প্রণয়ের_রূপকথা (৪৩)
রাত্রি মাত্রই ছাদ থেকে কাপড় নিয়ে নামল। ওমন সময় সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ হলো অরণ্য’র। এখানে আসতে না আসতেই বৃষ্টি শুরু হয়ে গিয়েছিল। শেষবেলায় ছুটে এসেও রক্ষা হলো না। বৃষ্টি এতই বাড়ল যে ও একদম ভিজে একাকার। চুল থেকে টুপটুপ করে পানি নামছে এখন। অরণ্য’র ঠান্ডার বাতিক আছে। বিষয়টি রাত্রি জানে। ও চেয়েও এড়াতে পারল না। একটা তোয়ালে রেখে বলল,”চাইলে এটা ইউজ করতে পারো।”
বাকি কাপড় গুলো সোফায় রেখে ও চলে গেল নানিজানের ঘরে। বৃদ্ধা ডাকছিলেন।
“হ্যাঁ, নানিজান। বলো।”
“বৃষ্টি শুরু হয়েছে রে?”
“হুম। অনেক বেশি।”
“একটু চা বানিয়ে আন তো বোন। গলাটা কেমন লাগছে।”
“রং চা?”
“হুম। আদা দিয়ে।”
“আচ্ছা।”
রাত্রি ফিরে দেখল অরণ্য তখনো দাঁড়িয়ে। তোয়ালেটা ওভাবেই আছে। ও ভ্রু কুঞ্চিত করল। কোনো কথা না বলে তোয়ালে নিয়ে হাঁটতে যেতেই অরণ্য ডেকে ওঠল।
“রাত্রি।”
ওর পা থমকাল। চাইল পেছনে। অরণ্য দূরত্ব কমাল।
“মায়া দেখিয়ে তোয়ালে রেখেছিলে, নাকি করুণা?”
এ কথায় রাত্রির হাসি পেল। ও সামান্য হাসল ও বটে। সেই হাসিতে তিরস্কার স্পষ্ট।
“মায়া কিংবা করুণা, কোনোটাই দেখাইনি অরণ্য।”
“মিথ্যে বললে। তুমি জানো আমার ঠান্ডার বাতিক।”
এ কথার পর পরই অরণ্য কয়েকবার হাঁচি দিল। হাঁচি থামলেও নাক টানতে টানতে বলল,”ঠান্ডা লেগেই গেছে। যাই হোক, তোয়ালের দরকার নেই। তবে পারলে চা দিও।”
অরণ্য দাঁড়াল না। চলে গেল। রাত্রি ওর যাওয়ার পানে একটু সময় চেয়ে, চা বানাতে গেল।
চা বানিয়ে নানিজানকে দিয়ে এসে রাত্রি এল অরণ্যর ঘরের দরজাতে। ঠকঠক করতেই অরণ্য বলল,”ভেতরে আসো।”
“আসব না। চা দিতে এসেছি।”
“অহ।”
বলে কিছু সেকেন্ড পরই দরজা খুলল অরণ্য। ওর শরীরে শুধুই তোয়ালে। রাত্রি বিরক্তির চোখে তাকাল। অরণ্যর এমন খোলামেলা অবস্থার বিপরীতে কাঠ গলায় ও বলল,”এসব কী রকম নোংরামি?”
“নোংরামির কী হলো? চা নিতে এসেছি। তুমি তো এলে না।”
“ভাগ্যিস যাইনি। না হলে, এত খারাপ অবস্থায় তোমার সাথে…..
ওর কথা পূরণ হওয়ার আগেই অরণ্য বলল,”একটা সময়, এই সব কিছু স্বাভাবিক হওয়ার কথা ছিল। এনি ওয়ে, চা দাও।”
বলে চা নিয়ে দরজা আটকিয়ে দিল অরণ্য। একদম মুখের ওপর লাগাল। রাত্রির একবার ইচ্ছে করল, দরজায় একটা লাথি দিতে। তবে তেমন কিছুই ও করতে পারল না।
আকাশে তখন মেঘ ডেকে চলেছে। ভীড়ের মাঝে, অনেকটা দিশেহারা হয়ে পড়েছে কুহু। ওর ভয় হচ্ছে। অতিরিক্ত ভয়। ভয়ের মাত্রা বাড়িয়েছে ফোন হারিয়ে ফেলাটা। ওর খুব কাঁদতে ইচ্ছে করছে। এদিকে লোকজন ছুটোছুটি করছে। ও এবার ওঠে দাঁড়ানোর প্রয়াস করল। ওমন সময় কোথা হতে দীপ্রর ডাক ভেসে এল।
“কুহু।”
কুহু তাকাল ছটফটে নয়নে। এদিক সেদিক মাথা ঘুরিয়ে। তবে দীপ্রকে দেখতে পেল না। দ্বিতীয় দফায় ডেকে ওঠল দীপ্র।
“কুহু।”
এবারও দীপ্রকে দেখতে পেল না কুহু। ও মাথা এদিক সেদিক ঘোরানোর মাঝেই কোথা হতে যেন ছুটে এল দীপ্র। কুহু তখনো মাটিতেই বসা। দীপ্র এসে ওর পাশে বসেছে। বাহু চেপে ধরেছে।
“ঠিক আছিস? ঠিক আছিস তুই?”
কুহুর চোখে থাকা জলের বিন্দু এবার গড়িয়ে পড়ল দু চোখ বেয়ে। ও দীপ্রর মুখের পানে তাকাল।
“কুহু, কাঁদছিস কেন? ভয় পেয়েছিস? এসে গেছি তো।-
“ফোন হারিয়ে ফেলেছি।”
বলে ঠোঁট কামড়ে ধরল ও। ওর বাহু থেকে হাত নামিয়ে গাল স্পর্শ করল দীপ্র।
“ঠিক আছে। কোনো ব্যাপার না। ওঠ এখন।”
কুহু ওঠল না। বসে রইল ওভাবেই। দীপ্র প্রশ্ন নিয়ে তাকাতেই ও বলল,”বাবার দেওয়া গিফট ছিল। আমি সেটাও হারিয়ে ফেললাম। আমার সব কিছু কেন হারিয়ে যায় দীপ্র ভাই?”
এ প্রশ্নের জবাব দিতে পারল না দীপ্র। এদিকে ঝামেলা বেড়েই চলেছে। মানুষ এখনো ছুটোছুটি করছে। আবার আকাশও রং বদল করেছে। বোঝা যাচ্ছে একটু বাদেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামবে। দীপ্র ওর বাহু ধরে ওঠিয়ে নিল। কুহুর শরীর একদম ছেড়ে দিয়েছে। দীপ্র ওর গাল ছুঁয়ে বলল,”তোর আর কিছুই হারাবে না কুহু। আর কিছুই হারাবে না। আমি কথা দিলাম।”
সামনের সিটে বসা আয়ানা। দীপ্র ড্রাইভ করছে। তবে বার বার লুকিং গ্লাসে তাকাচ্ছে। কুহুর চোখ দুটো রক্তিম। একদম নাজেহাল অবস্থা। আয়ানা এবার ফোঁস ফোঁস করে ওঠল।
“তোর কী দরকার ছিল ভীড়ের মাঝে যাওয়ার? আমরা কেক খাচ্ছিলাম, একটু সময় দাঁড়াতে পারলি না। তাও আবার ফোন হারিয়ে এসেছিস। সব দিক থেকেই ঝামেলা করে আসছিস।”
কুহু জবাব দিল না। কণা কি বলবে বুঝল না। এখানে তার বোনের কিঞ্চিৎ দোষ তো আছে। তবে, ঘটনা এমন হবে সেটা কি কুহু জানত? পাশের দোকানেই তো গিয়েছিল। তারপর কি থেকে কি হলো। সুযোগ পেয়ে আরো কিছু কথা বলল আয়ানা। দীপ্র এবার কথা বলল।
“আয়ানা, এই টপিকে আর কোনো কথা নয়।”
“কিন্তু দাদাভাই….
“বলেছি তো আর কোনো কথা নয়। ওর মন খারাপ। সেটা বাড়ানোর কী দরকার?”
আয়ানা দমল এবার। দীপ্র লুকিং গ্লাসে তাকিয়ে কুহুকে একবার দেখল। মেয়েটি একদম ভেঙে পড়েছে। পাশের এলাকায় বৃষ্টি ছিল না। তবে দীপ্রদের এলাকায় প্রবেশ মাত্রই ধীরে ধীরে বৃষ্টির তীব্রতা বোঝা গেল। বৃষ্টির শব্দে কুহু একটু নড়েচড়ে বসল। জানালার কাচটা নামিয়ে ফেলল। এক ছটা বৃষ্টি এসে কুহুর গাল ছুঁয়ে দিল। লুকিং গ্লাসে দৃশ্যটি ধরা দিল দীপ্রর কাছে। ওর মনোযোগ বার বার সরে যাচ্ছে। ও এবার কঠোর হয়ে বসল।
ফোন হারানোর বিষয়টি নিয়ে কেউ ই রাগারাগি করলেন না। এমনকি ববিতাও না। তিনি বরং মেয়েকে সান্ত্বনা দিলেন দ্রুতই একটা ফোন কিনে দেবেন বলে। ব্যবসাটা নতুন হলেও রোজগার হচ্ছে ভালোই। রান্না ভালো হওয়াতে খোদ্দের বাড়ছে রোজই। কুহুর মন এসবে ভালো হলো না। ওর নিজের ওপর রাগ হচ্ছে। ফোনটা হারাল নাকি চুরি হলো এটাও জানা নেই। কীভাবে কী ঘটে গেল ভাবতেই নিজেকে চড় লাগাতে ইচ্ছে করছে। সেদিন রাতের খাবার খেতে এল না কুহু। এমনকি রাত্রি এসে কয়েকবার ঠেলাঠেলির পর ও না। তখন মাঝ রাত। মন খারাপ নিয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিল কুহু। রাত্রি এসে দরজায় নক করল। কুহুর ঘুম ভাঙল। ও দরজা খুলেই বলল,”আমার খিদে নেই রাত্রিপু। তুমি শুধু শুধু কষ্ট করে চলেছ।”
রাত্রির চোখে মুখে খুশির জোয়ার। বিষয়টা খানিক বাদেই ধরতে পারল কুহু। তবে সেটা দীঘল হওয়ার পূর্বেই ওর হাত ধরে সামনে এগোতে লাগল রাত্রি।
“কোথায় যাচ্ছি আমরা?”
“নিচে। বসার ঘরে।”
কুহুকে নিয়ে বসার ঘরে এল রাত্রি। দীপ্রর শরীর তখন ভেজা। সন্ধ্যার পর থেকে বৃষ্টি যে শুরু হয়েছে তা থামেনি একটুও। ঘুম চলে গিয়েছে কুহুর। ও চেয়ে আছে ভিজে একাকার হওয়া দীপ্রর পানে। দীপ্রর চুল বেয়ে গড়িয়ে নামছে পানির বিন্দু। কুহু কিছু বলার পূর্বেই দীপ্র হাত বাড়িয়ে দিল। সেই হাতে নিজের ফোন খানা দেখে কুহু ভাষা হারিয়ে ফেলল। দীপ্র বলল,”বলেছিলাম, তোর কিছুই আর হারাতে দেব না। তার শুরুটা না হয়, হারানো জিনিস ফিরিয়ে এনেই করলাম।”
চলবে….
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি
Share On:
TAGS: প্রণয়ের রূপকথা, ফাতেমা তুজ নৌশি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৫৫
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৩
-
প্রণয়ের রূপকথা গল্পের লিংক
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১৩
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৮
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৬৪
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২০
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩৭
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪৫
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৫৬