Golpo romantic golpo প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা

প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ২৫


প্রণয়ের_মায়াতৃষ্ণা ||২৫||

ফারজানারহমানসেতু

রেহেনা নেওয়াজের কথাটা শুনে সবাই একসাথে রোজার দিকে তাকাল। রোজা নিচের দিকে তাকিয়ে দেখল গাউনের পাশের দিকে সত্যিই কালো কালি লেগে আছে। যদিও তার মুখে অবাক ভাব, কিন্তু মনে মনে সে নিজেই জানে,এটা কিভাবে লাগল। কিছুক্ষণ আগেই তো ইচ্ছে করেই লাগিয়েছে! নয়তো অন্যের রাগ দেখবে কে?
রোজা কপালে হাত দিয়ে বলল,“এই সর্বনাশ! কালি লাগলো কিভাবে?”

তুবা সামনে গাড়ি থেকে নেমে এগিয়ে এসে বলল, “দেখি দেখি… আরে সত্যিই তো! এইটা তো পুরো নষ্ট হয়ে গেল।”

মিরান পিছন থেকে বলে উঠল,“ওফফ! এতক্ষন রেডি হয়ে এখন আবার নতুন করে রেডি হতে হবে। মেয়ে মানুষদের নিয়েই সমস্যা!”

রোজা বিরক্ত হয়ে বলল,“একটু চুপ করবে তুমি ভাইয়া?”

রাহেলা নেওয়াজ ভ্রু কুঁচকে বললেন,“এখন কি করবি? এই গাউন পরে তো আর যাওয়া যাবে না।”

রোজা একটু ভেবে মুখ কাঁচুমাচু করে বলল,
“আমি এখন কি পরে যাবো?”

মিরান বললো, “ তুই থাক বনু! আমরা ঘুরে আসি। “

“ যাও!যাও! আমি যাবো না। “

তূর্জান বাইকে বসে এতক্ষন সব দেখছিলো। তবে একটা কথাও বললো না। তানিয়া নেওয়াজ কে বলল, “ আম্মু আমি সমুদ্রের বাসায় যাচ্ছি !

বলেই বাইক স্টার্ট দিলো। রোজা ভ্রু কুচকে তাকিয়ে তূর্জানের গুষ্টি উদ্ধার করে ফেললো।
তানিয়া নেওয়াজ বললেন,“ আচ্ছা ঝগড়া বাদ দে সবাই । রোজা তুই তাড়াতাড়ি গিয়ে অন্য কিছু পরে আয়। ”
তারপর মিরানের উদ্দেশ্য বলল, “ মিরান আমরা আগেই গেলাম, তুই ওদেরকে নিয়ে আয়!”

মিরান মাথা ঝাকিয়ে হ্যাঁ বললো। রোজা যেন এই কথাটার জন্যই অপেক্ষা করছিল। সে দ্রুত বলল,
“হুমম, তোমরা যাও আমরা এখনই আসছি।”

বলেই দৌড়ে আবার বাড়ির ভিতরে ঢুকতে গিয়ে আবার ফিরে এলো।এসেই দেখলো রাফিয়া আরাজকে নিয়ে দাড়িয়ে আছে। রোজা আরাজ কে মিরানের কোলে বসিয়ে দিয়ে রাফিয়াকে ব্যক সিটে বসতে বলল। তুবা মুখ গোমড়া করে বসে আছে। কি মুশকিল! নিশ্চই রোজা শাড়ি পরবে, রাফিয়াও শাড়ি পড়েছে আর ও একা গাউন পরে যাবে। এটা ভেবেই মন খারাপ করছে। রোজা গাড়ির উইন্ডো দিয়ে তাকিয়ে বলল, “ তুবা, শাড়ি পরবি? “

“ না!”

“ আরে শাড়ি পড় না। শাড়িতে তোকে অনেক সুন্দর লাগে!”

রাফিয়াও বলল, “ তুবা যা, শাড়ি পড়ে আয়। তাহলে তিনজনই শাড়িতে ভালো লাগবে।”

“ আমার ভালো নতুন শাড়ি নেই। যা আছে সব পড়ে ফেলেছি। “

মিরান চট করে বলল, “ মেয়ে মানুষের ঢং! এই তোরা যা করার তাড়াতাড়ি কর। নয়তো ফেলেই চলে যাবো!”

রোজা মিরানের কথা সাইডে রেখে তুবার দিকে তাকিয়ে বলল, “ ভাইয়া কালকে একটা শাড়ি আনলো তোকে দেয়নি? “

“ বনু তুই কাজের একটা কথা মনে করেছিস। আমি তো শাড়ির কথা ভুলেই গেছিলাম। দ্বারা শাড়িটা নিয়ে আসি। “

“ ভাইয়া তোমাকে যেতে হবে না। তুবাকে নিয়ে আমি যাচ্ছি। আর তুবা আজকে ওই শাড়িটাই পড়বে। “

বলেই রোজা তুবাকে নিয়ে হাটা ধরল। মিরান পিছন থেকে বলল, “ আরে বনু শোন, শাড়িটা….

কথা শেষ হওয়ার আগেই রোজা বলল, “ জানি, শাড়িটা তুবার জন্য এনেছো। ওকে দেওনি! “

মিরান আহম্বক! ওটা বোন নাকি শত্রু। রোজা তুবাকে টানতে টানতে বাড়ির ভিতরে নিয়ে গেল।
বাড়ির ভেতরে ঢুকেই রোজা হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। দৌড়ে মিরানের রুম থেকে শাড়ি নিয়ে এসে, দরজা লাগিয়ে বিছানায় বসে পরল। তুবার দিকে তাকিয়ে বলল, “ তা ভাবি, শাড়িটা পছন্দ হয়েছে?”

তুবা যেন রোজার মুখে ভাবি ডাক শুনে লজ্বায় রাঙা হয়ে গেল। রোজা চোখের ইশারা দিতেই বলল, “ খুউউব!”

“ দেখতে হবে তো ভাইটা কার! যতই হোক ভাইয়া টা তো আমার। তাই পছন্দ সুন্দর না হয়ে উপায় আছে। “

“ হুমম! “

রোজা ভেবে বলল, “ আচ্ছা তুবা, তুই ভাইয়া কে তোর মনের কথা বলিস না কেন? “

“ ভীষণ ভয় হয়, যদি মনের কথা বলতে গিয়ে আমাদের ফেন্ড হিসেবে থাকা সম্পর্কটাও নষ্ট হয়ে যায়। “

রোজা আর কিছু বললো না। তুবাকে বলল শাড়ি পরে নিতে। তুবা ওয়াশরুমে যেতেই রোজা নিজেই নিজের দিকে তাকিয়ে হাসল। বিরবির করল,
“হাহ! তূর্জান ভাই খুব রাগ দেখাচ্ছিলেন না? এবার দেখেন আমি কি করি!”

রোজা আলমারি খুলে সেই শাড়িটা বের করল।
শাড়িটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল। কালকের কথা মনে পড়ল, তূর্জান যখন শাড়িটা হাতে দিয়ে বলেছিল,“কালকে এই শাড়িটা পরিস।”

রোজা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,“এত রাগ দেখানোর কি আছে? মানলাম কেউ কিছু দিলে তা পড়তে হয়, যদি না পড়ি তাহলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে নাকি?”

কিন্তু কথাটা বললেও শাড়িটা খুব যত্ন করে বিছানায় রাখল। তারপর আবার নিজেই বিড়বিড় করল,“যাই হোক এত ঝামেলা যখন হলো এই শাড়ি পড়া নিয়ে তখন পড়েই ফেলি।”

রোজা ধীরে ধীরে শাড়িটা পরতে লাগল। শাড়ি পরে যখন আয়নার সামনে দাঁড়াল তখন নিজেই একটু থমকে গেল।
মেরুন আর হালকা গোলাপি কাজ করা শাড়িটা তার গায়ে দারুণ মানিয়েছে। চোখে কাজল, ঠোঁটে হালকা লিপবাম, আর খোলা চুল সব মিলিয়ে তাকে যেন আরও শান্ত আর সুন্দর লাগছে।
তুবা আয়নায় রোজার নিজের প্রতিবিম্ব দেখে বলল,“উফ! এখন যদি তোকে কেউ দেখে সে দেখেই তো পাগল হয়ে যাবে। “

“ আর তোকে দেখে আমার ভাই। “

**
কিছুক্ষণ পর রোজা আর তুবা নিচে নামল।
তুবাকে আজ নিজ ইচ্ছেতে রোজা সামনে বসিয়েছে। নিজে ব্যক সিটে বসেছে।
সবাই গাড়িতে উঠে বসেছে। সামনের গাড়িতে বড়রা চলে গেছে। আর পিছনের গাড়িতে মিরান, তুবা, রাফিয়া, রোজা আর আরাজ। রোজা গিয়ে ব্যক সিটের জানালার পাশে বসলো। শাড়ির আঁচলটা ঠিক করতে করতে মনে মনে বিরবির করল, “উফ! এত ঝামেলা করে শেষমেশ শাড়িই পরতে হলো। এই শাড়ি সামলাতে গিয়ে আমি শেষ।”
রাফিয়া পাশে বসেই ফিসফিস করে বলল,
“সত্যি করে বল তো, তুই ইচ্ছে করে গাউনে কালি লাগিয়েছিস না?”

রোজা চোখ বড় করে তাকাল।“কি বলছো ভাবি ! আমি কেন ইচ্ছে করে একটা ড্রেস নষ্ট করবো?”

রাফিয়া ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,“আমাকে বলার দরকার নেই। তোর মুখ দেখেই বুঝছি।”

রোজা ভ্রু কুঁচকে বলল,“চুপ থাকো না ভাবি ! এতো বেশি বুঝো কেন তুমি! ”

মিরান সামনে থেকে ঘুরে বলল,
“এই তোরা দুই জন কি আবার ষড়যন্ত্র করছিস?”

রোজা সাথে সাথে বলল,“তোমার বিরুদ্ধে।”

মিরান নাটকীয়ভাবে বুক চেপে বলল,“হায় আল্লাহ! এই বাড়িতে আমার জীবন নিরাপদ না।”

গাড়ির সবাই হেসে উঠল, এদিকে তূর্জান বাইক নিয়ে আগে বেরোলেও গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যায়নি। রোজাদের গাড়ির সামনে চলছে। কিছুটা দূরে গিয়ে সে সানগ্লাসের ভেতর দিয়ে মিররে তাকাল। পিছনের গাড়ির জানালায় রোজার মুখ দেখা যাচ্ছে। হাওয়ায় তার চুল উড়ছে, আর শাড়ির আঁচল একটু একটু দুলছে। তূর্জান কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল।
তারপর নিজেই মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,
“ যাক বউ আমার রাগ, অভিমান বোঝার মতো বড় হয়ে গেছে!”

তূর্জানের ঠোঁটে অজান্তেই হালকা হাসি ফুটে উঠল।

**
কিছুক্ষণ পর সবাই নূরদের বাড়িতে পৌঁছে গেল।
বাড়ির সামনে তখন বেশ কোলাহল। রঙিন আলো, ফুলের সাজ, আর গানের শব্দে পুরো বাড়ি উৎসবমুখর।গাড়ি থামতেই তুবা লাফ দিয়ে নামল।“উফফ! কি সুন্দর সাজিয়েছে!”

রোজাও নেমে চারপাশে তাকিয়ে বলল,“ওয়াও! একদম সিনেমার মতো লাগছে।”

ঠিক তখনই নূরের বড় বোন অনন্যা এসে বলল,
“ রোজাস্মিতা এতক্ষন পরে আসলে কেন?”

ভিতর থেকে নূরের মা এগিয়ে এসে সবাইকে স্বাগত জানালেন। “এসো এসো, কতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছি।”

তানিয়া নেওয়াজ হেসে বললেন,“রেডি হতে গিয়ে একটু দেরি হয়ে গেল।”

রোজা আর তুবা একে অন্যের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল।ভিতরে ঢুকতেই দেখা গেল নূর হলুদের স্টেজে বসে আছে। চারপাশে হলুদ ফুলের সাজ, আর সামনে অনেক মেয়েরা গান গাইছে। নূর রোজাকে দেখে হাত নাড়ল।
“এইদিকে আয়!”

রোজা যেতেই নূর বলল, “ তোদের সাথে কথা নেই! তোরা লেট করেছিস। “

রোজা এগিয়ে গিয়ে বলল,“ আরে একটা সমস্যায় পরেছিলাম তাই লেট হয়েছে,,ওহহো! আজ তোকে একদম রানীর মতো লাগছে।”

নূর হেসে বলল,“তোরও তো কম লাগছে না। কে শাড়িটা বেছে দিয়েছে?”

রোজা একটু থেমে বলল,“আমি… মানে…”

তুবা পাশে থেকে বলে উঠল,“ প্রফেসর তূর্জান নেওয়াজ। আই মিন আমার ভাইয়া। ”

রোজা সাথে সাথে তুবার দিকে কটমট করে তাকাল।নূর মুচকি হেসে বলল,
“ওহহ! তাই বল।”

রোজা বিরক্ত হয়ে বলল,“তোমরা দুজন না থাকলেই শান্তি।”
এই সময় মিরান এসে বলল,“এই তোরা কি এখানেই আড্ডা মারবি, না হলুদ দিবি?”

নূরের এক খালা বললেন,“হ্যাঁ হ্যাঁ, আগে হলুদ দাও।”
তুবা আর রোজা এগিয়ে গেল। রোজা যখন নূরের গালে হলুদ লাগাতে গেল, তখন পিছন থেকে কেউ বলল, “ধীরে লাগান বেয়াইনরা , না হলে পুরো মুখ হলুদ করে দেবেন।”

রোজা পিছনে তাকিয়ে দেখল,কয়েকটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। বোঝার বাকি রইলো না এরা ছেলে বাড়ির লোক। তবে মেয়েরাও কম কিসে? রোজা, তুবা, নূরের খালাতো বোন, ইরা, সাথে আরও তিন চারটা মেয়ে।সবার চোখেই দুষ্টু হাসি।
রোজা ভ্রু তুলে বলল,“আপনাদের খুব অভিজ্ঞতা মনে হচ্ছে।”

একটা ছেলে শান্ত গলায় বলল,“হুমম! বলতে পারেন কিছু কিছু ব্যাপারে আছে।”

রোজা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,“ তাহলে আসুন, আপনি হলুদ লাগান।”

বলেই হঠাৎ হলুদের বাটি এগিয়ে দিল। একটা ছেলে বললো, “ বেয়াইনরা তো মাশাআল্লাহ! এতো সুন্দর বেয়াইন থাকতে আমরা এখনো সিঙ্গেল থাকি কি করে? “

রোজাদের সাথে থাকা একটা মেয়ে বলল, “ তা বেয়াইগণ, শুধু মুখে ফটর ফটর করেন, না কাজেও? “

চারিদিকে হাসির রোল পরল। ছেলেরাও কম না। তারা বলল, “ কাজে তো আমরা এক্সপার্ট আছি। কিন্তু আপনারা কতখানি তা দেখান। “

“ চ্যালেঞ্জ করছেন? “

“ বলতে পারেন তাই!”

“ তা কি করতে হবে? “

একটা ছেলে রোজাকে দেখিয়ে বলল, “ বেয়াইন, এসে আমাদের দলের কাউকে হলুদ লাগিয়ে দেখান।”

রোজা তো কোনো ছেলেকে স্পর্শ করবে না। তবে মেয়েরা সবাই বলছে এগোতে। ছেলেরাও চ্যালেঞ্জ করছে। এগোবে কি এগোবে না ভেবে তূর্জানকে দেখে আবার থেমে গেল। তূর্জান ওপাশ ফিরে কারোর সঙ্গে ফোনে কথা বলছে। এই লোক নাকি ছেলের বাড়ি থাকবে, তো এখানে কেন? একটা ছেলেকে জিজ্ঞেস করতেই বলল, “ ওই ভাই ও আমাদের দলের লোক। তো আর কি হলুদের বাটি থেকে একটু হলুদ তুলে এগিয়ে গিয়ে তূর্জানের মুখে লাগিয়ে দিল।

ইনশাআল্লাহ চলবে…

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply