Golpo romantic golpo প্রণয়ের রূপকথা

প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৮


প্রণয়ের_রূপকথা (২৮)

কদিনেই হোটেলের সব আয়োজন শেষ করে ফেলা হয়েছে। সবাই মিলেমিশে করায় এতটা দ্রুত সব সম্ভব হয়েছে। দুদিন পরই হোটেলের উদ্বোধন। ববিতা ভীষণ চিন্তায় আছেন। তাই এসেছেন শাশুড়ির কাছে। একটু কথা বলে যদি মন হালকা হয়।

“চিন্তা কোরো না ছোট বউ।”

“চিন্তা তো হচ্ছেই আম্মা। এত গুলো টাকা দিয়ে হোটেল করা হলো। যদি ভালো সাড়া না পাই।”

“পাবা, পাবা। আল্লাহ আল্লহ করো।”

“তা তো করি আম্মা। তবু ভয় হচ্ছে।”

“ভয় পেও না। সব ঠিক হবে।”

“হুম।”

বলে ববিতা চুপ হলেন। বৃদ্ধা একটু সময় পর বললেন,”একটা কাজ ভালো করছো।”

“কী আম্মা?”

“দীপ্রর সাথে কুহুরে মিশতে দিয়ে।”

“কী করব আম্মা। আর কিছু তো করার নেই। আমার ও আর ভালো লাগে না।”

“ভালো কাজ হয়েছে এটা। দুজনে একসাথে থাকুক। মিশুক,বুঝুক একে অপরকে।”

বিপরীতে ববিতা বললেন,”আম্মা, আপনি কি আমায় কোনো ইঙ্গিত দিতে চাইছেন?”

“ইঙ্গিত না। সরাসরিই বলি। দুজনের বিয়ের বিষয়ে ভাবতে হবে না?”

“এটা হয় না আম্মা। দীপ্র বিয়ে ভেঙেছে। আমার মেয়েটার সম্মান গিয়েছে। হ্যাঁ, আমি এখন স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখতে চাচ্ছি। কিন্তু ঐ বিষয়টা কি মিথ্যে হয়ে যাবে?”

“আচ্ছা,সেটা সময়েই বলুক না। ওরা দুজন যদি চায়।”

“সেটা ভিন্ন আলাপ আম্মা। কিন্তু আমি আর আমার মেয়েকে জোর করব না। কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়েও দেব না।”

বলে ববিতা নিজের সিদ্ধান্ত জানালেন। কুহুর প্রতি একটা অন্যায় তিনি করে ফেলেছেন। সেটির জন্য রোজ হৃদয়ে ব্যথা অনুভব করেন তিনি।

দীপ্র-কুহুর এক সাথে কাজ করাটা সবথেকে বেশি প্রভাব ফেলল আয়ানার ওপর। ও দুদিন নিজের ঘরে কেঁদেছে। একদম চোখ লাল করা কান্না। বিষয়টি আবিদা যখন বুঝেছেন তখনই স্বামীর সাথে আলাপ করেছেন। ওনার স্বামী সবটা শুনে একটা সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানিয়েছেন। কিন্তু হুট করেই সেই সিদ্ধান্তটা নেয়া যায় না। একটু সময় প্রয়োজন। সেই সাথে প্রয়োজন বড়ো ভাইয়ের সাথে সম্পর্কের ঝালাই। আরো একটি বিষয়ও প্রয়োজন। সেই জন্যই এসেছেন তিনি। ভাইয়ের সাথে আলাপে বসেছেন। আনোয়ার বললেন,”ভাইজান, কি ভাবলেন? বিদেশে ফিরবেন এর মাঝে?”

“ফেরার তো একটা ইচ্ছে আছে আনোয়ার। ওখানে সব ফেলে এসেছি। তবে দীপ্রর জন্য সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না।”

“কেন? ওর কী মতামত?”

“ও দেশেই থাকতে চাচ্ছে। ব্যবসাটা করবে না বলেও স্থির করেছে।”

আনোয়ারের ভ্রু কুঞ্চিত হলো। একটু সময় নিয়ে তিনি বলল‍েন,”ওর ব্যবসার গ্রোথ তো খুব ভালো। এটা তো বোকামি হবে।”

“তা তো আমিও ভাবি। দেখি কি করে। এখন আমিও সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। ছেলেটাকে এখানে রেখে যে ফিরব সেটাও তো একটা চিন্তা।”

হাসলেন আনোয়ার। বললেন,”কি যে বলেন ভাইজান। চিন্তা কীসের? এখানে আমি আছি। দীপ্র কি আমার ছেলে নয়?”

“হ্যাঁ, তোরা তো আছিস। তবু ওকে নিয়ে চিন্তা হয়। আমার একটা মাত্র সন্তান।”

আনোয়ার আরো কিছু কথা বলে এলেন কক্ষে। সেখানে আগে থেকেই আবিদার সাথে আয়ানাও ছিল। বাবাকে দেখেই আয়ানা বলল‍,”চাচ্চুকে বিয়ের বিষয়ে বলেছ?”

“এত তাড়া কীসের?”

“তাড়া কীসের মানে। তুমি বুঝো না বাবা? কুহুর নজর দীপ্র দাদাভাইয়ের ওপর।”

“শোনো এত দ্রুত চাইলেই বলা যাবে না। সম্পর্কটা আরেকটু মজবুত করতে দাও।”

“আবার কীসের মজবুত?”

“আবিদা, মেয়েকে সামলাও। ওর মাথা খারাপ হয়ে আছে। আমি যদি বিয়ের বিষয়ে বলি আর ভাইজান রাজি না হোন। তখন কী হবে? ভেবেছে ও?”

আবিদা মেয়ের দিকে চাইলেন। চোখের ইশারায় শাসন করে বললেন,”তোর বাবার কথার গুরুত্ব বুঝতে পারছিস?”

আয়ানা জবাব দেয় না। ওর যে আর সহ্য হয় না। দীপ্র দাদাভাই কুহুকে সাথে নিয়ে এখানে ওখানে যাচ্ছে। আর ও সেসব চেয়ে চেয়ে দেখছে। কিচ্ছু করতে পারছে না।

লম্বা একটা লিস্ট নিয়ে এসেছে দীপ্র। কুহু নিজের ঘরে। দীপ্র ঠকঠক আওয়াজ করে বলল,”ঘরে তুই?”

কুহু পড়ছিল। ইদানীং তার মনটা একটু স্থির হয়েছে। পড়াশোনা আর হোটেলের কাজে মস্তিষ্ক ব্যস্ত হয়েছে। দূর হয়েছে নিজের একাকিত্ব। তাই দুঃখটা আগের মতন টের পায় না। কুহু বই রেখে বলল,”আছি।”

লিস্ট নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল দীপ্র। কুহু বসা ছিল। দীপ্রকে দেখে দাঁড়িয়ে গিয়েছে।

“বোস।”

এক পলক দেখে নিয়ে বলল দীপ্র। কুহু বসল। দীপ্র লিস্টে থাকা খাবারের নাম গুলো বলে বল‍ল,”কোনো কিছু এড কাট হলে জানা।”

কুহু মেন্যুর লিস্ট হাতে নিল। ভালো মতন পড়ল। তারপর বলল‍,”স্কুলের বাচ্চাদের জন্য আলাদা কিছু করার কথা মাথায় এসেছিল। মা কিছু হেলদি নাশতা বানাতে পারে। ওগুলো যদি লাভ ছাড়া ওদের জন্য দেয়া যায়। তাহলে ভালো হয়।”

এতদিন পর কুহুর মস্তিষ্ক ঠিক ঠাক কাজ করতে পারছে। দীপ্র একটু সময় নিয়ে বলল,”আইডিয়া ভালো। বাচ্চাদের জন্য সুবিধা হবে। কিন্তু হোটেল আর স্কুল বেশ খানিকটা দূরে। এটা কিন্তু সমস্যা।”

“ওদের জন্য খাবার নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। ক্যান্টিনের খাবার দিনকে দিন আরো খারাপ হয়েছে। মানহীন করে ফেলেছে। আমি জেনেছি বিষয়টা। তখনই মাথায় এসেছে ওদের জন্য কিছু করা গেলে ভালো হবে।”

“ওকে। এটা আমি দেখছি। বাড়তি একটা লোক নিতে হবে।”

“আচ্ছা।”

“মেন্যুতে কিছু এড কাট করতে হবে?”

“না। সব ঠিক ঠাক।”

“ওকে।”

“লিস্ট কি আপনি করেছেন?”

“হুম। ভালো হয়নি?”

“না। হয়েছে। বেশ ভালো হয়েছে।”

“আচ্ছা।”

দুজনের কথা ফুরালো। দীপ্র ওঠে যেতে নিলেই কুহু কিছু বলতে নিয়েও আটকে গেল। দীপ্র সেটি বুঝতে পারল। শুধাল,”কিছু বলবি?”

গলায় এসে আটকে যাচ্ছে কথা গুলো। কুহু শুকনো ঢোক গিলে বলল,”না।”

দীপ্র চলে যেতেই আগমন হলো আয়ানার। মেয়েটি বোধহয় এখানেই ঘুরঘুর করছিল। সুযোগ পেয়েই ঘরে প্রবেশ করল।

“বাহ, ভালোই তো।”

ঠেস দিয়ে বলল আয়ানা। কুহু একবার দেখে নিয়ে বিছানা ঠিক করায় ব্যস্ত হলো।

“দীপ্র দাদা ভাইকে পটানোর কোনো রকম উপায়ই তো বাদ দিচ্ছিস না কুহু।”

হাসি পেল কুহুর। সে পটাতে চাচ্ছে? এ কথার মতন যুক্তিহীন কথা বোধহয় দুটি নেই।

“আমি আগেও ক্লিয়ার করেছি আয়ানাপু।”

“উম, তোকে ভরসা তো করি না। তুই আর তোর বোন যা শেয়ানা।”

“শেয়ানা তুমি কি কম?”

মুখের ওপর জবাব দিল কুহু। আয়ানা ঠোঁট কামড়ে বলল,”ভালোই তো মুখ থেকে কথা বের হচ্ছে আজকাল।”

“মুখ থেকে কথা বের করা কি শুধু তোমার অধিকার? লেখা আছে নাকি কোথাও?”

“শোন কুহু।”

“কিচ্ছু শুনতে চাচ্ছি না। যেচে পড়ে ঝগড়া করবে না আয়ানাপু। ভালো ব্যবহার করে এসেছি দেখে আরো বেশি পেয়ে বসেছ।”

“তোর ভালো ব্যবহারের পেছনে যে মুখোশ আছে সেটা তো আমি জানি।”

“জানো, তো ভালো। যা ইচ্ছে করো।”

“করব। ঠিকই করব। শুধু একবার সময় আসুক।”

একদম মুখের সামনে এসে কথাটা বলল আয়ানা। কুহু জবাব দিল না। আয়ানা এবার আঙুল উঁচু করে বলল,”দীপ্র দাদাভাইয়ের ওপর নজর দিস না। ফল ভালো হবে না।”

“তুমি আমাকে ধৈর্য হারা করে দিচ্ছ আয়ানাপু। আমি ক্লিয়ার করেছি আমি ওনার প্রতি আগ্রহী না। কিন্তু তুমি বিষয়টা বাড়াচ্ছ। এক কথা কত বার বলব?”

“ওকে। আগ্রহী না হলেই ভালো। এমনিতেও দীপ্র দাদাভাইয়ের সাথে আমার বিয়ে নিয়ে কথা চলছে।”

এই পর্যায়ে কুহু আসলেই অবাক হলো। ওর ভ্রু কুঞ্চিত হলো। ভেতরে ভেতরে আসলেই কথা বার্তা চলছে তবে? কুহু তো এমন কিছু শোনে নি। আর দীপ্র ভাইকে দেখেও তো মনে হয় না আয়ানাপুর সাথে তেমন কোনো সম্পর্ক আছে। ও যখন গভীর ভাবনায় ডুবে। আয়ানা তখন গর্বের মতন করে বলে,”আর মাত্র কিছুদিন। তারপরই দীপ্র দাদাভাই আমার হবে।”

বলে বাঁকা হাসল আয়ানা। ও মূলত এসেছিলই কুহুর কানে বিয়ের বিষয়টি প্রবেশ করাতে।

চলবে…
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply