Golpo romantic golpo প্রণয়ের রূপকথা

প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪৭


প্রণয়ের_রূপকথা (৪৭)

কুহুর বলা কথায় একটা বিশাল ধাক্কা লাগল আয়ানার। ও সবসময় ইঙ্গিতে দীপ্রকে নিজের অনুভূতি বুঝিয়েছি। অপেক্ষায় ছিল বাবা বিয়ের বিষয়ে কথা বলবেন। কিন্তু সেদিকেও তেমন গতি নেই। ও তাই ঠিক করেছে দীপ্রকে প্রপোজ করবে। সেসব নিয়েই পরিকল্পনা চলছিল। ওমন সময় আবিদা এসে বললেন,”তুই কী করতে চাচ্ছিস বল তো আমায়।”

আবিদার কথায় ওর হাসি হাসি মুখটা গোমড়া হলো। কোনো জবাব দিল না ও।

“কী করতে চাচ্ছিস আয়ানা?”

“যাই করি, তাতে তোমাদের কী?”

“আমাদের কী মানে!”

“তোমাদের একটা বিষয়ে কথা বলতে বলেছিলাম। তোমরা সে কথা শুনেছ? ইনিয়ে বিনিয়ে আমায় শুধু আটকে রেখেছ। আমি এসব আর নিতে পারব না।”

আবিদা মেয়ের দুঃখটা বুঝেন। ওদিকে স্বামীর বিষয় খানাও ধরতে পারেন। আনোয়ার বরাবরই স্বার্থপর ধাঁচের। স্বার্থ ছাড়া কখনো কিছুই করেননি। তাই বলা চলে, তার সম্পর্কে একটা বিরূপ ধারণা সবার মাঝেই আছে। এমন অবস্থায় তিনি কীভাবে দীপ্রর সাথে আয়ানার বিষয়টি বলবেন তা বুঝতে পারছেন না।

“শোনো মা।”

আবিদার ধ্যান ফিরে। তিনি তাকান মেয়ের পানে। আয়ানা বসা থেকে দাঁড়িয়ে গিয়েছে।

“আমি ঠিক করেছি দীপ্র দাদাভাইকে প্রপোজ করব।”

এ কথায় আবিদা একটু নড়েচড়ে বসলেন। সত্যি বলতে আয়ানা যতটা ছেলেমানুষ, তিনি তো ততটা ছেলেমানুষ নন। দীপ্র আয়ানাকে বোনের চোখে দেখে। ওদিকে কুহুকে, কুহুকে…..

তার ভাবনা বৃদ্ধির পূর্বেই আয়ানা একটা গিফট বক্স বের করল। খুব দামি একটা ঘড়ি আছে এতে। মায়ের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,”এটা নিয়েছি। ভালো হয়েছে না?”

“এটা তো অনেক দাম আয়ানা। টাকা পেলে কোথায়?”

“টাকা, আমার কাছে ছিল।”

“তোমার কাছে ছিল বলতে?”

“ডায়মন্ডের রিং কেনার জন্য টাকা নিয়েছিলাম না? ওটা না নিয়ে এটা নিয়ে এসেছি।”

এ কথায় আবিদা ভীষণ অবাক হলেন। আয়ানা রিংটা খুব পছন্দ করেছিল। কেনার জন্য মড়িয়া ছিল। এই তো কিছু দিন আগেই টাকাটা নিল। অথচ সেটা খরচ করল দীপ্রকে ঘড়ি দেয়ার জন্য! তিনি শুকনো একটা ঢোক গিললেন।

“ভালো হয়নি?”

শুধাল আয়ানা। আবিদা মেয়ের পানে চাইলেন। আয়ানাকে হাসি খুশি দেখাচ্ছে। ছোট থেকেই মেয়েটার সমস্ত শখ আহ্লাদ পূরণ করা হয়েছে। একটু খরুচে স্বভাবের ও বটে। কেনাকাটা করতে খুব ভালোবাসে। সেই আয়ানা, নিজের পছন্দের রিং না কিনে দীপ্রর জন্য উপহার কিনেছে। আবিদা আর ভাবতে পারলেন না। ওনার বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠল।

“আয়ানা।”

মায়ের ডাকে ফিরে চাইল আয়ানা। চোখে মুখে তখনো হাসি লেপ্টে।

“তুমি পছন্দের রিংটা কিনলে না?”

“হুম।”

“অথচ তুমি পছন্দের কোনো কিছু না নিয়ে কখনোই থাকতে না।”

আয়ানা হাসল। ঘড়ির বক্সটা হাতে তুলে নিয়ে বলল,”দীপ্রও তো আমার পছন্দের। তার কাছে ঐ রিং তো সামান্য মা।”

কুহুর ভেতরে একটা উদাসীনতা কাজ করছে। দীপ্র ভাইকে নিয়ে ওর অনুভূতি এখনো পরিষ্কার নয়। মানুষটা ওর প্রতি যে মায়া দেখিয়েছে, তারই প্রভাবে বুকের ভেতরটা আজকাল কেমন যেন করে। এটা হয়তো প্রণয়ে পড়ার আগ মুহূর্ত। কিন্তু বিপরীতে, আয়ানাপু। আয়ানাপু ও তো দীপ্র ভাইকে চায়। কুহু আসলেই দ্বিধার মধ্যে পড়েছে। ওর দিন দুনিয়া কেমন যেন লাগে। উদাসীনতা নিয়েই রাস্তার পথ ধরে ভার্সিটি থেকে বাড়ির পথে হাঁটছিল। ওমন সময় একটা গাড়ি এসে থামল। গাড়ির ভেতরে দীপ্র ভাইকে দেখা যাচ্ছে।

কুহু বড়ো করে নিশ্বাস নিল। দীপ্র নেমে এসে কুহুর বরাবর দাঁড়াল। এতে করে মেয়েটির নজর পড়ল দীপ্রর বুক বরাবর।

“হেঁটে বাড়ি যাচ্ছিস যে? রিকশা পাসনি?”

কুহু মিথ্যে বলল না। ও সত্যিটাই বলল,”পেয়েছি।”

“তবে?”

“হাঁটতে ইচ্ছে হলো।”

দীপ্র আশেপাশে তাকাল। জায়গাটা নির্জন। তার ওপর সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। ও মুখের ভঙ্গিমা কঠোর করল।

“এই রাস্তায় একা একা হাঁটবি না।”

কঠোর হওয়া কণ্ঠের বিপরীতে কুহু কিছু বলল না। দীপ্রই বলল,”গাড়িতে ওঠ।”

“হেঁটেই তো ভালো….

“ওঠতে বলেছি কুহু। এত না, না করিস কেন?”

শেষ বাক্যটায় কি যেন এক বেদনা মিশে। কুহু কথা বাড়াল না। গাড়িতে ওঠে বসল। দীপ্র বসল ওর পাশে। মানুষটার মেজাজ যেন আজ একটু বিগড়েই আছে।

কুহু আর দীপ্রকে একসাথে ফিরতে দেখে দবীর একটু নড়েচড়ে বসলেন। তিনি বসে ছিলেন বসার ঘরে। হাতে এক কাপ চা।

“জেবা, দীপ্রকে এক কাপ চা দাও।”

দীপ্র নাকোচ করতে বলল,”লাগবে না।”

“কেন? আজকাল চা ছেড়ে দিলে নাকি?”

“না। তবে এখন চাচ্ছি না।”

কুহু পাশেই দাঁড়িয়ে। দীপ্রর কথার টোন ওকে কেমন বিস্মিত করল। ও চেয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। তারপর বলল,”আমি আসছি।”

ও চলে যেতেই দবীর বললেন,”আমার সাথে আসো দীপ্র।”

দীপ্রর চোখ মুখ কঠোর হয়ে রইল। ছেলেকে নিয়ে দবীর এলেন ছাদে। মাত্রই সন্ধ্যার আজান পড়েছে। পরিবেশে পবিত্রতার হাওয়া। ফোঁস করে দম ফেললেন দবীর।

“তোমার সাথে সরাসরি কথা বলা উচিত দীপ্র। তুমি ছোট নেই। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কিছু বলতে চাচ্ছি না।”

দীপ্র একটু হলেও বিষয়টা বুঝতে পেরেছিল। দবীর তাকে কল করে যখন কথা বলার কথা বলল তখনই ও যা বোঝার বুঝে নিয়েছে। মনে মনে নিজেকে প্রস্তুত ও করল।

“তোমার চাচা, অনেকদিন ধরেই আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করছে। আমি বুঝেও সরাসরি কিছু বলিনি। আয়ানার বিষয়ে…

ভদ্রলোক কথা শেষ করার পূর্বেই দীপ্র বলল,”আই লাভ কুহু। আমি কুহুকে চাই। শুধু কুহুকে।”

দবীরের মস্তিষ্ক বলছিল এমন কিছু হবে। তবে ছেলে যে এভাবে সরাসরি মুখের ওপর বলে দেবে তা তিনি ধরতে পারেননি। এবার চোয়াল শক্ত করলেন তিনি।
“যদি কুহুকেই চাও, তবে বিয়েটা ভেঙেছিলে কেন? কেন সবার সামনে ওমন কান্ড করেছিল? জবাব আছে দীপ্র?”

“আছে। আমার মনে হয়েছিল সময় প্রয়োজন। এভাবে রাতারাতি বিয়ের আয়োজন করে, বিয়ে হয়ে যাওয়াটা আমার ঠিক মনে হয়নি।”

“এটা আগেও বলতে পারতে তুমি। সেটা না করে বিয়ের ঠিক আগ মুহূর্তেই কেন বললে?”

এ প্রশ্নের কোনো জবাব এল না। দবীর মাথা গরম করলেন না। তিনি শান্ত ভাবেই বললেন,”তুমি একটা নয়, অনেক গুলো অঘটন ঘটিয়ে ফেলেছ দীপ্র। তোমার চাচা
চাচ্ছে আয়ানার সাথে তোমার বিয়ে হোক। অন্যদিকে আয়ানা, ও তো তোমাকে সেই শুরু থেকেই….

এই জায়গায় কথা বলার প্রয়োজন মনে করল দীপ্র। বলল,”এক পাক্ষিক তো কিছু হয় না বাবা। আয়ানা চাইলেই তো হবে না। আমার মতামতের গুরুত্ব আছে। নাকি নেই?”

দবীর ছেলের কথা বুঝলেন। ভালো মতন চাইলেন। দীপ্রর চোখে মুখে দৃঢ়তা। তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন,”আর যদি, কুহু তোমাকে না চায়? তখন, তখন কী করবে দীপ্র? এই এক পাক্ষিক কিছু হয় না বলে মেনে নিতে পারবে তো?”

সময় নিল দীপ্র। স্থান ত্যাগের পূর্বে বলল,”কুহু চাইবে। ও চাইবে। ওকে চাইতেই হবে। চাইতেই হবে বাবা। এর জন্য দুনিয়া উলোটপালোট করতে হলে আমি সেটাও করব।”

ছাঁদ থেকে নেমে দীপ্র যখন নিচে নামতে যাচ্ছিল তখনই কুহুর সাথে দেখা। কুহু ড্রেস বদল করে নিয়েছে। চোখাচোখি হলো দুজনের। দীপ্রর চোখ দুটো দেখে কুহুর একটু ভয় ভয় লাগল। ও পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলেই দীপ্র ডেকে ওঠল।

“কুহু।”

কুহু জবাব না দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। দীপ্রই এল ওর কাছে। সামান্য দূরত্ব দুজনের মাঝে। পুরুষটির শরীর থেকে আসা পারফিউমের ঘ্রাণ মেয়েটির নাকে এসে স্পর্শ করে চলেছে।

“কিছু বলতে চেয়েছিলেন দীপ্র ভাই?”

দীপ্র শুরুতেই উত্তর করল না। কয়েক সেকেন্ড চেয়ে রইল ওর পানে। তারপর বড়ো করে দম নিয়ে বলল,”না।”

চলবে….
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply