প্রণয়ের_রূপকথা (২)
হাজার টাকার নতুন নোট গুলো নাড়াচাড়া করছে কুহু। ঘরে ফিরে কয়েকবার টাকা গুলো গুনেছে সে। গুনে গুনে নিশ্চিত হয়েছে পুরো তেরো হাজার টাকা আছে এখানে। কুহুর মনে পড়ে না, এ জীবনে তার হাতে কখনো তেরো হাজার টাকা ওঠেছে। ও টাকা গুলো বেশ কিছু সময় নাড়াচাড়া করে রেখে দিল পড়ার টেবিলে। তারপর শুয়ে পড়ল চিত হয়েছে। অনেকটা সময় ফ্যানের দিকে তাকিয়ে থেকে স্মরণ করল বাবার স্মৃতি। বাবা নামক মানুষটি জীবনে বড়ো কষ্ট করেছেন। আগে এই এলাকার বেশ নামডাক থাকলেও, সময়ের স্রোতে তা রং হারিয়েছে। এর পেছনে বড়ো একটি কারণ মানুষ কমে যাওয়া। শিক্ষিত, বড়ো মানুষ গুলো এলাকা ছেড়ে আরো ভালো জীবন বেছে নেওয়ার পাশাপাশি এলাকার সাধারণ সৌন্দর্যও নিয়ে গিয়েছে। উন্নয়নের নামে বছরে কোটি কোটি টাকা এলেও, উন্নয়ন হয় না এক চুলও। এমনকি পড়াশোনার ব্যবস্থাও ভীষণ খারাপ। কুহুর বাবার কাদেরের চেষ্টাতেই যা একটু টিকে আছে হাই স্কুলটি। তবে তিনি চলে যাওয়ার পর পরই হেড মাস্টার পদ নিয়ে নানান রাজনীতি যোগ হয়েছে। বাবার কথা স্মরণ করে কুহুর ভেতরটা ছটফট করে ওঠে। ও শোয়া থেকে ওঠে বসে। কয়েক সেকেন্ড মৌন থাকতেই রাত্রির কণ্ঠটা শোনা যায়।
“কুহু, কী করছিস রে।”
রুমের ভেতরে প্রবেশ করতে করতে কথা খানা বলে ওঠে রাত্রি। কুহুর মাথাটা হাঁটুর কাছে গোজা ছিল। ও মুখ তুলে চায়।
“চেহারাটা কেমন ফুলে গিয়েছে। তোর মন খারাপ?”
গাল ছুঁয়ে প্রশ্ন করে রাত্রি। কুহু একটু থেমে থেকে অধরে হাসি আনে।
“মন খারাপ কেন হবে রাত্রিপু?”
“এই যে দীপ্র ভাই বিয়েটা ভাঙল।”
“ভালোই তো হয়েছে।”
“ভালো হয়েছে?”
“হ্যাঁ। আমিও তো চাই নি বিয়েটা হোক। বাবা থাকলে, বাবাও চাইতেন না এই বিয়েটা হোক। তুমি তো জানোই, বড়ো চাচ্চুর প্রতি বাবার কতখানি রাগ ছিল।”
“না রে, রাগ না। অভিমান ছিল। যদি বড়ো মামা আগে ফিরতেন, তাহলে দেখতি ছোট মামা ঠিকই ভাইকে জড়িয়ে নিতেন।”
কুহু এ কথায় কিছু বলে না। ওর চোখ দুটো ছলছল করে। সেটা দেখে রাত্রি বলে,”বোকা,কাঁদছিস কেন?”
“বাবা কেন চলে গেল রাত্রিপু? কেন চলে গেল বলো তো।”
“সবাইকে চলে যেতে হয় রে।”
“তাই বলে, এত আগে? এভাবে? আমাকে বাবা পর করে দিয়ে গেল রাত্রিপু। পর করে দিয়ে গেল।”
বলতে বলতে কুহুর কান্না বাড়ে। রাত্রির ভেতরেও কষ্টের বৃষ্টি ঝড়ে। ও দু হাতে আগলে নেয় কুহুকে। রাত্রিকে জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে কুহু। কয়েক মুহূর্ত পর নিজেকে সামলে নেয়। বুক থেকে মাথা তুলে অশ্রু মুছে হাতের তালুতে। রাত্রি চেয়ে চেয়ে দেখে। এক পর্যায়ে নজর যায় টেবিলের ওপর। যেখানে হাজার টাকার নোট গুলো রাখা।
“কী রে, এখানে এত গুলো টাকা কেন রাখা?”
ওঠে দাঁড়ায় রাত্রি। টাকা গুলো তুলে নিয়ে বলে,”অনেক গুলো টাকা তো। এভাবে ফেলে রেখেছিস কেন? ফ্যান ও ঘুরছে। কোথাও ওড়ে গেলে?”
“টাকা গুলো দীপ্র ভাই দিয়েছেন।”
“দীপ্র ভাই?”
“হুম।”
রাত্রি মৌন হয়। কিছু সময় গেলে কুহুর পাশে এসে বসে। হাত বাড়িয়ে বাহু স্পর্শ করে।
“এই কারণে তোর মন খারাপ?”
“দায়িত্বের সাথে টাকার কি সম্পর্ক রাত্রিপু? সে কি আমায় অপমান করল?”
