প্রণয়ের_রূপকথা (১০)
কুহু বসেছিল। ঠিক তখনই রাত্রির আগমন। মুখটা কেমন থমথমে। ওকে দেখেই ঠিক হয়ে বসল কুহু।
“কিছু হয়েছে রাত্রিপু?”
“হয়নি। তবে হবে রে।”
“ওমা? কী হবে?”
“মাত্র শুনে এলাম, নানিজানের সাথে ছোট মামি কথা বলছেন।”
“মা, কী কথা বলছে?”
“দীপ্র ভাইয়ের বিষয়ে।”
“অহ।”
বলে মৌন হয়ে গেল কুহু। রাত্রি হতাশার নিশ্বাস ফেলে বলল,”দীপ্র ভাই কেন এমন করল কে জানে।”
“থাক না রাত্রিপু। ওনার ইচ্ছে হয়েছে তাই আমাকে নিয়ে খেলল।”
“না রে। এটা আমার বিশ্বাস হয় না। ছোটবেলার কথা মনে নেই তোর?”
কুহু কিছু না বলে চেয়ে রইল। রাত্রি স্মৃতিচারণ করে বলল,”তুই মনে করে দেখ, আমাদের মাঝে দীপ্রভাই কাকে সবথেকে আদর করত। তোকেই তো? তাই না?”
কুহু স্মরণ করল। হ্যাঁ সত্যিই তাই। লোকটা তাকে এককালে ভীষণ স্নেহ করত।
“সেই মানুষটা কেন এমন করবে কুহু?”
“মানুষ বদলায় রাত্রিপু।”
“দীপ্র ভাই বদলায় নি রে। একদমই বদলায় নি।”
“হয়তো বদলেছে। ছোটবেলায় আমি ওনার স্নেহের ছিলাম। বড়ো হয়েও যে তেমন থাকব সেটার তো কোনো লজিক্যাল ব্যাখা নেই রাত্রিপু। তার থেকেও বড়ো কথা ছোটবেলায় ওনি আমাকে স্নেহ করতেন অন্য সম্পর্ক ধরে। সেটার বদল ধরতে যাচ্ছিল। সেটা হয়তো মানতে পারেননি।”
“তেমন হলে, আগে কেন মানা করল না?”
ঠিক তাই। তবে আগে কেন মানা করল না? এই একটা প্রশ্নের উত্তর তো কুহুর নিকটও নেই। ও নিজেও তো এই উত্তর খুঁজে বেড়ায়। মাঝে অনেক বছর কেটেছে। দূরত্ব তৈরি হয়েছে। কিন্তু তবু, যেই মানুষটা ভীষণ আদরে রাখত, সেই মানুষটা এভাবে অপমান করতে পারে? কুহুর কান্না পায়। ভীষণ কান্না। তবে ও কাঁদতে চায় না কারো সামনে। এই ঝড়টা ওর নিজের। একান্ত কিছু ঝড়, একান্ত ভাবেই সামলাতে হয়।
রাতের খাবারের সময়। সবাই এসেছে। আয়ানাও এসেছে। তার চোখ মুখ গম্ভীর। সবাই ওর খোঁজ নিয়েছে। তবে দীপ্র ভাই তেমন একটা খোঁজ নিল না। খোঁজ নিল না বলতে আলাদা করে নিল না। একবার ঘরে গিয়ে দেখলও না। এই নিয়েই ওর মনে একটা রাগ তৈরি হয়েছে। দাদিজানকে নিয়ে এল কণা। বসিয়ে দিল চেয়ারে। খাবার বেড়ে দেওয়ার পর তিনি বললেন,”আহ, কাদের কোথায় চলে গেলি বাবা। তোকে ছাড়া সব কেমন মলিন।”
বলে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মায়ের কষ্টটা ভীষণ আলাদা হয়। এই কষ্টটা কোনো ভাবে ব্যাখা সম্ভব নয়।
“সবাই থম ধরলে কেন? খাওয়া শুরু কর। শুরুর দিকে আমার কাদের বলত, মা একদিন সব আবার আগের মতন হবে। ভাইজান’রা ফিরবেন। আমরা সবাই এক হব। হলোও তাই। কিন্তু সেটা দেখার জন্য আমারর ছেলেটা রইল না।”
বলে চোখের জলটুকু মুছলেন তিনি। দীপ্রর প্লেটে ভাত। ও নাড়াচাড়া করে কথা গুলো শুনছিল। কুহু নীরব হয়ে বসে। বাবার কথা মনে পড়লেই সবটা কেমন যেন লাগে।
“খাও তোমরা। ছোট বউ, তরকারি দাও সবাইকে।”
ববিতা তরকারির বাটি নিয়ে বেড়ে দিতে লাগলেন। তিনি পাথরের মতন আচরণ করছেন। নিস্ব হয়ে যাওয়ার পর মানুষ পাথরের মতনই হয়ে যায়। যদিও কখনো সখনো পাথরের মাঝেও ফাঁটল ধরে। আর তখন আষাঢ়ের বৃষ্টির মতন কাঁদতে ইচ্ছে করে।
বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। দীপ্র নিজের কক্ষে বসেই কাজ করছিল। তবে কাজে মন থাকছে না। এমনটা খুব অল্পই হয় ওর সাথে। ও বরাবরই কর্মঠ। স্বভাবতই কাজে মন না বসলে সেই কাজ আরো বেশি করে,করে ও। আজও তাই ঘটছে। কাজে মন বসছে না। তবে মনকে জোর করে বসিয়ে রেখেছে। এতে ধীরে হলেও কাজ গুলো আগাচ্ছে। দীপ্রর এই স্বভাবটা দারুণ। তাই তো ওর শিক্ষক বলতেন,’দীপ্র, তোমার মতন ডেডিকেটেড মানুষ খুব কমই জন্ম নেয়। নিজেকে হারিয়ে ফেলো না।’ এই কথাটা বার বার মনে করে ও। যখনই মনে হয়, তখনই ভেতর থেকে অন্য রকম শক্তি কাজ করে। বাইরের বৃষ্টি ওর কাজে বিরতি দিল। জানালাটা দুলছে। বার বার আ ঘা ত করছে। এতে মনোযোগ সরে যাচ্ছে। ও ল্যাপটপ রেখে গিয়ে জানালা লাগাতে এল। ঠিক তখনই নজরে এল বৃষ্টিতে ভিজে চলেছে এক নারী অবয়ব। একটু ভালো মতন দেখলে বোঝা যায়, অবয়বটি কুহুর। মেয়েটি দু হাত মেলে দিয়ে ভিজে চলেছে। বোধহয় অনেকক্ষণ হয়ে গিয়েছে।
একদম ভিজে চুপচুপ হয়ে ফিরল কুহু। দীপ্রর ঘরখানা পেরিয়ে যাওয়ার পথেই কণ্ঠটা শোনা গেল।
“মাঝ রাতে বাইরে গিয়ে ভিজছিলি কেন কুহু?”
কেঁপে ওঠল মেয়েটি। এমনিতেই বেশ অনেকটা সময় ভিজেছে। শুধু ভিজেই নি। কেঁদেছেও। তাই চোখ দুটো লাল হয়ে গিয়েছে। করিডোরে টিমটিম করে আলো জ্বলছে। হলদেটে তার রং। অনেকটা সন্ধ্যারাতের মতন।
“কী হলো? জবাব কোথায়?”
কুহুর জবাব দিতে মন চায় না। তবে ও দেখাতে চায় না নিজের রাগটুকুও। তাই ছোট করে বলে,”এমনি।”
“তাই বলে মাঝরাতে?”
“ছাঁদে তালা দেয়া। পিচ্ছিল হয়ে আছে। রেলিং এর কাজ চলছে।”
রেলিং এর কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। অথচ দীপ্রর জানা নেই বিষয়টি। অবশ্য বাড়িতে খুব কম থাকা হচ্ছে তার। কয়েক সেকেন্ড পর মেয়েটি পা বাড়াতেই দীপ্রর রাশভারী গলা,”যেতে বলেছি?”
কুহু মনে মনে আওড়াল,”আপনি বলার কে?” তবে মুখে তেমন কিছুই বলল না। দাঁড়িয়ে রইল।
“চাচি কী বলেছে?”
সহজ কথায় কুহু বলল,”আপনার সাথে দূরত্ব রাখতে।”
“তুই কী সিদ্ধান্ত নিলি?”
“আমার সিদ্ধান্তের মূল্য নেই।”
“কে বলেছে নেই?”
“কেউ বলেনি। আমার মনে হয়েছে।”
দীপ্র মৌন রইল কয়েক সেকেন্ড। তারপর বলল,”তার মানে দূরত্ব রাখছিস?”
কুহুর বলতে ইচ্ছে হয়,’দূরত্ব তার সাথে রাখা যায়, যার সাথে ঘনিষ্ঠতা থাকে। আপনার সাথে তো আমার ঘনিষ্ঠতা ছিলই না দীপ্র ভাই।
“চুপ কেন?”
আবারো শুধায় দীপ্র। কুহুর শরীর কাঁপছে। ভীষণ ঠান্ডা লাগছে।
“আমার কোনো সিদ্ধান্ত নেই। কোনো কিছু বলারও নেই। যা হয়েছে তা একটা অতীত।”
স্বীয় ঠোঁট কামড়ে ধরে দীপ্র। মিনমিনে সুরে বলে,”অতীত আমাদের পিছু ছাড়ে না কুহু। কখনোই ছাড়ে না।”
মানুষটার কথায় খুব সুক্ষ্ম রহস্য পাওয়া যায়। তবে কুহু সেসব পাত্তা দেয় না। ও কাঁপতে কাঁপতে বলে,”রাত অনেক বেশি। আমি এখানে দাঁড়িয়ে কথা বলতে পারছি না। আমায় মাফ করবেন।”
তারপর আর এক সেকেন্ডও সময় নেয়নি ও। বড়ো বড়ো পায়ে নিজের কক্ষের দিকে এগিয়ে গিয়েছে। দীপ্রও আর আটকায় নি। আটকাবেই বা কেমন করে? অধিকার তার নেই। একদমই নেই।
জামা কাপড় বদলে নিল কুহু। চুল গুলো মুছতে মুছতে আরশির সামনে এসে দাঁড়াল। ভীষণ খারাপ লাগা কাজ করছিল। কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছিল। আর বৃষ্টির ও প্রয়োজন ছিল। বৃষ্টিতে ভিজে কাঁদলে, সেই চোখের জল কেউ দেখে না। তখন ইচ্ছে মতন কাঁদা যায়। সৃষ্টিকর্তা সেই সুযোগটি দিতেই কুহু লুফে নিয়েছিল। তবে দীপ্রর সাথে দেখা হওয়াটা ওর মনকে প্রভাবিত করল। কঠিন ব্যক্তিত্ব দেখানো দীপ্র আজ তার সিদ্ধান্তের কথা জানতে চেয়েছে। এসবের মাঝে লুকায়িত কিছু কি আছে? হয়তো আছে। অপমান লুকিয়েই আছে। কুহুর তো তাই মনে হয়। মানুষটা তাকে স্মরণ করাল, তার সিদ্ধান্তের মূল্য নেই। মূল্য যদি থাকতই, তবে বিয়ের বিষয়টি ঘটতই না।
আয়ানার শরীর কাঁপছে। থমথমে মুখে মায়ের ঘরে এসে পৌঁছালও। মা বিরক্ত হয়ে বললেন,”এই মাঝরাতে এভাবে কেউ দরজা ধাক্কায় আয়ানা? এমন ম্যানারলেস কবে থেকে হলে তুমি?”
“তুমি জানো কী হয়েছে?”
“কী হয়েছে? যার জন্য এভাবে ঘুম নষ্ট করলে?”
“তুমি ঘুমিয়েই থাকো মা। আমি মাত্রই দেখলাম কুহু দীপ্র দাদা ভাইয়ের সাথে কথা বলছে। অথচ চাচি কী বলেছিলেন? শোনো, এসব মুখের কথা মা। আসলে চাচি কৌশলে কুহু আর দীপ্র দাদাভাইকে এক করতে চাচ্ছেন।”
সব গুলো কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলেন আবিদা। তারপর ছোট করে নিশ্বাস ফেলে বললেন,”তুমি এতটা উদ্বিগ্ন কেন হচ্ছ আয়ানা?”
“কেন হচ্ছি সেটা বুঝো না তুমি?”
“আমি তোমাকে সিরিয়াস ভাবে নিই নি। তুমি সত্যি দীপ্রকে চাও আয়ানা? একদম সিরিয়াস?”
আয়ানার চোখ দুটো নোনা জলে চিকচিক করে ওঠল। এক বিন্দু গাল বেয়ে গড়িয়েও পড়ল। এতেই যা বোঝার বুঝে গেলেন আবিদা।
| পরের পর্ব আগামীকাল পাবেন ইনশাআল্লাহ। আমার জন্য একটু দোয়া করবেন। তীব্র মন খারাপের সময় যাচ্ছে। |
চলবে…
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি
Share On:
TAGS: প্রণয়ের রূপকথা, ফাতেমা তুজ নৌশি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১৭
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১৪
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১২
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৭
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩০
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৬
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২১
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৯
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৩