প্রণয়ের_রূপকথা (৩৬)
দুজন মুখোমুখি দাঁড়ানো। এটা বুঝতে বাকি নেই ইচ্ছে করেই তাদের মুখোমুখি দাঁড় করানো হলো। কেউ কোনো কথা বলল না কিছুক্ষণ। রাত্রি ঠোঁট কামড়ে এবার শুধাল,”তুমি এখানে কেন?”
“দীপ্র’র সাথে দেখা করতে এসেছি। তুমি?”
“আমিও।”
বলে চুপ হয় রাত্রি। অরণ্য আড় চোখে চায়। বলে,”আমার ওপর রাগ দেখাও কেন? দীপ্র আর কুহু ইচ্ছে করে এমন করেছে।”
“কুহুর বাচ্চা….
বলে পেছন ঘুরতে যেতেই অরণ্য বলে ওঠে,”ওকে ধরে লাভ নেই। আসল মানুষকে ধরো। দীপ্রর বুদ্ধি এসব। কুহু তো বাচ্চা।”
“কুহু বাচ্চা?”
“তা নয় তো কী?
“ও বাচ্চা না, বরং ওকে বিয়ে দিলে ও নিজেই বাচ্চার মা হয়ে যাবে।”
“আর তুমি?”
ফট করেই বলে ওঠে অরণ্য। রাত্রি একটু অস্বস্তিতে পড়ে যায়। সম্পর্ক যখন ছিল তখন একটা সংসার, বেশ অনেক গুলো বাচ্চার কথাও বলা হয়েছিল। হুট করেই রাত্রির খুব কান্না পেল। খারাপ লাগল বোধহয় অরণ্যর ও। রাত্রি আর সময় নষ্ট করল না। উল্টো পথে ঘুরে গেল। আর সেদিকে চেয়ে রইল অরণ্য।
কুহু সামনে দিয়ে পাঁয়চারি করছে। ওর শান্তি নেই। ও বুঝতে পারছে না কী হবে। অরণ্য ভাইয়া আর রাত্রিপু আবার ঝগড়া করবে,নাকি ভালোভাবেই কথা বার্তা বলবে এসব নিয়ে ভেবে ভেবে ওর অবস্থা খারাপ। দীপ্র একটু দূরে বসা। ও দেখছে কুহুর কান্ড। এবার ডেকে ওঠল।
“কুহু।”
তাকাল মেয়েটি। চোখে মুখে চিন্তা লেপ্টে আছে। দীপ্র বসা থেকে ওঠে দাঁড়াল।
“ওমন ভাবে ঘুরঘুর করছিস কেন?”
“চিন্তা হচ্ছে।”
“কীসের জন্য?”
“রাত্রিপু আর অরণ্য ভাইয়ার জন্য।”
“ওদের জন্য চিন্তা কেন?”
“কী বলেন? চিন্তা হবে না? ওদের যদি ঠিকঠাক না হয়। উফ ভালো লাগে না।”
দীপ্র কয়েক সেকেন্ড থম ধরে রইল। একটি বার বলতে ইচ্ছে হলো, কুহু তুই অন্যের জন্যে ভাবছিস। অথচ তোর নিজেরই তো কিছু ঠিক ঠাক নেই। তবে এটা কিন্তু বলল না। বরং বলল,”চিন্তা করে লাভ নেই। যা হবার হবেই।”
“সেটাই।”
বলে বসতে নিচ্ছিল কুহু। ওমন সময় রাত্রিকে আসতে দেখা গেল। চোখ মুখ কালো আঁধার হয়ে আছে।
“রাত্রিপু।”
রাত্রি কথা বলল না। পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিল। কুহু এসে বাঁধা দিল।
“এই রাত্রিপু।”
“তুই কথাই বলিস না।”
“আমি কী করলাম? আমার সাথে রাগ করছো?”
“কুহু, তুই আমার বোন? নাকি অরণ্যর?”
কুহু জবাব না দিয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে রইল। রাত্রি কপট রাগ দেখিয়ে বলল,”তুই তোর অরণ্য ভাইয়াকে নিয়েই থাক। রাত্রিপু এখন কেউ না। গেলাম আমি।”
“আরেহ, এই শোনো…
শুনল না রাত্রি। ফটফট করে চলে গেল। একটু দূর থেকে সবটাই দেখল দীপ্র। ও এগিয়ে এল।
“এটা কী হলো বলেন তো? রাত্রিপু ওমন করল কেন?”
“কিছুই না।”
“কিছু না মানে?”
“কুহু, তোর মনে হয় না ওদের একা ছাড়া উচিত?”
কুহু তাকায় দীপ্রর চোখের দিকে। দীপ্র বলে,”কেউ নিজে থেকে না চাইলে, কখনো সম্পর্ক ঠিক করা সম্ভব নয়। তুই নিজেকে দিয়ে ভেবে দেখ কুহু।”
আলগোছে মেয়েটির মস্তিষ্কে কিছু পৌঁছে দিল দীপ্র। ও এমনই। ধীরে ধীরে আগাতে পছন্দ করে। এদিকে কথা মতন
ভাবতে গিয়ে কুহু হুট করেই বিষণ্ণ হয়ে গেল। দীপ্র সেটা বোধহয় বুঝল। তাই ও বলল,”ওদের একা ছাড়ি? দেখি কী হয়?”
“হুম।”
বলে মৌন হলো মেয়েটি। সামনে এগোতে গিয়ে আকস্মিক আহ বলে চিৎকার করে বসে পড়ল। হঠাৎ ওমন করায় দীপ্র ব্যস্ত হলো।
“কী হলো?”
“পায়ে, পায়ে..
বলে একদম মাটিতে বসে পড়ল কুহু। দীপ্র দেখল মেয়েটির পায়ে পেরেক ঢুকে গিয়েছে। একদম জুতা ভেদ করে পায়ে এসে লেগেছে। ক্ষ ত হয়ে লাল রঙের তরলে পা ভেসে যাচ্ছে। কুহু র ক্তে ভয় পায়। ছোট থেকেই। ও নিজের পা দেখে, ভয়ে একদম জ্ঞান হারিয়ে ফেলল।
বাচ্চারা ঘিরে রেখেছে কুহুকে। দীপ্র কুহুর পায়ের ক্ষত পরিষ্কার করে দিচ্ছে। কণার চোখ দুটো রক্তিম। বোনের এমন অবস্থা দেখে ও কেঁদে ফেলেছে। কুঞ্জ চিন্তিত, আতঙ্কগ্রস্ত। অরণ্য গিয়েছে ডাক্তার আনতে। কুহুর পায়ের ক্ষত পরিষ্কার করে দিয়ে দীপ্র বলল,”সবাই একটু বাইরে গেলে ভালো হয়। চাচা বাচ্চাদের একটু নিয়ে যান।”
“হ্যাঁ, বাবা।”
বলে ভদ্রলোক বাচ্চাদের নিয়ে বের হলেন। দীপ্র পেছন ঘুরে বলল,”কণা, কুঞ্জকে নিয়ে বাইরে যা।”
“ভাইয়া…
“আমি যেতে বলেছি কণা। কুঞ্জ বাচ্চা।”
কণা বিষণ্নতা নিয়ে কুঞ্জকে নিয়ে বের হয়। কুহুর চোখ মুখ কেমন শুকনো হয়ে আছে। মেয়েটিকে দেখলেই তো মায়া হচ্ছে। দীপ্র পা খানা হাতে তুলে নিল আবার। ক্ষত অনেকটা। নিশ্চিত যন্ত্রণা হচ্ছে। ধীরে ধীরে মেয়েটির পায়ের ক্ষত ছুঁয়ে দিল দীপ্র। মিনমিনে সুরে বলল,”যে পেরেক তোর পা ছুঁয়েছে, সেই পেরেক ধ্বং স হোক কুহু। তোকে কষ্ট দেওয়া সব কিছু ধ্বং স হোক। আমি হলে, আমিও যেন ধ্বংস হই কুহু।”
কুহুর জ্ঞান ফিরল। ডাক্তার এসে মেয়েটির পায়ের চিকিৎসা করে দিয়েছেন। সবাই ওর আশেপাশেই। কুহুর কেমন একটা লজ্জা লাগল। ও মাথা নত করতেই দীপ্র বলল,”লজ্জা পাচ্ছিস কেন?”
“কী একটা ঘটনা ঘটে গেল। আমার জন্য…
“এটা একটা দুর্ঘটনা।”
“তবু। আমি কেমন জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম।”
“তুই তো ছোট থেকেই এমন। এবার তো নিজের পায়ে ক্ষত হওয়াতে জ্ঞান হারিয়েছিস। ছোট বেলায় তো আমার পায়ের ক্ষত দেখে তোর দাঁত লেগে যাওয়ার মতন অবস্থা হয়েছিল। মনে নেই?”
এবার কুহুর লজ্জা আরো বাড়ল। ও মিনমিন করে বলল,”এসব না বললে হয় না?”
দীপ্র অবশ্য শুনেনি। ও পায়ে হাত দিতে যেতেই কুহু কেমন ছিটকে গেল। প্রশ্ন নিয়ে চাইল দীপ্র। মুখে বলল,”কী হলো? ওমন করলি কেন?”
কুহুর চোখে মুখে একটা অস্বস্তি। দ্বিধাও অনেকটা। সেই সাথে পায়ের যন্ত্রণা।
“কী? কিছু বল!”
মেয়েটির দিকে চেয়ে পুনরায় বলল দীপ্র। কুহু মিনমিন সুরে বলল,”পা ধরছেন কেন?”
“তাতে কী সমস্যা হয়েছে? পা ধরা মানা নাকি?”
“আপনি তো বড়ো।”
বলে থামল কুহু। চাইল আড়চোখে। ওর কথায় হালকা একটা হাসি দেখা গেল দীপ্রর চোখে মুখে। মানুষটা হাসলে অদ্ভুত রকমের সুন্দর লাগে।
“এত সময় তো আমিই ধরে রেখেছিলাম।”
এ কথায় কুহুর ভাবনায় ফোঁড়ন পড়ল। মুখ একদমই বন্ধ হয়ে গেল। দীপ্র আলগোছে ওর পা খানা পুনরায় স্পর্শ করল। কুহুর সমস্ত শরীরে শিরশির একট হাওয়া এসে সুরসুরি দিল যেন। ও শুকনো ঢোক গিলে বলল,”পা ছোঁয়ার ঋণ, কীভাবে শোধ দেব দীপ্র ভাই? আপনি ইচ্ছে করেই আমার ঋণ বাড়াচ্ছেন। অথচ আমি ঐ গরিব বামুনের মতন। যার চাঁদ দেখার সোভাগ্য হয়, তবে ছোঁয়ার সাধ্য হয় না।”
চলবে….
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি
Share On:
TAGS: প্রণয়ের রূপকথা, ফাতেমা তুজ নৌশি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের রূপকথা গল্পের লিংক
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪৪
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৫৫
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩৯
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪১
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১০
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৬৯
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৭০
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৭
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৫