প্রণয়ের_রূপকথা (৩৮)
নোটিফিকেশনের আওয়াজ হলো। কুহু দীপ্রর রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট করেছে। মেয়েটি একটু সময় নিয়েই রিকোয়েস্ট খানা অ্যাকসেপ্ট করল। দীপ্র তখন খাওয়ার টেবিলে। নোটিফিকেশনের শব্দে পাশে থাকা আয়ানা তাকাল। সহসাই বলে ওঠল,”কে?”
দীপ্র তাকাল। তবে জবাব দিল না। আয়ানা বুঝল সে ভুল করে ফেলেছে। তাই ছোট করে বলল,”সরি।”
দীপ্র এবারও জবাব দিল না। ওর এমন না জবাব দেয়াতে আয়ানা আহত হলো। আর একটি কথাও বলতে পারল না।
তখন রাত গভীর। দীপ্রর চোখে ঘুম নেই। হাত খানা নিসপিস করছে। কুহুকে টেক্সট দিতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু কী ভেবে যেন হচ্ছে না দেয়া। ও অনেকটা দ্বিধা দ্বন্দ্ব কাটিয়ে ফোন খানা তুলে ধরল। চোখ বন্ধ করে নিজের পিঠে অদৃশ্য হাত খানা বুলিয়ে বলল,”কুল দীপ্র, কুল। মন যা চায় তাই করে ফেলো।”
অদৃশ্য হাতের ভরসা পেয়ে দীপ্র কুহুর আইডি খানা ওপেন করল। লিখল, “কুহু, আছিস?”
কুহু কি দীপ্রর ম্যাসেজেরই অপেক্ষায় ছিল? হয়তো হ্যাঁ কিংবা না। মেয়েটি সেকেন্ডেই সীন করল। ওর এত দ্রুত সীন করায় দীপ্র নড়েচড়ে ওঠল।
“ঘুমাসনি?
ওপাশ থেকে জবাব আসার পূর্বেই দ্বিতীয় দফায় লিখে পাঠাল দীপ্র। কুহু জবাব দিল,”ঘুমাই নি।”
ম্যাসেজ খানা সীন করল দীপ্র। পুনরায় লিখল,”আচ্ছা।”
সীন হলো। তারপর কিছু সময় কোনো দিক থেকেই কোনো কথা এল না। খানিক বাদে কুহু লিখল,”আপনি ও ঘুমাননি?”
ফোন রেখে দিয়েছিল দীপ্র। এখন নোটিফিকেশন আসায় পুনরায় ফোনটি তুলল।
“উহু ঘুমাই নি।”
“কেন?”
“ভালো লাগছে না।”
“ভালো কেন লাগছে না?”
“জানি না রে। জানি না আমি।”
কুহু কি বলবে বুঝল না। কেমন একটা অনুভূতি হচ্ছে। সত্যি বলতে যখন থেকে নিজের ভুল খানা বুঝেছে। যখন থেকে বুঝেছে দীপ্র নিজের ঘাড়ে দোষ নিয়ে তাকে সেফ করেছে। ঠিক তখন থেকেই কুহুর সবটা কেমন গুলিয়ে আসে। দীপ্রর থেকে পাওয়া ছোটবেলার সমস্ত আদর স্মরণ হয়। আর সবটা কেমন ঝাপসা হয়ে আসে। কুহুর বুকটা কেমন করে ওঠল। এরই মাঝে দীপ্র লিখল,”কুহু।”
“হুম?”
“কষ্ট করে বারান্দায় আসতে পারবি?”
“পারব।”
দীপ্রর কক্ষের বারান্দা আর কুহুর কক্ষের বারান্দা কাছাকাছি। মাঝে শুধু কিছুটা ফাঁকা জায়গা। কুহু ধীরে ধীরে পা ফেলে বারান্দায় এল। কেন এল নিজেও জানে না। দীপ্র আগে থেকেই উপস্থিত ছিল। ওর অবস্থান বুঝে পেছন ফিরে চাইল। কিছুটা দূরে কুহুকে দেখা যাচ্ছে। চাঁদের হালকা আলোতে মেয়েটির মুখে একটা মায়া ভাব এসেছে। দীপ্র কথা বলল না। বলল না কথা কুহুও। ইশারায় ফোন দেখতে বলল দীপ্র। কুহু ফোনটা তুলল। দীপ্র ম্যাসেজ পাঠাল।
“চাঁদ তোর পছন্দ?”
অদ্ভুত লাগছে কুহুর কাছে। এই দীপ্র ভাই ওর নিকট নতুন। ও জবাব দিল।
“চাঁদ কার না পছন্দ?”
“কারো পছন্দ তো নাও হতে পারে?”
“আমার পছন্দ। আপনার?”
“পছন্দ নয়।”
“কেন?”
“এই উত্তর পরে দেব।”
“পরে কবে?”
“যেদিন সময় হবে।”
“কবে সময় হবে?”
“যেদিন তুই চাইবি।”
“আমি?”
“হুম। তুই যেদিন চাইবি।”
একটা শিরশিরে হাওয়া কুহুকে ছুঁয়ে গেল। ও চাইল সামনের দিকটায়। মুখ তুলল দীপ্রও। বাতাসে মেয়েটির কিছু চুল উড়ে বেড়াচ্ছে। দীপ্র ওর বারান্দার একদম শেষ দিকে এসে দাঁড়াল। কাছে এল কুহুও।
“ব্যথা হচ্ছে?”
“একটু, একটু।”
“ঘুমালি না কেন?”
“ইচ্ছে হচ্ছিল না। ঘুম আসছিল না।”
দীপ্র আর কি বলবে বুঝল না। ও তাকিয়ে রইল। তাকিয়ে রইল কুহুও। খানিক বাদে দীপ্র বলল,”ঘুমিয়ে পড় কুহু। ঘুমিয়ে পড় তুই।”
এই অবধি বলে বিড়বিড় করে বাকিটা বলল। বলল,”তুই প্লিজ ঘুমিয়ে পড়। আমার ঘুম হারাম করার শাস্তিটা না হয় তোলাই রইল।”
বাড়ির এক প্রান্তে যখন মিষ্টি মিষ্টি কিছু অনুভূতির তৈরি হচ্ছে। তৈরি হচ্ছে নতুন গল্প, ঠিক তখনই অন্য প্রান্তে কারো চোখের জল নেমে যাচ্ছে। আয়ানার আজ সব অসহ্য লাগছে। দীপ্র আগে তাকে স্নেহ করত। এখনো করে। তবে সেটায় ভীষণ তফাৎ আছে। এখন মনে হয়, অনেক কিছু বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে তাকে। না পাওয়ার এক যন্ত্রণায় আয়ানা কাহিনী হয়ে থাকে। একটা সময় দীপ্রকে সে মন দিয়েছিল তার গুড লুকিং,ভালো পজিশনের কারণে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে মনের ভেতর যে হাওয়া বদল ঘটে গেছে। ঘরটা অন্ধকার। আয়ানার ফোনটা পড়ে আছে মেঝেতে। ও দু হাতে ফোনটা খোঁজে। অন্ধকারে চোখে পড়ে না। ও তবু কয়েক দফার চেষ্টায় ফোন পায়। অন করতেই স্ক্রিনে ভেসে ওঠে দীপ্রর সাথে তোলা তার ছবি খানা। এই ছবিটা তোলা হয়েছিল সেই শুরুর দিকে। ঐ যে একবার সবাই মিলে ঘুরতে বের হয়েছিল তখনই দীপ্রর সাথে ছবিটা তুলে রাখা। সেই স্মৃতি স্মরণ করে আয়ানার চোখ দুটোয় জল নামে। ও ঠোঁট কামড়ে কেঁদে ফেলে।
“দীপ্র দাদাভাই, কেমন করে ভালো বেসে ফেললাম আমি? আমার সব কিছু এলোমেলো হয়ে গেল। তোমাকে আমি ভুলতে পারব না। একদমই পারব না। তুমি আমার হবে। আমার হবে। আমার হতেই হবে তোমায়।”
বলে চোখের জল মুছল আয়ানা। খুব কষ্ট লাগছে। মায়ের কাছে যেতে ইচ্ছে করছে। আয়ানা নিজের মনকে সায় দিল। ও নিজের কক্ষ থেকে বের হয়ে আগালো মায়ের কক্ষের দিকে।
সম্ভবত আজ দেওয়ান বাড়ির বেশিরভাগ সদস্যই না ঘুমানোর প্ল্যান করেছে। রাত্রির ঘুম আসছিল না। শরীরটা কেমন দুর্বল লাগছে। ওর মনে হলো এই অসময়ে এক কাপ চা হলে ভালো হয়। তাই বেরিয়ে রান্না ঘরে এসে চা বসাল। পানিটা বসানো মাত্রই কোথা হতে একটা গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল। গম্ভীর কণ্ঠটি বলল,”চায়ের পানি বাড়াও।”
রাত্রি চেয়ে। ওর চোখে ভেসে ওঠল অবয়ব খানা। ধীরে ধীরে অবয়বটি স্পষ্ট হতেই দেখা গেল বলিষ্ঠ দেহের অরণ্যকে।
“আমারও এক কাপ চা লাগবে।”
রাত্রির এবার ধ্যান ফিরল। ও ঠোঁট কামড়ে বলল,”নিজে বানিয়ে নাও।”
“আমি এসব পারি না,জানো না?”
“তুমি কি পারো,না পারো তা দিয়ে আমার তো কাজ নেই।”
“এক কাপ চা ই তো? দিলে সমস্যা কী?”
“সমস্যা নেই।”
“তাহলে?”
“আমার ইচ্ছে তাই দেব না।”
বলে দাঁতে দাঁত চেপে রইল রাত্রি। অরণ্যর মুখ খানা আরো বেশি গম্ভীর হয়ে ওঠল। এই মেয়েটি তার ওপর একটু বেশিই রাগ দেখাচ্ছে না?
চলবে…
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি
Share On:
TAGS: প্রণয়ের রূপকথা, ফাতেমা তুজ নৌশি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩৯
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১২
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৬৯
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪০
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১৬
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪৪
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৯
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪৫
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩২
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৬৭