Golpo কষ্টের গল্প পিদিম জ্বলা রাতে

পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৯


পিদিমজ্বলারাতে. ৯ ✍️ #রেহানা_পুতুল

“সমস্যা আমার নয় বাবা! সমস্যা আপনার হতো। প্রাণে মরে যেতেন। এই ট্যাবলেট খাইয়ে দিনের পর দিন আপনাকে কাবু করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে!”

মুহূর্তেই গোটা রুমজুড়ে শুনশান নিরবতা নেমে এল জনমানবহীন বিরানভূমির মতো!

“কী বলছিস এইসব তুই? নিজের ঘরে কে আমাকে মারতে চাইব? কেনই বা চাইবে?”
পীড়িত স্বরে জিজ্ঞেস করলো জাহেদ।

তৌসিফ শ্লেষের সুরে বলল,
“একই প্রশ্ন আমারও বাবা? আপনি, মা,দাদা,দাদী আমরা সবাই মনে করতাম ডায়াবেটিসের জন্য আপনি ক্রমশ দুর্বল হয়ে যাচ্ছেন। খাওয়া কমে যাচ্ছে। নাহ বাবা নাহ। একদম তা নয়। এই ট্যাবলেটের পাতা দেখে ডাক্তার যখন সব বলছিল, তখন আমার পাশে তানভির ছিল। আপনাদের বিশ্বাস না হলে প্রমাণের জন্য প্রয়োজনে আমি ডাক্তার এনে হাজির করবো এখন। আমি এখন প্রশ্নগুলো করবো এক এক করে। কসম করে বলছি, সত্য স্বীকার করলে ক্ষমা পাবে অপরাধীরা। নয়তো আমি কঠিন বদলা নিব! দ্বিগুণ সাজা দিব!”

তানভির ছাড়া বাকি সবাই জেলখানার আসামির মতো নিচু মাথায় বোবা মুখে বসে আছে৷ প্রাণচঞ্চল পরিবেশটার রূপ বদলে গেল ক্ষণ সময়ের ব্যবধানে। যেন অমাবস্যার নিঃস্তব্ধ ঘন আঁধার! সেই আঁধারের ভীড়ে হারিয়ে যাচ্ছে তারা সবাই।

এবার তৌসিফ প্রশ্ন ছুঁড়ে মারল ছোট চাচা জাবেদের দিকে।
“কাকা, যেদিন দাদা জায়গা ভাগ করার জন্য সবাইকে নিয়ে বসল। আমি বাইরে থেকে এসে আপনাদের ড্রেসিং টেবিলের ভিতরে এই ট্যাবলেটের পাতাটি পেয়েছি। তারপর চাচী এই ট্যাবলেটের পাতাটি খুঁজেছিল। কিন্তু পায় নি।”

মনি গলায় তেজ ঢেলে বলল, “তোমাকে বলছি আমি এইটা খুঁজছি?”

“তো কী খুঁজেছিলেন?”

“তোমাকে কইতে হইবো? আমার ব্যক্তিগত জিনিস। পরে পাইছি।”

“ঠিক আছে বুঝলাম। তাহলে এই ট্যাবলেটের পাতা কীভাবে এল আপনাদের রুমে? আমাদের ঘরে কে খায় এই ট্যাবলেট? কেন খায়? ডাক্তার বলল এটা বাংলাদেশে নাই। নিষিদ্ধ। বাইরের দেশে আছে। ভারত,কলকাতায় কিছু ফার্মেসীতে এই ট্যাবলেট পাওয়া যায়। বলেন চাচী?”

“আমি কইতে পারুম না। তোমার চাচারে জিগাও।”

সলিমুল্লা,মর্জিনা,খুকী, রাবেয়া,সাথি,সিমা ওরা প্রত্যেকে হতবুদ্ধির ন্যায় জবাব দিল,
“আমি জানিনা কিছুই। মাত্রই দেখলাম এই ট্যাবলেটের পাতা। এবং কে খায় তাও জানি না।”

“চাচা চুপ কেন? কিছু বলেন?”
শক্ত গলায় বলল তৌসিফ।

“ডাক্তার না-কি বলল এই ঔষধ দেশে নাই। বাইরে আছে। বাইরে কে গেল আমাদের?” বলল জাবেদ।

“বাইরে কে গেল সেটার চেয়ে বড় কথা আমি তো ঘরে এটা পেয়েছি। ঘরে কী হেঁটে এসেছে এই ট্যাবলেটের পাতা? পা আছে এই জড়বস্তুটির? নাকি জিন ভূতে এনে রেখে গেল আমাদের ঘরে?”

জেদী ও ব্যস্ত গলায় বলল তৌসিফ।

জাবেদও এবার রেগে গেল। চড়া কণ্ঠে সবাইকে শুনিয়ে বলল,
“সত্য বললে তো এখন তুই জ্বলে উঠবি। আমি যদি বলি এটা সম্পূর্ণ তোর সাজানো নাটক। তুই এই ট্যাবলেটের পাতা ঢাকায় থেকে যোগাড় করছস। কিছু ট্যাবলেট খুলে ফেলে দিছস। আর কেন করছিস সেটা? তা হলো আমাদেরকে দোষী সাব্যস্ত করলে তোর ভিন্ন হওয়ার পথ খুলে যাবে৷ এটাই একমাত্র কারণ। সামনে ঘরে তোর বউ আসবে। তাই আগেই ভিন্ন হয়ে যাইতে চাস,যেন বউ এসে কাজ না করা লাগে। আমার বড় ভাইরে আমি কতখানি শ্রদ্ধা করি,ভালোবাসি তাতো আমি জানি। আমার ভাই জানে।”

জাবেদের কথা জাহেদের অল্পস্বল্প বিশ্বাস হয়। রাবেয়া কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে আছে এক পাশে। দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে আছে। বাকি সবাই বিভ্রান্তি নিয়ে এ ওর পানে দৃষ্টি বিনিময় করছে। তৌসিফ উত্তেজিত হল না এতবড় জোচ্চুরি মার্কা কথা শুনেও।

তানভিরকে নির্দেশ করে বলল,
“আমি গেলে এরা ভাববে আমি শিখিয়ে দিয়েছি। তুই গেলেও একই ধারণা পোষণ করবে। অভ্রকে দোকানে পাঠা। আমিনুল ডাক্তারকে নিয়ে আসতে বল। উঠে যা।”

ভাইয়ের আদেশ শুনে তানভীর উঠে গিয়ে অভ্রকে পাঠায়। ছোট্ট অভ্র ঘর হতে বের হবার আগে বসার রুমে উঁকি দেয়। রুমে এসে স্থির চোখে সবার দিকে তাকায়। বোঝার চেষ্টা করে কার কী হয়েছে। না বুঝতে পেরে অবুঝের মতো বেরিয়ে গেল। নিকটবর্তী বাজারে গেল। আমিনুলকে সাথে করে নিয়ে এল। বাড়ি ও বাজারের দুরত্ব মাত্র কয়েক হাত। তাই গ্রাম্য চিকিৎসক আমিনুল বরাবরই সলিমুল্লার ঘরে আসে এমন ডাকে। সে হাতের ব্যাগ নিয়ে, প্রেশার মাপার যন্ত্রটা নিয়ে চলে এল।
তৌসিফ তাকে বলল,
“আমিন ভাই, আপনাকে বিরক্ত করলাম। এই ট্যাবলেটটা কী আছে আপনার কাছে? একটু জানার দরকার ছিল।”

আমিনুল ট্যাবলেটটি নেড়েচেড়ে চিন্তিত সুরে জানাল,
“নাহ নাই। কই পেলেন এটা ভাই? এটা তো মনে হয় বাইরের থেকে আনা হয়েছে। সিউর হতে চাইলে বড় ডাক্তারকে দেখাতে হবে।”

“আচ্ছা,বুঝতে পারলাম। আপনি আসেন ভাই। কষ্ট দিলাম। বিকেলে আসতেছি দোকানের দিকে। দেখা হবে।”

আমিনুল চলে যায়। তৌসিফ ছোট ভাইকে দৃঢ় স্বরে বলল,
“বড় বাজারে যা। একজন বড় ডাক্তারকে সাথে করে নিয়ে আয়। যেই ফার্মেসি থেকে বাবার জন্য সবসময় ঔষধ আনি, সেখানে আমার নাম বললেই তিনি ডাক্তার ম্যানেজ করে দিবে।”

তানভির বিনাযুক্তিতে ভাইয়ের কথায় উঠে দাঁড়াল যাওয়ার জন্য। তখনই জাবেদ বলে উঠল,
“যেতে হবে না। এই ঔষধ বাইরে থেকে আনা হয়েছে তাতো আমরা সবাই বিশ্বাস করছি। কথা হলো আমাদের ঘরে কীভাবে এল সেটা?”

তৌসিফ বলল,
“এটা যে আমার সাজানো, না আপনাদের কাজ তা স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে দিনের আলোর মতো।”

“কী প্রমাণ আছে তোর কাছে?””
বলল জাবেদ।

“আপনাদের ড্রেসিং টেবিলে যেহেতু পেয়েছি। তার মানে আপনারা যোগাড় করেছেন। হয় আপনি নয় চাচী।”

“কীভাবে?” বলল মনি।

তখনই তৌসিফ বলল,
“আপনার ভাই ইন্ডিয়া যায়। উনাকে দিয়ে সংগ্রহ করেছেন।”

“তুই দেখছত সে যাইতে?” বলল খুকী।

তৌসিফ সাথিকে বলল,
“সাথি আমাকে যে সেদিন কিছু জিনিস দেখালি,চাচি দিয়েছে বলে। ওগুলো নিয়ে আয় জলদি।”

সাথি তৎক্ষনাৎ উঠে যায়। একটু পর ফিরে আসে। চোখ কপালে তুলে বলল,
“এগুলো কিছুই নাই দেখি।”

“জানতাম এমনটাই হবে। এসব লুকিয়ে ফেলা হবে।”
তৌসিফ নিজের রুমে গিয়ে নিজে লুকিয়ে রাখা সেই পাঞ্চ ক্লিপটা নিয়ে আসে। সাথিকে বলল,
“এটা তোর ক্লিপ?”

“হ্যাঁ। কই পেলেন? বাকিগুলো কই?”

“বাকিগুলো চাচী সরিয়েছে প্রমাণ লুকানোর জন্য। এটা আমি সরিয়েছি প্রমাণ করার জন্য। এবার বল, এই ক্লিপ কোথায় পেলি তুই?”

“ছোট চাচী দিল আমাকে। চাচীর ভাই মাঝে মাঝে ইন্ডিয়া যায়। আসতে এটা সেটা আনে। চাচী আমাকে দেয়।”

সবাই অদ্ভুত চোখে সাথির কথা শুনল। মনি সাথির দিকে চেয়ে চোখ কটমট করে বলল,
” তোরে আমি খাইছি রে সাথির বাচ্চা সাথি। দেখিস তোরে কি করি আমি।”

তৌসিফ বলল,
” হাতেনাতে প্রমাণ করার পরেও অস্বীকার করবেন? ঠিক আছে। এই ক্লিপ দেশের কোথায় পাওয়া যায়? কোন কসমেটিক বা ইমিটেশন দোকানে পাওয়া যায় এনে দেখান পারলে? না-কি বলবেন এটাও আমি বাইরে থেকে আনিয়েছি?”

সলিমুল্লা খ্যাঁক খ্যাঁক করে কেশে উঠলেন। নীরিহ গলায় বললেন,
“ভাই বাদ দে। যা হইছে, হইছে। কারে কী কমু। ওই আমার ছেলে। তুই আমার নাতি। এখন জাহেদের দিকে ভালো কইরা,খেয়াল রাখতে হইবো। তার ঔষধপাত্তি মন দিয়া বেলায় বেলায় খাওয়াইতে হইব।”

একই সুরে সুর মেলাল খুকী,মর্জিনাও। খুকী মনে মনে বিশ্বাস করল জাবেদ ও তার স্ত্রী মিলে এই কাজ করতে পারে। কিন্তু তবুও সে ছোট বোন হয়ে কিভাবে বড় ভাই,ভাবিকে কিছু বলবে।

তৌসিফ উত্তেজিত হয়ে উঠল। হিংস্র গলায় বলে উঠল,
“এটা বাদ দেওয়ার মতো বিষয় দাদা?একজন মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। তাকে সচল থেকে অচল করে দেওয়া হচ্ছে ধীরে ধীরে,তার ডায়াবেটিসকে পুঁজি করে৷ তাকে শারীরিকভাবে,মানসিকভাবে দুর্বল করে রাখা হয়েছে। তারপরেও বাদ দিব? চুপ করে থাকব? এই আপনাদের বিচার? আপনাদের ইনসাফ?এই আমার বাবা,মায়ের এতটা বছরের ত্যাগের ফলাফল?”

সবাই নিঃশ্চুপ! নিশ্চল! জাবেদ,মনি অপমানে,রাগে,বিতৃষ্ণায় ফুঁসে উঠছে। তৌসিফ, জাবেদ ও মনির দিকে চেয়ে বলল,
“তার মানে ছোট চাচা, চাচী স্বীকার যাবেন না। নাহ?”

মনি বলে উঠল,
“আমার বড় ভাই বাইরে যায় সত্য। কিন্তু ট্যাবলেট আনবে ক্যান? সব চক্রান্ত আমাগো জন্য। তুমি ভিন্ন হইতে চাও ভালো কথা। তাই বলে আপন চাচীরে দোষারোপ করার গল্প বানাইতে হইবো?”

তৌসিফ হাত মুষ্টিবদ্ব করে ঘরের বেড়ায় জোরে ঘুষি মারল। চাচীর কথায় ভ্রুক্ষেপ করার সময় তার নেই।

সে ফের সবাইকে জিজ্ঞেস করলো,
” প্রমাণ পেয়েও আপনারা কী অবিশ্বাস করবেন আমার কথা? বলেন?”

মর্জিনা নিদারুণ স্বরে বলল,
“কারে কী কইতাম ক? কে ট্যাবলেট আনাইল? ক্যামনেই বা খাওয়ায় তোর বাপেরে সেইটাই তো আমার মাথায় আসতেছে না। তোর বাপেরে প্রত্যেক বেলা ঔষধ খাওয়ায় তো তোর মা-ই।”

“দাদা, আমরা কোন ভিটায় ঘর তুলব দেখিয়ে দেন। তানভির গিয়ে আমিন নিয়ে আসুক। কোন আমিনরে আপনি বলে রাখছেন? কালই আমি ঘরের কাজ ধরবো।”
ক্ষ্যাপাটে গলায় বলল তৌসিফ।

“আমিন তো একজনই আমাগো গেরামে। পাঠা তাইলে।”

” হ্যাঁ, যা। আমিন আনা। তুই তো এটাই চাইছিলি। তোর মূল উদ্দেশ্যেই ছিল এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা।”
বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে হেঁড়ে গলায় বলল জাবেদ।

“আমার শরীরে একবিন্দু র* ক্ত থাকতেও, আমার বাবাকে কীভাবে ও কেন সেই ট্যাবলেট খাওয়ানো হয়,এই কঠিন সত্যি আমি আপনাদের স্বামী, স্ত্রীর মুখ দিয়ে বের করাবোই। মনে রাখবেন।”

জাবেদের মুখের সামনে আঙুল তুলে বজ্রনিনাদ কণ্ঠে বলল তৌসিফ। জাবেদও মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে নেয়, তৌসিফকে দেখে নিবে বলে।

চলবে…৯

#

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply