Golpo romantic golpo প্রণয়ের রূপকথা

প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৫৭


প্রণয়ের_রূপকথা (৫৭)

কুহুর ভুলটা দীপ্র জানে। তবে যাকে ভালোবাসা হয়, তার ভুলটা হজম করে নেয়া যায় সহজেই। দীপ্র তাই করেছে। ও চোখ দুটো মুদিত করে নিজের ভেতর শক্তি জোগাড় করল। ও কখনো চায়নি কুহুকে ভালোবেসে বাকিদের প্রতি কঠোর আচরণ করতে। চেয়েছে সবাইকে সঙ্গী করে কুহুকে বুক পকেটে রেখে একটা জনম কাটিয়ে দিতে। কিন্তু সত্য হলো এ সম্ভব নয়। দীপ্রর মেজাজ আসলেই খারাপ হলো। ও নিজের রাগটা সামাল দিতে ব্যর্থ হলো। অনেকটা গর্জে উঠে বলল,”চাচি, মানা করেছিলাম। তুমি আমার কথা শুনলে না। আর কুহু যা করেছে তা তো আমার সাথে করেছে। আমি মেনে নিতে পারলে তোমাদের সমস্যা কোথায়? তোমরা কেন এ বিষয়ে ঝামেলা করবে? আমার কুহুর মাঝে তোমরা কে ঝামেলার করার?”

আবিদা বিস্মিত হলেন। দীপ্রর নম্র ভদ্র আচরণে তিনি অভ্যস্ত। ছেলেটাকে এমন গলায় কথা বলতে দেখেননি তিনি।

“দীপ্র! এভাবে বলতে পারলি তুই? আমরা,কে মানে?”

“কে মানে কে। চাচি, তোমাদের প্রতি সম্মান রেখেছি সবসময়। তাই বলে কুহুকে এভাবে অপমান করার অধিকার তোমাদের কারো নেই। কারো মানে কারোই নেই।”

বলে দীপ্র একটু থামল। সমস্ত ঘরে চোখ বুলিয়ে বুক ভরে দম নিল। হাতের মুষ্টি শক্ত করে বলল,”আমি, দীপ্র দেওয়ান। প্রতিজ্ঞা করছি আমার স্ত্রী কুহু দেওয়ানকে কেউ তিল পরিমাণ কষ্ট দিলে তাকে সবার আগে আমার মুখোমুখি হতে হবে।”

একটা প্রকাণ্ড সমীরণ এসে পড়ল ঘরটায়। দীপ্রর এই রূপটা প্রায় সবারই অচেনা। ও নম্র ভাবে কথা ফলিয়েছে সবসময়। আজ যেন তার বিপরীত আচরণ দেখা যাচ্ছে। দবীর নিজেও ছেলেকে চিনতে ব্যর্থ। দীপ্রর রাগ ক্রমশই মাথায় চড়ে যাচ্ছে। ও পুনরায় হিসহিস করে বলে,”আর এতদিন যা বলিনি, তা বলছি, আয়ানা অলরেডি অনেক গুলো অন্যায় করেছে। সেগুলো আমি দেখেছি। চুপ করে সয়ে গেছি। কিছু বলিনি। কারণ স্নেহ করি। কিন্তু সেই স্নেহের জায়গাটা কুহুর থেকে বেশি নয়।”

শোড়গোল পেয়ে আয়ানা নেমে এসেছিল। এসেই এই কথাটা শুনল। কুহু খানিক আগেই দোতলায় উঠে গিয়েছে। দীপ্রও দোতলার পথে আগাল। মাঝে আয়ানার মুখোমুখি হলো। কান্নাকাটিতে চোখ মুখের বেহাল দশা। তবে আর মায়া হলো না ওর। ও বরং কঠোর ভাবে বলল,”এতদিন ভালো রূপ দেখিয়েছি আয়ানা। এবার আর পারব না। তোকে নিষেধ করেছিলাম। স্নেহ করি বিধায় অনেক অপরাধ ক্ষমাও করেছিলাম। বিপরীতে তুই…

দীপ্র আর কিছু বলল না। চলে গেল। আয়ানা ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইল। কি থেকে কি হয়ে গেল। সবটা এলোমেলো। সত্যিই কি সব দোষ তার? সে খারাপ?

মায়ের ঘরের দরজায় এসে কান্নায় ভেঙে পড়েছে কুহু। বার বার বলার পর ও মা দরজা খুলছেন না। দীপ্র এসে দেখল মেঝেতে বসে চিৎকার করে চলেছে ও। মেয়েটির কান্না দীপ্রর হৃদয়ে এসে আঘাত করে চলেছে। ও বসল কুহুর পাশে। ডাকল আদুরে ভাবে।

“কুহু।”

কুহুর তার দু চোখের কান্না নিয়ে দীপ্রর দিকে চাইল। দীপ্র ওর হাত খানা নিজের হাতের মুঠোয় নিল।

“সরি,কুহু।”

কুহু কথা বলতে পারল না। সরি’র মানেও বুঝল না। দীপ্রই বলল,”তোকে এত কিছু শুনতে হলো। সবটা আমার জন্য। আমার জন্য শুনতে হলো তোকে। আই অ্যাম সরি কুহু।”

সত্যিই কি তাই? দীপ্রর জন্য শুনতে হলো? না তো। দীপ্রর দোষ কোথায়? দোষ তো ওর নিজের। ও নিজের কর্মের লজ্জায় মিইয়ে যেতে চাইল। তবে দীপ্রর শীতল হাতখানা যখন গাল ছুঁয়ে দিল, মেয়েটির মেরুদণ্ড বরাবর শীতল একটা স্রোত নেমে এল।

“চাচির অভিমান হয়েছে। আমি কথা দিচ্ছি, সব ঠিক করে দেব। তুই আয় আমার সাথে।”

দীপ্র ওকে ওঠাতে চাইলে কুহু নাকোচ করল। যেতে চাইল না। এতে করে ফোঁস করে দম ফেলল ও।
“বোঝার চেষ্টা কর প্লিজ। কান্নাকাটি করে লাভ নেই। উল্টো শরীর খারাপ। আর তোর কি মনে হয়, শরীর খারাপ করলে চাচির ভালো লাগবে? লাগবে বল?”

কুহু মাথা নাড়িয়ে না বোঝাল। দীপ্র একটুখানি হাসার মতন করে বলল,”গুড। তাহলে উঠে আয় প্লিজ।”

দীপ্রর এমন আদুরে অনুনয়, বুঝদার কথা বার্তা কুহুর ভেতরে নতুন একটা হাওয়া দিয়ে গেল। পুরুষটির হাতের জোরে দাঁড়ালো ও। পথ আগাতে আগাতে দীপ্র দরজার দিকে একবার ফিরল। বিনিমনে এল শুধুই দীর্ঘনিশ্বাস। সেই দীর্ঘশ্বাস চেপে গিয়ে কুহুকে নিয়ে গেল নিজের ঘরে। মেয়েটির এখন বিশ্রামের প্রয়োজন। সেই সাথে প্রয়োজন কিছু দানাপানির। সকাল থেকে পেটে সেভাবে কিছুই তো পড়েনি। অথচ দুপুর প্রায় শেষ হতে চলল।

বোনের প্রতি কণার একটা অভিমান জমে গিয়েছে। ও নিজেই চাইত দীপ্র ভাইয়ের সাথে কুহুপুর বিয়েটা হোক। কিন্তু আজকের ঘটনা শুনে, কুহুপুর প্রতি খুব রাগ হচ্ছে। খুব মানে খুব। মায়ের কথা ভেবে কান্নাও পাচ্ছে। এদিকে একটা ফোন কল খুবই বিরক্ত করে চলেছে। রাগীব দশবারের বেশি কল করেছে। কণার রাগে আক্রোশে ফোনটা ফেলে দিতে ইচ্ছে করে। কিন্তু ও পারে না। ওর সে সাধ্য নেই। ফোন ফেলে দিলে, পুনরায় ফোন জুটবে কি না তার নিশ্চয়তাও নেই। তাই ফোনটা আর ফেলা হয় না। ও কল রিসিভ করে চ্যাঁচিয়ে ওঠে।

“আপনার কী সমস্যা? আমাকে কেন কল করেন? আমি কে? আমাকেই কেন কল করতে হবে? কেন বিরক্ত করছেন? কল রিসিভ করছি না তারপরও কল করে চলেছেন।”

কণার বিচলিত ভাব, রাগ, ক্ষোভ ওপাশের ব্যক্তিটিকে প্রভাবিত করলেও অপমান বোধ হলো না তার। বরং শীতল একটা জবাব এল।

“সরি কণা। সত্যিই সরি।”

কণা দমল। বুঝতেও পারল রাগীবের সাথে বেশ খারাপ একটা আচরণ হয়ে গেছে। তবে এই নিয়ে কিছুটি বলল না। রাগীবই বলল,”তোমাকে আসলেই বিরক্ত করে চলেছি। কিন্তু আমি নিরুপায় হয়ে কল করেছি। রাত্রি কী ফিরেছে?”

“না।”

“অহ। ফিরেনি।”

একটু থেমে রাগীব আবারো শুধাল, “ওর কোনো খবর?”

“জানি না।”

কণার এই আচরণ যে অস্বাভাবিক নয় তা ও বুঝে। তাছাড়া আরো একটি ঘটনা তার কান অবধি এসেছে। ও সেটা তুলতেই কণা এবার ফোঁস ফোঁস করে উঠল।
“মজা নেয়ার জন্য কল করেছেন? আমার আপু না জানিয়ে বিয়ে করেছে, আমাদের অবস্থা এখন কতটা খারাপ সেসব জানার জন্যই কল করেছেন? বুঝতেই তো পারছেন। আমরা ভালো নেই। এবার শান্তি হয়েছে না?”

বলে ওপাশের ব্যক্তিটিকে কিছু বলার সুযোগ দিল না ও। কল কেটে আরো জোরে কেঁদে ফেলল। সামনেই তার কলেজ জীবন শুরু হতে চলেছে। অথচ পরিবারের সবটা এলোমেলো হয়ে আছে। সকল সুখ শান্তি শেষ হয়ে গেছে।

কুহুকে অনেকটা জোর করে কিছু খাবার খাওয়াতে পেরেছে দীপ্র। ও ভালোই বুঝেছে দবীর মনে মনে সন্তুষ্ট নয়। তাই নিজ থেকেই বাবার সাথে কথা বলতে এসেছে। দবীর ছেলেকে দেখে শান্ত সুরে বললেন,”বোসো দীপ্র।”

“বসব না বাবা।”

“আচ্ছা।”

“চাচির সাথে একটু কথা বলতে হবে।”

“কী বলব বলো?”

“বলবে কুহুর বিষয়টি তোমরা স্বাভাবিক ভাবে নিয়েছ।”

“ঠিক আছে।”

দীপ্র বেরিয়ে এল। ও বুঝেছে বাবা আসলেই স্বাভাবিক ভাবে নেয়নি। নেয়ার কথাও না। কেউই ঘটনাটা স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারবে না। দীপ্রর রাগ হলো। রাগ হলো নিজের ওপর। ও যদি আগে থেকেই কুহুকে বোঝাত। রাগ দেখিয়ে বিয়ে অবধি ঘটনাটা না গড়াত। তবে এসব হতোই না। আসলে ভুল হয়ে যাওয়ার পরই মানুষ নিজের ভুল বুঝতে পারে। যেমনটা কুহু বুঝেছে। আর এখন বুঝে চলেছে দীপ্র। আগে বুঝলে এই ঘটনা গুলো হতোই না। দীপ্র আসলেই স্বস্তি পেল না। ও চলে এল নিজের গাড়ি খানা নিয়ে। গ্রামের রাস্তায় গাড়ি চালাতে চালাতে বড়ো ব্রিজে এসে গাড়ি থামাল। ব্রিজের নিচ দিয়ে বয়ে গেছে বিশাল নদী। এই নদীর জল ভীষণ টলটলে। সে জলে চেয়ে দীপ্র ভাবল সকালের ঘটনা। অনেকটা ভেবে চিন্তেই সিদ্ধান্তটা নিয়েছিল ও। বুঝেছিল আয়ানা আর চাচা-চাচি কিছু একটা করতে চলেছে। আর সেটার প্রকাশ আগে হয়ে গেলে কুহুকে পাওয়া কঠিন হবে। এদিকে কুহু, মেয়েটির হৃদয়ের অনুভূতি পরিষ্কার নয়। অপরাধবোধ, বাবা হারানোর শোক, পরিস্থিতি সব কিছু তাকে চেপে ধরেছে। ও নিজেও বুঝে না কখন কি করে। কি অনুভূতি বুকের ভেতর দলা পাকায়। এমন অবস্থায় বিয়ে নিয়ে বললে কুহুর প্রতিক্রিয়া কি হবে সেটা একটা বিশাল বিষয় ছিল। সেই জায়গা থেকে অনেক ভেবে চিন্তে দীপ্র নিজের মনের কথা জানাল। কুহু নির্বিকার ভাবে শুনল। তারপর, তারপর দূরে সরে চাইল। তবে দীপ্র, দীপ্র সেটা হতে দিল না। দু হাতে আগলে নিল ওকে। বোঝাল সব ঠিক হবে। সব ঠিক হতেই হবে। ভরসা দিল। কুহুকে নিজের মনের সাথে মানিয়ে নেয়ার সবটুকু সময় ও দেয়া হবে। অতঃপর মেয়েটি রাজি হলো। খুব সহজে, মসজিদে তিন কবুলের মাধ্যমে বিয়েটা হলো। কবুল বলার পর, দীপ্র ভেবেছিল সবটা সে জিতে নিল। আসলেই সে জিতে নিল। কিন্তু এই জিতে যাওয়ার পর, একটা ঝড়ের আগমন যে হতে পারে সেটা ও জানত। তবে তার তীব্রতা এভাবে প্রকশ পাবে, সেটা ওর ধারণার বাহিরেই ছিল। আয়ানা কিংবা আবিদা, দুজনের আচরণ ও আগে ভাগেই বুঝতে পারেনি। ভেবেছিল আয়ানা সহজ ভাবে সব সামলে নেবে। কিন্তু তার কোনোটাই ঘটল না। মাঝ থেকে কুহুকে আরো বেশি কষ্ট পেতে হলো। দীপ্রর মাথা কাজ করে না। রাগ হয়। রাগের বসে ব্রিজের রেলিংয়ে ধুম করে আঘাত করে বসে। আর সেটাই কাল হয়। হাত ফেঁটে লাল তরল নেমে আসে। দীপ্র দুটো চোখ দুটো বন্ধ করে। সঙ্গে সঙ্গে ভেসে উঠে কুহুর মুখশ্রী।

চলবে…
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply