Golpo romantic golpo প্রণয়ের রূপকথা

প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩৫


প্রণয়ের_রূপকথা (৩৫)

বাড়ির সব বাচ্চা’রা আজ এতিমখানায় এসেছে। এই এতিমখানাটা বহু বছর আগের। কুহুর দাদার দান করা জমিতে গড়ে ওঠেছিল। ওরাই সব রকম দায়িত্ব নিয়ে চালাত। কুহুর দাদার ইন্তেকালের পর, দেওয়ান বাড়ির ওপর এক প্রকার নজরই লাগল। এত এত সম্পত্তি ধীরে ধীরে হারাতে লাগল। কাদের, দবীর আর আনোয়ার’রা একটু বড়ো হওয়ার পর স্থিরতা এল। তবে ততদিনে দেওয়ান বাড়ির ঐতিহ্য হারিয়ে বসেছে। তবু এতিমখানাটা চলমানই ছিল। তারপর তিন ভাইয়ের বিয়ে হলো। সংসার হলো। একটা সময় পর দবীর আর আনোয়ার জমি বিক্রি করে গ্রাম ছেড়ে চলেও গেলেন। তখন সব কিছুর হাল ধরল কাদের। শেষমেশ লোকটাও হারিয়ে গেল। এতিমখানার দায়িত্বরত লোকটি ওদেরকে দেখে এগিয়ে এলেন। সালাম জানাল ওরা। কুহু আর রাত্রিকে চেনেন ভদ্রলোক। হেসে বললেন,”ভালো আছ তোমরা?”

“ভালো আছি চাচা। মা বাচ্চাদের জন্য খাবার পাঠাল।”

“হ্যাঁ, হ্যাঁ ঐ জন্যই ওরা তো অপেক্ষায়। সবাই বেশ আগ্রহ নিয়ে বসে আছে।”

ওদের গাড়িটা থামার পরপরই বাচ্চারা সব কক্ষ গুলো থেকে উঁকি ঝুকি দিতে শুরু করেছে। দীপ্র সব খাবার নামানোর ব্যবস্থা করে এগিয়ে এল। পরিচয় দিতেই দায়িত্বরত লোকটা বললেন,”মাশাল্লাহ, বাবা তুমি তো অনেক বড়ো আর সুদর্শন হয়ে গেছ। কত আগে দেখেছি।”

“ধন্যবাদ চাচা। দোয়া করবেন।”

“সব সময় করি বাবা।”

“আমি খাবার নামিয়ে দিয়েছি। কাউকে একটু পাঠান, খাবার গুলো গরম গরম বাচ্চাদের দিয়ে দিক।”

“ও হ্যাঁ, আমি দেখছি। বাবা তোমরা ভেতরে যাও।”

লোকটা কাউকে একটা ডাকতে শুরু করলেন। কুহু পুনরায় গাড়ির কাছে এসে দেখল সব ঠিকঠাক নামানো হয়েছে কি না। দীপ্র ওর পেছন পেছন এসেছে।

“সব ঠিক ঠাকই নামিয়েছি।”

“না, আমি এমনিই দেখছিলাম।”

কুহুর মাথায় ঘোমটা টানা। সালোয়ার কামিজের সাথে ওড়না দিয়ে ঘোমটা টানায় ওকে কেমন বউ বউ লাগছে। দীপ্র কয়েক সেকেন্ড দেখে নিয়ে দৃষ্টি ফেরাল।

“অরণ্য ভাইয়া কখন আসবেন?”

অরণ্য ওদের সাথে আসে নি। একা আসার কথা। দীপ্র বলল‍,”কিছু সময়ের মধ্যেই। ও বাচ্চাদের জন্য উপহার আনতে গিয়েছে।”

“আজ আরেকবার দুজনের কথা বলার একটা পরিস্থিতি তৈরি করলে কেমন হয়?”

“ভালো তো হয়। তবে আমি আসলে সন্দিহান।”

“অরণ্য ভাইয়ার সাথে কথা বলেছিলেন?”

“হুম। আমি যা বলার বলেছি। এখন পুরোটাই ওদের ওপর। চল, আমরা সামনে যাই।”

সবাই ভেতরে চলে গিয়েছে। আজ আয়ানা আসে নি। সেই জন্য বেশ একটা ফুরফুরে ভাব বিরাজ করছে ওদের মাঝে। মেয়েটি থাকলে, সারাক্ষণ কোনো না কোনো সমস্যা হয়।

কুঞ্জ অবাক হয়ে বাচ্চা গুলোকে দেখে চলেছে। কেউ কেউ ওর বয়সী। কেউ ছোট। কেউ বা একটু বড়ো। বাচ্চা গুলোও কুঞ্জর দিকে কেমন করে তাকিয়ে আছে। কুঞ্জর গায়ে বেশ দামি পোশাক। বাচ্চা গুলোর গায়ে সাধারণ কিছুটা পুরাতন জামাকাপড়। একটা বাচ্চা এগিয়ে এসে কুঞ্জর জামা ধরে টান দিল। খুব আগ্রহ নিয়ে দেখছিল। এবার লোভ খানা সামাল দিতে ব্যর্থই হলো। কুঞ্জ বলল,”তোমাদের এমন জামা নেই?”

বাচ্চা গুলো একটু সময় নিয়ে মাথা নাড়াল। অথার্ৎ নেই। এমন জামা তো দূরের কথা, নতুন কোনো জামাও আর নেই। দেওয়ান বাড়ি থেকে আগের মতন টাকা যে আসে না। ওদের তো ভরসা ওনারাই।

কণা আর রাত্রি একসাথে হাঁটছিল। কুঞ্জ ছুটে এসে বলল,”রাত্রিপু, ওদের নাকি ভালো জামা নেই। সবাই কেমন পুরাতন জামা পরে আছে। আমরা ওদের জামা দিতে পারি না?”

কুঞ্জর কথা শুনে, রাত্রির মনটা ভীষণ ভালো হয়ে গেল। ও কিছু বলার আগেই, ওপাশ থেকে দীপ্রকে আসতে দেখা গেল। দীপ্র বলল,”কী বলছিস তোরা?”

জবাব দিল রাত্রি। বলল,”কুঞ্জ বলছিল বাচ্চাদের ভালো জামা নেই। আমরা কি জামা দিতে পারি না?”

দীপ্র হাসল। কুঞ্জর মনটা আসলেই পরিষ্কার। বাচ্চারা অবশ্য পরিষ্কার মনেরই হয়। ও কুঞ্জর মাথার চুল গুলো নাড়িয়ে বলল,”দিলে তুই কি খুশি হবি?”

“খুশি হব দাদাভাই।”

“তাহলে দেব।”

কুঞ্জর অধরে হাসি এসে ধরা দিল। ও বলল,”আমি ওদের বলি?”

“আচ্ছা বল।”

কুঞ্জ উচ্ছ্বাস নিয়ে বাচ্চাদের দিকে ছুটল। রাত্রি হেসে বলল,”কুঞ্জর শিক্ষা ভালো।”

ফট করেই পাশ থেকে কণা বলল,”হ্যাঁ। আমি অবাক হই একটা বিষয়ে। কুঞ্জ আর আয়ানাপু আপন ভাই বোন হয় কেমন করে। কুঞ্জর শিক্ষা আকাশে হলে, আয়ানাপুর শিক্ষা পাতালে।”

“কণা! চুপ কর তুই। বেশি কথা বলিস কেন?”

“তুই আপু, আমাকে সব সময় বকিস।”

বলে কণা উল্টো পথে হাঁটতে লাগল। রাত্রি গেল ওর পেছন পেছন। কুহুর একটু অস্বস্তি হচ্ছে। ও বলল,”কণা আসলে বাচ্চা রয়ে গেছে।”

“সেটা বুঝি। তাছাড়া আয়ানার ও দোষ আছে।”

“সে আপনাকে পছন্দ করে। তাই আমাদের খুব একটা দেখতে পারে না।”

ফট করেই বলে ওঠল কুহু। দীপ্র মুখের ভঙ্গিমা কঠোর রেখে বলল,”এক পাক্ষিক কোনো কিছুর মূল্য নেই কুহু। না হলে….

কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল দীপ্র। কুহু চেয়ে রইল। তবে বাকিটা আর বলল না পুরুষটি।

এক গাড়ি জিনিস এনেছে অরণ্য। একদম শেষ বেলায় পৌঁছাল ও। দীপ্র আগে ভাগেই ভেবে রেখেছিল বাচ্চাদের জামাকাপড়ের বিষয়টা। সেই অনুযায়ী কেনাকাটা করে এনেছে অরণ্য। চকলেট গুলো যখন নামানো হলো, বাচ্চা গুলো সব বড়ো বড়ো চোখ করে রইল। এত চকলেট ওরা কখনো দেখেনি। ড্রেস,চকলেট সহ আনুসঙ্গিক আরো কিছু জিনিস দেওয়া হলো ওদের। দীপ্র দায়িত্বরত লোকটার হাতে একটা মোটা অঙ্কের টাকাও তুলে দিল। মুখে বলল‍,”ওদের যা, যা লাগে সেগুলো দেবেন চাচা। ওদের এখন থেকে আর কষ্ট হবে না। এটা আমি নিশ্চিত করব।”

লোকটার চোখে পানি চিকচিক করে ওঠল। বাচ্চা গুলোকে সন্তানের অনুরূপ স্নেহ করেন তিনি।

“শুকরিয়া বাবা। আল্লাহ ভালো করবেন।”

“ধন্যবাদ চাচা। আমি লজ্জিত এত দিন পর এসে ওদের কথা ভেবেছি। আরো আগেই এখানে আসা দরকার ছিল।”

“সব ই আল্লাহর ইচ্ছা বাবা। তা তুমি বিয়ে করেছ? সন্তান আছে কোনো?”

ফট করে কথাটা বলায় দীপ্র একটু অস্বস্তিতে পড়ল। পর মুহূর্তেই সেটা কাটিয়ে বলল,”বিয়ে করিনি চাচা। দোয়ায় রাখবেন, যেন দ্রুত বিয়েটা করতে পারি।”

“আল্লাহ দ্রুত ইচ্ছে পূরণ করুক।”

বলে দীপ্রর বাহু ছুঁয়ে দিলেন তিনি। দীপ্র দেখল কুহু এদিকেই আসছে। ও ইশারা করল অরণ্য আর রাত্রির বিষয়টা নিয়ে। দীপ্র এগিয়ে এসে বলল,”তুই রাত্রি আর অরণ্যকে বলবি আমি এতিমখানার বাগানের দিকটায় আছি। যেতে বলেছি। ওরা একে অপরের মুখোমুখি ওখানেই হবে।”

“আচ্ছা।”

বলে চলে গেল কুহু। মেয়েটি এই সম্পর্ক নিয়ে অনেক বেশি আগ্রহী। অথচ নিজের বেলায়, একটু ও কি ভাবে?

চলবে…
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply