প্রণয়ের_রূপকথা (৬৩)
কুহুর চলন বলন সবকিছুই দীপ্র খুব ভালোভাবে খেয়াল করে। তাই খুব সহজেই কুহুর সমস্যাটি ও ধরতে পেরেছিল। তবু ও সময় নিয়েছিল। কিন্তু এখন আর সেটা সম্ভব নয়। সময়ের সাথে সাথে মেয়েটির সিদ্ধান্ত না নিতে পারার এই মানসিক ট্রমাটা বেড়েই চলেছে। তাই ও ঠিক করেছে কুহুকে কাউন্সিলিং করাবে। কুহুকে বলা হয়েছে আজ দীপ্র তাকে নিতে আসবে। ও অপেক্ষা করছিল। কিন্তু মানুষটার আসার নাম নেই। ধৈর্য হারিয়ে ও কল করতেই ওপাশ থেকে কণ্ঠ ভেসে এল।
“এসে গেছি। জ্যামে পড়েছিলাম। সরি রে।”
“ঠিক আছে।”
“তুই কোথায় এখন?”
“শাটলের লাইনে।”
“আচ্ছা।”
দুই মিনিটের মাথায় দীপ্রর গাড়িটা দেখা যায়। কুহু শাটলের লাইন থেকে এগিয়ে এসে। দীপ্র বের হয়ে বলে,”অনেকটা অপেক্ষা করলাম।”
“খুব বেশি না।”
“তবু, আমি তোকে কোনো কিছুর জন্যই অপেক্ষা করাতে চাই না কুহু। এক সেকেন্ডের জন্যও না।”
ওর বলা এ কথায়, কুহুর ভেতরটা বলে ওঠে,”আমি যে আপনাকে আরো অনেক বেশি অপেক্ষা করাচ্ছি দীপ্র ভাই। আমার ভ্রম আমাকে একটু একটু করে পিছিয়ে দেয়।”
“কুহু।”
ও তাকায়। দীপ্রই বলে,”খেয়েছিস?”
“না।”
“একসাথে খাই?”
“আচ্ছা।”
“কোনো স্পেসেফিক জায়গায় যেতে চাস?”
“উহু।”
“তাহলে সাথে চল।”
বলে মেয়েটির হাত আগলে ধরে ও। মৃদু একটা হাওয়া বয়ে যায়। হৃদয়ের স্পন্দন বৃদ্ধি পায়। দীপ্র ওকে গাড়িতে বসায়। নিজেও ওঠে যায় পাশের সিটে। গাড়ি চলছে। কুহুর মুখ থেকে কথা নেই।
“মন খারাপ?”
“না।”
“চোখ মুখ শুকনো লাগছে।”
“একটা কথা মনে পড়ছে।”
“কী?”
“কণার সাথে দূরত্ব বেড়েছে আমার।”
“ও তো বাচ্চা। সময় দিলেই ঠিক হয়ে যাবে।”
“হুম। রাত্রিপুরা কি এসে গেছে?”
“না। সন্ধ্যায় আসবে। হেরার জন্য কেনাকাটা কিছু বাকি আছে।”
“ওহ।”
কথার মাঝে ওরা নির্দিষ্ট রেস্টুরেন্টে চলে এল। শান্ত একটা জায়গা। পাশেই বড়ো একটা নদী। তার পাশে এই রেস্টুরেন্ট। জায়গাটা ওর ভার্সিটি থেকে কাছে। অথচ ওর আসা হয় নি। হবেই বা কেমন করে। ও তো ঠিক ঠাক ভার্সিটিতেই আসেনি।
কুহুর পছন্দের সব খাবার অর্ডার করল দীপ্র। নিজ থেকেই সবটা করল। কুহু অবাক হয়ে দেখছিল। এক পর্যায়ে শুধাল,”আপনি জানতেন এগুলো আমার প্রিয়?”
“হুম জানতাম।”
“কীভাবে? জানার তো কথা না।”
“জেনেছি, তুই ই বলেছিলি।”
“আমি বলেছি?”
“হুম।”
কুহু ভ্রু কুঞ্চিত করে রইল। দীপ্র বলল,”এখন বল, তোর সব কেমন চলছে। সায়েরের কী খবর?”
“সায়েরের খবর? আমি তো জানি না।”
“কেন? আর ঘুরঘুর করে না?”
“না।”
দীপ্র ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে। কুহুর কপাল কুঁচকে যায়। ও শুধায়,”হাসছেন কেন?”
“মেডিসিন কাজে লেগেছে।”
“মানে?”
“মানে তাকে যে বুঝ দিয়েছি,তা বুঝেছে। বোকামি করেনি কোনো।”
“আপনি ওর সাথে দেখা করেছিলেন?”
“হুম।”
“কেন?”
“কেন আবার, ভালো মতন বুঝ দিতে, কুহু শুধু দীপ্র’র।”
কুহু শুধু দীপ্রর এ কথায়, কুহুর বুকের ভেতরে দামামা বেজে ওঠে। ও নজর ফিরিয়ে নিতেই দীপ্র বলে,”চোখের দিকে তাকা কুহু।”
“আমি পারব না।”
“তাকা বলছি।”
“উহু।”
“তাকা প্লিজ।”
শেষ কথাটা এত আবেগ নিয়ে বলল ও, কুহু না তাকিয়ে পারল না। ঐ গভীর চোখে তাকাতেই ওর বুকের ভেতরটা আরো বেশি ধীম ধীম করতে লাগল। দীপ্র ডাকল,”কুহু।”
এত মায়া, এত মায়া এই ডাকে। কুহুকে সবাই কুহু বলেই তো ডাকে। কিন্তু দীপ্র ভাই, দীপ্র ভাই যখন ডাকেন, তখন দুনিয়া অন্ধকার লাগে। কুহুর দু চোখ নেমে আসে। দীপ্র বলে,”তুই আমাকে যতই অপেক্ষা করাস না কেন, দিনশেষে তুই শুধু আমার। শুধুই আমার।”
কুহুর নামানো দৃষ্টি। দু বিন্দু অশ্রু ও নেমে যায় চোখ বেয়ে। দীপ্র ওর হাতখানা নিজের হাতে তুলে নেয়। কুহু কেঁদে ফেলে কিছুটা শব্দ করেই।
“আমি বুঝতে পারি না নিজেকে। আমি জানি না কি করি। এখন যা ঠিক মনে হয়। তারপরই তা ভুল হয়ে ধরা দেয়। আমি, আমি ক্লান্ত এসবে। আমার সাথে থেকে আপনিও ক্লান্ত হয়ে যাবেন দীপ্র ভাই।”
কুহুর সমস্যাটা তো দীপ্র জানে। ও মুখোমুখি বসা ছিল। এবার ওঠে গিয়ে পাশে বসে। দু হাতে মুখটা তুলে নেয়।
“আমি তোকে বুঝি তো। তুই কেন এত চিন্তা করিস? আর যদি বলিস ক্লান্ত হওয়ার কথা, তবে বলব এই ক্লান্ত হওয়াটা আমি ভীষণ এনজয় করছি।”
কুহু আরো বেশি কান্না পায়। এত গুলো মাস ধরে, জীবনটা কেমন হয়ে আছে। শুধু তার জীবন নয়। এই মানুষটার ও। সেসবের জন্য তো ও দায়ী। ও ভাঙা গলায় বলে,”কিন্তু আমি, আমি তো নিজেই বুঝি না দীপ্র ভাই। আমার সব এলোমেলো।”
দীপ্র লম্বা করে শ্বাস নেয়। ওর চোখের পানি মুছিয়ে দেয়। আদরের সাথে বলে,”এটা হতে পারে কোনো মানসিক সমস্যা কুহু। তুই চাইলেই আমি ডাক্তার দেখাতে পারি।”
“মানসিক সমস্যা? আমি কি তাহলে পাগল হয়ে গেছি?”
“আরে ধুর বোকা, মানসিক সমস্যা মানেই পাগল হয়ে যাওয়া নয়। এটা সব মানুষের মাঝেই থাকে। কিন্তু খুব বেশি ধাক্কা, তা বৃদ্ধি করে। ট্রিটমেন্ট নিলেই ঠিক লাগবে। তুই কি চাস কাউন্সিলিং করাব?”
এখানে কুহু এসে আটকায়। দীপ্র ওর গাল ছেড়ে এবার হাতটা ধরে। ভরসা দেয়। কুহু মাথা নাড়িয়ে বলে,”ঠিক আছে।”
অশান্ত মনটা আজ কিছুটা শান্ত হয়েছে। কুহু বাড়িতে পা রাখা মাত্রই রঙিন আলো গুলো জ্বলে ওঠল। ওর চোখে মুখে হাসি দেখা গেল। রাত্রিরাও চলে এসেছে। বসার ঘরে সব কিছু নিয়ে বসেছে। সবার জন্যই এনেছে উপহার। কুহুকে দেখেই রাত্রি এগিয়ে আসে।
“কী রে। দ্রুত আয়। সব দেখবি চল।”
কুহুকে সবার মাঝে নিয়ে আসে ও। উপস্থিত বাড়ির প্রায় সকলেই। এত কেনাকাটা করেছে ওরা। আবির নিজ হাতে সবাইকে সব উপহার বুঝিয়ে দেয়। নানিজান সব কিছু নিয়ে বলেন,”আর মাত্র কদিন। তারপর আর এই বুড়িরে তো মনেই রাখবা না ভাই।”
আবির হেসে ফেলে। বলে,”প্রথম বউকে কীভাবে ভুলি?”
“হুম, এখন মুখে তো বলবাই। নতুন পেলে সবাই ভুলে যায়।”
“ভুলব না গো।”
বলে নানিজানকে জড়িয়ে ধরে আবির। বৃদ্ধা হেসে বলে,”এতদিনে একটা আয়োজন হচ্ছে।”
আবিদাও উপস্থিত ছিলেন। তিনি বললেন,”এবার ভালোই ভালোই সব হলেই হলো। এ বাড়িতে যা নাটক চলছে।”
সবার মুখেই অন্ধকার এসে ভর করে। জবাবটি বৃদ্ধাই দেন। বলেন,”কেউ বদদোয়া না দিলে ভালোই হবে সব মেজোবউ।”
“বদদোয়া তো দিচ্ছি না আম্মা। তবে যে যার কর্মের জন্য বদদোয়ার ভাগিদার হলেও হতে পারে।”
বৃদ্ধা ভারী বিরক্ত হোন। তিনি আর কথা বাড়ান না। কুহুর দিকে তাকিয়ে বলেন,”কই রে কুহু। তোর শোয়ামি কই।”
কুহু চোখ পিটপিট করে। দাদিজান বলেন,”কোথায় আছে সে? দেখা যায় না আজকাল। এক সাথে ফিরিস নি?”
“গ্যারাজে গিয়েছে।”
“অহ। যাই হোক, সবাই যে যার মতন তৈরি হও। পথ কিন্তু বেশ দূরের। আমাকে ঘরে দিয়ে আয় তো আবির।”
বৃদ্ধাকে নিয়ে চলে যায় আবির। একে একে বাকিরাও চলে যায়। রাত্রি কুহুর গালে হাত রেখে বলে,”যা, ফ্রেশ হয়ে নে। একটু পরেই সবাইকে নিয়ে রওনা হতে হবে। তারপর লম্বা জার্নি।”
কুহু ঠোঁট সামান্য প্রসারিত করে সায় জানায়। রাত্রিও চলে যায়। বিয়ের অনুষ্ঠানটা হবে কক্সবাজারে। যেখানে দুই ছেলে পক্ষ ও দুই মেয়ে পক্ষই থাকবে। সম্মলিতভাবে এই আয়োজনে কারোই কোনো দ্বিধা নেই।
কুহু নিজের সবকিছু লাগেজে নিচ্ছিল। চট করেই একটা ম্যাসেজ এল। দীপ্র লিখেছে,”আমার ঘরে আয়।”
এমনিতেই সেবার এক ঘটনা ঘটে গেছে। এরপর আর ও ঘরে যায়নি কুহু। ওর একটু অস্বস্তি হচ্ছে। দীপ্র নিজেই বলল,”কিছু করব না। প্রমিস।”
এবার লজ্জা লাগল ওর। মনের কথা দীপ্র ভাই কীভাবে জানলেন? ও লিখল,”আসছি।”
লাগেজ গোছানো রেখেই দীপ্রর ঘরের কাছে এল কুহু। বুক ভরে দম নিয়ে দরজাটা সামান্য খুলতেই দীপ্র বলল,”আয়।”
পা টিপে টিপে কক্ষে প্রবেল করল ও। গোছানো দীপ্র ভাইয়ের পুরো বিছানা অগোছালো হয়ে আছে। কাবাড এলোমেলো। কুহু ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে।
“সাহায্য কর। এই প্রথম এলোমেলো লাগছে। পছন্দ করতে পারছি না কি নিব। সম্ভবত বিয়ের পর সব ছেলেই এমন অগোছালো হয়ে যায়। আর হওয়াটাই তো স্বাভাবিক বল।”
কুহু নীরবেই সব গোছাতে থাকে। দীপ্র দাঁড়িয়ে থাকে পাশে। দেখতে থাকে ছোট্ট সেই কুহুটাকে। যে ওরই চোখের সামনে একটু একটু করে বড়ো হয়েছে।
চলবে…
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি
Share On:
TAGS: প্রণয়ের রূপকথা, ফাতেমা তুজ নৌশি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৫৫
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩৪
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১৭
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪১
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪৭
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৫৬
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৫১
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৬৫