Golpo romantic golpo প্রণয়ের রূপকথা

প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১৫


প্রণয়ের_রূপকথা (১৫)

কণার অভিযোগ পর্ব চলছে। কুহু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে সেসব। অভিযোগ শেষ হলে মেয়েটি ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে কেঁদে ফেলল। দীপ্র ছোট বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,”কোনো ব্যাপার না। বড়োরা একটু বকতেই পারে। তাই বলে মন খারাপ করলে হবে?”

“আমি নাকি শিক্ষা পাইনি। চাচি আমাকে বেয়াদব ও বলেছে। অথচ আয়ানাপু যে সব সময় কথা শোনাতে থাকে।”

“বুঝতে পেরেছি। কিন্তু কণা, সব সময় সব কথা গায়ে নিলে চলে? তাছাড়া চাচি যখন বলেছেই তুই বেয়াদব, তোর উচিত হবে এমন ভাবে নিজেকে তৈরি করা যাতে তার এই ধারণা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। লক্ষ্মী বোন আমার। মন খারাপ করিস না। আমি আছি তো?”

বলে গাল খানা ছুঁয়ে দিল দীপ্র। কণার চোখ দুটো থেকে পানি নেমে যাচ্ছে।

“বাবা থাকলে এমন হতো না।”

দীপ্র ছোট করে নিশ্বাস ফেলল। কণা বাচ্চা মেয়ে। ওর মনটা বড়ো নরম। একটুখানি আঘাতেই ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। আরেকটু সময় নিয়ে কণাকে বোঝাল দীপ্র। রাত বাড়তি। খাবার খেয়ে নিয়েছে প্রায় সকলেই। কুহু আর কণাই বাকি। দীপ্র তাকাল পেছন ফিরে। কুহু দাঁড়িয়ে আছে।
“খাবার দিতে পারবি?”

কুহু মাথা নাড়িয়ে বলল,”জি, পারব।”

“সব রেডি কর। আমরা আসছি।”

কুহু চলে গেল। দীপ্র চাইল কণার দিকে। কণা চোখ মুখ মুছে বলল,”আয়ানাপু একদমই ভালো না। সবসময় বেশি বেশি করে।”

“বুঝলাম, কিন্তু এখন তো খেতে যেতে হবে।”

“ইচ্ছে করছে না।”

“তাহলে কিন্তু আমার ও খাওয়া হবে না। আমি কিন্তু সারাদিন না খাওয়া।”

কণা তাকাল অসহায় চোখে। দীপ্র হেসে বলল,”চল।”

কুহু সব খাবার গরম করে নিয়েছে। বড়ো চাচির শরীরটা বিশেষ ভালো না। অনেকবার ডেকে সে নিজের ঘরে গিয়ে শুয়েছে। দাদিজানের কানে এই ঘটনা এখনো পৌঁছায়নি। তিনি বৃদ্ধ মানুষ। তাকে এত যন্ত্রণা দেয়া যায় না। কুহু সবটা নীরবেই করে চলেছে। দীপ্র কণাকে নিয়ে টেবিলে বসল। খাবারের প্লেট তুলে নিতেই খাবার বেড়ে দিল কুহু। খেতে গিয়ে দীপ্র শুধাল,”খেয়েছিস?”

কুহুর আসলে ধ্যান নেই। ও শুনেনি। দীপ্র পুনরায় বলল,”খেয়েছিস?”

এবার তাকাল কুহু। সরলতা তার চোখ জুড়ে। দীপ্র উত্তর পাওয়ার আগেই বুঝল মেয়েটির খাওয়া হয়নি।

“বোস।”

“পরে খাব।”

“বসতে বলেছি। চুপচাপ বসে পড়।”

শেষ কথায় কেমন একটা জোর আছে। পরিস্থিতি যে পর্যায়ে এতে তর্ক চলে না। চলে না মান অভিমান কিংবা রাগ। কুহু বসল চেয়ার টেনে। খাবার তুলে নিল প্লেটে। এক লোকমা ভাত মুখে দিতেই দীপ্র বলল,”ক্লাসে যাস না কেন?”

কুহু কি বলবে বুঝল না। জবাব না দিয়েও থাকা যায় না। ও শুধু বলল,”এমনি।”

“এমনি এমনি কিছু হয় না। ক্লাসে যাওয়া শুরু কর।”

“হুম।”

বলে আবারো খেতে লাগল কুহু। কণা দুজনের দিকে একটু পর পর দৃষ্টি দিচ্ছে। ওর মন খুব করে চাচ্ছে মানুষ দুটো এক হোক। কিন্তু কুহুপুর অবস্থা দেখে ওর ভয়ই লাগে। তার উপর যতটুকু আশা আছে, সেই আশায় আবার পানি ঢালার জন্য দাঁড়িয়ে আছে আয়ানা। সব মিলিয়ে কণার আর ভালো লাগে না।

কণার কাছেই থাকতে বলল দীপ্র। কুহু মেনে নিল। অবশ্য না মানার কিছু ছিল না। আর ও নিজেও চাচ্ছে না পরিস্থিতি জটিল হোক। সব স্বাভাবিক হলেই বরং ভালো। ও শুয়ে আছে। কিন্তু চোখে ঘুম নেই। ইদানীং ঘুম তার কমই হয়। মনটা সারাক্ষণ অস্থির লাগে। ও এপাশ ওপাশ করে রুম থেকে বের হয়ে গেল। করিডোর দিয়ে চলতে চলতে খেয়াল করল দীপ্র ভাইয়ের কক্ষে আলো জ্বলছে। এর মানে লোকটা ঘুমায়নি। নিশাচর প্রাণীর প্রতি খুব একটা আগ্রহ ওর নেই। তবু একটু ঘুরেটুরে নজর দিল কুহু। দেখল দীপ্র কাজ করছে। কুহু ফিরে এল নিজের জায়গাতে। কণা জেগে গিয়েছে।

“কী রে? কখন জাগলি?”

“মাত্রই।”

“ঘুমা, রাত অনেক।”

“হুম।”

বলে পুনরায় ঘুমের দেশে পাড়ি দিল কণা। কুহু বসল ফোন নিয়ে। সোশ্যাল মিডিয়া ঘাটতে ইচ্ছে করছে। ও উষ্ণ নিশ্বাস ফেলে নিজের একাউন্ট লগ ইন করল। সঙ্গে সঙ্গে সায়েরের ম্যাসেজ এল।

“কুহু, তুই কবে ক্লাসে ফিরবি?”

ম্যাসেজটা দেখেও না দেখার ভান করে চলে যাচ্ছিল কুহু। কিন্তু সায়ের পুনরায় লিখল,”তুই প্লিজ আয়। চিন্তা হয়। কোনো খোঁজ ও দিচ্ছিস না।”

সোশ্যাল একাউন্ট থেকে বের হয়ে গেল কুহু। সায়েরের আগ্রহ দিনকে দিন বেড়েই চলছে। এভাবে কুহুর জন্য সবটা কঠিন হয়ে যাবে। অথচ ছেলেটার থেকে মুক্তির কোনো উপায়ও নেই।

সকাল সকাল দীপ্রকে দেখে আয়ানার চোখে মুখে আলাদা দ্যুতি এসে ভর করল। ও আহ্লাদ মিশিয়ে বলল,”কাল কখন ফিরেছ দাদাভাই?”

“একটু রাত হয়েছে।”

“অহ। আমি আসলে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।”

বলে একটু থামল আয়ানা। পরমুহূর্তেই হাত খানা নাড়িয়ে বলল,”হাতে এখনো ব্যথা।”

“ঔষধ খেয়েছিস?”

“হুম।”

“টিভির রিমোর্ট নিয়ে ঝগড়া করা একটা বাচ্চামি আয়ানা।”

“কণাই তো বাড়াবাড়ি করেছে। আমার তো দোষ নেই।”

“তুই ওর বড়ো। ও না হয় বাচ্চা, তুই তো না।”

বলতেই আয়ানার মুখটা একটু অন্ধকার হলো। দীপ্র বলল,”যাই হোক, যা হবার হয়েছে। নেক্সট আর এমন কিছু করিস না।”

বলে এগিয়ে গেল দীপ্র। আয়ানার মনটা একদম বিষণ্ণতায় ভরে উঠল। এই বিষণ্ণতায় প্রচুর মেজাজ গরম হচ্ছে। আর তার সবটুকুই পড়ল কুহুর করা বাগানটার উপরে। মেয়েটি বেশ যত্ন নিয়ে বাগান করে রেখেছে। রোজ নিয়ম করে গাছ গুলোর যত্ন করে। কলি এসেছে অনেক। আয়ানা গিয়ে সবগুলো কলি ছিড়ে এল। কুহু যখন গাছে পানি দিতে গেল, তখন থ হয়ে গেল। ওর দুচোখ ভেঙে কান্না এল। ও কেঁদে ফেলল শব্দ করে। সেই কান্না গিয়ে পৌঁছাল দীপ্রর কাছে। দীপ্র নিজের কক্ষের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। হুট করেই কুঞ্জ এসে বলল,”দীপ্র দাদাভাই, কুহুপু বাগানে বসে কাঁদছে।”

এ কথায় ভ্রু কুঞ্চিত করল ও। চট করেই নেমে এল বাগানে। আসার পথে ওদের সাথে যোগ দিল কণাও। কুহু তখন কলি গুলো সব জড়ো করে ঘাসের ওপর বসে আছে। কাঁদছে ঠোঁট বাঁকিয়ে। কণা চ্যাঁচিয়ে উঠল।
“এগুলো কে ছিড়ল?”

কান্নার দরুন কথা আসছে না মেয়েটির মুখ থেকে। কণার খুব খারাপ লাগল। ও তো জানে, কুহুপু কতটা ভালোবাসে এই গাছ গুলোকে। কয়েক সেকেন্ড পর বাড়ির বাকিরাও চলে এল। কুঞ্জই খবর প্রচার করে এসেছে। আয়ানা যখন দেখল কুহু কাঁদছে তখন ওর ঠোঁটে একটা অদ্ভুত হাসি এসে ধরা দিল। আবিদা সেই হাসি লক্ষ্য করে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে পড়লেন। মায়ের সাথে চোখাচোখি হতেই দমে গেল আয়ানা। আবিদা মেয়ের হাতখানা চেপে ধরে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করলেন। পুরো বিষয়টাই দীপ্রর নজরে এসেছে। ও ভ্রু কুঞ্চিত করে একটু ভাবতেই, অনেক কিছুই বুঝে পারল। তবে এখনই প্রতিক্রিয়া দেখাল না। বরং সবটাই রেখে দিল গোপনে।

চলবে….
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply