প্রণয়ের_মায়াতৃষ্ণা ||১৫||
ফারজানারহমানসেতু
রাত তখন প্রায় বারোটা ছুইছুই হঠাৎ নিজের মুখে হীমশীতল হাতের ছোঁয়া টের পেতেই রোজা ধরফরিয়ে উঠল। বেড সুইচ অন করতেই হালকা আলো জ্বলে উঠতেই দেখল। সামনে তূর্জান দাড়িয়ে, আছে। বিছানায় তাকাতেই দেখল তুবা পাশে নেই!
বিছানা থেকে লাফ দিয়ে উঠে বসল,বলতে শুরু করল,“ আপনি কেন আমার রুমে এসেছেন? তাও এতো রাতে? এই আপনি আবার…..?“
তূর্জান ভ্রু কুচকে বলল, “ আমি আবার কি..?”
“ কিছু না!”
“ এইমাত্র বললি, আবার বলিস কিছু না! কথা অর্ধেক বলে থেমে গেলি কেন? “
রোজা কি করবে? যেই জায়গায় যা করা নিষেধ বা যা বলা নিষেধ তাই করে ফেলে। মনে হয় একটু অভার পসেসিভ হয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন! রোজা কথা পাল্টিয়ে বলল, “ এতো রাতে আপনি আমার রুমে এসেছেন কেন? “
“ রুম কি তোর নামে লিখে দিয়েছি? কই আমার তো মনে পড়ে না! এইটা এই বাড়ির রুম, তোর রুম তোর হাজবেন্ডের রুম!“
“ ওহ হ্যালো মিস্টার নেওয়াজ, আপনার লজিক আপনার পকেটে রাখুন! “
“ মেডিসিন খেয়ে নে, পা ব্যাথা ঠিক হয়ে যাবে!“
“ খাবো না আপনার মেডিসিন, আপনার মেডিসিন আপনি খান। “
বলেই আবার বলল, “ এইই দাড়ান! দাড়ান!”
কথা শেষ হওয়ার আগেই তূর্জান বলল, “ দাড়িয়েই আছি, আর কি দাড়াবো? “
“ বা’ল কথা শেষ তো করতে দেবেন!”
“ কি বললি আরেকবার বল!”
“ কিছু না, ওই মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে!”
“ জিভের আগায় এগুলো রাখলে তো আর মুখে থেকে যাবে না। আর একটা কথা, আর এইসব ওয়ার্ড উচ্চারণ করলে থাপ্পড়ে একদম সোজা করে দেবো!”
রোজা নিজেকে শান্ত করে বলল, “ আরে বা.. ধূর, আপনি কি করে জানলেন, আমি মেডিসিন খাইনি? আপনি আবার আমার রুমে ক্যামেরা লাগাননি তো? “
“ ভূত গিয়ে বলে এসেছে মেডিসিন খা, আর আমায় উদ্ধার কর! নয়তো তোর বাপ জানলে…”
রোজা জেদ ধরে বসে আছে মেডিসিন খাবে না।রেগে বলল,
“ তখন ওত সময় দাড় করিয়ে এখন এসেছে মেডিসিন খাওয়াতে। খাবো না মেডিসিন!“
“ রাগাবিনা কিন্তু, এক থাপ্পড় দিয়ে সব দাঁত
ফেলে দেব, বেয়াদব!“
“ খাবোনা, মানে খাবোনা, আপনি যান তো! “
তূর্জান এবার এক টানে রোজার কোমড় চেপে ধরে কাছে টেনে নিল। রোজা ছাড়া পাওয়ার জন্য ছোটাছুটি করতে লাগল। আরো শক্ত করে রোজার কোমড় চেপে ধরল। তূর্জান রোজার মুখে মেডিসিন দিয়ে বেডসাইট টেবিল থেকে গ্লাস নিয়ে রোজার মুখে পানি দিয়ে দিল। রোজা বাধ্য হয়ে ওষুধ খেয়ে নিল।
ততক্ষনে তুবা এসে হাজির, হাতে পানির বোতল। হয়তো নিচে পানি আনতে গিয়েছিলো। তুবা রুমে আসতেই তূর্জান বলল, “ রাত জাগবি না কেউ! “
রোজা মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল, “ কেন?
তূর্জান রোজার কথায় পাত্তা না দিয়ে এবার চলে যেতে যেতে বলল,
“ কালকে ভার্সিটিতে যাওয়ার দশ মিনিট আগে রেডি হবি দুজনে । “
রোজা আবারও প্রশ্ন করলো, “ কেন “
“ কালকে এক্সাম আছে, তাই। “
“ বুড়ো বয়সে ও পড়াশোনা শেষ করতে পারেন নাই, এখনো এক্সাম দেন। নিশ্চই বহুবার ফেল মারছেন, না জানি আপনার বউয়ের কপালে কি পরিমান দুঃখ আছে।তার জন্য আমার কষ্ট হচ্ছে বেচারির কপালে বুড়ো বর জুটবে সো স্যাড…“
“ তোদের দুজনের ক্লাস এক্সাম আছে!“
“ আমরা ভার্সিটি গেলাম মাত্র কয়েকদিন, এক্সাম দিব না, আর আল্লাহ ব্যতিত কারো কাছে এক্সাম দেয়া পাপ! “
এবার তূর্জান দরজা থেকে তেড়ে আসতে গেলে, রোজা বলল,
“ এক্সাম দেয়া সুন্নত, আমরা দুজনেই এক্সাম দিব।“
তূর্জান চলে যেতেই রোজা বলল, “ তোর ভাই বেশি স্টিক, ভাই এ এমন কেন? “
“ জানিনা। “
রোজা ঘুমুতে গেলো। এই এক্সামের চক্ররে কবে যেন ওক্কা যেতে হয়। তুবাও ঘুমাতে যাবে, এমন সময় রোজা উঠে বসল, হঠাৎ এমন লাফিয়ে ওঠায় তুবার জান বেরিয়ে যায় যায় অবস্থা। রোজা বলল,
“তুই কিচেনে গেলি ভালো কথা, দরজা লক করে যেতে পারলি ন।”
তুবা কি করে বলবে, তার ভাইয়াই তাকে কিচেনে পাঠিয়েছে। বউকে ওষুধ খাওয়াবে বলে। রাতে হঠাৎ তুবার কাছে তূর্জান কল দেয়। জিজ্ঞাসা করল, “রোজা ওষুধ খেয়েছে কি না।”
তুবাও সত্যি কথা বলল,” ওষুধ খায়নি! “
পরে তূর্জানের কথামতোই তো সে ভরা পানির বোতল নিয়ে কিচেনে গেলো। যেন কেউ দেখলে বলতে পারে পানি নিতে এসেছে। আচ্ছা তার ভাই কোনো মতে বউয়ের খেয়াল রাখার জন্য পিএইচডি করতে গেছিলো? নয়তো যেকোনো উপায়ে সে বউয়ের খেয়াল কেমনে রাখে? তুবার ভাবনার মাঝে রোজা বলল, “ হারালি কই? “
“ কই এমনি, ঘুমা সকালে এক্সাম!”
“ হুমম! কপাল খারাপ হলে যা হয়! নয়তো তোর ভাইয়া কেন আমাদের ভার্সিটির প্রফেসর হবে? “
★★★
রাতের ঘটনার পর রোজার ঘুমটা ঠিক মতো হলো না। বাইরে তখনও ভোরের আজানের সুর ভেসে আসছে। জানালার ফাঁক দিয়ে হালকা নীলচে আলো ঢুকছে। চোখ বন্ধ করেও বারবার মনে পড়ছে তূর্জানের সেই কড়া মুখ, আবার ওষুধ খাওয়ানোর সময়ের অদ্ভুত যত্নটা।
নিজের মনেই বিড়বিড় করল রোজা,“উফ! লোকটা আসলে কী চায়?”
আজকেও সকালে তুবার প্রথমে ঘুম ভাঙাল রোজা। দুজনে নামাজ পড়ে নিল। রোজা বিছানায় গিয়ে বলল,
“ আজ তোর এক্সাম আছে !”
“মানে?”
“ আমার এক্সাম নেই!”
তুবা উঠে এসে বিছানায় রোজার পাশে বসে বলল, “ আমাদের দুজনের এক্সাম, না আমার একার না তোর একার!”
রোজা আবার শুয়ে পড়ল। বেবি কম্ফোটারের ভেতর থেকে রোজা মাথা বের করে বলল,
“আমার জ্বর… আমার মাথা ঘুরছে… আমি যাচ্ছি না।”
**
সকালে উঠে নাস্তা করে নিল নেওয়াজ পরিবার। নাস্তার টেবিলে প্রতিদিনের মতো আজও আড্ডার কমতি নেই! মিরান রোজা, তুবা মিলে আড্ডায় জমেছে, আজ বিসনেস মিটিং থাকায় মোস্তফা নেওয়াজ আর তাজারুল নেওয়াজ একটু আগেই বেরিয়ে গেছে। আরাজ এখন রোজাকে দেখলেই বলে, ম্যানারস’লেস ফুপি, যদিও ম্যানারস,লেস বলাটা পরিষ্কার হয় না। তানিয়া নেওয়াজ আর রেহেনা নেওয়াজ নাস্তা দিচ্ছে সবাইকে। রাহেলা নেওয়াজ এখন আর আগের মতো নেই, শরীরে বৃদ্ধার অনেক পরিবর্তন এসেছে। রোজা খেতে খেতে দুনিয়ার সকল গল্প শেষ করবে এমন অবস্থা। খাওয়ার জন্য মুখ না চললেও, কথার বেলায় মুখ ফাস্ট চলছে। তা দেখে আরাজ বলল,’
“ মানাস’লেস ফুপি, ব্রেকফাস্ট করতে বসে কেউ কথা বলে? “
সবাই হেসে ফেললো। রাফিয়া আযাজকে বললো,
“ ফুপিকে সরি বলো! বড়োদের কে এসব বলতে নেই।”
আরাজ মায়ের বাধ্য সন্তান। তাই করলো।রোজা তূর্জানকে কিছু বলতে গিয়ে চোখ পড়লো সিড়ি দিয়ে নেমে আসা তূর্জানের দিকে। ফরমাল ড্রেসাপে হিটলারটাকে ভালোই লাগছে, তবে একটু হিরো টাইপের! নাহ এই ব্যাটা হিটলার হিসেবে থাক। নইলে ঝগড়া করে মজা হবে না। তূর্জান আসতেই রাফিয়া তূর্জানে ব্রেকফাস্ট দিয়ে দিল।তূর্জান আসার পর সবাই কথা বলতে বলতে ব্রেকফাস্ট শেষ করলেও রোজা চুপ করে রইলো। ব্রেকফাস্ট শেষে তুবা আর রোজা নিজেদের রুমে গেলো। ঠিক তখনই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ।রোজা তুবা
দু’জনেই চুপ। দরজার ওপাশ থেকে তূর্জানের গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।
“দশ মিনিট।”
রোজা দাঁত কিড়মিড় করে উঠল।“এই মানুষটা আমার লাইফে কেন? ভাই এর মতো তো ঘড়িও পাঙচুয়াল না!”
তুবা হেসে বিরবির করে বলল, “কারণ আল্লাহ চাইছে।”
রোজা কিছু বুঝতে পারলো না তুবার কথা। বলল, “ কি বলছিস? “
“ কিছু না, তুই রেডি হ! “
রোজা বালিশ ছুঁড়ে মারল তুবার দিকে। এরা দুইভাই বোন এমন কেন? সময়ের দাম এতো বেশি, সত্যিই কি বেশি। হয়তো, সময়ের দাম অনেক বেশি, নয়তো সময়ের সাথে সব হারিয়ে যায় কেন?
দশ মিনিট পরে ড্রইংরুমে এসে দাঁড়াতেই তূর্জান হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, “এগারো মিনিট। মানে ওয়ান মিনিট লেট!”
রোজা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,“মেয়েদের রেডি হতে টাইম লাগে, এটা জানেন না?”
তূর্জান শান্ত গলায় বলল,“ পড়াশোনা করে বড় হতে চাইলে সময়ের দাম দেওয়া আগে শিখতে হয়।”
রোজা একটু থমকাল। কথা বলার মতো কিছু পেল না।গাড়িতে ওঠার পর অদ্ভুত নীরবতা।আজও তুবা ব্যকসিটে আর রোজা ফ্রন্টসিটে।হঠাৎ তূর্জান বলল,“পা এখন কেমন?”
রোজা জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,” আগের মতোই!”
তূর্জান ভ্রু কুচকে বলল,“ মানে?”
রোজা এবার নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “ মানে আবার কি? আগের মতো দুইটা পা ই তো আছে, আগে যেমন দেখতে ছিলো এখনো তেমন আছে!”
পেছন থেকে তুবা ফিক করে হেসে উঠলো। এদের লাভস্টোরি টা টম এন্ড জেরির মতো। রোজা তুবার দিকে তাকাতেই তুবা হাসি থামিয়ে দিল। তূর্জান সামনে চোখ রেখেই বললো, “ পায়ের ব্যাথা কমেছে? “
রোজা বললো,“ভালো।”
“ মানে? “
“ এইটা আগের প্রশ্নের উত্তর!”
তূর্জান একে নিয়ে কোথায় যাবে? এর সাথে সারাজীবন থাকলে নিশ্চিত পাগল হয়ে যাবে। তূর্জানও প্রশ্ন করলো, “ পরীক্ষায় ও একটার উত্তর আরেকটাতে দিস? “
“ওষুধ না খেলে ভালো হতো, থ্যাংকস!”
তের্জানের এবার নিজেকে পাগল মনে হচ্ছে। এই মেয়েকে নিয়ে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আর থাকা হবে না। এই মেয়ে তার আগেই মেরে ফেলবে।
তূর্জান কোনো কথা বলছে না দেখে রোজা এবার ঘুরে তাকাল। লোকটা কি রেগে গেলো, একবার দেখবে রেগেছে না কি? দেখাই যায়, কাউকে জ্বালাতে তো আর টাকা লাগে না,
“আপনি আমাকে ভয় দেখিয়ে ওষুধ খাইয়েছেন।”
“ভয় দেখাইনি ?”
এক প্রশ্ন উত্তরে রোজা চুপ হয়ে গেলো। নাহ এ এখন শান্ত, আর শান্ত মানুষকে জ্বালাতে ভালো লাগে না।ভার্সিটিতে পৌঁছাতেই নূর দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল।
“কই ছিলি কাল? তোর মুখে এত রাগিভাব কেন?”
রোজা ফিসফিস করে বলল,“গল্প আছে, পরে বলব।”
তূর্জান গাড়ি থেকে নেমে দূর থেকে একবার তাকাল। চোখে অদ্ভুত কড়া নজর। যেন কাউকে সাবধান করে দিচ্ছে,“ওদের দিকে খেয়াল রেখো।”
রোজার চোখে সেই দৃষ্টি ধরা পড়ল। কেন যেন বুকের ভেতর কেমন করে উঠল। এক্সাম হলে বসে প্রশ্নপত্র হাতে নিয়েই রোজার মাথা ঘুরে গেল।
“ইয়া আল্লাহ! এগুলো তো আমি পড়িই নাই!”
তুবা পাশে বসে ফিসফিস করল,
“বলেছিলাম পড়তে! আর সমস্যা নেই এগুলো আজ না পড়লেও কয়েকদিন আগে পড়েছিস। লেখা শুরু কর!”
রোজা কলম কামড়ে লেখা শুরু করল। ঠিকই তো সে এগুলো আগে পড়েছে।লেখার মাঝে মনে হলো কোনো চোখ তার দিকে তাকিয়ে আছে
মাঝে মাঝে দরজার দিকে তাকাচ্ছে। যেন কেউ দাঁড়িয়ে আছে কি না। আধা ঘণ্টা পর বেরিয়ে এসে দেখল সামনে একটা ছেলে, বয়স দশ থেকে বারো বছর ।হাতে তিনটে জুস, এনে রোজার হাতে দিল। রোজা অবাক।কে এই ছেলে?ছেলেটি চলে যেতে চাইলে রোজা জুস ফেরত দিতে চেয়ে বলল, “এই ছেলে জুসগুলো আমাকে কেন দিচ্ছো? “
“ ভাবি, ভাই আপনাকে দিতে বললো!”
রোজাসহ তুবাও আহম্বক। এই ছেলের ভাবি হয় রোজা কেমনে? রোজা বললো, “ তোমার ভুল হচ্ছে, এগুলো অন্য কারোর, নিয়ে যাও!”
“ ভাবি, ভাই আপনার ছবি দেখিয়ে বলেছে, এগুলো আপনাকে দিতে!”
ইনশাআল্লাহ চলবে…
এ নতুন ভাই আবার কেডা? আমি জানিনা, এ আবার কোথা থেকে আবিষ্কার হলো?
Share On:
TAGS: প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা, ফারজানা রহমান সেতু
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৭
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা গল্পের লিংক
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ১০
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ২
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৬
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৮
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ১৩
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ১১
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৩
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৫