প্রণয়ের_রূপকথা (২২)
রাত্রি কি বলবে বুঝতে পারছে না। এত বড়ো একটা সত্য কুহু লুকিয়ে রেখেছিল। ওর খুব রাগ হলো এবার। ও কুহুকে দু হাতে চেপে ধরে বলল,”যদি এমনটাই হয়ে থাকে, তবে সব সময় দীপ্র ভাইকে দোষারোপ কেন করেছিস কুহু?”
কুহু কান্না মিশ্রিত সুরে বলে,”আমি তাকে সরাসরি দোষারোপ কখনো করিনি রাত্রিপু।”
“করিসনি? এটা কীভাবে বলতে পারিস? সেই ঘটনার জন্য দীপ্র ভাইকে কম সহ্য করতে হয়েছে কী? অথচ তোর তো খুশি হওয়ার কথা ছিল।”
কুহু কান্না থামায়। তবে চোখ দুটো ভেজা।
“সে আমাকে অপমান করে বিয়েটা ভেঙেছে।”
“আর তুই যে পালিয়ে যেতে চেয়েছিলি। সেটা দীপ্র ভাইকে অপমান করা হতো না?”
কুহু জবাব দিতে পারে না। হ্যাঁ হতো। অবশ্যই হতো। কিন্তু সে তো পালায়নি। তাহলে দোষটা তার ঘাড়ে কেন আসবে? রাত্রি হতাশ হয়ে পড়ে।
“কুহু, এটা ঠিক হলো না। তুই নিজেই পালানোর জন্য তৈরি ছিলি। বিয়েটা না ভাঙলে অবশ্যই পালাতি। কি পালাতি না?”
“হ্যাঁ, পালাতাম।”
ঠোঁট কামড়ে জবাব দেয় কুহু। রাত্রির মাথাটা খালি খালি লাগছে।
“সবাই বাবার মৃ ত্যুর পর কেন দরদ দেখাতে আসছে রাত্রিপু? আমার বাবা বেঁচে থাকাকালীন কতটা কষ্ট করেছেন। তখন কেউ কেন আসেনি? বাবার মৃ ত্যুর পর সবাই লোক দেখানো দরদ দেখাচ্ছে। দয়া দেখাচ্ছে আমাদের। আমি এতিম হয়ে গিয়েছি বলে, আমার ভরণপোষণের দায়িত্ব নিচ্ছে। এসব তো দয়া রাত্রিপু।”
এই ব্যাপারে রাত্রি কথা বলতে পারল না। কুহুই বলল,”আমার দোষ ছিল। একই দোষ তো দীপ্র ভাইও করেছেন। তবু তার থেকে বেশি আমাকে সইতে হচ্ছে। হচ্ছে না? আসলে ছেলেদের কখনোই দোষ হয় না। সব দোষ হয় মেয়েদের। আর সেই মেয়ে যদি আমার মতন এতিম হয় তাহলে তো কথাই নেই। সোনায় সোহাগা। আমি পালালে, বিয়ে ভাঙলে, তখন আমার উপর কেমন প্রভাব আসত ভেবে দেখো তো। কিন্তু দীপ্র ভাই আমাকে ছোট করে, অপমান করে বিয়ে ভাঙার পর তাকে কতটুকুই বা সইতে হচ্ছে?”
কুহুর মুখ থেকে শুধুই কথা আসছে। রাত্রি ফোঁস করে দম ফেলল।
“কিন্তু তুই ই তো বিয়ে করতে চাসনি। পালানোর প্ল্যানও করেছিলি।”
“করেছিলাম।”
“তাহলে দীপ্র ভাইকে দোষ দিচ্ছিস কেন?”
“দোষ দিচ্ছি না। আমি বাস্তবতা দেখাচ্ছি রাত্রিপু। আমার দোষ ছিল। কিন্তু দীপ্র ভাইয়ের কি দোষ নেই?”
রাত্রি মৌন হয়ে গেল। কুহুর দু চোখ থেকে পানি নেমে যাচ্ছে। যেন আজ চোখের জলেই সাগর হয়ে যাবে।
“আরেহ বাহ। তাহলে এই ব্যাপার?”
ফট করেই দরজার ওপাশ থেকে বের হয়ে এল আয়ানা। কুহুর বুকটা ধীম ধীম করে ওঠল। রাত্রি ভ্রু কুঞ্চিত করে বলল,”তুই এখানে কী করছিস আয়ানা? লুকিয়ে আমাদের কথা শুনছিলি?”
“হ্যাঁ, রাত্রিপু। শুনছিলাম ই তো। না শুনলে তো এত বড়ো সত্য জানাই হতো না।”
কুহু মাঝ থেকে বলল,”আয়ানাপু দেখো বিষয়টা…
“কী দেখব? তুই এত বড়ো সত্য লুকিয়ে রেখে নেকু সেজে থাকিস সেসবই দেখব?”
“আয়ানা।”
“আমাকে থামাতে পারবে না রাত্রিপু। একদমই পারবে না।”
“আমার কথা শোনো আয়ানাপু। তুমি কিন্তু….
“চুপ, একদম চুপ। তোদের দুই বোনের নেকামির শেষ আমি করবই। বেয়াদব কোথাকার। ভেতরে ভেতরে এত কিছু করে, সবার কাছে মহান সাজা।”
আয়ানার হাতটা ধরতে গিয়েছিল কুহু। কিন্তু পারল না। আয়ানা ফট করেই পা বাড়িয়ে চলে গেল। কুহু অসহায় হয়ে পড়ল। অন্ধকারের মধ্যে রাত্রিকেও ভীষণ অসহায় দেখাল। ও আসলেই বুঝতে পারল না কি করা উচিত।
আবির, দীপ্র একসাথে বসে আড্ডা দিচ্ছিল। ওমন সময় আয়ানাকে আসতে দেখা গেল। হনহন করে এসেছে সে।
“দীপ্র দাদাভাই, দীপ্র দাদাভাই….”
ওর কণ্ঠে দুজনই তাকাল। দীপ্রর ভ্রু কুঞ্চিত হলো। আয়ানা হাঁপিয়ে গেছে একদম।
“কুহু কত শেয়ানা। কত শেয়ানা তুমি জানো?”
একদম দীপ্রর বরাবর এসে দাঁড়াল আয়ানা। আবির কাহিনী না বুঝে চেয়ে আছে। দীপ্রর বাহু খানা স্পর্শ করল আয়ানা।
“তুমি জানোই না, কুহু বিয়ের দিন, বিয়ের দিন…
ঠিক সে সময়ই দোতলার করিডোর দিয়ে আসতে দেখা গেল কুহুকে। ওর পেছন পেছন আসছে রাত্রি। কুহুর দু চোখে জল টইটই করছে। আয়ানা তাকাল।
“নেকু মেয়ে। নেকামির শেষ নেই।”
এই পর্যায়ে দীপ্র বলল,”আর একটা কথাও না আয়ানা।”
“তুমি শোনো কথাটা। কুহু আসলে বিয়েটা…
দীপ্র দোতলা থেকে দৃষ্টি ফেরাল আয়ানার দিকে। কঠিন সুরে বলল,”চুপ করতে বলেছি আয়ানা। আর একটা কথাও না।”
“দাদাভাই তুমি জানোই না ও আসলে…
“আমি জানি আয়ানা। এ ব্যাপারে কোনো কথা চাচ্ছি না।”
আয়ানা অবিশ্বাস ভরা চোখে তাকাল। দীপ্র নিচু সুরে বলল,”এই টপিক এখানেই শেষ। কোথাও যেন না যায়। মনে থাকবে?”
আয়ানা কথা বলতে পারল না। ও পিছিয়ে গেল এক পা। দু চোখ ভরা অবিশ্বাস। কুহু সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসেছে। ওর দুটো চোখে জল থই থই করছে। দীপ্র কঠিন সুরে বলল,”এই বিষয়ে কেউ কোনো কথা বলবে না। এখানেই সব শেষ। যদি কেউ বলো তো, আমার থেকে খারাপ কেউ হবে না। আশা করি এইটুকু সম্মান আমাকে দেওয়া হবে।”
কুহুর শরীর কাঁপছে। সে রাতের খাবার খেতে যেতে পারেনি। ওর সাহস হয়নি। দীপ্র ভাই তাকে বাঁচাল। এটাও কি দয়া? হয়তো হ্যাঁ কিংবা না। ওর ফোনটা তখন থেকে বেজে চলেছে। ও রিসিভ করছে না। ওর দুটো চোখ বেয়ে সমানে নোনা জল নেমে যাচ্ছে। শুকনো একটি ঢোক গিলল ও। হাতের তালুতে গাল মোছার প্রয়াস করল। কিন্তু লাভ হলো কী? হলো না। পুনরায় গাল ভিজে গেল।
সায়ের লিখেছে,”কুহু, আমি সরি রে। আমি সরি। আমি রাগের মাথায় ওসব বলে ফেলেছি। আর বলব না। আর তুই টেনশন করিস না। আমি কোথাও কিছু বলব না।”
ম্যাসেজটা কয়েকবার পড়ল কুহু। তারপর সায়েরের নাম্বারের ডায়াল করল। একটা সেকেন্ড ও লাগেনি রিসিভ করতে। সায়ের একই ভঙ্গিতে সরি বলতে বলতে বলল,”দোস্ত আমি বলব না। কাউকে বলব না বিষয়টা। তুই প্লিজ মাফ কর। মাফ কর আমায়।”
“সবাই সব কিছু জেনে যাবে সায়ের।”
“আরে না পাগল। আমি তো বললামই। কোথাও বলব না।”
“তোর বলতে হবে না। তোর হয়ে অন্য একজনই এ কাজ করে দেবে। থ্যাংক ইউ রে। আমার অসহায়ত্ত্বের সুযোগ নিয়ে এভাবে শেষ করার জন্য। থ্যাংক ইউ সো মাচ।”
বলে কল কাটল কুহু। সায়ের বার বার হ্যালো হ্যালো করল। কল করার চেষ্টা করল। কিন্তু লাভ হলো না। কুহু তাকে ব্লক করে দিয়েছে।
রাত্রি এসে বসল কুহুর পাশে। কুহু কথা বলল না। নড়ল না। মেঝেতেই বসে রইল। রাত্রি কুহুর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,”যা হবার হয়েছে কুহু। আমরা আর এটা নিয়ে ভাবব না। আয়ানাকেও নিষেধ করা হয়েছে। তুই টেনশন করিস না।”
কুহুর গলাটা ধরা। কথা আসতে চাচ্ছে না। তবু ও ভাঙা কণ্ঠে বলল,”দীপ্র ভাই আমাকে কেন বাঁচাল রাত্রিপু? ওনি আবারো আমায় দয়া দেখাল? তাই না? দয়া দেখাল আমায়। আমি দয়াতেই রয়ে গেলাম।”
বলে ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকাল কুহু। রাত্রির ভেতর থেকে কোনো শব্দই এল না। ও পুনরায় মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। বলল,”তুই বরং দীপ্র ভাইয়ের সাথেই কথা বল কুহু। দীপ্র ভাই’ই সবটা বলতে পারবে। তবে একটা কথা, মানুষটাকে আর দোষারোপ করিস না। আল্টিমেটলি তার কোনো দোষই নেই। তবু এতদিন সব সহ্য করেছে।”
| প্রিয় পাঠক, আমি চাইলে শুরুর দিকেই এই ঘটনাটা সামনে আনতে পারতাম। কিন্তু এতে করে অন্যান্য চরিত্র গুলোর প্রকাশ ঠিক ঠাক ভাবে হতো না। আমার পুরাতন পাঠক যারা আছেন, তারা তো জানেন, আমি একটু ভেঙে লিখতে পছন্দ করি। কখনো খুব ধীরে প্লট আগাবে। আবার কখনো অনেক দ্রুত। এটাই আমার লেখার ধরন। আমি একই তালে লিখতে পারি না। আর আমার মনে হয় আপস অ্যান্ড ডাউন দিয়েই উপন্যাস লেখা উচিত। সবাই দোয়ায় রাখবেন। |
চলবে….
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি
Share On:
TAGS: প্রণয়ের রূপকথা, ফাতেমা তুজ নৌশি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের রূপকথা গল্পের লিংক
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৫
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৯
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১৭
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৬
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৮
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩০
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৮
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১২