প্রণয়ের_রূপকথা (১৮)
দীপ্রর চক্করে পড়ে কুহুকে আজ বের হতে হলো। ও বলেছে ভার্সিটি যাবে। গ্রাম থেকে মোটামুটি কয়েক ঘন্টা বাস জার্নি করে যেতে হয় ভার্সিটি। রাস্তায় গিয়ে একবার ভেবেছিল এদিক সেদিক ঘুরে টুরে চলে আসবে। আবার ভাবল ক্লাস করবে না। তবে ভার্সিটি থেকেই তো ঘুরে আসা যায়। ও আসবে শুনে লাবিবা নিজেও ক্লাস করবে না বলে জানিয়েছে। ভোর বেলায় ওঠে হালকা পাতলা খেয়েই বের হয়ে গিয়েছে কুহু। বাসে বসেছিল জানালার সিট ধরে। গ্রামের রাস্তা পেরিয়ে ধীরে ধীরে ইট পাথরের শহরটায় বাস পৌঁছাল। শুরু হলো জ্যাম। এই সকাল বেলাতেও শহরের রাস্তা গুলো জ্যামে গমগম করে। অফিস টাইমে তো দম নেওয়ার ও সুযোগ হয় না। কিছু সময়ের জ্যাম পেরিয়ে বাস পুনরায় চলতে লাগল। কুহুর ফোনটা বাজল ঠিক তখনই। কণা কল করেছে।
“হ্যাঁ, কণা?”
“তুই চলে গিয়েছিস আপু?”
“হুম। ঘুমে ছিলি। ডাকলাম না আর।”
“ডাকবি না একবার? বাড়িতে কেমন লাগছে। মা নেই। তোকেও দেখলাম না। আমার সব খালি খালি লাগে রে।”
মন খারাপের একটা কণ্ঠ বেজে ওঠল। কুহু বুঝল ওর মনের অবস্থা। একটু সময় নিয়ে বলল,”মন খারাপ করিস না। আর তোর খালি খালি কেন লাগছে? বাড়িতে তো তোর পছন্দের মানুষ আছে।”
পছন্দের মানুষ বলতে দীপ্রকেই বুঝিয়েছে কুহু। কণা সেটা বুঝল। ওমন ভাবে বসে থেকেই বলল,”তার সাথে সারাক্ষণ বসে থাকব নাকি? সে কি আমার দুলাইভাই হয়? হয় তো বড়ো ভাই। বড়ো ভাইয়ের সাথে তো আর ঠাট্টা করা যায় না।”
কণাটা ভারী চালাক আছে। কুহুর কথা থামে। ও প্রসঙ্গ বদলে বলে,”কুঞ্জকে নিয়ে থাক। দাদিজানের কাছে গিয়ে বসতে পারিস। সেদিন বলছিল কণাটা আজকাল দেখাই করে না। ঘুরে আয় গিয়ে।”
“আচ্ছা। তুই সাবধানে যাস।”
বলেই কল কাটল কণা। কুহু কয়েক সেকেন্ড মুঠো ফোনের দিকে চেয়ে রইল। তারপর ছোট করে নিশ্বাস ফেলে ব্যস্ত রাস্তাটার দিকে চাইল।
দাদিজানের ঘরে গিয়ে দেখা গেল আগে থেকেই সেখানে একজন উপস্থিত। আর সে হলো আয়ানা। এমনিতে আয়ানা এ বাড়ির কাউকেই পছন্দ করে না। এমনকি দাদিজানের সাথে দেখা করতেও চাইত না। আজ এভাবে বসে আছে। তাও এই সকাল সকাল। কণার ভ্রু কুঞ্চিত হয়ে রইল। মেয়েটিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দাদিজান বললেন,”ওখানে দাঁড়ায়া আছিস কেন? এদিকে আয়। আজকাল তো তোকে পাওয়াই যায় না।”
কণা শুকনো মুখে দাদিজানের কাছে এসে দাঁড়াল। তবে বসল না। দাদিজান বসতে বললেও বসল না।
“কী খবর তোর? মন খারাপ নাকি?”
“মন খারাপ কেন হবে বুড়ি?”
“তাহলে সারাদিনে একবারও আসার সময় হয় না যে?”
“ইচ্ছে করেই আসি না। এখন তো তোমায় দেখার মানুষের অভাব নেই।”
সামান্য খোঁচা দেয়ার চেষ্টা করল কণা। আয়ানা সেটা বুঝতে পেরেও গিলে নিল। মুখটায় হাসি রেখেই বলল,”কণা, বোস না। দাঁড়িয়ে আছিস কেন?”
“বসব না।”
বলে থম ধরে রইল কণা। দাদিজান বললেন,”বোস, বোস। তোদের দুজনের সাথে কথা বলি। বুড়ি মানুষের বড়ো যন্ত্রণা। কেউ কথা বলার নেই। কুহু কোথায় রে? কুহু, এই কুহু।”
ডেকে ওঠলেন বৃদ্ধা। কণা দাঁড়িয়ে থেকেই বলল,”আপু ভার্সিটিতে গিয়েছে।”
“ভার্সিটিতে গিয়েছে?”
কথাটা বলল আয়ানা। কণা মুখটা ওমন শুকনো রেখেই বলল,”হুম।”
আয়ানার ভালো লাগল না। কুহু অনেক দিন ধরেই ক্লাসে যায় না। অথচ দীপ্র এক বলাতেই চলে গেল। ও ঠোঁট কামড়ে রইল। কুহুটা বড়ো শেয়ানা। তাকে সহজ ভাবে নেয়া ঠিক হবে না।
সায়েরকে আসতে দেখে কুহু প্রায় চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,”তুই ওকে জানালি কেন?”
“দোস্ত, রাগ করিস না। জানাতে চাই নি। ও এমন ভাবে জানতে চাইছিল যে….
“ও জানতে চাইল আর তুই ও বলে দিলি? আসাই ভুল হয়েছে আমার।”
বলে চোখ মুখ শক্ত করে ফেলল কুহু। লাবিবা ওর হাতটা ধরে বলল,”সরি দোস্ত।”
“সব সময় সরি বললে হয় না লাবিবা। সায়ের একটা পাগল। সেবার রটাল আমি নাকি ওর সাথে প্রেম করি। ও একটা….
কথা শেষ করার আগেই সায়ের এসে দাঁড়াল সামনে। কুহু চোখ মুখ অন্ধকার রাখল।
“কুহু! ফাইনালি ক্যাম্পাসে এলি তুই।”
বলে এমন ভাবে নিশ্বাস ফেলল যেন এতকাল ধরে দম আটকে রেখেছিল। লাবিবা পরিস্থিতি ঠিক করতে বলল,”চল ক্যান্টিনে গিয়ে বসি।”
ওরা গেল ক্যান্টিনে। সায়ের চট করে চায়ের টোকেন নিয়ে চা অর্ডার করল। কুহু বসে আছে মনমরা হয়ে। লাবিবা বলল,”আমি চা নিয়ে আসি। তোরা বোস।”
বলে সরে পড়ল লাবিবা। কুহু চিবিয়ে চিবিয়ে তাকাল একবার। সায়ের বলল,”কুহু, তুই এখনো সেই ব্যাপারটা নিয়ে রাগ করে আছিস?”
“রাগ করাটা স্বাভাবিক না?”
“আই নো, স্বাভাবিক। কিন্তু বিষয়টা ইচ্ছেকৃত ছিল না রে। আমি মজা করে বলেছিলাম তুই আমি রিলেশনে। সেটা এক কান করে করে কীভাবে যে ছড়াল। আমি সেটার জন্য সরি।”
কুহু দম ফেলল। বলল,”আমি তোকে কী বলেছিলাম সায়ের? একটু দূরত্ব রাখ।”
“দূরত্ব তো রেখেছিই। আর কীভাবে?”
“তুই কেন আমার বিয়ের দিন গিয়েছিলি তবে?”
“ওটা তো….
ওর কথা আটকে গেল। কুহুর ফোনটা বেজে ওঠেছে। কণার নাম্বার থেকে কল এসেছে। কুহু রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে কণার ভয়ার্ত কণ্ঠ শোনা গেল।
“আপু, আপু,দাদিজানের শরীর খারাপ করেছে। খুব খারাপ করেছে। আমার খুব ভয় হচ্ছে রে। খুব ভয় হচ্ছে।”
কুহু জবাব দিতে পারল না। বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেল। এক সেকেন্ড ও সময় নিল না। সামনের পথে এগিয়ে গেল। সায়ের কিছু বলতে নিয়েও বলতে পারল না। দাঁড়িয়ে রইল শুধু। লাবিবা ঠিক তখনই চা নিয়ে ফিরল। কুহুর যাওয়ার পানে তাকিয়ে বলল,”ও চলে গেল কেন? আবার কী করেছিস সায়ের? তুই তো আমাকে মহা বিপদে ফেলি দিচ্ছিস। তোর জন্য আমার ফ্রেন্ডসীপ না ভাঙে!”
বলে একরাশ বিরক্তি প্রকাশ করল লাবিবা। সায়ের কথা বলল না। তাকিয়েই রইল। বোঝার চেষ্টা করল কুহু কেন ওভাবে চলে গেল। দোষটা কি তার?
চলবে….
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি
Share On:
TAGS: প্রণয়ের রূপকথা, ফাতেমা তুজ নৌশি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১২
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১৯
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৭
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১০
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৭
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৪
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৯
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৩