প্রণয়ের_মায়াতৃষ্ণা ||১৮|
ফারজানারহমানসেতু
ডাইনিং টেবিলের হাসাহাসি শেষ হতে হতে সকালটা বেশ প্রাণবন্ত হয়ে উঠল। রোজা এবার সত্যি সত্যিই খেতে শুরু করল। তবে খাওয়ার চেয়ে তার কথা বলাতেই যেন বেশি মন।
“গ্রানি, তুমি কি আসলেই আমার পক্ষে কথা বলেছো?”
রাহেলা নেওয়াজ হেসে বললেন,“আমি সবসময় সত্যির পক্ষে থাকি।”
মিরান সাথে সাথে বলল,“তাহলে তো গ্রানি আজকে প্রথমবার ভুল করল।”
রোজা চোখ বড় করে তাকাল,“ভাইয়া!”
তুবা হেসে বলল,“আজকে মনে হচ্ছে আবার যুদ্ধ শুরু হবে।” তূর্জান তখনও শান্তভাবে খাচ্ছে। যেন এইসব ঝগড়াঝাঁটি তার জীবনের খুব সাধারণ ব্যাপার।
মিরান আবার বলল,“গ্রানি, তুমি জানো না বনু সারাদিন কত কথা বলে। ও যদি একদিন চুপ থাকে, মনে হবে পৃথিবীতে কোনো সমস্যা হয়েছে।”
সবাই আবার একসাথে হেসে উঠল। ঠিক তখনই তানিয়া নেওয়াজ বললেন, “আচ্ছা হাসাহাসি বাদ দিয়ে তোরা আগে খাওয়া শেষ কর। তারপর যার যার কাজ কর।”
রোজা খাওয়া শেষ করে উঠে দাঁড়াল।
তুবাও উঠল। রোজা হঠাৎ তূর্জানের দিকে তাকিয়ে বলল,“আজকে ভার্সিটিতে যাবেন?”
তূর্জান ভ্রু তুলে বলল,“কেন?”
“এমনিই জিজ্ঞেস করলাম।”
“ হুমম! আমি শুক্রবারে ভার্সিটি যাবো! তুই যাবি?”
দুপুরের দিকে বাড়িটা একটু শান্ত হয়ে গেল। তুবা আর রোজা নিজের রুমে পড়ছে। মিরান কোথাও বেরিয়ে গেছে। আরাজ রাহেলা নেওয়াজের সাথে খেলছে। রোজা রুমে বসে বই খুলে রেখেছে, কিন্তু পড়ছে না। তার মাথায় ঘুরছে সকাল কার কথা।
“কৃপণ লোক…”
নিজেই বিড়বিড় করল।
তারপর আবার মনে পড়ল তূর্জানের মুখটা।কেমন করে কালকে বলল, “থাপ্পড়ে গালের মানচিত্র পাল্টে ফেলব…”
রোজা মুখ বাঁকাল। বলল,“হুহ! খুব দাদাগিরি!”
তুবা এতক্ষন রোজার ভাবভঙ্গি খেয়াল করছে! প্রথমে পড়ছে ভাবলেও পরে বুঝল অন্য কিছু চলছে। তুবা রোজাকে ধাক্কা দিয়ে বলল, “ এই যে, আপনার মাথায় সমস্যা হয়েছে না কি? এমন বিরবির করছিস কেন?”
“ তোর ভাইকে বকা দিচ্ছি!”
“এ্যাহ! আচ্ছা আমাকে একটা কথা বল, তোর মাথায় এখন সবচেয়ে বড় চিন্তা কি ভাইয়া? “
“ মানে..? “
ঠিক তখন দরজায় টোকা পড়ল।“ভিতরে আসো।”
দরজা খুলে মিরান ঢুকল রুমে। এসেই বিছানায় সটান হয়ে শুয়ে পড়ল। সিলিং এর দিকে তাকিয়ে বলল,
“কি করছিস?”
“কিছু না।”
মিরান সন্দেহের চোখে তাকাল রোজার দিকে! রোজার ভ্রু কুচকানো দেখে বলল,“তুই কি ভাবছিস?”
“ কিছু না!”
“ তুই আবার আমাকে উল্টো পাল্টা ভেবে উপাধি দেওয়ার চেষ্টা করছিস না তো? “
“কিছু না বললাম তো!”
মিরান বিছানায় শোয়া থেকে উঠে বসল। রোজার দিকে তাকিয়ে বলল,” বনু, তোর সব উপাধি মেনে নিবো, একটা প্রেম করিয়ে দে!”
রোজা তুবা দুজনেই হতবাক! তাদের বড় ভাই তাদেরকে বলছে প্রেমের কথা! হারি কে যেন বলেছিলো এটা কলিযুগ! তুবা একটা কলম নিয়ে মিরানের দিকে ছুড়ে মারল, মিরান যদিও কলমটা ধরে ফেলল। তুবা রোজা দুজনেই বলল, “ তোমার লজ্জা লাগে না ভাইয়া! ছোট বোনদের কাছে প্রেমের কথা বলো!”
বিকেলের দিকে বাড়িতে আবার একটু হৈচৈ শুরু হলো। আরাজ মিরানের পেছনে পেছনে দৌড়াচ্ছে।
“কাকু! কাকু!”
মিরান হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,“এই বাচ্চাটা কার? আমি চিনি না একে! এ আমাকে কেন তাড়া করছে? ও রাফেজ ভাইয়া তুমি কোথা থেকে এ জন্তু আবিষ্কার করলে, এ আমাকে বাঁশ দেওয়া ছাড়া কিছুই পারে না!”
আরাজ মিরানের পিছু ছুটতে ছুটতে বলল,
“কাকু তুমি ফকির.. ফকির!”
আবার তানিয়া নেওয়াজ আর রেহেনা নেওয়াজ কে উদ্দেশ্য করে বলল, “ দিদুনরা ফকির কে টাকা দাও!”
মিরান নাটকীয়ভাবে বলল,“এই পরিবারে আমার কোনো সম্মান নেই! আমি থাকবো না এই পরিবারে!”
রেহেনা নেওয়াজ চরম বিরক্ত মিরানের এতো দুষ্টামিতে! আর হবেই না বা কেন? এতোবড়ো ছেলে এখনো বাচ্চাদের মতো দৌড়ে বেড়ায়। ভন্ডামী করে! রেহেনা নেওয়াজ কিছু বলতে গেলে তানিয়া নেওয়াজ আটকে দিলো। চোখ দিয়ে বুঝিয়ে দিল, কিছু না বলতে! রেহেনা নেওয়াজ বড় বোনের মতো জায়ের কথা শুনে মেনে নিয়ে কিচেনে গেলেন, সন্ধ্যার নাস্তা বানাতে! রাফিয়া ধমক দিয়ে আরাজকে সোফায় বসিয়ে দিল। রাফেজ ভিডিও কল দিয়েছে, আরাজ বাবার কাছে সব নালিশ দিয়ে দিল মায়ের নামে। পৃথিবীতে সন্তানের এই দৃশ্যটা সবচেয়ে সুন্দর, বাবা রাগ করলে বা বকা দিলে সালিশ যায় মায়ের কাছে, আর মা বকা দিলে সালিশ যায় বাবার কাছে! একএক করে সবাই রাফেজের সাথে কথা বলে নিল। রাফেজ জানালো এই সপ্তাহে সে বিডিতে ব্যক করবে।
ঠিক তখন দরজার বেল বেজে উঠল। তানিয়া নেওয়াজ বললেন,“মিরান দরজা খুলে দেখ তো কে এসেছে?”
মিরান দরজা খুলতেই অবাক! দরজা খুলেই বলল, “ মিস ধাক্কাধাক্কি..!”
“ আপনি এখানে …
অনন্যা যেন আকাশ থেকে পড়ল। এই ছেলে এখানে কেন? নূর কিছুই বুঝতে পারছে না! অনন্যার দিকে তাকিয়ে বলল, “ ভাইয়া আপনি আমার আপুকে চেনেন? “
“ ওনি তোমার আপু হয় ? “
“ হুমম, ভাইয়া! কেন আপনারা পূর্ব পরিচিত! তবে আপু যে বলল আপনাদের বাসা চেনে না!”
মিরান কিছু বলার আগেই রেহেনা নেওয়াজ মিরানের পিছন থেকে বলল, “ কে এসেছে? আর তুই আহম্বকের মতো ভিতরে আসতে না বলে ওখানে দাড় করিয়ে রেখেছিস!”
সাথে সাথে আরাজ সেই বাক্যটাও মিরানকে বলল। আরাজের মুখে এমন কথা শুনে অনন্যা হেসে ফেলল। রোজা নূরদের দেখে দৌড়ে এলো! এসেই অনন্যা কে জড়িয়ে ধরে বলল, “ আপু কেমন আছো? কতদিন পর তোমার সাথে দেখা!”
অনন্যা মেয়েটা ভীষণ মিশুক, রোজার গাল টেনে বলল, “ আমি আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি, তোমরা সবাই কেমন আছো? “
তুবা দরজার কাছে এসে বলল,“ ভালো, ভীষণ ভালো আপু! তোমাকে দেখার পর আরো ভালো আছে..! না মানে আমরা সবাই অনেক ভালো আছি। “
অনন্যা আর নূর কে বাড়ির ভেতরে নিয়ে বসালো তানিয়া নেওয়াজ। তাদেরকে নাস্তা এনে দিল রাফিয়া। হালকা গল্প করার পরে অনন্যা তানিয়া নেওয়াজ কে বলল, “ আন্টি, আঙ্কেল কোথায়? “
“ তোমার আঙ্কেলরা তো, অফিসে গেছে! হঠাৎ নাকি তাদের কাজের চাপ বেড়েছে! তাই শুক্রবার ও তারা অফিস করছে! এক্ষুনি চলে আসবে!”
অনন্যা নেওয়াজ পরিবারের অফিসে একজন স্টাফ, নূরের হঠাৎ বিয়ে ঠিক হওয়ায় তাজারুল নেওয়াজ অনন্যা কে ছুটি দিয়েছেন। ছুটি মূলত তূর্জান দিয়েছিলো,একসপ্তাহের জন্য! তা বাবাকে দিয়ে এখন যে কাজগুলো করাচ্ছে তার কিছু কাজ অনন্যা ও করতো। তবে এক ছুটিতেই নূরের বিয়ে ও ঠিক হলো। সামনের শুক্রবারে। অনন্যা
তানিয়া নেওয়াজের হাতে একটা ইনভিটেশন কার্ড ধরিয়ে দিল। তানিয়া নেওয়াজ খামটা খুলে ভেতর থেকে একটা কার্ড বের করল।
সোনালী অক্ষরে লেখা। “সমুদ্র রহমান এবং নূরাইয়া ইসলাম নূরের বিবাহ।”
অনন্যা বলল,” আন্টি কিছু মনে করবেন না। আসলে হঠাৎ বিয়ে ঠিক হওয়ায় বিয়েট ছোট করেই দেওয়া হচ্ছে! আর আমাদের বাবা তো নেই, আর আম্মু বাড়ির কাজে ব্যাস্ত তাই আমাদেরকে আসতে হয়েছে!”
রেহেনা নেওয়াজ হেসে বললেন, “ পাগলী মেয়ে, কি মনে করবো! আর তোমার আঙ্কেলের থেকে তোমার কথা অনেক শুনেছি, আজ দেখেও নিলাম! তুমি বড্ডো লক্ষীমন্ত মেয়ে!”
অনন্যা মুচকি হেসে বলল, “আন্টি আঙ্কেল আসলে বলবেন, আপনাদের সপরিবারে দাওয়াত! আসবেন কিন্তু বিয়েতে!”
বলেই বলল, “ আজ তবে আসি!”
তাদেরকে বলেও রাখা গেলো না। আর নেওয়াজ পরিবার ও তাদেরকে জোর করল না। সব সমাজে তো আর মেয়েরা দেরিতে বাড়ি ফিরলে ভালো বলে না।
★★
সন্ধ্যার পরে বাড়ির ছাদে হালকা বাতাস বইছে।
রোজা একা দাঁড়িয়ে আকাশ দেখছিল।
হঠাৎ পেছন থেকে একটা চেনা পরিচিত গলা এল।
“একা একা কি করছিস?”
রোজা ঘুরে তাকিয়ে দেখল,তূর্জান।আবার আকাশের পানে চেয়ে বলল,“কিছু না।”
“কিছু না মানে?”
“আকাশ দেখছি।”
তূর্জান পাশে এসে দাঁড়াল।কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ।
তারপর তূর্জান বলল, “ মন খারাপ? “
“ না! আমি অনেক খুশি?”
“কিসে?”
“সমুদ্র ভাইয়া আর নূরের বিয়েতে।”
তূর্জান কিছুই বুঝতে পারল না! এই মেয়ে হঠাৎ এমন কথা বলছে কেন? তাও মাথা নেড়ে বলল,“কেন?”
“ কারণ নূর অনেক আগে থেকেই সমুদ্র ভাইয়াকে ভালোবাসে!আর আমার জানামতে সমুদ্র ভাইয়াও নূরকে অনেক ভালোবাসে! ওদের ভালোবাসা পূর্ণতা পাবে!”
তূর্জানের বুকের ভিতরে যেন হৃদপিন্ড অস্বাভাবিক ভাবে কম্পন সৃষ্টি করছে। মন বলছে, সব ভেঙে আপন করে নিতে, তবে মস্তিস্ক বলছে এতো তাড়াহুড়োই যতোটুকু এগিয়েছিস তা নষ্ট করিস না। তূর্জান খুব করে চাইছে রোজার সকল অনুভূতি জানতে! তবে এখন না জানাটাই উত্তম, নয়তো রোজার বিপদ বাড়বে বৈকি কমবে না। হয়তো রোজার ব্রেনে চাপ পড়বে, তবে তূর্জান এতটুকু বুঝতে পারছে, তার অনুভূতি প্রকাশের দিন, আর বেশি দূরে নয়। তবে এতদিন অপেক্ষা করতে পারলে এই কয়দিনও পারবে। এই কয়দিন না হয় অনুভূতিরা চাপা থাক ভালোবাসার গোপন সীমানায়। তূর্জান নিজের অনুভূতি চাপা দিয়ে বলল,
“ নূর সমুদ্র কে ভালোবাসে? “
“হুমম! কেন?”
“ এমনি! “
রোজা একটু থেমে বলল, “ সমুদ্র ভাইয়া নূরকে খুব পছন্দ করে, তাই না?”
“ মানে..? আর আমি কি করে জানবো?“
রোজা মুচকি হাসল।“তাইলে আপনি আজকে সমুদ্র ভাইয়া কে মেসেজে এত বড় লেকচার দিলেন কেন?”
তূর্জান ভ্রু তুলল।“তুই পড়েছিস?”
রোজা একটু থতমত খেয়ে বলল,“না… মানে…”
তূর্জান হালকা হেসে ফেলল।“মিথ্যা বলিস না। এটলিস্ট তোর মিথ্যা বলাটা হয় না!”
রোজা মুখ বাঁকাল।“আপনার ফোনটা টেবিলে ছিল।”
“আর তুই পড়েছিস।”
“একটু।”
তূর্জান মাথা নেড়ে বলল,” ম্যাসেজ একটু পড়া যায়, জানতাম না তো! তো কোন একটু পড়লি?
দুজনের দৃষ্টি আকাশের দিকে দিয়ে তাকিয়ে রইল।রোজা হঠাৎ বলল,“আপনি কি সত্যিই মনে করেন… মেয়েরা একটু পেলে অনেকটা দিতে পারে?”
ইনশাআল্লাহ চলবে…
আমার পেজ লিংক Farzana Rahman Setu
Share On:
TAGS: প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা, ফারজানা রহমান সেতু
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ১২
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ১৯
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৫
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৬
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা গল্পের লিংক
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ১১
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ১৩
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৩
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ১৬
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ১৫