প্রণয়ের_রূপকথা (৪৪)
রাতের ঘুম পালিয়ে গিয়েছে কুহুর। ও জানে না দীপ্র কীভাবে ফোনটা ফেরত আনল। শুধু মনের ভেতর একটা কথাই জাগ্রত হলো, দীপ্র ভাই ফোন ফিরিয়ে এনে দিয়েছে। এত কিছুর পর ও দীপ্র ভাই তার জন্য এতটা করে চলেছে। মুখে খুব একটা স্বীকার না করলেও মনে মনে দীপ্রর প্রতি একটা কৃতজ্ঞতাবোধ আগে থেকেই কাজ করত। আজকের ঘটনার পর সেটা আরো বৃদ্ধি পেল। দীপ্র ভেজা শরীরে ছিল বিধায় ঘটনার বিশদ আর জানতে চাওয়া হয়নি। তবে সকাল সকাল খেতে আসার সময় ঘটনাটি ওর কানে এল। দীপ্রকে সম্ভবত এই বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেছেন বাড়ির কর্তা দবীর দেওয়ান। সেই জন্যই দীপ্র বলছে,’কেকের স্টলের পাশেই জুয়েলারির স্টল গুলো ছিল। কুহু সেসবই দেখতে গিয়েছিল। ও দেখতে দেখতে অন্যপাশে এসে গিয়েছিল। আর ভীড় যেহেতু বেশি ছিল তাই আমাদেরকে আর দেখতে পায়নি। তারপর ওখানে ঝামেলা শুরু হলো। আমার ধারণা ও ভয় পেয়ে দোকানেই ফোন রেখে চলে গিয়েছিল। আমি পরে গিয়ে দোকান গুলোতে জিজ্ঞাসা করি। তারপরই তারা জানান একটা ফোন পেয়েছে।”
এ অবধি বলার পর আবিদা বললেন,”এত ভালো দোকানদার?”
“হুম।”
বলে থামল দীপ্র। কুহু ফোন রেখে চলে এসেছিল নাকি কৌশলে তার ফোন হাতিয়ে নিয়েছে এ ব্যাপারটি দীপ্র জানে না। তবে এমন না দোকানদার সৎ। বরং দীপ্র টাকার লোভ দেখিয়ে ফোনটি ফেরত এনেছে। শুরুতে ভীষণ অস্বীকার করে চলেছিল। বিষয়টি ইচ্ছে করেই দীপ্র এড়িয়ে গেল। ঘটনা শুনে খুশি হয়নি আয়ানা। সে খাবার খাওয়া বন্ধ করে দিল। কুহু খাবার খেতে এসেছে দেখে জেবা বললেন,”বোস কুহু। ওদের হয়েই গিয়েছে।”
দীপ্রর খাওয়া শেষ। খাওয়া শেষ অরণ্যর ও। ওরা দুজনেই ওঠে গেল। দীপ্রর চেয়ার খানায় বসল কুহু। আয়ানা বসেছে বরাবর। ওর খাওয়া হয়নি তখনো। ও না খেয়েই ওঠে গেল। জেবা ডাকলেন।
“আয়ানা, খাওয়া শেষ কর।”
“পেট ভরে গেছে। আর খাব না।”
আয়ানা চলে যেতেই কুঞ্জ বলল,”কুহুপু ট্রীট দিতে হবে।”
কণাও বসে। ও খেতে খেতে বলল,”হুম, হুম। ট্রীট তো দিতেই হবে। তবে আমাকে দুই খুশিতে।”
একটা খুশির কারণ তো সবার জানা। তবে আরেকটি খুশি বলতে কণা যা বুঝিয়েছে তা বেশ ভালোই বুঝেছে কুহু। ও চোখ পাকাল। কণা হেসে বলল,”না মানে, এমনিই বলছিলাম আর কি।”
কুঞ্জকে নিয়ে মায়ের হোটেলে এসেছে কুহু। ববিতা ওদের দুজনকে বসিয়ে দিয়ে, নানান রকম খাবার নিয়ে এসেছেন। কুঞ্জ সকালের নাশতা করে এসেছেও মজার সব খাবার দেখে লোভ সামলাতে পারেনি। ও খাচ্ছে আপন মনে। বাড়ি থেকে খুব একটা দূরে নয় এই হোটেল। একজন পুরুষ কর্মচারীর পাশাপাপাশি চারজন নারী কর্মচারী রয়েছে হোটেলে। ইচ্ছে করেই নারীদের রেখেছেন ববিতা। স্বামীর চলে যাওয়ার পর তিনি নারীদের সাবলম্বি হওয়ার বিষয়টি খুব করে বুঝেছেন। কুহু কুঞ্জকে খেতে বলে মায়ের কাছে এল। মা বাজারের খাতা নিয়ে বসেছেন। হিসেব করছেন মন দিয়ে।
“ব্যস্ত মা?”
“না রে। বোস তুই। এমনি হিসেব করছিলাম।”
“বাজারের খাতা?”
“হ্যাঁ, আজকাল মনে হচ্ছে হিসেবে অল্প বিস্তর গড়মেল।”
“কেমন?”
“খুবই সামান্য। চোখে দেখে বুঝতে পারবি না। ধর পাঁচ কেজি আটা আনতে বললাম, লেখা পাঁচ কেজি, কিন্তু এনেছে সাড়ে চার কেজি। এমন কিছু গড়মেল পাচ্ছি।”
কুহু বিষয়টি নিয়ে একটু ভাবল। তারপর বলল,”প্যাকেটের জিনিসপত্র আনতে বলো। তাহলে আর ঝামেলা করতে পারবে না।”
“সেটাই করব এখন থেকে। তুই কিছু বলতে এসেছিলি?”
“হ্যাঁ, মা।”
বলে কুহু একটু থামল। তাকাল মায়ের চোখের দিকে। ববিতাও মেয়ের চোখের দিকে তাকালেন।
“শাহ আলম স্যার, আমার জন্য প্রস্তাব পাঠিয়েছেন। স্কুলে শিক্ষকের অভাব দেখা গিয়েছে। খন্ডকালীন শিক্ষক প্রয়োজন। জয়েন করব?”
“তোর পড়াশোনায় ঝামেলা হবে না?”
“তেমন কিছু হবে না মা। একটু চাপ হবে, তবে পারব।”
“তাহলে ঠিক আছে। জয়েন কর।”
বলে একটু হতাশার মতন শ্বাস ফেললেন তিনি। ববিতার এই শ্বাস ফেলার অনুভূতি ভালোই বুঝতে পারল কুহু।
দীপ্র আর অরণ্য সারাদিন বাড়ি ছিল না। এসেছে রাতে। খেয়ে এসেছে বাইরে থেকেই। তাই রাতেও দেখা হলো না। কুহু অপেক্ষায় ছিল। কৃতজ্ঞতা জানানোর ছিল। তবে সেটা আর হলো না। রাত তখন গভীর। কুহুর চোখে ঘুম নেই। আচ্ছা, এই মাঝ রাতে ম্যাসেজ দেওয়া ঠিক হবে? হবে না বোধহয়। ভেবেও কি মনে করে যেন ম্যাসেজ পাঠাল কুহু। দারুণ ব্যাপারটি হলো সঙ্গে সঙ্গে সীন হলো। দীপ্র লিখেছে,”ঘুমাস নি?”
“না।”
“কেন?”
“ঘুম আসে না।”
“ঘুম আসে না কেন?”
“সেটা তো জানি না। কিছু বলতে চাই।”
“কী?”
“থ্যাংকস।”
“কেন?”
“হারিয়ে ফেলা জিনিস ফেরত এনে দেওয়ার জন্য।”
“আচ্ছা।”
“হুম।”
“কুহু।”
“জি?”
“যদি কখনো…
এই অবধি লিখেও ডিলিট বাটনে প্রেস করল দীপ্র। লিখল,”ঘুমিয়ে পড়। শরীর খারাপ হবে।”
“আচ্ছা।”
এইটুকু বলার পর দুজনেই দু দিক থেকে অফলাইন হয়ে গেল। কেন যেন মানুষটার সাথে কথা আগায় না কুহুর। অথচ মাঝে মাঝে মনে হয় কত কথা বলার ছিল। বলতে গিয়ে কিছুই আর পায় না।
রাগীবদের বাড়িতে আজ ফোন করে জানানো হলো তারা যেন এসে দিন তারিখ ঠিক করে যায়। আবিরের বিয়েটাও আটকানো হয়েছে। ঠিক হয়েছে দুই ভাই বোনকে একসাথেই বিয়ে দেয়া হবে। কুহুর মনটা আবারো খারাপ হয়ে গেল। ও ফিরেছিল ভার্সিটি থেকে। কেন যেন রাত্রিপুর বিয়েটা ও মানতে পারছে না। ও হতাশ হয়ে দাদিজানের কাছে এল। দাদিজান ওকে দেখেই হাসলেন।
“পান এনেছি দাদিজান।”
বৃদ্ধার পান শেষ হয়ে গিয়েছিল। কুহুকে কিছু বলতে হয় না। মেয়েটির নজর সবদিকেই থাকে। ও পানের কৌটায় পান রেখে বসল।
“বোস রে কুহু।”
দাদিজানের কাছে বসল কুহু। বৃদ্ধা পান সাজাতে সাজাতে বলল,”মন খারাপ?”
“কিছুটা।”
“কেন?”
“রাত্রিপুর বিয়ে।”
“হুম। সে তো বিয়ে দিতেই হবে। তোর নিজের বিয়ে নিয়ে কী ভাবলি?”
“আমি তো বিয়ে করব না।”
“কেন? দীপ্র দাদুভাইকে ছাড়া বিয়ে করবি না নাকি?”
এ কথায় কুহু উদাসীন হলো। কিছু বলল না। দাদিজান বললেন,”সময় আছে। রাত্রির পর আয়ানার বিয়ে। তারপর তোর। এবার আর তাড়াহুড়ো নেই।”
“আমার বিয়ে নিয়ে ভাবি না দাদিজান।”
এ অবধি বলে কুহু একটু থামল। ও জানে আয়ানার বলা কথা গুলো মিথ্যে বানোয়াট। ও কিছু একটা বলতেই নিচ্ছিল, তখনই দীপ্রকে আসতে দেখা গেল। দীপ্র এসে বৃদ্ধার পাশে বসলেন।
“নাতনি কে পেয়ে আমাকে ভুলে গিয়েছেন বেগম সাহেবা।”
পান খেতে খেতে হাসলেন বৃদ্ধা। দীপ্রর বাহুতে স্পর্শ করে বললেন,”নাতিও আমার। নাতনিও আমার। কাউকেই ভুলি নাই ভাই।”
“তাই? কী কথা হচ্ছিল?”
সুযোগ পেয়েই বৃদ্ধা বললেন,”কুহুর বিয়ে নিয়ে।”
ভ্রু কুঞ্চিত করে চাইল দীপ্র। কুহুর দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে বলল,”ও কি বিয়ে করতে চাচ্ছে?”
কুহু কি বলবে বুঝল না। হাবুলের মতন চেয়ে রইল। বৃদ্ধা বললেন,”মুখে না বললেও, মন হয়তো চায়। তবে নাতনিকে বিয়ে দেব সে পাত্র কোথায়? তুমি চাইলে খোঁজ করতে পারো দাদুভাই।”
দীপ্র তখনো কুহুর দিকে তাকিয়ে। কুহুর দৃষ্টি এদিকসেদিক ঘুরছে।
“ঠিক আছে। তাহলে খোঁজ করব।”
ঘর থেকে বের হয়েই কুহু ডেকে ওঠল,”শুনুন।”
দীপ্র দাঁড়াল। চাইল পেছন ফিরে। কুহু মুখটা আঁধার করে বলল,”আমি কিন্তু বিয়েটিয়ে করতে চাইনি।”
“তাই, সত্যিই চাসনি?”
“হুম।”
“দাদিজান এমনি এমনি বলল?”
“হুম। এমনিই বলেছেন। তবে আপনাকে বিশ্বাস নেই। যেভাবে রাত্রিপুর বিয়ে নিয়ে কথা এগিয়ে দিয়েছেন কখন না আমার বিয়ে নিয়েও সবাইকে বলে দেন। আমি কিন্তু বিয়ের বিষয়ে কিছু বলিনি।”
বলে কুহু থামল। দীপ্র একটু এগোল। মাথাটা সামান্য নিচু করে বলল,”স্কুলে জয়েন করছিস?”
এ কথায় অবাক হলো কুহু। বলল,”আপনি কীভাবে জানলেন?”
“তোর সব খবর আমার কাছে থাকে।”
এ কথার বিপরীতে কুহু আসলেই কথা খুঁজে পেল না। ওদের মাঝে সহসাই আগমন হলো আয়ানার। ও এসেছে হন্তদন্ত হয়ে। সম্ভবত দূর থেকে কুহু আর দীপ্রকে কথা বলতে দেখেছে।
“দাদাভাই।”
বলেই এগিয়ে এল একদম কাছাকাছি। দীপ্র নড়েচড়ে ওঠল।
“আমাকে একটু শপিংয়ে নিয়ে যেতে পারবে?”
আয়ানা বোধকরি ইচ্ছে করেই কুহুর সামনে কথাটা বলল। কারণ ও জানে, দীপ্র মানা করবে না। তবে ওর ভাবনাতেও ছিল না দীপ্র বলবে,”নেওয়া যেতেই পারে। কুহু, তুই ও চল।”
যতটা উচ্ছ্বাস ওর মধ্যে ছিল, তা মিলিয়ে গেল হাওয়াই মিঠাই হয়ে। আয়ানা ইশারায় কুহুকে নিষেধ করল। বোঝাল কুহু যেন মানা করে। তবে ওকে আরেক দফায় অবাক করে দিয়ে কুহু বলল,”ঠিক আছে।”
চলবে…
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি
Share On:
TAGS: প্রণয়ের রূপকথা, ফাতেমা তুজ নৌশি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৫৩
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৫
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৬৭
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৮
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪৮
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৫
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪৯
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৬১
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৬৫