প্রণয়ের_রূপকথা (২৪)
আয়ানার সমস্ত শরীর জ্বলে ওঠল। কুহু মাত্র কি বলে গেল। সেটা ভাবতেই ওর মাথায় আগুন জ্বলে যাচ্ছে। ও ঘরময় পায়চারী করতে করতে পৌঁছাল মায়ের কক্ষে। মাথা ঠিক নেই। মা ঘুমিয়ে আছেন। ও ডেকে তুলল। আবিদা বিরক্তি নিয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে। ঘটনা বলতে গিয়ে আয়ানার মনে পড়ল দীপ্র দাদাভাইয়ের কথা। সে মানা করেছে কথা পাঁচ কান করতে। যদি বিষয়টা সে এখনই বলে দেয়, তবে দীপ্র দাদাভাইয়ের চোখে খারাপ হতে হবে। এটা কিছুতেই হতে দেয়া যাবে না। মেয়ের থম ধরা দেখে আবিদা ধমকে ওঠলেন।
“কথা বলিস না কেন? সকাল সকাল কী শুরু করলি?”
“না। কিছু না। ঘুমাও।”
তিনি তাজ্জব বনে গেলেন। আয়ানা অলস পায়ে বেরিয়ে এল। ভাবতে লাগল সামনেটা নিয়ে। কুহুকে সে যতটা সহজ ভাবে নিয়েছিল মেয়েটি অতটাও সহজ নয়। ও ভেতরে ভেতরে বড্ড শেয়ানা।
সকালের নাশতার টেবিলে দুজন নতুন মানুষের আগমন হলো। নতুন বলতে এরা বাড়িরই সদস্য। তবে দীর্ঘ দিন পর আসা। রাত্রির বাবা আর মা। মোটামুটি উৎসব লেগে যাওয়ার মতন অবস্থা হলো। দীপ্রর ফুপি সালমা বললেন,”কতদিন পর সবাই আমরা। শুধু ছোট ভাবি…
বলে থামলেন তিনি। কুহুর দিকে চেয়ে বললেন,”এই কুহু। ভাবি কবে আসবেন?”
কুহু ঠিক ভাবে বলতে পারল না। দাদিজান এমনিতে ঘরে খাওয়া দাওয়া করলেও আজ এসেছেন টেবিলে। অনেকটা চাঙ্গা দেখাচ্ছে তাকে।
“কাজ শেষ করে আসতে বলেছি। যা ঝড় যাচ্ছে ছোট বউয়ের ওপর।”
“আম্মা, ভাবি চাইলে কিন্তু সবটা সুন্দর হতে পারত। কিছু জমি বিক্রি করলেই তো হয়।”
এ কথা বলতেই বৃদ্ধা একটু চটে গিয়ে বললেন,”যেটুকু আছে, তাও শেষ করুক? বংশের কিছুই আর না থাকুক?”
সালমা একটু দমে গেলেন। অতীতে ভাইরা যখন সম্পত্তি ভাগাভাগি করল। তখন সেও ভাগ পেয়েছে। উপায় না পেয়ে ভাইদের সাথে বিক্রি করেছে। তবে দুই ভাইয়ের মতন স্বার্থপর ছিলেন না তিনি। নিয়মিত ছোট ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ ছিল তার। বাড়ির খোঁজ খবর নিয়েছেন সব সময়। সালমা ছোট করে বললেন,”দুঃখিত আম্মা। আসলে এই পরিস্থিতি তো নেয়া যাচ্ছে না। আমার দুই ভাতিজির ভবিষ্যৎ আছে না?”
“আলবত আছে। আল্লাহ যা রেখেছেন ভাগ্যে তাই হবে। তোমার ছোট ভাই ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। এতিমখানা, মাদরাসা চালিয়ে এসেছে বছরের পর বছর ধরে। স্কুলটা নিজ হাতে গড়ে তুলেছে। তার সেই কষ্টে গড়া সব কিছু এভাবে তো শেষ করতে পারি না আমরা। প্রয়োজনে….
বলে তিনি একটু থামলেন। বললেন না কিছুই। খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষ হলো। বৃদ্ধাকে ঘরে পৌঁছে দিল আবির।
“খবর কী ভাই?”
“খবর তো ভালো নানিজান।”
“এবার বিয়ে টিয়ে করবে তো? নাকি সে চিন্তা নাই।”
“চিন্তা তো আছে। আপনি যদি ব্যবস্থা করেন।”
বলেই আবির হাসল। বৃদ্ধা হেসে বললেন,”তা ভালো। ম রা র আগে অন্তত এক নাতির বউ দেখে যাই।”
“এভাবে বলছেন কেন? আল্লাহ আপনার অনেক হায়াত দান করুন।”
দরজার কাছ থেকে আমিন পাঠ করল আয়ানা। ওকে দেখে হাসল আবির।
“দাদিজানের অনেক হায়াত হোক।”
“আরে, আর কত? এত হায়াত দিয়ে হবেই বা কী? সবাইকে এক সাথে দেখতে পারলাম। এখন ম রেও শান্তি। তবে এর আগে যদি নাতি বউ দেখে যেতে পারি….
নাতি বউ বলাতে আয়ানার চোখ দুটো চকচক করে ওঠল। ও উৎসাহ নিয়ে বলল,”দীপ্র দাদাভাইয়ের বউ?”
“আর দীপ্র। ও চিন্তা বাদ। এখন আবিরের বউ দেখতে চাই।”
কথা খানা পছন্দ হলো না আয়ানার। কেন? দীপ্রর বউয়ের চিন্তা বাদ যাবে কেন? কুহু ছাড়া কি দীপ্রর যোগ্য আর কেউ নাই? ওকে কি চোখে পড়ে না কারো? সুন্দরী, শিক্ষিত, স্টাইলিশ। কোন দিকের কমতি তার?
আড্ডা গল্পের কথা থাকলেও রাতে আসলে কিছুই হয়নি। আবিরের সাথে মাত্রই বসার সুযোগ হলো দীপ্রর। ওরা বসেছে বাড়ির ঠিক মাঝে। এই বাড়িটার মাঝ দিকটায় কিছুটা খোলা স্থানের মতন রয়েছে। আর তার চারপাশে জুড়ে করিডোর ও কক্ষ গুলো। পুরাতন বাড়ি গুলো যেমন হয়। মাঝের খালি অংশটায় চৌকি রাখা। সেখানেই বসেছে দুজন। কথা বলতে বলতে দীপ্র শুধাল,”বিয়ে তাহলে এবার পাঁকা?”
“ভাই রিস্ক আছে। মেয়ে তো রাজি। কিন্তু বাপ যে বড্ড পাজি।”
আবিরের এহেন ছড়ায় হো হো করে হেসে ওঠল দীপ্র। চতুরভূজাকার করিডোর দিয়ে দৌড়ে এল কুঞ্জ। এসে বসল ভাইদের মাঝে। আবির ওর চুল গুলো নাড়িয়ে দিয়ে বলল,”কুঞ্জকে আগে বিয়ে দেব।”
“এহহ আমার বিয়ের বয়স হয়েছে নাকি?”
“কি বলিস? বিয়ের বয়স হয়নি। তোকে বিয়ে দিলে, তুই বাপ হয়ে যাবি।”
কুঞ্জ বাচ্চা হলেও ওর লজ্জা লাগল। ও ছুটে পালাল। দীপ্র হাসল।
“কুঞ্জর কথা বাদ। তোর বাপ হওয়ার সময় হয়েছে। বিয়েটা এবার কর।”
আবির কিছুটা হতাশ হলো। তার একটা প্রেমের সম্পর্ক আছে। দু গ্রাম পরে। কিন্তু সমস্যা হলো মেয়েটার বাবা ভীষণ কঠোর। জামাই নির্বাচনে তারা হাজারটা শর্ত রয়েছে। সেসব নিয়েই আবিরের যত ভয়।
সারাদিনে একটা বারের জন্যও দেখা হয়নি দীপ্র-কুহুর। এবার হলো। কুহু তার গাছ গুলোর পাশে বসা। হাঁটুতে গাল পেতে রাখা। দীপ্র শব্দহীন ভাবে এসে দাঁড়াল। কয়েক সেকেন্ড থেমে থেকে শুধাল,”ভার্সিটি যাস নি?”
“না।”
“কেন?”
“ইচ্ছে করছে না।”
“কেন?”
“জানি না।”
দীপ্র থমকে রইল। ক্ষণকাল ওভাবেই গেল। ছোট করে শ্বাস ফেলে ছেলেটি বলল,”যা হবার তা তো হয়েছে কুহু। এবার সব ঠিক কর। পড়াশোনায় মন দে।”
কুহুর দু চোখ বেয়ে জল নেমে এল। ও হাতের তালুতে মুছে নিয়ে বলল,”এত দরদ কেন দেখাচ্ছেন? দরদ চেয়েছি আমি।”
“দরদ দেখাচ্ছি না। আমি তোর ভালো চাই।”
“খুব ভালো চেয়েছেন। এতই ভালো চেয়েছেন যে আজ আমার বন্ধুদের সাথেও সম্পর্ক শেষ করতে হলো।”
দীপ্র বিস্মিত হয়ে রইল। কুহুর খুব কান্না পাচ্ছে। চিৎকার করে কাঁদতে পারলে মনটা ভালো হতো।
“বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক শেষ কেন করলি?”
“আপনার জন্য। ওদের ভুলের কারণেই আপনার কাছে বিষয় গুলো গিয়েছে। আর আপনি সুযোগ নিয়ে আমাকে অপদস্ত করলেন। আর এখন তো আয়ানাপু…
কথা শেষ করল না কুহু। দীপ্র ভ্রু কুঞ্চিত করে বলল,”আয়ানা কী করেছে?”
“কিছু না।”
“ও বলে দিয়েছে?”
“না।”
“তাহলে?”
“আমার মাথা ব্যথা করছে। আপনার সাথে কথা না বলি।”
বলে কুহু বসা থেকে ওঠে গেল। ওর চুল খোঁপা করা ছিল। আলগা করে। দ্রুত বসা থেকে ওঠে যাওয়ায় আলগা খোঁপা আরো আলগা হয়ে গেল। পিঠময় ছড়িয়ে পড়ল ঝলমলে চুল গুলো।
বসার ঘরে একটা চমৎকার আবহাওয়া চলছে। আয়ানা নিজ হাতে রান্না করেছে। তার রান্নার প্রতি ইদানীং খুব আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। সবাই প্রশংসা করে চলেছে। কুহুকে দেখেই আয়ানা সেসবের মাত্রা বাড়িয়ে দিল। সবাইকে আরো তোষামোদ করে খেতে বলল। সালমা বললেন,”খাচ্ছি তো। তুই বোস আরাম করে। ঘেমে নেমে এত কিছু করেছিস।”
“তোমাদের জন্য এইটুকু করব না ফুপি?”
“তা করবি। বোস এখন।”
বসে টেনে বসিয়ে দিলেন তিনি। কুহু শুকনো ঢোক গিলল। ওর মনে পড়ল। একটা সময় খুব রান্না বান্না করা হতো। বাবা স্কুল থেকে ফিরে সেসব টেস্ট করতেন। প্রশংসা করতেন। সেই দিন গুলো হারিয়ে গিয়েছে।
“এই কুহু।”
ডাকল আবির। কুহু ঘোর থেকে বেরিয়ে বলল,”হ্যাঁ?”
“সবাই খাচ্ছে। আয়ানা বানিয়েছে এসব। তুই ও খা।”
কণা একটা ভাজা নিয়ে নাড়াচাড়া করছে। একদমই খেতে ইচ্ছে করছে না তার। অথচ ভীষণ পেটুক সে।
“আমার পেট ভরা আবির ভাইয়া। তোমরা খাও।”
“একটা খা।”
“পরে খাব।”
বলে পা বাড়াতে নিচ্ছিল কুহু। আয়ানা বসা থেকে ওঠে পড়ল। একটা ভাজা তুলে নিয়ে এগিয়ে এল।
“দাঁড়া।”
পা থামল কুহুর। আয়ানা ওর বরারব এসে দাঁড়াল। একদম চোখে চোখ রাখল। কুহুর দুটো চোখ লাল। টইটই করছে জলে। আয়ানা এক গাল হেসে বলল,”খেয়েই দেখ। সব টেস্ট ভুলে যাবি।”
বলে ভাজাটা কুহুর মুখের দিকে বাড়িয়ে দিল আয়ানা। স্বাভাবিক ভাবে দেখলে ঘটনাটা খুব সুন্দর মনে হতে পারে। সবার নিকট আয়ানা মহান কেউ হতেই পারে। তবে কুহু আর আয়ানাই জানে এই ঘটনা সুন্দর নয়। একদমই নয়। আয়ানার তিরস্কার, সর্তকতা, সব মিলিয়ে এই ঘটনা একদমই সুন্দর নয়।
চলবে….
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি
Share On:
TAGS: প্রণয়ের রূপকথা, ফাতেমা তুজ নৌশি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের রূপকথা গল্পের লিংক
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৭
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১৬
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২২
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৭
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৮
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৯
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৯