প্রণয়ের_রূপকথা (৫)
দীপ্র কিংবা জেবা, কেউই নাকোচ করেননি। এলাকার প্রতি আলাদা টান আছে দীপ্র’র। সেই টান থেকেই হয়তো নাকোচ করেনি সে। আজ সারাটাদিন এখানে ওখানে ঘুরেছে। তাই দুপুরের খাবার খাওয়া হয়নি। বাড়ি ফিরে গোসল করে চুল শুকিয়ে নিচ্ছিল। তখনই জেবা এলেন। বললেন,”ক্ষুধা লাগেনি তোর?”
“একটু লেগেছে। তবে রাতে এক সাথেই খাব।”
“হালকা কিছু নিয়ে আসি? কুহুকে দেখলাম, সিঙ্গারা বানাচ্ছে।”
কুহু সিঙ্গারা বানাচ্ছে শুনেও তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না দীপ্র। ওর ভেতরে একটা রাগ কাজ করছে। মেয়েটি ওর স্নেহকে দয়ার সাথে তুলনা করেছে। যা ভীষণ অপমানের।
জেবার হাতে সিঙ্গারা তুলে দিতেই দবীরের ডাক পড়ল। কুহুর হলো বিপদ। তাকে বলা হলো দীপ্রকে যেন সিঙ্গারা দিয়ে আসে। এমন একটা সময়, আশেপাশে না আছে কণা আর না আছে রাত্রিপু। এমনকি আয়ানাপু ও নেই। অবশ্য আয়ানা থাকলেও যে বিশেষ লাভ হতো তা বলা মুশকিল। মেয়েটা তো কোনো কাজই করে না। সারাক্ষণ অর্ডার করতে থাকে। কুহুর আসলেই কিছু করার নেই। ও চারটে সিঙ্গারা তুলে নিয়ে,ছোট বাটিতে কাসুন্দি দিয়ে নিয়ে এল দীপ্রর কক্ষে। দীপ্র তখন গায়ে টি শার্ট জড়িয়ে নিচ্ছিল। কুহু ঠকঠক করল।
“কে?”
“আমি।”
কুহুর কণ্ঠে দীপ্রর মুখখানা আঁধারে ডুবল। ও টি শার্ট খানা ভালো মতন জড়িয়ে নিয়ে বলল,”কী দরকার?”
“সিঙ্গারা দিতে এসেছি।”
“মা কোথায়?”
“বড়ো চাচ্চু ডেকেছে।”
“আর কেউ নেই?”
“আমিই দিতে এসেছি।”
“অন্য কাউকে আসতে বল।”
শেষ কথায় কুহুর মুখশ্রী আঁধারে ডুবল। ও বলল,”আমি দিলে কী সমস্যা?”
“যার তার হাত থেকে নেই না।”
“অথচ সব গুলো সিঙ্গারা আমিই কিন্তু বানিয়েছি।”
দীপ্র এবার দরজার কাছে চলে এল। খুলে ফেলল এক টানে। আচমকা হওয়াতে কুহু বেশ ভয়ই পেল। ও পিছিয়ে গেল এক পা।
“দে।”
বলে সিঙ্গারার প্লেট তুলে নিল দীপ্র। পুরো বিষয়টা এত দ্রুত ঘটল যে কুহু থমকে গেল। চেয়ে রইল বিস্ময়ের সাথে। দীপ্র একটা সিঙ্গারায় কামড় বসিয়ে বলল,”তাকিয়ে আছিস কেন? খেতে দিয়ে, নজর দিবি নাকি?”
“নজর কেন দেব? যার তার খাওয়াতে আমি নজর দেই না দীপ্র ভাই।”
“যা এখন। ভালো লাগছে না।”
বলে একদম মুখের ওপর দরজা লাগিয়ে দিল দীপ্র। কুহুর অন্ধকার মুখটা আরো বেশি অন্ধকারে ডুবে গেল। তার কী ঠেকা, যে সে সিঙ্গারা দিতে আসবে। নেহাতই বড়ো চাচি দিতে বললেন। নতুবা কুহু কখনোই আসত না।
সারাদিনে জ্বর ছিল না। এখন আবার শরীরটা কেমন লাগছে। সিঙ্গারা খেতে খেতে কুহুর শরীর খানা কেঁপে ওঠল। আয়ানা বলল,”বাহ, বেশ ভালো হয়েছে সিঙ্গারা গুলো। একদমই তেল চিটচিটে না।”
“আসলেই। কুহু এত গুণী।”
গুণী বলায় কুহুর চোখে মুখে কোনো পরিবর্তন এল না। তবে, আয়ানার মুখটা বিবর্ণ হলো। বলা বাহুল্য কুহু, কণা কিংবা রাত্রি, কাউকেই ওর সহ্য হয় না। ও আড়ালে ভেংচি কেটে পুনরায় সিঙ্গারায় কামড় বসাল। সবার ভাগে দুইটা করে সিঙ্গারা জুটেছিল। এতই ভালো হয়েছে যে কুঞ্জ ছুটে এসেছে আরেকটি খেতে। কিন্তু আর যে নেই। ও বায়না ধরে বলল,”আপু, তোর ওখান থেকে এক কামড় দে না।”
আয়ানা বড়ো বিরক্ত হলো। বলল,”তুই তো খেয়েছিস দুটো।”
“এক কামড় খাব। দে না।”
কুঞ্জ ছোট মানুষ। অতশত বুঝে না। ও মুখটা শুকিয়ে ফেলল। সেটা দেখে কুহু বলল,”এটা নে কুঞ্জ।”
নিজের ভাগ থেকে একটা সিঙ্গারা দিয়ে দিল কুহু। সেটা পেয়ে কুঞ্জ মহা খুশি। ও চেপে ধরল কুহুর গলা।
“ইস্ট অর ওয়েস্ট, কুহুপু বেস্ট।”
বলে কুহুর গালে চুমু খেয়ে কুঞ্জ ছুট লাগাল। ওর এ কাহিনী দেখে রাত্রি আর কণা হাসল। আয়ানা বিরক্তি টেনে বলল,”এত ভালো হওয়ার কী আছে? ও তো দুটো খেয়েছে।”
“থাক না আয়ানাপু। কুঞ্জ তো ছোট।”
“বেশি বেশি।”
বলে আবারো বিরক্তি প্রকাশ করল আয়ানা। রাত্রি তার ভাগ থেকে সিঙ্গারা দিতে গেলে কুহু বলল,”আমার শরীর খারাপ লাগছে। আমি আর খাব না রাত্রিপু।”
“একটু খা। কত ভালো হয়েছে সিঙ্গারাটা।”
“খেলাম তো। আর ইচ্ছে করছে না।”
“আমার এখান থেকে খা আপু।
বলল কণা। কুহু একটুখানি হেসে কণার গাল স্পর্শ করে বলল,”তুই খা। আমার পেট ভরে গিয়েছে। ভালোও লাগছে না। আমি ওঠি।”
বলে ওঠে গেল কুহু। আয়ানা ভেংচি কাটল পুনরায়। খেতে ইচ্ছে করছে না বলেই কুঞ্জকে সিঙ্গারা দিয়ে দিল কুহু। অথচ, সবাই তাকে মহান বানিয়ে পারলে মাথায় তুলে নাচে। এসব ওর নিকট বড়ো ন্যাকামিই লাগে।
কুঞ্জকে চেপে ধরেছে আয়ানা। ছেলেটার মাথায় দু চারটে চাপর ও পড়েছে। সেই জন্য কাঁদছে ও। আবিদা তড়িঘড়ি করে এলেন। জড়িয়ে ধরলেন ছেলেকে। শাসিয়ে তাকালেন মেয়ের পানে।
“ওকে মা র ছিস কেন?”
“মা র ব না? ও জানো কী করেছে?”
“কী করেছে ও?”
“বেহায়া, ছোঁচার মতন সিঙ্গারা চায়। কুহু নিজের ভাগ থেকে দিল। কতটা অপমানিত হলাম আমি।”
“কুহুপু দিয়েছে তাদের তোর কী?”
“আবার মুখে মুখে কথা।”
বলেই কুঞ্জর মাথায় গাট্টা দেয় আয়ানা। আবিদা ধমকে ওঠেন।
“কী সমস্যা আয়ানা? আবার মা রছিস। আমি সামনে থাকা সত্ত্বেও।”
“ওর মুখটা সামলাও মা। না হলে সমস্যা। ফাজিল কোথাকার।”
বলে রেগেমেগে চলে যায় আয়ানা। কুঞ্জ কাঁদতে থাকে। তার বুঝে আসে না, আয়ানাপু কেন এভাবে রাগ দেখাল। কুহুপু তো নিজ থেকেই দিয়েছে। সে তো চায়নি।
যতটা রাগ, ক্ষোভ নিয়ে আয়ানা রুম থেকে বের হয়েছিল ঠিক ততটাই শীতল হলো দীপ্র’কে দেখে। ছেলেটা যেমন বলিষ্ঠ দেহের, ঠিক তেমনই তার চেহারার ধাঁচ। আয়ানার যেন গলা শুকিয়ে এল। ও এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। দীপ্র বলল,”কী হয়েছে?”
কথা বলতেই যেন ভুলে গেল আয়ানা। শুধু চেয়ে রইল মুগ্ধতা নিয়ে। দীপ্র এবার ওর মুখের সামনে তুড়ি বাজানোর মতন শব্দ করল। এতে করে ধ্যান ফিরে পেল ও। কিছুটা আমতা আমতা করে বলল,”না কিছু না।”
“এভাবে দাঁড়িয়ে আছিস কেন তাহলে?”
“ও তাই তো।”
বলে একটু সরে দাঁড়াল আয়ানা। দীপ্র সামনের দিকে আগাল। হঠাৎ আয়ানা বলল,”দাদাভাই।”
থামল দীপ্র। ঘুরে চাইল। আয়ানা হাসি হাসি মুখে এগিয়ে এল। একদম দীপ্র’র বরাবর হলো।
“একটা আবদার করব?”
“হু?”
“ঘুরতে নিয়ে যাবে কোথাও? এখানে এসে কোথাও যাওয়া হয়নি। প্লিজ নিয়ে যাও। প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ।”
ও একদম বাচ্চাদের মতন করতে লাগল। কুহু আর কণা বের হয়েছিল। এসেই এই দৃশ্যের দেখা মিলল। আয়ানা হুট করেই দীপ্রর বাহু খানা স্পর্শ করল। দীপ্র বলল,”আচ্ছা, নিয়ে যাব।”
হাঁ বোধক জবাব পেয়ে আয়ানার খুশি হলো দেখার মতন। ও অতি উত্তেজনায় দীপ্রর বাহুতে মাথা ঠেকাল। গদগদ হয়ে বলল,”থ্যাংক ইউ সো মাচ। কালই কিন্তু নিয়ে যাবে।”
“আচ্ছা, ঠিক আছে। যাব নিয়ে।”
বলে বাহু ছাড়িয়ে নিল দীপ্র। আয়ানা এক প্রকার লাফিয়েই ওঠল। কণা ভ্রু কুঞ্চিত করে ছিল। কুহু নির্বাক। সহসাই কণা বলে ওঠল,”আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, সামথিং ইজ রং।”
“রং হোক আর যাইহোক। তাতে আমাদের কী?”
“আমাদের কী মানে? দীপ্র ভাইয়ার তো আমার দুলাভাই হওয়ার কথা ছিল।”
“এসব কথা বলবি না কণা।”
কুহু একটু রেগেই গেল। কণাও মিইয়ে গেল। মিনমিনে সুরে কুহু বলল,”তাকে বিয়ে করার জন্য আমিও ম রে যাচ্ছিলাম না। শুধু আমাকে এভাবে অপমান না করলেও পারত। ফালতু লোক।”
| আমার জন্য একটু দোয়া করবেন। এত বাজে সময় পার করছি। |
চলবে….
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি
Share On:
TAGS: প্রণয়ের রূপকথা, ফাতেমা তুজ নৌশি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৯
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৩
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৯
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১৮
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৫
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১৫
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২০
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১৭
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৪