প্রণয়ের_রূপকথা (৬১)
খুব বেশি ভুগতে হলো না কণাকে। দুদিনেই ওর জ্বর নেমে গেল। আর তারপরের দুদিনে একদম সুস্থ সবল আগের কণা হয়ে গেল। এই কদিনে বাড়ির সকলের ব্যস্ততা বেড়েছে। এসেছে একটি ভালো খবর ও। সেটি হলো আবিরের বিয়ে। হেরার পরিবার থেকে আর আপত্তি নেই বলে জানানো হয়েছে। তবে রাত্রির সাথে আবিরের সম্পর্কটা আগের মতনই আছে। ভাই রেগে আছে, সেটা বুঝেও রাত্রির সাহসে কুলোয়নি। আজ দীপ্রর কথাতে ও এসেছে ভাইয়ের কাছে। আবির তখন সব হিসাব মেলাতে ব্যস্ত।
“আসব ভাইয়া?”
আবিরের কাজ থেমে গেল। জবাব দিল না। রাত্রি অপেক্ষা ও করল না। কেন করবে? এই ভাইয়ের সাথে এত বছরের পথচলা। জীবনে কখনোই তো অনুমতির প্রয়োজন পড়েনি। আজ নেহাতই অনুমতি চেয়েছে, এক ভুল করে ফেলেছিল বলে। তবে অনুমতি না দিলে, ওকী ঘরে প্রবেশ করবে না? না, সেটা হতেই পারে না। রাত্রি প্রবেশ করল একদম অস্বস্তিহীন ভাবে। আবির দাঁড়াতেই, রাত্রি এবার ঠোঁট কামড়ে বলল,”ভুল করেছি। ভেবেছিলাম ক্ষমা চাইব। কিন্তু না, ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নই আসে না। তুমি কে যার থেকে ক্ষমা চাইতে হবে আমায়? আমি ছোট। ভুল তো আমিই করব। সংশোধন করে দেয়ার দায়িত্ব কার? কার উচিত আগে কথা বলার? আমাকেই কেন আসতে হবে? ইগো তোমার বেশি হয়ে গেছে নাকি? সবসময় এমন করবে। দুদিন পর আমি যখন অন্যের বাড়ি চলে যাব, তখন ঠিকই টের পাবে।”
শেষ বাক্যটা বলতে গিয়ে রাত্রির গলা ধরে এল। সত্যিই তো। আর কিছুদিন। তারপর ও চলে যাবে। চলে যাবে অন্যের বাড়ি। সবটা কেমন স্বপ্নের মতন। যেখানে বেড়ে ওঠা। যাদের সাথে এত বছরের পথচলা। তাদের রেখে ও চলে যাবে। হুট করেই রাত্রির কান্না পেল খুব। ও ভাঙা গলায় ডাকল।
“ভাইয়া।”
আবিরের হৃদয়ের পাথর নেমেছে আগেই। ও নিজেও ভাবছিল বিষয়টা ঠিক করবে। কিন্তু কেন যেন হয়ে ওঠছিল না। রাত্রির কথা গুলো শুনে ওর বুকের ভেতর একটা তপ্ত বাতাস নেমে এল। নিজেকে কঠোর দেখানোর প্রয়াস করে বলল,”যাবি তো ভালো। তুই নিজেই তো যাওয়ার জন্য মড়িয়া। এখন কেন ঢং করছিস?”
“আমি না যেতে চাইলে, আমাকে রেখে দেবে তোমরা?”
“মাথা নষ্ট নাকি পেট খারাপ? তোকে কেন রাখব? কম জ্বালাতন তো করিস নি। রাখব না তোকে। আমি তো বিয়ে করবই। আমি বউ পাব। আর মা-বাবা পাবে একটা মেয়ে। তোকে কে মনে রাখবে?”
“বাহ। বেশ ভালো। রাখতে হবে না মনে। গেলাম আমি।”
বলে হুড়মুড় করে চলে গেল রাত্রি। ও বুঝেছে আবিরের কথা গুলো সিরিয়াস না। তবু কেন যেন মানতে কষ্ট হচ্ছে। রাত্রি চলে যেতেই আবিরের বুক ভেদ করে একটি নিশ্বাস নেমে এল। হাহাকার জমল। সত্যিই তো। আর মাত্র কিছুদিন। তারপর চলে যাবে রাত্রি। চাইলেই আর সবটা আগের মতন করতে পারবে না। এখনকার মতন এ বাড়িতে যখন তখন আসতেও পারবে না। আচ্ছা ওর প্রস্থানের কথা চিন্তা করেই আবিরের বুকটা কেমন করছে। আর রাত্রি যে চলে যাচ্ছে। ওর কষ্টটা তবে কেমন বেশি? রাত্রির বিষয়টি ভাবতে গিয়ে হেরাকে স্মরণ হলো ওর। হেরাও তো এত বছরের সম্পর্ক, পথচলা ফেলে ওর নিকট উপস্থিত হবে। ওর অনুভূতিই বা কেমন? ভাবনাটি ভাবতে গিয়ে মেয়েটিকে খুব স্মরণ হচ্ছে। ও আর অপেক্ষা করল না। তৎক্ষণাৎ কল করল হেরার নাম্বারে। খানিক বাদে রিসিভ হলো। একটি মিষ্টি কণ্ঠ ভেসে আসতেই পেছনের কথা ভুলে গিয়ে আবির বলল,”এই কণ্ঠের মালিক, কবে আমার ঘরে উপস্থিত হবে? কবে আমার পাশে বসবে। কবে আমি ঘুম থেকে ওঠে কিংবা ঘুমুঘুমু চোখে, বিছানার পাশে তাকে দেখব। তার নরম হাত আমার গাল ছুঁয়ে যাবে? হেরা, এই অপেক্ষা কেন ফুরায় না?”
ওদের এত দীর্ঘ অপেক্ষা। নানান ঝামেলা। সব মিলিয়ে সত্যিই এবার অপেক্ষা ফুরানোর পালা। শেষ অপেক্ষা যেন, আরো বেশি কষ্টের। আরো বেশি দীঘল। ওপাশ থেকে হেরা মিষ্টি করে হাসল। বলল,”অপেক্ষা ফুরিয়ে গেলে, তো ফুরিয়েই গেল। এই অপেক্ষাটাই উপভোগ করো আবির।”
আবির দীর্ঘ শ্বাস ফেলার মতন করে বলল,”অপেক্ষা উপভোগ কীভাবে করে হেরা? তোমার এই কণ্ঠ শুনেই তো আমার পথটা এলোমেলো হয়ে যায়।”
“তাই নাকি?”
“হুম। সত্যিই তাই। একদম এলোমেলো। সমুদ্রের বুকে উঁচু উঁচু ঢেউ নামছে যেন।”
আবিরের কথা গুলো কাব্যিক শোনাচ্ছে। হেরা হেসে ফেলে ওর কথা গুলো শুনে।
দুদিন ধরে দীপ্র বাসায় নেই। এই না থাকাটা কুহুকে খুব পোড়াচ্ছে। ও ভার্সিটি গিয়েও উদাস থেকেছে। আজ বাড়িতে ফিরেই এসেছে দীপ্রর কক্ষে। যদিও লুকোচুরির প্রয়োজন নেই। তবুও লুকোচুরি করেই এসেছে। বরাবরের মতন এই ঘরে প্রবেশ করে বুক ভরে দম নিয়েছে ও। সঙ্গে সঙ্গে পরিচিত সেই সুবাস খানা নাকে এসে ধরা দিয়েছে। চোখ দুটো মুদিত রেখেই ও বিড়বিড় করে,’কেন এমন লাগছে। যেন আপনি আমার আশেপাশেই আছেন দীপ্র ভাই।’
ওর বিড়বিড় শেষ হওয়া মাত্রই একটি ধীর গলা ভেসে ওঠে।
“চোখ খুলে দেখ কুহু। সত্যিই আমি তোর কাছে।”
কণ্ঠের তীব্রতা কানে পৌঁছাতেই ফট করে চোখ মেলে কুহু। ভেসে ওঠে দীপ্র”র শক্তপোক্ত বুকখানা। ও পিছাতে গিয়েও পারে না। দীপ্র সামান্য ঝুঁকে মেয়েটির চোখের দৃষ্টি কাড়ে। শুধায়,”মিস করছিলি?”
কুহু জবাব দিতে পারে না। অস্বস্তির দল গলায় এসে আটকায়। এই দুদিনে একটিবার কলেও কথায় হয়নি ওদের। দীপ্র হেসে পুনরায় বলে,”কুহু, তুই মিস করছিলি আমায়।”
এবার জবাব দেয় ও। ফট করে পেছন ফিরে দৃষ্টি লুকায়। বড়ো করে নিশ্বাস নিয়ে বলে,”মিস কেন করতে যাব?”
“করিস নি?”
“না।”
“উম, যদি মিস নাই বা করিস। তবে এখানে কেন এসেছিস?”
কুহু আটকায়। ও জানে না আজ কেন এখানে এল। আর এল তো এল, আজই দীপ্র ভাইকে ফিরতে হলো! আর কুহু ধরাও পড়ল। এভাবেই কুহুর সবকিছুতে সন্ধ্যা নামে। ও দীর্ঘশ্বাস ফেলে। দীপ্র কাবাড খুলে তোয়ালে নেয়। তারপর চলে যায় শাওয়ার নিতে। মাত্রই ফিরেছিল। অন্য দিকটায় ছিল। তখনই চুপিসারে কুহুকে কক্ষে প্রবেশ করতে দেখে। দীপ্র আড়াল থেকে দেখতে চাইছিল কুহু কি করে। কিন্তু ঘরে প্রবেশ করেই মেয়েটি যখন চোখ দুটো বন্ধ করল, তখনই মনে হলো সামনে আসা যাক। তাই সামনে এসে গেল। সেই সাথে শুনল কুহুর বিড়বিড় করা কথাটাও।
সময় পেয়ে কুহু কথা সাজিয়ে নিল। মাথায় বুদ্ধি খেলতেই ও পেছন ঘুরতে ঘুরতে বলল,”আমি আসলে এসেছি আমার একটা ড্রেসের খোঁজে। ভুলে এখানে…
ও কথা শেষ করতে পারল না। দেখল দীপ্র তো এখানে নেই। কুহুর ভ্রু এবার কুঞ্চিত হলো। পুরো ঘরে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে চিন্তায় পড়ল। এবার আর বিড়বিড় নয়। স্বাভাবিক ভাবেই বলে উঠল।
“কি আজব। এভাবে কোথায় হারালো। জেগে জেগে স্বপ্ন দেখলাম নাকি? মাথা গেছে কুহু তোর।”
বলতে না বলতেই বাথরুমের দরজা খোলার শব্দ হয়। ভেতর থেকে দীপ্র বলে,”কুহু, আছিস এখানে?”
কুহু আবারো চমকায়। বুকের ভেতর থু থু দেয়। দীপ্র আবারো ডাকে।
“কুহু।”
কুহুর বিশ্বাস হয়। সে ভুল দেখেনি। দীপ্র ভাই আগেও উপস্থিত ছিলেন। তবে কখন বাথরুমের দিকে গেলেন। কে জানে। কুহু ছোট করে নিশ্বাস ফেলে।
“জি, বলেন।”
“কাবাড খুলে তোয়ালে নিয়ে আয় তো।”
“তোয়ালে কেন? আপনি গোসল করতে গিয়ছেন তোয়ালে না নিয়েই নাকি?”
“নিয়েছি। এটা পড়ে গিয়ে ভিজে গিয়েছে।”
“তাহলে নিজেই এসে নিয়ে নিন।”
“সেটা সম্ভব নয় বলেই তো তোকে বলেছি।”
কুহু আর কথা বাড়ায় না। শুধায় ও না কেন সম্ভব নয়। এই লোককে দিয়ে বিশ্বাস নেই। শেষে কি না কি বলে ফেলে। ও কাবাড খুলে। তোয়ালে বের করে নিয়ে আসে বাথরুমের কাছে।
“এনেছি।”
“ওকে। গুড গার্ল।”
বলে বাথরুমের দরজা কিছুটা খুলে। কুহু তোয়ালে বাড়িয়ে ধরে। আর সঙ্গে সঙ্গে হ্যাঁচকা টানে মেয়েটিকে ভেতরে নিয়ে যায় দীপ্র। কুহু কোনো কিছু বোঝার পূর্বেই ওকে দাঁড় করিয়ে দেয় শাওয়ারে নিচে। শীতল পানিতে সঙ্গে সঙ্গে ভিজে যায় কুহু। ও সরতে চাইলেই হাতের সাহায্যে বাঁধা দেয় দীপ্র।
“এটা কী হলো!”
“যা হওয়ার তাই হলো।”
“দীপ্র ভাই আপ…
“হুস।”
বলে মেয়েটির ঠোঁটে আঙুল রাখে দীপ্র। কুহু তখনো শাওয়ারের নিচে। শীতল পানি ত্বক স্পর্শ করে যাচ্ছে। সেই সাথে দীপ্রর পুরুষালি আঙুল ঠোঁটে এসে নেমেছে। কুহু কিছু বলতে পারে না। ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে। দীপ্র মাথা নামিয়ে আনে। ঝুঁকে ওর দিকে। এতে করে ঝর্ণার পানি দুজনকেই সমানতালে ভিজাতে শুরু করে। দীপ্রর এক হাত দেয়ালে ঠেস দিয়ে রাখা। দুজনের দূরত্ব নেমে এসেছে। পুরুষালি কণ্ঠটা বলে উঠে।
“হুজ ‘দীপ্র ভাই’? কল মি দীপ্র। কোনো ভাই টাই নয়। অনলি দীপ্র। বুঝেছিস?”
একে তো দীপ্র এত কাছে। তার ওপর শীতল পানির ছোঁয়া। কুহু কাঁপছে এমনিতেই। সেই সাথে বাড়তি হিসেবে আছে, দীপ্রর বলা এই কথা গুলো। কুহুর গলা শুকিয়ে আসে। দীপ্রর আঙুল তখনো ঠোঁট ছুঁয়ে আছে। কুহু কিছু বলতে চায়। সেটি বুঝেই আঙুল সরিয়ে নেয় ও। কুহু বুক ভরে দম নেয়। বলতে নেয়,”দীপ্র ভাই…
দীপ্র বিরক্ত হওয়ার ন্যায় শব্দ করে। পুনরায় আঙুল টেনে আনে মেয়েটির ঠোঁটের কাছে। ফিসফিস করে বলে,”কি বলেছি? কল মি দীপ্র। অনলি দীপ্র। নট ভাই।”
কুহু ঢোক গিলে। বলে,”দেখুন।’
“কী দেখতে বলছিস?”
এবার কুহুর চোয়াল নেমে আসার উপক্রম। ও ভাষা হারায়। দীপ্র এক হাতে শাওয়ার বন্ধ করে। ওরা দুজনেই তখন একদম কাক ভেজা হয়ে গিয়েছে। কুহু মাত্রই খেয়াল করে দীপ্রর বুক খালি। শার্ট নেই। জিম করা পেটানো বুক, বাহু। সিনেমার হিরোদের অনুরূপ। এই প্রথম, কুহু এভাবে বেহায়ার মতন চেয়ে থাকে। দীপ্র খেয়াল করে ঠান্ডায় মেয়েটির শরীরে কম্পন ধরেছে। ও ফোঁস করে দম ফেলে বলে,”কাঁপছিস। চেঞ্জ করতে হবে। আমি ড্রেস এনে দিচ্ছি।”
ধ্যান ফিরে কুহুর। ও দ্রুত চোখ সরায়। সত্যিই এবার খুব ঠান্ডা লাগছে। কুহু বলে,”আমি রুমে যাচ্ছি।”
“এভাবে? কেউ দেখলে।”
সত্যিই তো,এভাবে কেউ দেখলে, তখন কুহু কি বলবে? ও ভেবে পায় না। দীপ্র আবারো বলল,”ওয়েট কর। আমি যাচ্ছি।”
এই বলে ও যখন বের হতে নিল। কুহু তখন আটকাল।
“আমি বের হয়ে যাই। এটাই ভালো হবে। আপনি থাকেন।”
দীপ্রকে আর সুযোগ না দিয়েই বেরিয়ে পড়ল ও। পুরো ভেজা শরীর। দীপ্র দরজা খুলে বলল,”তোয়ালে নিয়ে যা।”
কিন্তু কুহু আর কিছুই শুনল না। ও তৎক্ষণাৎ দরজার কাছে এসে উঁকি দিল। কেউ নেই দেখে ও দ্রুত পা বাড়াল নিজের ঘরের দিকে।
চলবে….
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি
Share On:
TAGS: প্রণয়ের রূপকথা, ফাতেমা তুজ নৌশি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১৬
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১৭
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৬২
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৬৯
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১৮
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৬
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৫৭
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৬৫
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩৯
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪১