Golpo romantic golpo প্রণয়ের রূপকথা

প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩২


প্রণয়ের_রূপকথা (৩২)

দুটো দিন অরণ্য আর দীপ্র’র খুব ব্যস্ততা গেল। ব্যবসায়িক ব্যাপার নিয়ে এখানে ওখানে ছুটতে হয়েছে। খাবার খাওয়ার সময় অবধি পায় নি। আজ আবার বাড়িতে সবাই উপস্থিত। সবাই বলতে সবাই। এর কারণ আছে অবশ্য। আবিরের বিয়ের কেনাকাটা করতে হবে। আর এক পক্ষ যাবে, বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করতে। শুরুতে কেনাকাটার বিষয়টা বড়োদের কাছে দিতে চাইলেও, কিছু সময়ের আলোচনায় ঠিক হলো বাড়ির বাচ্চারাই কেনাকাটা করবে। সেটা নিয়েই হৈ হৈ চলছে। তবে আয়ানা গো ধরে বসে। সে নাকি যাবে না। কেন যাবে না, সেটা বলে নি অবশ্য। ওকে মানাতে গিয়েছে আবির। কতক্ষণ চেষ্টা করে মেয়েটিকে নিয়ে এসেছে। তখন সবাই বসার ঘরে। আয়ানা মুখটা গোমড়া রেখেই উপস্থিত হলো। রাত্রি শুধাল,”অভিমান ভাঙল?”

মিনমিন করে আয়ানা বলল,”অভিমান করি নি।”

“তবে? যাবি না কেন?”

“এমনি মন চাচ্ছিল না।”

“আচ্ছা, এসেছিস এখন। বাকি কথা বাদ।”

বলার মাঝেই বসার ঘরে উপস্থিত হলো অরণ্য। ওর উপস্থিতি রাত্রিকে ধীর করে দিল। কুহু সেটা লক্ষ্য করে বলল,”অরণ্য ভাইয়া। চলে এসেছেন। আপনাকে তো আজকাল দেখাই যাচ্ছে না।”

অরণ্য হেসে বলল,”ব্যস্ততা গেল দুদিন। আমাকে একা না, দীপ্রকেও কিন্তু দেখো নি।”

সত্যিই তাই। দীপ্রকেই দেখে নি কুহু। ও একটু চোখ বুলাল। তবে দীপ্র নেই। অরণ্য বলল,”ওদিকে খুঁজে লাভ নেই। দীপ্র গ্যারাজে আছে।”

কথাটা শুনেই আয়ানা বের হয়ে গেল। ওকে সেভাবে কেউ খেয়াল করল না। তবে গ্যারাজের কাছে গিয়ে দেখা গেল, আয়ানা দাঁড়িয়ে। অরণ্য আসা মাত্রই আয়ানা সব গুলো দাঁত মেলে দিয়ে হাসল।

“ভাইয়া আমি সামনের সিটে বসলে আপনার অসুবিধা হবে?”

“আরে না। কী সমস্যা হবে?”

“অহ, থ্যাংক ইউ ভাইয়া।”

বলে গাড়িতে ওঠে বসল আয়ানা। কণা ফোঁড়ন কেটে বলল,”দেখলি আপু। ঠিকই গাড়িতে ওঠে বসল।”

কুহু কিছু বলল না। ও বুঝেছে আয়ানার বিষয়টি। এখানে কিছু বলার ও নেই আসলে। ওর অবশ্য এসব নিয়ে মাথা ব্যথাও নেই। কণা দাঁতে দাঁত চেপে গাড়িতে ওঠে বসল।
ওর পাশে বসল রাত্রি। দীপ্র ঠিক তখনই বলল,”অরণ্য, তুই ও এই গাড়িতে ওঠ।”

এ কথায় রাত্রি নড়েচড়ে ওঠল। অরণ্যও কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ল। তবে সরাসরি মানা করতে পারল না। শেষমেশ অরণ্য ও পেছনে গিয়ে বসল। এদিকে কুঞ্জও এই গাড়িতে ওঠতে চাইল। তবে আয়ানা ধমকে বেচারাকে সরিয়ে দিয়েছে। শেষ মেশ কুহু ওকে নিয়ে বসেছে অন্য গাড়িতে। আয়ানা অপেক্ষা করছে। দীপ্র ভাই আসবে। পাশে বসবে। কিন্তু কিছু সময় পর আবির এসে ড্রাইভিং সিটে বসল। ওকে দেখে আয়ানা বলে ওঠল,”দীপ্র দাদাভাই কোথায়? সে চালাবে না?”

“ও অন্যটায় ওঠল। এই গাড়িতে রাশ বেশি। জানিস তো ও একটু শান্ত পরিবেশ পছন্দ করে।”

আয়ানার মুখটা একদম কালো হয়ে গেল। ওদিকে পেছনের সিট থেকে মুচকি মুচকি হেসে চলেছে কণা। সে বেশ খুশি হয়েছে।

দীপ্রকে দেখে কুহু বলল‍,”সেকি, আপনি কেন?”

কুঞ্জকে নিয়ে পেছনের সিটে বসা ছিল কুহু। দীপ্র এসে ড্রাইভিং সিটে বসল।

“এটা তো আবির ভাইয়ের গাড়ি। ওমা, আপনার গাড়ি তো চলে যাচ্ছে। ওটা কে চালায়?”

“আবির।”

“কেন?”

“ইচ্ছে হয়েছে তাই।”

বলে পেছনে তাকাল দীপ্র। কুঞ্জ হাসি হাসি মুখে বলল,”ইয়ে, ভালো হয়েছে। তুমি এখানে এসেছ দাদাভাই। আমাকে তো ঐ গাড়িতে বসতেই দিচ্ছিল না।”

“তোর জন্যই এসেছি কুঞ্জ।”

“আমি জানি।”

বলে হাসল কুঞ্জ। দীপ্র একটা নিশ্বাস ফেলে বলল,”কুহু, সামনে এসে বোস।”

“আমি? কুঞ্জ যাক?”

“কুঞ্জ বাচ্চা। ও পেছনেই বসুক। সেফটির জন্য ভালো।”

কুহুকে সামনে এসে বসতে হলো। দীপ্র কথা ছাড়াই গাড়ি চালাতে শুরু করেছে। কিছু সময় পর পেছন থেকে কুঞ্জ বলল,”একটা গান ছাড়ো তো দাদাভাই।”

“যে কোনো টাইপ হলে চলবে?”

“একদম। গান হলেই হলো।”

কুঞ্জ আসলেই ভদ্র, মিশুক একটা বাচ্চা। শুধু ওর নিজের বোনের সাথেই বনিবনা যা হয় না। দীপ্র গান ছাড়ল….গান বাজতে লাগল….

যখন খোলা চুলে হয়তো মনের ভুলে
তাকাতো সে অবহেলে দু চোখে
হাজার কবিতা, বেকার সবই তা
হাজার কবিতা, বেকার সবই তা
তার কথা কেউ বলে না
সে প্রথম প্রেম আমার নীলাঞ্জনা
সে প্রমম প্রেম আমার নীলাঞ্জনা

পুরো গানের সময়টাতে কুহু বার বার পাশ ফিরে চেয়েছে। দীপ্র সেটা বুঝেও তাকায় নি একবার ও। গানটা কয়েক বার প্লে হতে হতে ওরা পৌঁছে গেল শপিংমলে। সেখানে আগে থেকেই বাকিরা উপস্থিত ছিল। আয়ানার মুখটা কালো আঁধারে ছেয়ে যায়। কুঞ্জ হৈ হৈ করে নামল গাড়ি থেকে। সবাইকে ভেংচি কেটে বলল,”ভালো হয়েছে। আমাকে ও গাড়িতে বসতে দেও নি কেউ। দাদাভাই তো আমার সাথেই এসেছে।”

কুঞ্জর চুল গুলো নাড়িয়ে দিল দীপ্র। হেসে বলল,”তোরা কেনাকাটা কর। আমি কুঞ্জ আর কুহুকে নিয়ে অন্যদিকে‍ যাই।”

আয়ানা ফট করেই বলল,”আমিও যাব।”

“না। তুমি‍ যাবে না। তুমি আমাকে গাড়িতে বসতে দাও নি।”

“কুঞ্জ!”

চোখ গরম করে চাইল আয়ানা। দীপ্র বলল,”আচ্ছা থাক, তোরা দুজন দু পথে থাক। না হলে ঝগড়া লাগতেই থাকবে।”

দীপ্র, কুহু আর কুঞ্জকে নিয়ে অন্য পথে গেল। আয়ানার এবার কান্না পেয়ে গেল। কুঞ্জ হয়তো বুঝল না, সে তার বোনের কতখানি লস করে ফেলল।

পুরো সময়টা রাত্রি আর অরণ্য একে অপরকে উপেক্ষা করে চলেছে। তবে এবার আর পারল না। দুজনের চোখাচোখি হয়ে গেল। রাত্রি ঠোঁট কামড়ে চাইল। অরণ্য মুখটা গুমোট রেখে বলল,”একটু স্বাভাবিক আচরণ করলেও পারো। মনে হচ্ছে আমাকে দেখলে তোমার শরীর জ্বলে ওঠে।”

“একদমই তাই। ওঠে বলেই স্বাভাবিক আচরণ করতে পারছি না।”

“রাত্রি, আমাকে অপমান করছো। অথচ আমি তোমাদের মেহমান।”

“তোমাকে আমি মেহমান বলে মানি না অরণ্য। তুমি, তুমি….তুমি একটা…

কথা শেষ না করেই পাশ কাটিয়ে চলে গেল রাত্রি। অরণ্যর মুখ খানা অন্ধকারে ভরে গিয়েছে। আচ্ছা, প্রেমের শুরুটা এত দারুণ হয়, অথচ বিচ্ছেদ কেন এত বেদনার?

আইসক্রিম খাবে। বায়না ধরেছে কুঞ্জ। ওরা এসেছে একটা আইসক্রিমের দোকানে। তিনটা আইসক্রিম নিয়ে দাঁড়িয়ে দীপ্র। কুহু বুঝতে পারছে না কি হচ্ছে। সহসাই দীপ্র বলে ওঠল,”বিল দে।”

আকাশ থেকে পড়ার মতন অবস্থা কুহুর। ও নিজের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল,”আমাকে বললেন?”

“হুম। তোকেই বলেছি।”

কুহু যারপরনাই অবাক। ও এই মানুষটাকে বুঝতে পারে না। পার্স থেকে টাকা বের করে বিল মিটায়। কুঞ্জ এখনই খাওয়া শুরু করেছে। দীপ্র একটা টেবিলে হাতের ব্যাগ গুলো রেখে বলল,”তোরা বোস। আমি আসছি।”

আমি আসছি বলে চলে গেল দীপ্র। কুহু পেছন থেকে ডাক দিল,”আপনার আইসক্রিম।”

“এসে খাব।”

“গলে যাবে তো।”

“ড্যাম।”

বলে এগিয়ে এল দীপ্র। কুহুর আইসক্রিমটা খুলে রাখা। ও সেটা এক কামড় খেয়েছে ও। সেটাই তুলে নিয়ে দীপ্র হনহনিয়ে চলে গেল। পুরো বিষয়টা কুহু বেকুব বনে গেল। এদিকে কুঞ্জ মিটিমিটি হাসছে। কুহু তাকাতেই ও বলল “দাদাভাই তো তোমার খাওয়া আইসক্রিম নিয়ে চলে গেল।”

কুহু আসলে কি বলবে বুঝতে পারছে না। এটা কি শুধুই মনের ভুলে করা হলো, নাকি ইচ্ছাকৃত?

চলবে…
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply