প্রণয়ের_রূপকথা (২৬)
কয়েকটা দিন কীভাবে যেন কেটে গেল। সকাল সকাল গাছে পানি দিচ্ছিল কুহু। আলগোছে দীপ্র এসে দাঁড়াল। মানুষটার উপস্থিতি বুঝতে পেরে কুহু বলল,”কিছু বলবেন?”
“হুম।”
ওঠে দাঁড়াল কুহু। পানির মগখানা বালতিতে রেখে বলল,”বলুন।”
“আয়ানা সমস্যা করছে?”
“না।”
“আমার চোখে ধরা পড়েছে। মিথ্যে বলছিস কেন?”
“আপনাকে সমস্যা দিতে চাচ্ছি না।”
“হুট করে কেন মনে হলো আমাকে সমস্যা দিচ্ছিস?”
কুহু জবাব দিল না। দীপ্র চোখ মুখ শক্ত করে বলল,”তোর সমস্যাটা কী?”
“আমার সমস্যা আমি নিজেই। আমার জন্য সব এলোমেলো হয়ে গেছে। আমি দোষ করেছি। আমিই দোষ করেছি। দোষ করেও আপনাকে দোষারোপ করি। এখন কী করব বলেন? ম রে যাব? এটাই বাকি। আর নিতে পারছি না।”
বলে কুহু পা বাড়িয়ে চলে গেল বাড়ির ভেতর। একটু দূরেই দাঁড়িয়ে ছিল রাত্রি। ও এসে দাঁড়াল। থমথমে মুখশ্রী।
“ওর কী হয়েছে?”
“আমি আসলে…
বলে একটু থামল রাত্রি। দীপ্র দৃষ্টি ঘুরাল। রাত্রি কিছুটা আমতা আমতা করে বলল,”আমি বকা দিয়েছি দীপ্র ভাই। ওর মাথায় কি চলে বুঝতে পারি না। সারাক্ষণ তোমাকে দোষ দেয়। অথচ দোষ তো ও নিজেই করেছে। একটা বিষয় মানতে পারে না। মানতে পারে না বিয়ে ভাঙাটা। অথচ ও নিজেই বিয়ে ভাঙত। ও এক কথাতেই থাকে। কেন তাকে অপমান করা হলো। কিন্তু ও অন্যকে অপমান ঠিকই করতে পারবে। এটা কেমন যুক্তি? রাগ লাগছিল। বকা দিয়েছি।”
দীপ্র কিছু বলল না। কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে দম ফেলল। রাত্রিই বলল,”আমার ইদানীং কিছু ভালো লাগে না। কী হচ্ছে দীপ্র ভাই?”
“কুহু এখনো চাচার মৃত্যুটা মেনে নিতে পারেনি। ওর মনে হয়, আমরা সব কিছু লোক দেখানো করছি। বিশেষ করে আমি। অথচ…”
“তাই বলে, এভাবে তোমাকে দোষ দেবে?”
“জানি না। ঘুরে ফিরে আমারই দোষ হচ্ছে। ওর সাথে কী একটু খোলামেলা কথা বলা উচিত? দয়া, দয়া বলে মাথাটা খেয়ে নিচ্ছে। আমি কখনোই কিছু দয়া থেকে করিনি। বরং…ওর ভালো চেয়েছি। মাঝে একটা ভুল করেছি, বিয়েটা আগে না ভেঙে, একদম শেষ সময়ে ভেঙে। ওটার জন্য আরো সব এলোমেলো হলো।”
দীপ্র এবার একটু থামল। চাইল রাত্রির দিকে। বলল,”তুই ই বল, ওর সাথে কথা বলা উচিত তাই না?”
দীপ্রর কণ্ঠটা বেশ অসহায় লাগল। রাত্রি কিছু বলার আগেই গাড়ির হর্ন বেজে ওঠল। ওরা দেখল ছোট চাচি ফিরেছেন।
“মামি কেমন আছ?”
এগিয়ে গেল রাত্রি। এল দীপ্রও। ববিতা মলিন মুখে বলল,”ভালো আছি রে। তোরা কেমন আছিস?”
“ভালো। হাতের ব্যাগ গুলো দাও।”
বলতেই রাত্রিকে থামিয়ে দীপ্র বলল,”আমি নিচ্ছি।”
ব্যাগ গুলো তুলে নিল দীপ্র। তবে মুখে কোনো কথা বলল না। ববিতাও আর কিছু বললেন না। ছোট ছোট পায়ে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করলেন।
মাকে দেখে এক প্রকার কেঁদেই ফেলল কণা। জড়িয়ে ধরে রইল অনেকক্ষণ। কুহু চাইলেও পারল না জড়িয়ে ধরতে। ওর কেমন অসহায় লাগল। সেই সাথে অনেকটা ভয়ও লাগল। পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টা আয়ানা জানার পর থেকেই ওর মস্তিষ্ক ঠিক ঠাক কাজ করছে না। মেয়েটির রোজ রোজ হুমকি শুনে, সত্যিই ভয় কাজ করে।
“কুহু। এদিকে আয়।”
এগিয়ে এল কুহু। ববিতা কন্যার মুখে হাত রাখলেন। এরই মধ্যে বাড়ির অন্যান্য সদস্যরাও চলে এলেন। পুরো বসার ঘর জমজমাট হয়ে গেল। সবাইকে এতদিন পর দেখে ববিতার কেমন একটা লাগল। তিনি খুব একটা সময় থাকলেন না। চলে এলেন নিজের ঘরে।
দুপুরের খাবার খেয়ে ববিতা এলেন শাশুড়ির কক্ষে। নারীটির মুখ দেখেই যা বোঝার বুঝে নিলেন বৃদ্ধা। ববিতা ঠোঁট কামড়ে বললেন,”আমার কপালটাই খারাপ আম্মা। কপালটাই খারাপ।”
এতদিন ধরে ভাইদের জন্য অপেক্ষা করেছেন ববিতা। কিন্তু দিনশেষে লাভের লাভ কিছুই হয়নি। বোন সম্পত্তি নিবে এ কথা শুনেই যে যার আসল রূপ দেখিয়ে দিয়েছে। উপায় না পেয়ে বিচার বসিয়েছিলেন ববিতা। বৃদ্ধা ছোট করে নিশ্বাস ফেললেন।
“কান্নাকাটি করিও না ছোট বউ। আল্লাহ যা রেখেছেন কপালে।”
“আমার সাথেই সব সময় এমন কেন হয় আম্মা? আমার ভাইয়েরা, এতদিন তো সম্পত্তি নেয়ার কথা বলিনি। বিপদে পড়েই তো গিয়েছিলাম।”
“কান্নাকাটি কোরো না। বিপদ একটা সময় পর কেটে যাবে।”
“তা কেটে যাবে আম্মা। কিন্তু ভাইদের সাথে সম্পর্ক আর ঠিক হবে না। তারা ধরেই নিয়েছিল, এ বাড়ির বউরা সাধারণ ভাবেই বাবার বাড়ির সম্পত্তি আনে না। তাই আমিও সেই প্রক্রিয়ায় আটকে থাকব। আর তারা নিজেদের ভাগ বৃদ্ধি করবে। দিন শেষে সবাই কি স্বার্থপর আম্মা?”
ববিতার বুক ভেঙে কান্না এল। সম্পত্তি বিক্রি করে আসার পাশাপাশি সমস্ত সম্পর্কও শেষ করতে হয়েছে। ভাইরা সরাসরি বলেছেন, সব সম্পর্ক শেষ।
অনেক গুলো টাকা জমা দিল কুহু। সে বরাবরই ভালো স্টুডেন্ট। এমন না পাবলিকে পড়তে পারত না। অবশ্যই পারত। কিন্তু রাজনীতির মুখোমুখি না পড়তে হয় যেন সেই জন্যই বাবা ভর্তি করালেন প্রাইভেটে। বাবা বেঁচে থাকাকালীন সমস্যা হতো না। কষ্ট করে হলেও বাবা সব জমা করে দিতেন। তার চলে যাওয়ার পরই এত গুলো বকেয়া হলো। খুব খারাপ লাগল কুহুর। ও বাড়ি ফিরেই মায়ের কাছে এল। নারীটি তখন বসে বসে হিসাব করে নিচ্ছিলেন।
“এসেছিস কুহু?”
“হুম।”
“বোস, একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে চাচ্ছি।”
ববিতার অপর পাশেই বসল কুহু। মা বললেন,”টাকা যা পেয়েছি, বসে খেলে কিছুই থাকবে না। আমি কোনো একটা ব্যবসা করার কথা ভাবছিলাম।”
“তেমনটা হলে তো ভালো হয় মা। কিন্তু তুমি…
ওকে থামিয়ে দিয়ে নারীটি বললেন,”পারব না ভাবছিস?”
“সেভাবে বলতে চাইনি মা।”
“না। বুঝতে পেরেছি। শোন, বিপদে পড়লে কত কিছু করতে হয়। আর সফলতা ও আসে। কিন্তু কী নিয়ে কাজ করব সেটাই ভাবছি। সেলাইয়ে কাজ তো পারি। এটা দিয়ে কিছু একটা…
কণা পাশেই বসা ছিল। হুট করেই বলে ওঠল,”এটা কী বাংলা সিনেমা মা? যে সেলাই মেশিন দিয়ে তুমি বড়োলোক হয়ে যাবা। আর তুমি সাবানাও না।”
“সাবানা না হলেও আমি কিন্তু ববিতা। সেটা ভুলে গেলি?”
একটু রসিকতা করে বললেন তিনি। কণা কয়েক সেকেন্ড মৌন থেকে বলল,”তাও ঠিক। তুমি সাবানা না হলেও ববিতা। মানে বাংলা সিনেমার নায়িকা। তবে এই সেলাই মেশিনের প্ল্যান বাদ দাও মা। অন্য কিছু প্ল্যান করো।”
“কী করব তাহলে? আইডিয়া দে।”
কণা বেশ আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে এল। বসল মায়ের পাশে। তারপর বলল,”আমরা খাবারের বিজনেস দিতে পারি না? তুমি তো ভীষণ ভালো রান্না করো মা। সেরার সেরা।”
“খাবারের?”
“হুম।”
“তা দেয়া যায়। কুহু তোর কী মতামত?”
কুহু মা আর বোনের দিকে চেয়েছিল। দুজন বেশ আগ্রহ নিয়ে কথা বলছে। ওর ভালো লাগছিল সেসব দেখে।
“কী রে? বল, খাবারের বিজনেস করব কী?”
“করা যায় মা। আমাদের এলাকায়, ভালো খাবারের হোটেল খুব কম। আশা করি সফল হব।”
“তাহলে ভেবে দেখি। আর কয়েক জনের সাথে কথাও বলি। একা তো পারব না।”
সেদিন বিকেলেই পুরোপুরি পাকাপোক্ত হয়ে গেল খাবারের হোটেল দেয়াটা। তা শুনে আবিদা বললেন,”মহিলা মানুষ হোটেল চালাবে?”
“কেন আপা? রান্না বান্না করতে পারলে হোটেল কেন চালাতে পারব না?”
“তা করো। মানা তো করছি না। শুধু বললাম।”
বলে আবিদা কেমন চোখে তাকালেন। খানিকটা অহং বোধ তার আছে। শহরের আবহওয়াটা বেশ ভালোই গায়ে লেগেছে।
চাচি হোটেল দেবে, এটা শুনে দীপ্রই খুশি হলো। ও সরাসরি কথা বলার পর ববিতা অনেকটাই স্বাভাবিক হয়েছেন। হওয়ারই কথা। অনেক গুলো দিন চলে গেল। সবটা ঠিক হলেই ভালো হয়।
“চাচি, আমি আসলেই সরি। আমার ভুলটা বুঝতে পারছি।”
“থাক রে দীপ্র। ওসব আর মনে করিস না। উল্টো কষ্ট লাগবে। তার থেকে ভালো হয় সব স্বাভাবিক হোক।”
সত্যি বলতে ববিতা অনেকটাই নরম হয়ে গিয়েছেন। ভাইদের সাথে সম্পর্ক শেষ করে এসে, এখন তিনি ভয়ে আছেন। আর কোনো সম্পর্ক শেষ করতে চাচ্ছেন না। তার থেকে ভালো, যেভাবে যা চলছে চলুক। দীপ্র একটু সময় পর বলল,”আমি কেনাকাটার লিস্ট করি? কণার খুব আগ্রহ। ওকে সাথে নিই?”
ববিতা সায় জানালেন। দীপ্র মৃদু হেসে বলল,”আর একটা কথা বলব?”
“হ্যাঁ,বল।”
“কুহুকে নিতে পারি? ওর সাথে স্বাভাবিক হওয়া দরকার।”
সত্যি বলতে ববিতার মন খুব একটা সায় দিচ্ছে না। তবে মুখের ওপর মানা করতে কেমন যেন লাগছে।
“না চাইলে, থাক।”
“না, সমস্যা নেই। আমি বলে দিচ্ছি। কুহুও তোদের সাথে থাকবে।”
চলবে….
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি
Share On:
TAGS: প্রণয়ের রূপকথা, ফাতেমা তুজ নৌশি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৬
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১৭
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১২
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২১
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১১
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৯
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩০
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৮
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১৩
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২২