র ভাই।”
আবারো ভাই! দীপ্র এবার দাঁড়িয়ে পড়ে। চ্যাঁচিয়ে বলে,”আবারো ভাই! এটার কিন্তু শোধ রইল কুহু। সুদে আসলে পূরণ করব।”
অরণ্য এসেছে রাত্রির কাছে। কিছুটা লুকিয়েই। ওকে দেখে রাত্রি বলল,”আরে! তুমি এসেছ কেন? তোমার না,আসা মানা।”
“ধুর। কে মানবে এসব?”
“তবু, কেউ দেখলে তখন…
“কিছুই হবে না। ওরা কি জানে না, আমি তোমায় ভালোবাসি। আর রাত পোহালেই তুমি আমার বউ হতে চলেছ। তার থেকেও বড়ো কথা, একই রিসোর্টের অন্যপাশেই থাকছি। এসব মানা যায় নাকি?”
বউ কথাটা শুনে রাত্রির কেমন সুখ সুখ অনুভূতি লাগে। ও হেসে বলে,”বউ কথাটায় আলাদা ম্যাজিক আছে।”
“আছে তো। আরো অনেক কিছুই আছে।”
অরণ্যর কথার ধরণে রাত্রি কিছু বুঝল। ও ঠোঁট কামড়ে বলল,”পেটে পেটে এসব চলে।”
“তো, এসব চলবে না তো কী চলবে? আবার এসব না চললেও তো ভাববে আমার হয়তো সমস্যা আছে।”
“এই, কথা দিয়ে প্যাঁচ দেবে না। দূরে সরো।”
“কেন? তুমি দেখি এখনো আমাকে নিরামিষের মতন রাখতে চাচ্ছ।”
“এসব তোমার শাস্তি।”
“আমি মানি না। আমি এসেছি চুমুও…..
ও আর কিছু বলতে পারে না। তার আগেই সালমা এসে দরজায় কড়া নাড়েন। রাত্রির হৃদয় চমকায়। ও লাফিয়ে ওঠে।
“উফ, উফ, মা আর আসার সময় পেল না। এই তুমি এখন, তুমি এখন…
“আমি লুকাচ্ছি।”
“গুড। লুকাও। কিন্তু লুকাবে কোথায়?”
আশেপাশে তাকায় ও। তারপর বলে,”আলমারির ভেতরে?”
“ওকে। এই না, তোমার মতন জাম্বু দেহকে এই টুকু আলমারি কীভাবে নেবে?”
“তাহলে?”
“বাথরুমেও রিস্ক আছে। তুমি বরং বিছানার নিচে যাও।”
“আচ্ছা।”
অরণ্য তৎক্ষণাৎ বিছানায় নিচে চলে যায়। ওদিকে সালমা কড়া নাড়তে নাড়তে অস্থির প্রায়। রাত্রি দ্রুত গিয়ে দরজা খুলে দেয়। সালমা ভ্রু কুঞ্চিত করে বলেন,”এত সময় লাগে?”
“ওয়াশরুমে ছিলাম মা।”
“ওহ। যাই হোক, দেখ তো এসব।”
একগাদা গহনা নিয়ে এসেছেন তিনি। রাত্রি সব গুলো দেখে নিয়ে বলে,”এগুলো কার?”
“তোর জন্য এনেছি।”
“এত খরচা করলে কেন? স্বর্ণের যা দাম।”
“অনেক আগে থেকেই বানিয়ে রাখা এসব। তোর বিয়ের জন্য।”
রাত্রি কি বলবে বুঝে না। মা এত আগে থেকে সব গুছিয়ে রেখেছেন। সালমা গহনা গুলোয় হাত বুলায়। তারপর বলে,”ছোট বেলায়, তোর জন্য প্রতিটা গহনা বানাতাম আর আমি অনেকটা সময় ধরে কাঁদতাম।”
“কাঁদতে কেন?”
“কাঁদতাম এটা ভেবে, তোকে একদিন অন্য বাড়িতে চলে যেতে হবে।
এবার রাত্রির গলা তরলহীন হয়ে পড়ল। চোখটা কেমন জ্বালা করছে। ও ডাকল,”মা।”
সালমা চোখ মুছলেন। রাত্রি তাকে জড়িয়ে ধরে বলল,”এমন ভাবে কাঁদলে, আমি বরং বিয়েটা ক্যানসেল করে দেই।”
খাটের নিচ থেকে সবকিছু শুনছিল অরণ্য। বিয়ে ক্যানসেল করার কথা শুনে ও মুখ ফুটে বলে উঠল,”না।”
রাত্রি চোখ বড়ো বড়ো করে ফেলল। সালমার কানেও সে শব্দ এসেছে। তিনি মেয়েকে ছেড়ে বললেন,”কী রে। মনে হলো কে যেন ‘না’ বলল।”
“না মা।”
“হ্যাঁ?”
“না মানে তুমি হয়তো ভুল শুনেছ। আমিও তো এখানে। শুনলাম না তো।”
“শুনিস নি? আমি তো…
“তুমি ভুল শুনেছ। আচ্ছা মা শোনো, তুমি এখন এগুলো নিয়ে যাও। আমিও একটু জিরিয়ে নিই।”
“কিন্তু….
“আবার কিন্তু কী? তুমি এগুলো নিয়ে সুন্দর করে রেখে দাও তো।”
একপ্রকার জোর করেই মাকে পাঠিয়ে দিল ও। মা চলে যেতেই রাত্রি এসে বিছানের নিচে উঁকি দিল। দাঁত কিড়মিড় করে বলল,”এই তোমাকে কথা কে বলতে বলেছে?”
“তুমি কেন বিয়ে ক্যানসেলের কথা বলবে?”
“তো, বলেছি তো কী হয়েছে?”
“কী হয়েছে মানে?”
বলে অরণ্য উঠতে যেতেই ঠাস করে মাথায় বাড়ি খেল। রাত্রি হতাশ হয়ে বলল,”পাগল তুমি? কোথায় আছ খেয়াল তো করো।”
অরণ্য মাথা মালিশ করতে করতে খাটের নিচ থেকে বেরিয়ে আসে। রাত্রি বলল,”ব্যথা পেয়েছে খুব?”
“হুম। চুমু খেলে ঠিক হবে।”
“ধুর। বেয়াদব ছেলে। যাও তো।”
“রাত্রি একটা…
“তুমি কিন্তু মা র খাবে অরণ্য।”
“রাত্রি প্লিজ….
ওকে আর কিছু বলতে দেওয়া হয় না। রাত্রি ওকে ঠেলে বের করে দেয় রুম থেকে। অরণ্য বের হতেই হেসে ফেলে রাত্রি।
চলবে….
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি
Share On:
TAGS: প্রণয়ের রূপকথা, ফাতেমা তুজ নৌশি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪৩
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৮
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৬১
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৫
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪৪
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩১
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৫১
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩৯
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩২