প্রণয়ের_রূপকথা (৬৪)
ফ্লাইটে করে ওরা যাবে কক্সবাজার। তার আগে এয়ারপোর্ট অবধি মোটামুটি একটা জার্নি আছে। আবির নিজের বাইক নিয়ে এসেছিল। আর বাকি সবাই যাচ্ছে তিনটে গাড়ি নিয়ে। কিন্তু কায়দা করে দীপ্র বাইক রেখে আবিরকে গাড়ি দিয়েছে। সবাই তখন তৈরি। দীপ্রর ব্যাগ গোছাতে গিয়ে দেরি হয়ে গেছে কুহুর। ওর জন্য সবাই অপেক্ষা করছিল। ও হুড়মুড় করে নেমে এল। দবীর বললেন,”কুহু মামুনি,কোন গাড়িতে যাবে তুমি?”
এ কথার বিপরীতে কুহু জবাব দিতে পারল না। জবাবটি দিল দীপ্র।
“ও আমার সাথে যাবে বাবা।”
আয়ানা চাইল কঠিন নজরে। ভীষণ রাগে মাথা ধরে যাচ্ছে। বাবা-মা স্বাভাবিক ভাবেই চলছেন। এসব ওর আরো সহ্য হয় না। ও কুঞ্জর হাতটা ধরে বেরিয়ে যায়। দবীর ছেলের পানে তাকিয়ে ছিলেন। একটু সময় নিয়েই বললেন,”বাইকে যাচ্ছ?”
“জি।”
“আচ্ছা, আসো সবাই।”
বলে তিনিও বের হয়ে গেলেন। কুহু হাবুলের মতন চেয়ে আছে। কখন ঠিক হলো, সে দীপ্র ভাইয়ের সাথে বাইকে যাবে?
কুহুর স্থিরতা দেখে দীপ্র বলল,”বাইকে কোনো সমস্যা?”
ও মাথা ঝাঁকিয়ে না বোঝাল। চাইল দীপ্রর দিকে। ঐ সুন্দর চোখ দুটোর সাথে দৃষ্টি মিলতেই পুনরায় নজর ফিরিয়ে নিল।
বাইক চলছে। কুহু দূরত্ব নিয়ে বসেছে। দীপ্রর হতাশ লাগে। এই মেয়েটার মাথায় ঘিলু আসলেই কম আছে। যেন কাছাকাছি থাকা যায় সেই জন্যই তো বাইকটা নিল। অথচ মনে হচ্ছে দীপ্র রাইড শেয়ার করেছে। আর কুহু ওর যাত্রী।
“ভালো করে বোস।”
“হুম?”
“মাঝে এত গ্যাপ রেখে বসেছিস কেন?”
“ঠিক আছি তো।”
“স্পিড বাড়ালে ঠিক থাকবি না।”
এই কথার পর ও একটু দূরত্ব কমাল। তবু সেটা বেশি নয়। দীপ্র বুঝল এ মেয়ে কথায় বুঝবে না। তাকে কাজ দিয়ে প্রমাণ করতে হবে। ও তাই স্পিড বাড়ালো। কুহু সঙ্গে সঙ্গে তাল না সামাল দিতে পেরে দীপ্রর কাঁধে হাত রাখল।
শীত লাগছে। বাইকের গতির সাথে সাথে শীতল বাতাসটা যেন আরো বেশি বৃদ্ধি পাচ্ছে। কুহুর জমে যাওয়া দেখে বাইক থামাল দীপ্র। একটু ঘুম ঘুম ও পাচ্ছিল ওর। ও সহসাই শুধাল,”এসে গেছি?”
জবাব এল না। কুহু চারপাশে তাকাল। এ তো খালি রাস্তা। চারপাশে বড়ো বড়ো গাছ।
“থামালেন কেন?”
দীপ্র এবারও জবাব দিল না। নিজের শরীরে থাকা ব্লেজার খুলে বলল,”এটা পর।”
“হুম?”
“পরতে বলেছি। শীতে জমে যাচ্ছিস।”
“সমস্যা নেই। আমি ঠিক আছি।”
“কথা নয়, পরতে বলেছি।”
কুহু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে। দীপ্র ইশারা করে। ও হাত বাড়িয়ে ব্লেজার খানা নেয়। বেশ সংকোচ নিয়েই ব্লেজার গায়ে দেয়। তারপর বলে,”আপনার তো ঠান্ডা লাগবে।”
“সয়ে যাবে।”
“আমারো সয়ে যেত।”
“কিন্তু তখন, আমার সইতো না।”
কুহুর নত দৃষ্টি উঁচু হলো। এই লোকটা এমন কেন? এত বেশি যত্ন কেন দেখায়। বিপরীতে কুহু যে কিচ্ছুটি করতে পারে না।
দীপ্রর শরীরের ঘ্রাণটা এত বেশি প্রকট হলো যে, কুহুর মনে হলো মানুষটা বুঝি ওকে জড়িয়ে আছে। অথচ কোনো সংকোচ লাগছে না। লাগছে না খারাপ। বরং অন্য রকম ভালো লাগছে। এই ভালো লাগা নিয়েই ওরা পৌঁছে গেল এয়ারপোর্টে। কুহু ভুলে গেল দীপ্রর ব্লেজারের কথা। ও ব্লেজার সমেত বাড়ির সকলের সামনে উপস্থিত হতেই, সবার চোখে মুখে এক রকম মিটিমিটি হাসি এসে ভর করল। ও না বুঝে চেয়ে রইল বোকার মতন। রাত্রি এসে বলল,”তোর গায়ে দীপ্র ভাইয়ের ব্লেজার।”
কুহু কি বলবে বুঝল না। অতি উৎসাহে ব্লেজার না দিয়েই চলে এসেছে। তিনিও তো চাননি! ওর ভারী লজ্জা লাগছে এখন। রাত্রি হেসে বলে,”ভালোই, রোমান্টিক সময় গিয়েছে তবে।”
“তুমিও না রাত্রিপু।”
“বুঝি, তোদেরই দিন। যাক গে, আমি কিন্তু হিংসা করছি না আয়ানার মতন। আমি বরং খুশিই হয়েছি।”
আয়ানার কথা ওঠাতে ও দৃষ্টি ঘুরায়। মেয়েটি ওর দিকেই চেয়ে আছে। যেন চোখ দিয়েই গিলে খাবে।
অনেক ঝড় ঝামেলার পর এই বিয়ের আয়োজন। তাই সব গুলো পরিবারই টাকা খরচাতে কার্পণ্য করেননি। ববিতা স্বামীর একটা ছবি সাথে নিয়ে এসেছেন। কণা মায়ের সাথেই থাকবে। ও এসে দেখল ব্যাগ থেকে মা ছবিটা বের করছেন। এটা দেখে এত কান্না পেল ওর।
“মা।”
ববিতা চাইলেন। ছবিটা রাখতে না রাখতেই কণা এসে একদম জড়িয়ে ধরল। ববিতার মাতৃ মন কেমন করে ওঠল। এক হাতে মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন তিনি।
“কী হয়েছে মা? সব ঠিক আছে তো?”
“ঠিক আছে।”
“তাহলে?”
“বাবাকে মনে পড়ছে। আগের দিন গুলোও মনে পড়ছে। এখন সব কেমন যেন লাগে মা।”
মেয়ের মনের অবস্থা তিনি বুঝলেন। তবে এর আগেও তিনি খেয়াল করেছেন কণা কেমন উদাসীনতায় ভোগে। কলেজ শুরুর পর থেকে ঠিক মতন ক্লাস অবধি করেনি। তিনি হালকা হাতে মেয়ের পিঠে হাত বুলান।
“ঠিক হয়ে যাবে মা। সব সহজ ভাবে নিলেই ঠিক হবে।”
“আমি নিতে পারছি না মা। আমি পারছি না। আমার ভেতরটা যেন কেমন লাগে। শুধু কান্না পায়। কাউকেই দেখতে ইচ্ছে করে না।”
ববিতা বুঝলেন না মেয়েকে কীভাবে বুঝ দিবেন। কণার বয়স কম। মানসিক ট্রমা, ডিপ্রেশন এই বয়সে খুব বেশিই আসে। তবে সমস্যাটা কণা যদি না ভেঙে বলে, তিনি তো বুঝবেন না। দম ফেললেন তিনি। বুক থেকে সরিয়ে মেয়েকে গালে হাত রাখলেন। বোঝালেন আমি আছি মা। সবসময় তোর সাথে। তোদের সাথে আছি। তোরা ছাড়া আমার আর কে আছে বল?
কুহু আর রাত্রি এক ঘরে। ওরা ফ্রেশ হচ্ছে। রিসোর্টটা দারুণ সুন্দর। কাল সকালেই মেহেদির অনুষ্ঠান হবে। সন্ধ্যায় হলুদ। আর পরশু বিয়ে। অনুষ্ঠানে খুব বেশি অতিথি থাকবে না। বিয়ের পরেরদিন যে যার এলাকায় আয়োজন করে খাওয়াবে বলেই ঠিক হয়েছে। জামা বদলে নেওয়ার পর রাত্রি বলল,”কুহু।”
কুহু তাকাল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ও নিজেকে দেখে নিচ্ছিল। পেছন ফিরে বলল,”বলো রাত্রিপু।”
এগিয়ে এল রাত্রি। চোখে চোখ রাখল। কুহুর প্রতি এত মায়া ওর। ও হেসে বলল,”সবসময় খুশি থাক বোন।”
“তুমিও রাত্রিপু। সবসময় এমন খুশি থাকো।”
ঝামেলার পর এই প্রথম সকলে মিলে খাবার খেতে বসেছে। অরণ্যর পরিবার কাল সকালে আসবে। হেরার পরিবার রওনা করেছেন। আসতে আসতে আরো রাত হবে। এখনই প্রায় রাত দশটা বেজে গিয়েছে। খাবার খেতে খেতে বৃদ্ধা তৃপ্তির শ্বাস ফেললেন। বললেন,”কতদিন পর সবাই আবার একসাথে খাচ্ছি। আমি শুধু আমার সন্তানদের, নাতি-নাতনিদের নিয়ে একসাথে শেষ সময় গুলো পার করতে চেয়েছিলাম।”
আনোয়ার বললেন,”যা হবার তো হয়েছেই। এখন থেকে সব ঠিক হোক মা।”
“হুম, সব ঠিক হোক। তোমরা কেউ কারো প্রতি দুঃখ রেখো না। রাগ রেখো না। দুনিয়ার জীবন আর কদিন বলো? নিশ্বাস নিচ্ছি। সকালে না ও নিতে পারি।”
মানুষ যত বৃদ্ধ হয়, মৃত্যুকে তত বেশি বুঝতে পারেন। বৃদ্ধার অবস্থাও তেমনই। সবাই এক সাথে খাওয়া দাওয়া শেষ করল। রিসোর্টটা বড়ো, ও খোলামেলা। বেশ আরামদায়ক। ব্যাটমিন্টনের কোর্ট ও করা আছে। ঠিক হলো সবাই মিলে ব্যাটমিন্টন খেলবে। আয়ানার ইচ্ছে ছিল না। ও তবু গেল। এরই মাঝে কোথা হতে যেন আগমন হলো অরণ্যর। ওকে দেখে রাত্রি অবাক হয়ে গেল। ছুটে গেল কাছে। অরণ্য হেসে বলল,”সারপ্রাইজ, মিস প্রেমিকা। দ্রুতই তো বউ হয়ে যাবে। প্রেমিক হিসেবে সময় গুলো মিস করতে চাইছিলাম না। তাই চলে এলাম সবার আগে।”
“তুমি পাগল অরণ্য?”
অরণ্য শুধুই হাসল। রাত্রির চোখ দুটো খুশিতে ঝলমল করছে। ওর খুব ইচ্ছে করছে শক্ত করে অরণ্যকে জড়িয়ে ধরতে। তবে, এত গুলো মানুষের সামনে সেটা পারছে না।
কণা আর আবির ব্যাটমিন্টন খেলছে। কুহু আর রাত্রির খেলার কথা ছিল। অরণ্যর আগমনে সেটা আর হচ্ছে না। কুঞ্জ বাচ্চা। এখনো সেভাবে পারে না। কুহু তাই বসেছিল। আয়ানার সাথে ও তো আর খেলতে পারে না। ও দেখছিল সবটা। ভালোই লাগছে। দীপ্র ছিল না এত সময়। আগমন হলো তখনই। ব্যাট নিয়ে এসেছে। ওকে দেখেই কুহুর ঠোঁটটা কেমন প্রসারিত হলো। দীপ্র বলল।
“ওঠে আয়।”
দীপ্র ভাই আসলেই কি কুহুর মন পড়তে পারে? ও অবাক হয়। ভীষণ অবাক হয়। দীপ্র ব্যাট তুলে দিয়ে বলে,” একটা বাজি খেলি চল।”
“বাজি?”
“হুম।”
“কেমন বাজি?”
“আমি জিতলে আমার একটা উইশ পূরণ করবি। আর তুই জিতলে আমি তোর একটা উইশ পূরণ করব।”
কুহু ছোটবেলা থেকেই ব্যাটমিন্টের পোকা। ও এত দারুণ খেলে যে, আকাশ কুসুম না ভেবেই ও রাজি হয়ে গেল। সরল মনেই খেলা শুরু হলো। কুঞ্জ পাশ থেকে হৈ হৈ করছে। আয়ানার এসব আর সহ্য হয় না। ও তাই ওঠে চলে যায়। এতে কুঞ্জর উচ্ছ্বাস আরো বাড়ে। এত সময় বোন থাকাতে অনেক কিছুই করতে পারে নি সে।
কুহু আসলেই দারুণ খেলছে। ওর এই উচ্ছ্বাস অনেক দিন, অনেক মাস পর দেখা গেল। দীপ্র”রা দেশে এসেছে প্রায় আট মাস হয়ে এল। এই আটমাসে কত কিছুই তো ঘটল। কুহুর উচ্ছ্বাস দেখে দীপ্রর ভালো লাগছে। দীপ্র চাচ্ছিল কুহুই জিতুক। কিন্তু হুট করেই মনে হলো, কিছু জিত নিজের ও হওয়া উচিত। তাই এবার আর ছাড় দিল না। ভীষণ ভালো খেলতে পারা কুহুকে ও হারিয়ে দিল। হাবুলের মতন চেয়ে রইল কুহু। ফ্যাল ফ্যাল করা দৃষ্টি নিয়ে বলল,”এটা কী হলো?”
“যা হওয়ার তাই হলো।”
ওরা দীর্ঘ সময় ধরে খেলায়, বাকিরা সবাই চলে গিয়েছে। দুজনেই আছে এখন। কুহু মন খারাপের মতন করে বলল,”আমি এত ভালো খেলছিলাম। শেষে এসে কী করলেন এটা।”
“হেরেছিস সেটা স্বীকার কর।”
কুহু ওভাবেই চেয়ে রইল। দীপ্র হেসে কিছুটা এগোল। বলল,”এবার, আমার চাওয়ার পালা।”
কুহুর ধ্যান ফিরল এবার। মস্তিষ্ক কিছু একটা জানান দিল। ও এক পা পিছিয়ে যেতে নিয়ে, কিছু একটার সাথে পা লেগে পড়ে যেতে নিচ্ছিল। কিন্তু দীপ্রর বলিষ্ঠ হাত খানা ওকে ধরে ফেলায় কুহু পড়তে নিয়েও পড়ল না। এক টানে মেয়েটিকে একদম কাছে টেন নিল ও। দু চোখে তাকিয়ে কুহুর নিজের ও কেমন ঘোর ঘোর লাগল। দীপ্রর মুখটা ওর কানের কাছে এসে ঠেকল। ঠোঁটের উষ্ণতা, গাল জুড়ে থাকা রোমরাজি কুহুর মুখে এসে সুরসুরি দেয়। ও কেঁপে ওঠে। এতে করে আরো বেশি চেপে ধরে দীপ্র।
“কুহু।”
দীপ্রর এই ডাকে মেয়েটি যেন মূর্চ্ছা যেতে চায়। দীপ্র ফের বলে,”কুহু।”
জবাবহীন কুহু। বুকের ভেতর উতালপাথাল করা ঢেউ।নিশ্বাসের গতি বৃদ্ধি পায়। দীপ্রর কণ্ঠও ক্রমশ গভীর হয়। নিশ্বাস এসে পড়ে মেয়েটির ঘাড়ে। দীপ্র ডাকে,”কুহু, জান আমার। আমার হৃদয়ের একমাত্র রানী। তুই জানিস,আমি তোকে ঠিক কতটা চাই? কত ভাবে চাই। অথচ কীভাবে যে নিজেকে আটকাই সেটা আমিই জানি। আমার সামনে, আমার সবটুকু অধিকার যখন ঘুরঘুর করে, আমি তখন ঠিকই কন্ট্রোল হারাই। কিন্তু, কিন্তু….জান…
দীপ্র কথা হারায়। কুহুর শরীর তখন একদম স্থির হয়ে আছে। তবে হৃদয়ের গতি বেড়েছে হাজারগুণ। দীপ্র বড়ো করে দম নিয়ে বলে,”তোকে প্রমিস করেছিলাম। তুই না চাইলে ছুঁয়েও দেখব না। কিন্তু, আমি সেই কথার খেলাপ করতে চাই। যদি এই এক চুমুর শাস্তি হিসেবে দরবারে আমার ফাঁ সিও হয়, তবু আমি তা মাথা পেতে নিতে চাই। আই অ্যাম সরি, বাট নট সরি জান। প্লিজ তুই রাগ করিস না। আই প্রমিস,আই ডু দিস জেন্টলি, লেটিং ইচ মোমেন্ট বার্ন উইথ ডিজায়ার।”
চলবে….
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি
(৬৫)
Share On:
TAGS: প্রণয়ের রূপকথা, ফাতেমা তুজ নৌশি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৬১
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৫৭
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৬০
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১৭
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৭০
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৩
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২১
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৬৯
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৮