“না রে। অপমান কেন করবে? দীপ্র ভাইকে তোর তেমন মনে হয়? এত বছর পর দেশে এসেছে। বল, আচরণ কি স্বাভাবিক না? বিদেশে থাকা সত্ত্বেও কি অহমিকা আছে? নেই তো। এটা তোর নিজস্ব খরচের জন্য দিয়েছে কুহু। তুই ভাব, টাকা ছাড়া জীবন চলে? চলে না তো। আবেগ দিয়ে না ভাবলেই তুই উত্তর পেয়ে যাবি।”
এত গুলো কথা বলে তবেই থামল রাত্রি। কুহু শুনল। তবে জবাব দিল না। ওর ভেতরটায় তখনো বাবার শোক। মন বলছে,’বাবা, কেন তুমি চলে গেলে? কেন চলে গেলে বাবা। আমাকে কেনই বা পর করলে তুমি?’
বাবা নামক ছায়া হারিয়ে কুহুর ভেতরটা বড়ো অশান্ত। হবেই না বা কেন? ও যে বড়ো বাবার নেউটা ছিল। বাবার কথার বাইরে একটি কথাও বলেনি। কখনোই না। বাবার সিদ্ধান্ত সর্বদা লালন করেছে। কোনো রকম যদি কিন্তু ছাড়াই লালন করেছে। অথচ আজ তার মাথার ওপর থেকে বাবার হাত খানা সরে গিয়েছে। যেই হাত আর কখনো স্নেহ দেবে না।
রাতের খাবার খেতে সবাই এক হয়েছে। বাড়ির ছোট সদস্য কুঞ্জ থেকে শুরু করে, সবথেকে বৃদ্ধা দাদিজান ও আছেন। এ বাড়িতে রাতের খাবার খাওয়াটা এক সাথেই হয়। কুঞ্জর চোখে ঘুম ঘুম। সে কুহুর মেজো চাচা আনোয়ারের ছেলে। কুঞ্জর এক বোন ও রয়েছে। নাম আয়ানা। মেয়েটি শহরের হাওয়া পেয়ে বদলে গিয়েছে পুরো ষোলো আনা। এই যে যেমন এ বাড়িতে এসেই তার এটা সেটা অভিযোগের লিস্ট হয়েছে। এখন তার চোখে মুখে বিরক্তি। তার ভাবনায় আসে না কেন রাতের খাবার সবাইকে এক সাথে খেতে হবে। এসব নিয়ম বড়ো অযৌক্তিক। ও এটা নিয়েই মায়ের সাথে রাগারাগি করছিল। তখনই দীপ্রকে আসতে দেখা গেল। যার দরুন থেমে গেল ওর কথা।
“এদিকে এসে বসো।”
হাতের সাহায্যে ডাকলেন দাদিজান। নাতি এত বড়ো অন্যায় করার পর ও তাকে আদর করে ডাকছেন তিনি। বিষয়টা দেখে আয়ানার মা আবিদা ভ্রু কুঁচকালেন।
“দীপ্র’কে বরাবরই সবাই মাথায় তুলে রাখে।”
আয়ানা মায়ের কথায় ঠোঁট কামড়ে ধরল। কিছুটা চিবিয়ে বলল,”তাতে কী হয়েছে?”
“একটু আগেই তো বিরক্তিতে ম রে যাচ্ছিল। এখন এসব চোখে দেখিস না?”
“উফ মা। দীপ্র দাদাভাইয়ের স্ট্যান্ডার্ড অনেক ওপরে। আমি নিজেই মানতে পারছিলাম না কুহুর সাথে ওনার বিয়ে হচ্ছে! কুহু কতটা ক্ষ্যাত তা দেখো না?”
মেয়ের কথায় অনেক কিছু বুঝলেন আবিদা। তাই বাহু টেনে আড়ালে নিয়ে এলেন।
“এভাবে টেনে আনলে কেন?”
বাহু ছাড়িয়ে নিয়ে কথা খানা বলল আয়ানা। আবিদা চোখে মুখে আঁধার ধরে রেখে বললেন,”তোর মনে কী চলে বল তো?”
“কী চলে?”
“দীপ্র’র প্রতি এত দরদ। এমনিতে তো আর কাউকে দু চোখে সহ্য করতে পারিস না।”
আয়ানা একটু থতমত খেল। এড়িয়ে যেতে বলল,”এত কথা ধরো না তো।”
পাশ ফিরতেই পুনরায় মেয়ের বাহু চেপে ধরলেন আবিদা। চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন,”মায়ের সাথে চালাকি করিস?”
“উফ মা! চালাকির কী আছে?”
“দীপ্রকে পছন্দ করিস?”
“না করার কী আছে? ওনার স্ট্যান্ডার্ড দেখেছ? গুড লুকিং, বিদেশে পড়াশোনা করছে, আবার বিজনেস ও শুরু করেছে। আমি ড্যাম সিওর সফল ও হবে। আর এত অল্প বয়সে এত এত এচিভমেন্ট। তো যে কেউ পছন্দ করবে।”
আবিদা মেয়ের দিকে ভালো মতন চাইলেন। বুঝতে পারলেন, কন্যার অনুভূতি। সত্যি বলতে না মানতে চাইলেও, দীপ্রকে তারও ভীষণ পছন্দ। ছেলেটা ছোট বেলা থেকেই যেমন সুদর্শন ঠিক তেমনই মেধাবী। কিন্তু সমস্যা হলো, তার কন্যার রূপ থাকলেও, গুণের বেলায় একেবারেই খালি কলসি।
| সকলের মন্তব্য চাই। কুইক কুইক জানান কেমন হচ্ছে। অনেক বেশি ভালোবাসা জানবেন। |
চলবে….
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি
Share On:
TAGS: প্রণয়ের রূপকথা, ফাতেমা তুজ নৌশি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১৭
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৯
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১২
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৮
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২২
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১১
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৫
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২০