Golpo romantic golpo প্রণয়ের রূপকথা

প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৫৫


প্রণয়ের_রূপকথা (৫৫)

বসার ঘরে নীরবতা। বাচ্চা থেকে বুড়ো সবাই উপস্থিত। তাদের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে দীপ্র আর কুহু। মাত্রই ফিরেছে তারা। আয়ানার ঘুম ভেঙেছে দেরিতে। গতকাল সবটা মাটি হওয়াতে ঘুম হচ্ছিল না। ভোরের দিকে ঘুমিয়েছে। সেই জন্যই লেট হলো। ও চোখে মুখে হাত বুলাতে বুলাতে নামছিল। সহসাই ওর চোখ গেল বসার ঘরে। সবাই এভাবে জড়ো হয়ে আছে কেন? এই প্রশ্নটি মাথায় আসতে না আসতেই দীপ্রর কণ্ঠটা বেজে ওঠল। ও বলল,”সরি, তোমাদের চিন্তায় রেখেছিলাম। ইচ্ছে করেই কল রিসিভ করিনি।”

“ইচ্ছে করে করোনি মানে?”

শুধালেন আবিদা। তার মাথা তপ্ত। কুহুকে নিয়ে দীপ্র বের হয়েছিল। এটা ভাবতেই তো মনটা বিষিয়ে যাচ্ছে। তার কথার বিপরীতে দীপ্রর সহজ জবাব।

‍”গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল চাচি। কল রিসিভ করার থেকে ওটা বেশি প্রয়োজন ছিল।”

এবার মুখ খুললেন আনোয়ার। তিনিও মনে মনে বেশ একটা আশঙ্কায় আছেন। রিস্ক নিতে চাচ্ছেন না আর। তিনি বললেন,”যাক গে এসব কথা। আমি একটা বিষয় বলতে চাচ্ছিলাম। ভাইজান….

তিনি চাইলেন ভাইয়ের দিকে। দবীর ছেলের মতিগতি বুঝে ওঠতে পারছেন না। ছেলেকে তার বিশ্বাস হচ্ছে না। ও ঠাণ্ডায় মাথায় যা তা করে ফেলে। যেমনটা ঘটেছে রাত্রিকে নিয়ে। আনোয়ার ভাইয়ের দিকে এগোলেন। বসলেন পাশে।

“ভাইজান, রাত্রি তো যা করার করেই ফেলল। ওর কথা বাদ। এখন আমার মনে হয়, একটু শান্তি প্রয়োজন। আবিরের বিয়েটার ও যে কি হবে, তা বোঝা যাচ্ছে না। আমরা দীপ্রর বিয়ে নিয়ে ভাবতে পারি না?”

দবীর কিছু বলার পূর্বেই দীপ্র বলল,”চাচ্চুর সাথে আমি এক মত।”

ওর কথায় বসার ঘরের সবার চোখ এদিকে নেমে এল। আয়ানা তখন ঘটনা একটু একটু করে বোঝার চেষ্টায় আছে। বাবার এই কথাতে তার মনের ভেতর প্রজাপতি উড়তে লাগল। এতদিনে তার বাবা একটা কাজের মতন কাজ করতে চলেছে। ও খুশি মনে এগিয়ে এল। দীপ্রর পাশে কুহু দাঁড়িয়ে। মাথাটা নামিয়ে রাখা। ওর মেজাজ খারাপ হচ্ছে। তবে ও খারাপ হওয়া মেজাজকে শান্ত করল। আর একটু সময়। তারপরই দীপ্র তার জন্য বরাদ্দ হবে। দবীর এখনো কোনো জবাব দেননি। আনোয়ার দীপ্রর থেকে এমন কথা শুনে খুশি হলেন বটে। উঠে এলেন। দীপ্রর বাহুতে হাত রেখে বললেন,”বাহ, আমি খুশি হলাম এই জবাবে। তবে বিয়ে নিয়ে….

আনোয়ারকে মাঝ পথেই থামালো দীপ্র। বলল,”চাচ্চু, তোমাদের কষ্ট আমি একটু কমিয়ে দিয়েছি।”

আনোয়ারের মুখে তখনো হাসি। তিনি ওভাবেই হাত রেখে শুধালেন,”কষ্ট কমালে, কীভাবে?”

“বিয়ে করে।”

পুরো বসার ঘরে একটা বোম পড়ল যেন। সকলের চোখ হলো বড়ো বড়ো। কেউ কোনো কথা বলতে পারল না। দবীর নড়েচড়ে উঠলেন। দীপ্র পুনরায় বলল,”বিয়ে করেছি কুহুকে। সরি তোমাদের জানাতে পারিনি।”

সরি! সামান্য সরি? দীপ্র এইটুকু বলে ফেলল এত সহজে? এদিকে কুহুর হাত পা শীতল হবার জোগাড়। ও নড়তেও পারছে না। চুপ করে আছে। ভয় হচ্ছে। কী ঘটে গেছে ভাবতেই তো মস্তিষ্ক জ্যাম লাগছে। আর এদিকে দীপ্র ভাই এত শান্ত। কীভাবে? কুহুর মাথায় আসে না। ও ওভাবেই থাকে। সকলের নজর বাঁচিয়ে, মাথা নত করে। সহসাই একটা শিষ বেজে ওঠল। সবার নজর পড়ল সেদিকে। জেসমিন তুমুল উল্লাস নিয়ে বলে উঠল,”ভাইজান এক্কেবারে সেই একখান কাম করছেন। শীত আইতে না আইতেই….

পাশেই ছিল আয়ানা। ওর কথা শেষ করার পূর্বে ধমকে উঠল। এতে করে জেসমিন দমে গেল। সকলের চোখ এদিকেই। ধমক খেয়ে জেসমিন দাঁত কেলিয়ে হেসে বলল,”তওবা, তওবা, আমি কিন্তু ওডি বুঝাইনি। মানে আমি তো….

আবিদা মেয়ের দিকে তাকালেন। আয়ানাকে অন্য রকম লাগছে। তিনি বুঝলেন জেসমিনকে সরানো প্রয়োজন। না হলে যখন তখন আক্রমণের শিকার হবে। তিনি তৎক্ষণাৎ বললেন,”জেসমিন তুই যা।”

“কিন্তু খালাম্মা..

“তুই যা জেসমিন।”

জেসমিন আর দাঁড়ালো না। চলে গেল বড়ো বড়ো কদমে। ও আর একটু অপেক্ষা করলে আয়ানা নিশ্চিত চড়টা বসাত। আবিদা স্বামীর পানে তাকালেন। কোনো কিছুই বুঝলেন না। ওভাবেই চেয়ে রইলেন। এবার মুখ খোলার প্রয়োজন বোধ করলেন দবীর। বসা থেকে উঠে দাঁড়ালেন।

“কুহু, তুই তোর ঘরে যা তো মা।”

কুহু বিনা বাক্যে চলে যেতে নিচ্ছিল। এটাই যে তার জন্য মঙ্গল। হাত পা যে শীতল হয়ে আছে। ও দোতলার দিকে যাবে তখনই আটকাল দীপ্র। বলল,”তোর ঘর মানে, আমার ঘরে যেতে বলেছে। বুঝেছিস?”

কুহু দাঁড়িয়ে রইল হাবুলের মতন। মুখ থেকে কোনো রা কাটল না। দীপ্র বাবার দিকে চেয়ে বলল,”একটু অপেক্ষা করো বাবা। ওকে আমি পৌঁছে দিয়ে আসছি।”

দবীর কথা বলতে পারলেন না। চোখ মুখ কঠোর করেই রাখলেন। দীপ্র এমন আচরণ করছে যেন কুহু বাচ্চা! তিনি লম্বা করে শ্বাস নিলেন। সকলকে পিছে ফেলে কুহুর পাশাপাশি এল দীপ্র। বলল,”আয়। তোর ঘরের সব কিছু আমাদের ঘরে শিফট করে নিব।”

আমাদের ঘর? কুহুর হৃদয়ে একটা ঝড় বয়ে গেল। দীপ্র ভাই কত সহজেই তার ঘরকে ওর ঘর হিসেবেও ভাগ করে নিল। এই প্রথম কুহু বোধহয় ভরসা পেল। দম নিল বড়ো করে। দীপ্র আবারো ডাকল,”আয়।”

কুহু পথ আগাতে পারল না। দীপ্র ওর হাত খানা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। নড়েচড়ে উঠল কুহু। এবার পথ চলতে পারল। যেন এই ভরসাটাই দরকার ছিল। যা দীপ্র ভাই পূরণ করে দিল। ও দীপ্রর পিছু পিছু এগোচ্ছে। আর সকলের চোখ এদিকেই। বিস্মিয় নয়ন জুড়ে। এদিকে জেসমিনের মনটা খুশি খুশি। এই রকম করে বিয়ে সে সিনেমাতে দেখেছে। বাস্তবে দেখার সৌভাগ্য হবে তা কখনো ভাবনাতেও আসেনি। ভারী আনন্দ লাগছে তার। ও বড়ো করে নিশ্বাস নেয়। আড়ালে থেকে বুকে হাত দিয়ে বিড়বিড় করে”এই না অইল বেডা মানুষ। শীত আইতে না আইতেই কামডা কইরালায়ছে। তাও কি না নিজের চাচাতো বোনরে। তার মানে রোমান্সটাও…

ওর বিড়বিড় শেষ হলো না। তার পূর্বেই ডেকে উঠল আয়ানা। ডাক পেয়ে ছুটল জেসমিন। ও যাওয়া মাত্রই ঠাস করে চড় পড়ল গালে। জেসমিস গালে হাত দিয়ে বলে উঠল,”এইডা কি হইল আফা। কুহু আফারে বিয়া করল দীপ্র ভাইজান। আর চড় খাইলাম আমি।”

রাগে গজগজ করছে আয়ানা। ও কটমট করে বলল,”তোকে মা এখানে কেন এনেছে জেসমিন? তুই আমার লোক নাকি ওদের? আর আমার দু চোখের সামনে আসবি না জেসমিন। দূর হ বলছি।”

জেসমিন বুঝল আয়ানার মাথায় সমস্যা। এর আগেও মনে হোতো। কিন্তু আজ ও একেবারে নিশ্চিত হয়ে গেল। না হলে দীপ্র-কুহুর বিয়েতে সে কেন চড় খেল? ও আর দাঁড়াল না। দ্বিতীয় চড় খাওয়ার ইচ্ছে নেই। তাই চলে গেল স্থানটি থেকে।

হোটেলে ঝামেলা হয়েছিল। সেই জন্য ঘুম থেকে ওঠেই চলে গিয়েছিলেন ববিতা। কুহু কিংবা কণা, কারো সাথেই কথা বলে যেতে পারেননি। ভেবেছিলেন মেয়ে দুটো ঘুমাচ্ছে। তাই বিরক্ত না করাই ভালো। সকাল হতেই নাশতার টেবিলে হলো বিপত্তি। কুহু আর দীপ্রকে পাওয়া যাচ্ছিল না। একসাথে না পাওয়াতে সন্দেহ ছিল দুটিতে এক সঙ্গে আছে। কিন্তু সমস্যা হলো কল করেও দুজনের কাউকেই পাওয়া যাচ্ছিল না। সবাই মোটামুটি চিন্তাতেই ছিলেন। না বলে কয়ে বাড়ির দুই ছেলে মেয়ে হাওয়া। তার ওপর গতকাল থেকে কম ঝামেলা তো চলছে না। একটা অস্থিরতা চলছিল। সবাই চিন্তায় বসেছিল বসার ঘরে। ওমন সময় বাড়িতে উপস্থিত হলো দুজনে। সকাল থেকে এখন অবধি ঘটে যাওয়া সব ঘটনাই ববিতার নিকট অজানা। তিনি কাজ করছিলেন। মাত্রই ঝামেলাটা মিটিয়ে বসেছেন। সাগর ছুটে আসছে। ওকে দেখেই ববিতা চ্যাঁচালেন।

“আস্তে আয়। এভাবে ছোটাছুটি করছিস কেন? তোকে নিয়ে তো সমস্যার শেষ নাই সাগর। কোনো কাজই ঠিক মতন করিস না। আমি না এলে তো বিশাল ঝামেলা করে ফেলছিলি।”

সাগর এসে হাঁপাতে লাগল। হাঁপানো শেষ হতেই বলল,”কাকি, কাম তো এক খান হইছে।”

সাগরের প্রতি এমনিতেই বিরক্ত ববিতা। কোনো কাজের ঠিক নেই। সব কাজেই ঝামেলা থাকে। তিনি ওর কথা সেভাবে কানে নিলেন না। নারকেল গুলো সব ঠিক ঠাক আছে কি না তা দেখতে লাগলেন। শীতের আগমনী বার্তা পাওয়া যাচ্ছে। এই সময়ে পিঠার ব্যবসা লাভজনক। তাই নারকেল আনিয়েছেন বস্তা ভরাট করে।

“ও কাকি। কথাটা শুইনেন।”

“বল। শুনছি আমি।”

“দীপ্র ভাইজান তো বিয়া করছে।”

এ কথায় ববিতা থামলেন। বিরক্তি নিয়ে বললেন,”সকালে ঝামেলা করছিস। এখন রোদ মাথার ওপর উঠতে না উঠতেই মাথার পোকা আবার নাড়া দিয়ে উঠছে? তোর কি আর কোনো কাজ নেই সাগর?”

“আহ কাকি। কথাটা বিশ্বাস করতেছেন না।”

“আচ্ছা করলাম বিশ্বাস। তা কাকে বিয়ে করল দীপ্র?”

“আবার কারে? কুহু আপারে।”

ববিতার হাত থেমে গেল। তিনি থমকে গেলেন। সাগর হতাশ হয়ে বলল,”বিশ্বাস করলেন না। আমি মাত্রই খবর পাইছি। জেসমিন আছে না? আপনাগো বাসায় থাকে এখন। অয় তো আমার গার্লফ্রেন্ড হয়। বেচারি দুঃখ কইরা বলতেছিল। বিয়া করল দীপ্রভাই আর কুহু আফা। অথচ আয়ানা আপার হাতে চড় খাইল অয়! কন তো এটা কোনো কাম হইল?”

চলবে…
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply