প্রণয়ের_রূপকথা (৫৪)
দেওয়ান বাড়িতে মাত্রই ঝড় বয়ে গেল। রাগীবের বাড়ির লোকজন যা তা শুনিয়ে গিয়েছে। এতটা অপমান বোধহয় এর আগে কারো থেকে পায়নি দেওয়ান’রা। কারো সাহস হয়নি। কিন্তু আজ হয়ে গেল। এর নেপথ্যে রাত্রি মূল হলেও, একটা বিশাল ঝড় এসে পড়ল কণার উপর। আর এটা শুরু করলেন আবিদা। তিনি কণাকে দোষ দেওয়ার পর, একে একে বাকি’রা কথা শুরু করলেন। কণা বুঝল তার কিছু ভুল হয়েছে। সে অতি আতঙ্কে, সকলের মাঝেই কথাটা বলে দিয়েছে। ও এই প্রথম চুপ রইল। একটা কথাও বলল না বিপরীতে। বকা খেয়েও না। অথচ দস্যি মেয়ে সে। কাউকে এক চুল ছাড় দিয়ে রাজি নয়। কণার এই মুখশ্রী, এই মিইয়ে যাওয়া কুহুকে আঘাত করে চলেছে। তবে, সান্ত্বনা দেয়ার মতন এখন সময় সুযোগ যে নেই। ওর মাথাটা ভনভন করছে। রাত্রিপু এটা কি করল। কি করল এটা। এই শেষ সময়ে এসে, কুহু আর ভাবতে পারল না। ও চাইল দীপ্রর দিকে। দীপ্র নির্বিকার। যেন এসব হওয়ারই ছিল। এরই মধ্যে বাড়ির সবাই পুলিশে যাওয়ার চিন্তা করে নিয়েছে। রাত্রি একটা চিরকুট দিয়েছে। বলেছে সে পালাচ্ছে। কিন্তু কার সাথে সেটা বলেনি। দেওয়ান’রা উত্তপ্ত মস্তিষ্ক নিয়ে এসব ভাবতে ভাবতে পুলিশে কল করতে যেতেই এই ঘটনায় প্রথমবার মুখ খুলল দীপ্র। ও বলল,”রাত্রি যথেষ্ট এডাল্ট। ও নিশ্চয়ই নিজ ইচ্ছেতেই পালিয়েছে।”
“তুমি কি বলতে চাচ্ছ দীপ্র?”
বললেন দবীর। দীপ্র মুখের ভঙ্গি কঠোর রেখে বলল,”এটাই যে, রাত্রি পালিয়েছে। কিডন্যাপ হয়নি যে ওকে খোঁজার জন্য পুলিশ লাগবে।”
দবীর যেন ছেলের চোখ মুখে কিছু একটা খুঁজে পেলেন। এগিয়ে এলেন ছেলের কাছে। দীপ্র নড়ল না। ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইল।
“আমার সাথে আসো দীপ্র।”
বাবার সাথে চলে গেল দীপ্র। সালমা সোফায় বসে কেঁদে চলেছেন। তিনি ভাবতেও পারছেন না রাত্রি এমন একটা কাজ করেছে। এদিকে আবির পড়েছে আরেক ফ্যাঁসাদে। হেরার বাড়িতে কীভাবে যেন খবর পৌঁছে গেছে। হেরার পরিবার এমনিতেই এসব বিষয়ে খুব কঠোর। শুধুমাত্র দেওয়ানদের জৌলুসের কারণেই সম্পর্কটি মেনে নিয়েছেন। কিন্তু সেই জৌলুসে যদি কালি পড়ে, তখন তো ঘটনা ভিন্ন ঘটবে। আবিরের মাথা কাজ করে না। ও হেরাকে শান্ত হতে বলে ফিরল বসার ঘরে।
“উফ, রাত্রি, রাত্রি, রাত্রি। ও কি করল এটা!”
সবথেকে বেশি ক্ষতি তো হয়েছে আয়ানার। ওর স্পেশাল দিনটা পুরো ঘেঁটে গেল। ও রাগে ক্ষোভে চিৎকার করে ওঠল এবার।
“সব ঝামেলা আমার বেলাতেই হয়। এই জন্যই এই বাড়ি আমার ভালো লাগে না। একদমই না।”
চেপে রাখা রাগ, ক্ষোভ প্রকাশের পর সকলে কেমন চোখে যেন ওর দিকে তাকাল। এতদিন আয়ানা যে রূপ ধরে রেখেছিল, তার বিপরীত রূপটা হজম হলো না কারোর। তবে কেউ কিছু বলল না। কিছু বলার নেই ও আসলে। পরিস্থিতি যে ঘোলাটে। আয়ানার তখনো খেয়াল নেই। ও আরো কিছু বলতে নিতেই আবিদা এসে আটকালেন। ফিসফিস করে বললেন,”কী হচ্ছে আয়ানা। তুমি ভুলে যাচ্ছ এখানে সবাই আছে।”
“আমার সবটা শেষ করে দিল। সবটা শেষ। এই বাড়ির কাউকে সহ্য হচ্ছে না আমার।”
“এখন চুপ থাকো। তোমার চাচা আর দীপ্র আসছেন।”
দীপ্র আর দবীর বসার ঘরে উপস্থিত হলেন। ওনাদের মাঝে কি কথা হয়েছে কেউ জানে না। দবীরের চোখ মুখ গম্ভীর।
“এখন সবাই মাথা ঠান্ডা করো। চারপাশে যা ছড়ানোর ছড়িয়ে গিয়েছে। আর বাড়িও না।”
বললেন দবীর। তার কথায় সবাই একটু বোধ ফিরে পেল। তবে আহামরি পরিবর্তন দেখা গেল না।
“সেটাই। সবাই চুপ থাকো তো। কণা, তুই যদি ওভাবে না বলতি তাহলে এটা হোতো না। কোনো জ্ঞান কি নেই?”
আবিদার কথার বিপরীতে দীপ্র বলল,”ও ছোটো। এত বুঝে করেছে? আর কোনো না কোনো ভাবে ঘটনা ছড়াতই। ওকে দোষ দিয়ে লাভ নেই চাচি।”
আবিদা থামলেন। এদিকে কণার চোখ থেকে দু বিন্দু পানি নেমে গেল। মা ও তাকে বকা দিয়েছে। দীপ্র ওর মাথায় হাত বুলিয়ে কুহুকে ইশারা করল। কুহু এসে কণাকে ভেতরে নিয়ে গেল।
বাড়িটা পুরো স্তিমিত হয়ে গেছে। কুহুর মনটা উদাস। রাত্রিপু যে কি এক কাজ করে বসল। এর জন্য অনেকটা ভোগান্তি যাবে। ওর ভালো লাগছে না। মাথা কাজ করছে না। উদাস লাগছে। আবার নিজের কথাও মনে পড়ে যাচ্ছে। সেও তো এর কাছাকাছি ঘটনা ঘটাতে যাচ্ছিল। গায়ে কাটা দিল যেন। ভাগ্যিস দীপ্র ভাই সেদিন আটকেছিল। মনে মনে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল কুহু। এই মানুষটার প্রতি কৃতজ্ঞতার পাল্লা এত ভারী হয়ে যাচ্ছে। কুহু জানে না কীভাবে ও শোধ দিবে। কিংবা দিতে পারবে। ও এসবই ভাবছিল নিজের ঘরে বসে। দরজায় টোকা পড়ল। ও মাথা তুলে চাইল। দেখল দীপ্র ভাই এসেছে।
“রেডি হয়ে নে।”
এ কথায় ভারী অবাক হলো কুহু। এখন ভোর। বাড়িতে কেউ জেগে ওঠেনি। আবার বলা চলে কেউ তো ঘুমাতেও পারেনি। ওভাবেই সময় কেটে গিয়েছে।
“হাতে সময় কম কুহু।”
“রেডি হব কেন?”
“বের হব।”
“কোথায়?”
“গেলেই দেখতে পাবি। এখন কথা বাড়াস না। রেডি হয়ে নে।”
কুহু আর কথা বাড়াল না। গতকালের পোশাকই শরীরে। তাই শুধু এলোমেলো চুল গুলো ঠিক করে নিয়েই বের হয়ে গেল। গাড়ি চলছে। ভোরের হাওয়া শরীরকে হীম করে চলেছে। মুখটা শুকিয়ে আছে একদম। দীপ্র শুধাল,”চা খাবি?”
মনটা এত সময় চা-চা, না করলেও চায়ের কথা শুনে এখন চা,চা করছে। কুহু মাথা নাড়াল। দীপ্র একটু এগিয়ে গাড়ি থামাল। টং দোকানে তখন চায়ের পানি বসেছে সবে। এখনো মানুষ জন আসেনি। লোকটা দাঁত কেলিয়ে হাসল। প্রথম খোদ্দের বলে কথা। যত্নটাই আলাদা। দীপ্র দু কাপ চা দিতে বলে দোকানের সামনে রাখা বেঞ্চে বসল। কুহু তখন অন্য পাশ হয়ে দাঁড়িয়ে। এত সকালে অনেকদিন বের হওয়া হয়নি তার। এই পরিস্থিতিতেও আরাম লাগছে। পাশেই বিশাল খেতের পর খেত। ফসলে ভরাট। শিরশির বাতাসটা বাহুতে স্পর্শ করতেই কেঁপে ওঠে কুহু। পেছন ফিরে দেখে ওর ঠিক পেছনে, এক হাত দূরে দীপ্র দাঁড়িয়ে। হঠাৎ ঘুরে মানুষটার বৃহৎ বক্ষ দেখে সামান্য ভরকেছে বটে। ও এবার চোখ তুলে চায়। বলে দুজনের দৃষ্টি মিলে যায়।
“চা।”
ওয়ান টাইম কাপটা বাড়িয়ে দেয় দীপ্র। কুহু সেটা হাতে তুলে নেয়। নিঃশব্দে চুমুক বসায়।
“রাত্রিপু’রা কোথায় আছে, সেটা জানেন আপনি?”
“জানি।”
“সেখানে যাচ্ছি আমরা?”
“না।”
“তবে?”
দীপ্র জবাব দেয় না। কুহুও আর কিছু শুধায় না। চায়ের কাপে আরো একবার চুমুক বসায়। আবারো শীতল হাওয়া এসে শরীর স্পর্শ করে যায়। কম্পন ধরায় শরীরে। যেন বলে যায় শীতের আগমনের কথা। ওরা চা খাওয়া শেষে পুনরায় গাড়িতে ওঠে বসে। গাড়ি চলতে থাকে গন্তব্যহীন ভাবে। খানিকবাদে দীপ্র ডাকে।
“কুহু।”
দীপ্রর নাম ধরা ডাকটা বরাবরই আদুরে। এত আবেগ মিশে থাকে তাতে। কুহু দৃষ্টি ফেরায়। দীপ্র না তাকিয়েই বলে,”আমাকে ঘৃণা করিস?”
হঠাৎ এহেন প্রশ্নে কুহু জবাব হারায়। ঘৃণার কথা কেন আসছে এখন? ও বুঝতে পারে না। চেয়ে থাকে বিস্মিত হয়ে। দীপ্র মৃদু হাসে।
“ঘৃণা তো করতি একটা সময়, তাই না?”
একটা অস্বস্তি গলায় এসে আটকায়। কুহু হাত কচলাতে, কচলাতে বলে,”করতাম না। আমি আসলেই ভুল ছিলাম। কিন্তু কখনো আপনাদের কারো খারাপ চাইনি। আমার মনে হয়েছিল চাচা’রা স্বার্থপর। স্বার্থের টানে এসেছে। হয়তো কোনো….
কুহু আটকে যায়। ওর অর্ধেক কথাটা পুরো করে দীপ্র। বলে,”হয়তো কোনো স্বার্থের টানেই আমাদের বিয়ে হতে যাচ্ছিল, তাই ভেবেছিস?”
কুহু বড়ো করে নিশ্বাস নেয়। হ্যাঁ তাই। তাই ভেবেছিল ও। ওর ভেতরটা কেমন করে ওঠে। দীপ্র পুনরায় বলে,”তুই ঠিক ছিলি কুহু। একদম ঠিক ছিলি।”
এ কথার মানে বুঝে না কুহু। অবাক করা নয়নে তাকাতেই, জোরালে ভাবে ব্রেক কষে দীপ্র। কুহু ঝুঁকে যেতে নিতেই নিজ হাতের সাহায্যে আটকে নেয় দীপ্র। তারপর ওর দিকে অনেকটা ঝুঁকে গিয়ে বলে,”স্বার্থ ছিল কুহু। স্বার্থ ছিল। স্বার্থ ছিল ভালোবাসার। তোকে ভালোবাসি। কীভাবে, কখন, ভালোবেসেছি তা টের পাইনি। কিন্তু তোকে হারানোর ভয়, হারানোর ভয় সব সময় পেয়েছি। ছোট থেকেই পেয়েছি। সেই জন্যআ এতটা আদরে রাখতাম তোকে। সবার থেকে বেশি আদরে। ভালোবাসা তো নিয়মহীন গন্তব্য। কোনো নিয়ম করে কি ভালোবাসা যায় বল?”
চলবে….
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি
Share On:
TAGS: প্রণয়ের রূপকথা, ফাতেমা তুজ নৌশি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪২
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৬
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩৮
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪৬
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১৬
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১২
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩২
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১৩
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪১