Golpo romantic golpo প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা

প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৬


প্রণয়ের_মায়াতৃষ্ণা ||৬||

ফারজানারহমানসেতু

🚫কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ 🚫

তূর্জান দেশ ছেড়েছে বছর হলো। যাওয়ার আগে রোজার সাথে দেখা করেনি। কেন করেনি এর উত্তর কেউই জানে না। তবে তূর্জান যাওয়ার পর নেওয়াজ বাড়ির লোকের বাড়িতে কম, হসপিটালে বেশি থাকতে হচ্ছে। রোজা প্রায় অসুস্থ থাকে। একদিন সুস্থ থাকলে পরের দুদিন হসপিটালে কাটায়। তূর্জানের সাথে রোজার এই একবছরে হাতেগোনা কয়েকবার কথা হয়েছে। তাও তূর্জান যাওয়ার প্রথম দিকে। রোজা অসুস্থ থাকে বিধায় তার সাথে তূর্জানের কথা বলা হয় না।সবাই এটা ওটা বলে তূর্জানের থেকে এড়িয়ে যায়। আর তূর্জানের কাছে বলা হয়েছে, “ রোজা ফোনে তূর্জানের সাথে কথা বলতে চায় না। একেবারে কথা বলবে সামনে থেকে তাই তূর্জানও তার প্রেয়সীর কথায় একমত পোষণ করেছে। এতদিনের সৃতি, ভালোবাসা, অপেক্ষা, অভিমান, অনুভূতি, সব নাহয় একেবারে দেশে ফিরে চুকিয়ে দিবে। আর সাথে নিজের টাও চুকিয়ে নিবে।

রাফিয়া বোনের পাশ থেকে সরছেই না। কেবিনের বেডে রোজার পাশে বসে নোনাজল বিসর্জন দিচ্ছে। তার তো পৃথিবীতে আপন বলতে এই একটাই আপনজন আছে। ডাক্তার তূর্জানের বাবাকে ডেকে পাঠালেন নিজ চেম্বারে। তাজারুল নেওয়াজ ডাক্তারের পিছু পিছু গেলেন চেম্বারে।সাথে মোস্তফা নেওয়াজ ও গেলেন। ডাক্তারকে বলতে বললেন, কি বলতে চান তিনি? ডাক্তার বললেন,

“ দেখুন মিস্টার নেওয়াজ, আপনাদের আগেই পরিষ্কার করে বলেছিলাম, ওর মেন্টাল কন্ডিশন ভালো না। ওকে যথেষ্ট সঙ্গ দিবেন সকলে। ও প্রায় ঠিক ও হয়ে যাচ্ছিলো, হঠাৎ এইবছর এত অসুস্থতার কারণ কি?“

তাজারুল নেওয়াজ কি বলবেন? তার কারণেই তো তূর্জান দেশ থেকে বিদেশে পড়তে গেলো।তিনি না বললে যে তূর্জান যেত না। তা তিনি ভালো করেই জানতেন। তবে কি তূর্জানকে বিদেশে পাঠানো ঠিক হলো না। ভাবনার মাঝেই ডাক্তার আবার বললেন,

“ রোজাস্মিতা হঠাৎ কোনো কারণে শকড হয়েছে। হয়তো ওর পছন্দের কোনো জিনিস বা..

কথা সম্পূর্ণ করার আগেই তাজারুল নেওয়াজ বললেন, “ মানুষ, ওর পছন্দের মানুষ দূরে চলে গেছে। চলে যায়নি, আমি পাঠিয়েছিলাম।”

বলেই তিনি কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন। তিনি কি তবে বন্ধুর শেষ সম্পদ রক্ষা করতে ব্যর্থ হলো। তূর্জানকে বললে সে ঠিকই থেকে যেত।কিন্তু তিনি কি করে ফেললেন। তাজারুল নেওয়াজ বেরিয়ে যেতেই মোস্তফা নেওয়াজ ডাক্তারকে সব বলতে বললেন।
“ দেখুন মিস্টার মোস্তফা, এক কথাই বলি, আমাদের আর কিছু করার নেই!কয়েকদিনের মধ্যে বা ভবিষ্যতে রোজাস্মিতা সব ভুলে যেতে পারে, কিছুটা মনে থাকতে পারে, আবার নাও পারে। সবই উপর ওয়ালার হাতে!”

“ ওকে কোনোভাবেই ঠিক করা সম্ভব না? “

“ বললাম তো ওর কন্ডিশনের কথা! আমাদের হাতে কতটুকু বলুন। আমরা তো শুধুমাত্র উছিলা, সব ওই একজনের হাতে। “

মোস্তফা নেওয়াজ রিপোর্ট গুলো নিয়ে বাইরে আসার জন্য পা বাড়াতেই ডাক্তার বলল,

“ একটা কথা বলব, যদি মাইন্ড না করেন? “

মোস্তফা নেওয়াজ মাথা ঝাকিয়ে হ্যাঁ বলল। ডাক্তার বললেন, “ দেখুন আমি সামান্য একজন ডাক্তার, আপনাদের মতো বিসনেস ম্যানদের পারিবারিক বিষয়ে ঢোকা ঠিক হবে না। তাও
যেহেতু আপনাদের পরিবারের হয়ে কাজ করছি অনেকদিন। আমার মনে হয়,এইমূহুতে তূর্জান কে দেশে ফেরত আনাই উত্তম। “

মোস্তফা নেওয়াজ কোনো কথা বললেন না। শুধু নিরব থেকে প্রস্থান করলেন। তারই বা কি করার, তিনি কোনোদিন তো বড় ভাইয়ের মুখের উপর কথা বলেননি।যে আজকে বলবেন। তবে তার পরিবার ভাইয়ের বন্ধুর শেষ আশা কতক্ষন আগলে রাখতে পারবেন তা জানা নেই কারোর। তারও তো মেয়ে নেই, সে তো রোজাকে মেয়ে ভাবে, তবে মেয়ের জন্য কি বাবা কিছুই করতে পারবে না।

কেবিনের ভেতর নিস্তব্ধতা যেন জমাট বেঁধে আছে। সাদা চাদরের উপর শুয়ে থাকা রোজার মুখটা আরও ফ্যাকাশে। বুকের ওঠানামা ছাড়া বোঝার উপায় নেই সে বেঁচে আছে। রাফিয়া চুপচাপ তার হাতটা ধরে বসে আছে। মাঝে মাঝে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, যেন ছোটবেলার মতো করে ঘুম পাড়াচ্ছে।
বাইরে করিডোরে দাঁড়িয়ে তাজারুল নেওয়াজ স্থির দৃষ্টিতে শূন্যে তাকিয়ে। মোস্তফা নেওয়াজ তার পাশে এসে থামলেন।বললেন,

“ভাই, তূর্জানকে বলব না?”

তাজারুল নেওয়াজ ধীরে মাথা নাড়লেন, “না। ওকে বলার মতো ভাষা আমার নেই। গত একবছরে ওকে জানাইনি, মিথ্যা বলেছি। এখন কি করে জানাবো? জানিস মোস্তফা,আমি ওকে কথা দিয়েছিলাম, রোজার খেয়াল রাখব, পারিনি,! আমি পারিনি! তবে কি আমি বাবা হিসাবে ব্যর্থ। “

ভেতরে নার্স এসে ইনজেকশন দিল। রোজার চোখের পাতা কেঁপে উঠল কিছুটা। রাফিয়া ঝুঁকে এলো রোজার মুখের উপরে । বলল, “রোজা? শুনতে পাচ্ছিস?”

রোজা ঠোঁট নাড়ল খুব আস্তে, প্রায় শোনা যায় না এমন আধোস্বরে বলল, “ভাইয়া… এসেছে?”

রাফিয়ার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে তো জানেই না এই অবস্থা, আসবে কি করে?তবে মুখে বলল,
“না রে, ভাইয়া তো তোর উপর রাগ করে আসেনি। তুই ঠিক নেই তাই ভাইয়া বলেছে, তুই সুস্থ হলেই আসবে। তুই আগে ভালো হয়ে যা। তারপর ভাইয়া আসবে।”

রোজার চোখে একফোঁটা নোনাজল গড়িয়ে পড়ল। তার এত অসুখ হলো, তাও তূর্জান একবার আসলো না।
কিন্তু রোজা আর কিছু বলল না, অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে আবার চোখ বুজে ফেলল।
সন্ধ্যায় পুরো পরিবার কেবিনে জড়ো হলো। কেউ উচ্চস্বরে কথা বলছে না। সবাই জানে, এই মেয়েটার হৃদয়ের অসুখ ওষুধে সারে না।তার সঙ্গ প্রয়োজন, অনেক সঙ্গ প্রয়োজন।

মোস্তফা নেওয়াজ ধীরে বললেন, “ভাই,আমার ভয় হচ্ছে,যদি স্মৃতি হারিয়ে ফেলে রোজা? ডাক্তার তো বলল, “

তাজারুল থামিয়ে দিলেন, “আমি সব নিজ হাতে নষ্ট করেছি। আমি এখন কি বলব। তবে মেয়েটা তূর্জানের জন্য এখন যে কষ্ট পাচ্ছে…..

একটু থেমে আবার বললেন,
“যদি ভুলেই যায়… তাহলে হয়তো কষ্ট কম হবে। তবে আমি আর ভুল করবো না। আমার…

বলতেই কথারা উবে যেতে লাগল চাপা কান্নার তলে। তাই মোস্তফা নেওয়াজ ও আর
কথা বাড়ালেন না।কারণ তিনি জানেন, “ভুলে যাওয়া মানেই শুধু কষ্ট কমবে তা নয়, ভালোবাসাও মুছে যাবে ।ভুলে যাবে পিছনের সকল পিছুটান। “
রাত গভীর হলো। সবাই একে একে কেবিনের মেঝেতে, চেয়ারে, সোফায় বসে রইল। কেউ বাড়ি ফিরল না। যেন সবাই পাহারা দিচ্ছে রোজার নিঃশ্বাস, তার স্মৃতি, তার অপেক্ষা।
রেহেনা নেওয়াজ আর তানিয়া নেওয়াজ রোজার দুপাশে। কারোর চোখে ঘুম নেই।

ওদিকে বহু দূরের এক শহরে তূর্জান বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছে। মাঝে মাঝে ফোনটা হাতে নিচ্ছে, আবার রেখে দিচ্ছে। তারও মন অকারণে অস্থির হচ্ছে । হঠাৎ মনে হচ্ছে কাছের কেউ কষ্টে আছে। কিন্তু রাত হওয়ায় ফোন করতে পারছে না।
কিন্তু সে জানে না,এই মুহূর্তে তার নামটাই একটি মেয়ের শেষ ভরসা হয়ে আছে।

★★★

(নয়বছর পর)

এখনো বাড়ি আগের মতোই উৎফুল্ল। সবাই পুরোনো পিছুটান ছেড়ে নতুনের সূচনা করেছে। সবাই কি পেরেছে, না কেউ কেউ এখনো পুরোনো মায়ায় আসক্ত আছে। শুধু সামনে এগোনোর জন্য
সেই পুরোনো মায়া ভুলে থাকার চেষ্টায় আছে। শুধু কিছু পরিচয় পাল্টে গেছে। ডাক এক থাকলেও সম্পর্ক বদলে গেছে।তূর্জান নয়বছরের কথা বললেও থেকেছে দশ বছর।
রোজা এখন উনিশ বছরে পা দিয়েছে। তূর্জানেরও বয়স গিয়ে দাড়িয়েছে আঠাশের ঘরে। তুবা এখনও চুপ থাকতেই বেশি পছন্দ করে। বড়রা যার যার নিজ কাজে ব্যাস্ত। তাদেরকে আর ছোট ভেবে ছেলে- মেয়েদের পিছু ছুটতে হয় না। বাড়িতে যেমন সবাই ব্যাস্ত, তেমনি অফিসে আজ নিরব ব্যাস্ত, কেউই অসাবধানতায় কাজ করছে না। আজ তাদের অফিসে নতুন স্যার আসবে। সে নাকি ভীষণ রাগী। কেউ নিজের ভাইয়ের নামে নিজে যখন ভাইয়ের ইমপ্লয়দের কাছে ভাইয়ের নামে এত রাগী বর্ণনা দিচ্ছে। তখন তো সবাই ভয় পাবেই।একজন প্রশ্নই করল,
“ ছোট স্যার কি অনেক রাগী? “

“ নাহ! তার মধ্যে রাগের র ও দেখতে পাবেন না। “

“তাহলে ছোট স্যারের নামে এতক্ষন মিথ্যা কথা বললেন?”

“ বলেছি মানে সে নিশ্চই রাগী,সে মিষ্টি হলে তো আর তার নামে নুনের গুনগান করতাম না। “

“ স্যার মিষ্টির চেয়ে লবন ভালো!”

ইনশাআল্লাহ চলমান

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply