প্রণয়ের_রূপকথা (৪৬)
অরণ্যকে রাত্রির চরম নির্লজ্জ মনে হয়। ছেলেটা এ বাড়িতেও চলে এসেছে। মনে হচ্ছে এই বিয়ে খেতেই সে দেশে এসেছিল। রাত্রি এক মনে ওকে গালিগালাজ করছিল। তখন আবির এসে ওর চুল টেনে ধরল।
“ভাইয়া, লাগছে তো।”
“তখন থেকে দেখছি বিড়বিড় করছিস। কী বলছিস ওদের দিকে তাকিয়ে?”
বসার ঘরে অরণ্য আর দীপ্র বসা। ওদের থেকে দু হাত দূরে বসা কুঞ্জ। এই তিন মানবকেই আপাতত দেখা যাচ্ছে। একটু আগে অবশ্য আরো অনেকেই ছিল।
“কোথায় কী বিড়বিড় করলাম?”
“আমি স্পষ্ট দেখেছি।”
“তোমার চোখে সমস্যা হয়েছে। ডাক্তার দেখাও। ও হ্যাঁ, ডাক্তার কেন দেখাতে হবে,তোমার বউই তো ডাক্তার।”
আবির একটু থিতু হলো। হেরার সাথে সম্পর্কটা বেশ অনেক গুলো বছরের। মেয়েটি তখন বাচ্চা। সবে স্কুল শেষ করছে। কলেজে ওঠেই আবির নামক মায়ায় পড়ে। আবিরই তার প্রথম প্রেম। অন্যদিকে আবিরের প্রথম প্রেম না হলেও হেরার প্রতি আলাদা মায়া কাজ করত ওর। ওর আগের প্রেমিকারা সমবয়সী কিংবা কাছাকাছি বয়সের ছিল। হেরা সেখানে অনেকটাই ছোট। তার ওপর মাত্র কলেজে ওঠেছে। ওর বাচ্চামিটা আবিরকে আর্কষণ করেছিল সবথেকে বেশি। মেয়েটি দিনে একাধিক বার রাগ করত। সেই রাগ আবির ভাঙাত। ও বিরক্ত হোতো না। বরং সময় নিয়ে, যত্নের সাথে সব করত। মেয়েটির কিশোরী বয়সের যত্ন তো আবিরেরই নেওয়া। এই তো কিছু বছর পূর্বে, মেডিকেল পরীক্ষা দিয়ে এসে সে কি কান্না করেছিল। কারণ তার মনে হয়েছে পরীক্ষা ভালো হয়নি। আবিরের কত চেষ্টার পর হেরার কান্নাকাটি থেমেছিল। সেসব ভেবে আবিরের ভেতরটা স্থির হয়ে রইল। ও ডুবে রইল সেই ভাবনায়। আর এই সুযোগটাই কাজে লাগিয়ে পালাল রাত্রি। ওর দৌড়ে পালানোর শব্দে ঘুরে তাকাল অরণ্য আর দীপ্র। আবিরের ও ধ্যান কাটল। দীপ্র ডাকতেই আবির ওদের সঙ্গী হলো।
ও বাড়ি থেকে লোকজন আসার ঠিক আগ মুহূর্তেই অরণ্যর সাথে দেখা হলো রাত্রির। ছেলেটাকে দেখেই রাত্রির ভেতরটা হু হু করে ওঠল। ও পাশ কাটিয়ে যেতে নিয়েও পারল না। বিড়বিড় করে ওঠল।
“নির্লজ্জ একটা।”
সেটা শুনতে পেয়ে অরণ্য বলল,”কী বললে তুমি?”
“যা বলেছি, বলেছিই।”
“নির্লজ্জ বলেছ রাইট?”
“হুম। তাই বলেছি। পৃথিবীতে একমাত্র তুমিই আছ, যে প্রেমিকার বিয়ে খেতে এত উৎফুল্ল হয়ে আছে।”
এ কথায় অরণ্য হাসল। কিছুটা এগোল। রাত্রিও চোখে চোখ রাখল।
“তুমি আমার প্রেমিকা?”
এ প্রশ্নের জবাব দিল না রাত্রি। অরণ্যই বলল,”তুমি প্রেমিকা ছিলে রাত্রি। এখন এক্স হয়ে গেছ। আর সেটা তোমার সিদ্ধান্ত ছিল।”
“হুম। আমার সিদ্ধান্ত ছিল। আর সেই সিদ্ধান্তটা আমার নেওয়া সেরা সিদ্ধান্ত ছিল অরণ্য। আমি কখনো আপসোস করব না এটা নিয়ে। কখনোই না।”
বলে অরণ্যকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গেল রাত্রি। অরণ্য ওর যাওয়ার পানে চেয়ে শুধুই হাসল। হয়তো সত্যিই রাত্রি সেরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
যতটা আন্তরিকতা দেখানো যায়, তার সবটুকু মিশিয়েই ও বাড়ির সবাইকে বাড়ির ভেতরে নিয়ে আসা হলো। কুহু অপেক্ষায় ছিল। অপেক্ষায় ছিল দীপ্র ভাইয়ের। লোকটার সাথে কথা ছিল। কিন্তু সুযোগই হচ্ছে না। ও ওড়নার কোণ প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে দীপ্রর পেছনে এসে দাঁড়াল। মানুষটা যে খুব লম্বা তা আরো একবার অনুভব হলো।
“দীপ্র ভাই।”
পেছন ফিরে চাইল দীপ্র। কুহুকে সে আগেই খেয়াল করেছে। তবু ইচ্ছে করেই চুপ ছিল।
“বল কুহু।”
“একটু এদিকে আসেন।”
“কোন দিকে?”
“এদিকেই।”
বলে ইশারা করল কুহু। দীপ্র ওর পেছন পেছন এল। কুহু ঘাড় তুলে চাইল। আনমনেই বলে ফেলল,”উফ, আপনি এত লম্বা কেন!”
এ কথায় দীপ্র ভ্রু কুঞ্চিত করল। শুধাল,”এটা বলতে ডেকেছিস?”
“এই না।”
“তাহলে?”
“পায়েল দিলেন যে?”
দীপ্র জানত কুহু এটাই জিজ্ঞেস করবে। ও কুহুর চোখের দিকে দৃষ্টি রাখল।
“পছন্দ হয়নি?”
“হয়েছে। কিন্তু এটা…..
ওর কথা থামিয়ে দিল দীপ্র। বলল,”মেলায় তোর পাশে পড়ে ছিল। ভেঙে গিয়েছিল ওটা।”
কুহু আর কি বলবে বুঝল না। কৃতজ্ঞতায় চোখ নেমে এল। মাথাটা সামান্য নত করে বলল,”থ্যাংক ইউ।”
দীপ্র জবাব দিল না। বরং অদ্ভুত একটা কাজ করল। হাত বাড়িয়ে দিল কুহুর থুতনিতে। পুরুষটির স্পর্ষে কুহুকে শীতল এক হাওয়া স্পর্শ করে গেল। থুতনিতে চাপ প্রয়োগে মেয়েটির নত মুখটা উঁচু করল দীপ্র। এতে করে পুনরায় দৃষ্টির মিলন ঘটল। পুরো ঘটনায় কুহু বোকার মতন চেয়ে রইল। বলতে পারল না একটা শব্দ ও। দীপ্র ভাই’ই বলল,”কুহু।”
মেয়েটি জবাব দিল না। চেয়ে রইল দীপ্রর গভীর দুটো চোখে। পুনরায় দীপ্রই বলল,”কুহু, তুই কখনো মাথা নত করবি না। কখনোই না। আমার সামনে তো একদমই না। সব সময় মাথা উঁচু করে রাখবি। তোর দৃষ্টি সবসময় আমার দৃষ্টির সাথে থাকবে। বুঝলি?”
রাত্রির সাথে কিছু কথা বলার ছিল। অথচ মেয়েটিকে আশেপাশে দেখা যাচ্ছে না। কল ও ধরছে না। এদিকে বড়োদের বলতে গিয়েও লজ্জা লাগছে। কণা এদিক দিয়েই যাচ্ছিল। তখনই রাগীব ডেকে ওঠল। কণা শুকনো ঢোক গিলল। রাগীব কি তাকে বকা দেবে?
“রাত্রিকে একটু ডেকে দিবে? অথবা ও কোথায় আছে বলতে পারবে?”
একদম স্বাভাবিক ভাবে বলল রাগীব। কণার ধরে প্রাণ এল। বুঝল তাকে চেনেনি রাগীব। ও হেসে বলল,”ঐ তো ওদিকে।”
“ওদিকে মানে, কোন দিকে?”
“ওদিকে মানে ওদিকে।”
রাগীব হা হয়ে রইল। হুট করেই কণার কথা স্মরণ হলো। ও বলে ওঠল,”তুমি কণা?”
এবার থিতু হলো কণা। মিনমিনে সুরে বলল,”বুঝে ফেলল রে।”
ওর মেকি হাসি দেখেই যা বোঝার বুঝল রাগীব। কণা বাচ্চা মানুষ। অন্যদিকে রাগীব ভীষণ ম্যাচিউর এক ছেলে। ও কণাকে সেভাবে কিছুই বলল না। শুধু বলল,”রাত্রিকে একটু ডেকে দেবে প্লিজ? ও কল ধরছে না।”
“আচ্ছা,দিচ্ছি।”
বলেই প্রস্থান করল কণা। ফোনে লোকটার সাথে বেশ এক রকম মজা নিয়েছে ও। একটু আগেও যখন বুঝল ওকে চিনতে পারেনি তখনও মজা নেয়ার চেষ্টা করছিল। কিন্তু হুট করেই ধরে পড়ে যাওয়ায় সবটা কেমন ঘেঁটে গেল। এর জন্যই হয়তো বলে অতি চালাকের গলায় দড়ি।
কুহুর ভেতর নতুন একটা প্রজাপতির আগমন হয়েছে। এই প্রজাপতিটা অনেক দিন ধরে ওর ভেতরে জাগ্রত হতে চাইছিল। কিন্তু বাবার মৃ ত্যুর শোক, নিজের করা বোকামি, সব মিলিয়ে প্রজাপতিটা ঠিক ঠাক জাগ্রত হতে পারছিল না। আজ সে পুরোপুরি জেগে ওঠেছে। মনের ভেতর সুখের একটা হাওয়া বইছে। সেই সুখের হাওয়া গায়ে লাগিয়ে প্রজাপতিটা ডানা মেলে ঘুরঘুর করছে। কুহু আপনমনেই দোতলার পথে যাচ্ছিল। রাত্রিপুর কাছে। ঠিক তখনই আয়ানার সাথে দেখা। ওর পথের মাঝে পড়ে গিয়েছে। কুহুর হাসি হাসি মুখটা শক্ত হলো। ও পাশ কাটিয়ে যেতে নিলেই আয়ানা বলে ওঠল,”এত খুশি কীসের জন্য?”
থামল কুহু। ঘুরে চাইল। ঘুরে চাইল আয়ানাও। দুজনের দৃষ্টি একে অপরের দিকে পড়ল।
“আমি খুশি, তাতে কি তোমার দুঃখ লাগছে আয়ানাপু?”
“তা একটু লাগছে। লাগার তো কথাই কুহু। আমার খুশিতে ভাগ বসানো তো তোর,স্বভাব হয়ে গিয়েছে।”
এ কথায় কুহুর ভ্রু কুঞ্চিত হলো। আয়ানা আরেকটু এগোল। হেসে বলল,”দীপ্র দাদাভাইয়ের থেকে দূরে থাকবি কুহু। এটাই তোর জন্য ভালো হবে।”
“আর যদি সে কাছে চায়? তখন কী করব আয়ানাপু?”
কুহু এমন কিছু বলবে তা আয়ানা একদমই আশা করেনি। ওর মুখে মেঘ এসে ভর করল। কুহু হেসে বলল,”ভাগ্যে যা আছে, তা তো হবেই আয়ানাপু। তুমি আমি কিংবা অন্য কেউ, তা বদলাতে পারব না। একদমই না। তুমি আমাকে শত্রু না মনে করে, বরং দীপ্র ভাইকে পটানোর চেষ্টা করো। তোমার জন্য সেটাই ভালো হবে।”
“কুহু তুই….
“হুম আমি, বলো কী বলবে? প্রথমত, আমি দীপ্র ভাইকে পটানোর কোনো রকম চেষ্টা কখনোই করিনি আয়ানাপু। তবে তুমি, আমাকে বার বার প্রতিপক্ষ মনে করেছ। শোনো, আমি সত্যি সত্যিই প্রতিপক্ষ হয়ে গেলে, তোমাকে এক চুটকিতে হারিয়ে দিব। সেটা তুমি ভালো করেই জানো। তাই তোমার জন্য সাজেশন, আমাকে প্রতিনিয়ত হুমকি ধমকি না দিয়ে, বরং দীপ্র ভাইকে পটাও। যদিও, আমি নিশ্চিত খুব একটা লাভ হবে না। তবু চেষ্টা করো। ঐ যে কথাটা আছে না, যেখানে দেখিবে ছাই, কুড়াইয়া দেখিও তাই। পাইলেও পাইতে পারো, অমূল্য রতন। তুমি বরং সেটাই করো আয়ানাপু। তোমার জন্য এটাই মঙ্গল।”
চলবে….
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি
Share On:
TAGS: প্রণয়ের রূপকথা, ফাতেমা তুজ নৌশি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৫
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪৮
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩১
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৭
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১৯
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৮
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩৪
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৭
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪৫