পিদিমজ্বলারাতে. ৮ ✍️ #রেহানা_পুতুল
তানভির ছাড়া বাকি সবাই অসহিষ্ণু ও বিষ্ফোরিত চোখে তৌসিফের মুখপানে চাইলো। রাবেয়া অতিশয় ক্ষুব্ধ হলেন ছেলের উপরে। শাসনের ঢংয়ে উচ্চকণ্ঠে বললেন,
“তোর হইছেটা কী এবার বাড়িতে আইসা? এমন শুরু করছস ক্যান? কিসের প্রশ্ন করবি তুই দাদা,ফুফুরে? আবার হুমকি দেস ভুল উত্তর দিলে পরিণাম ভয়াবহ! বড়দের নিয়া কী কস তুই এইসব? নম্রতা,ভদ্রতা কই গেল তোর? অসুস্থ বাপেরে মারতে চাস? তাইলে হাসপাতালেই মাইরা ফালাইতি! আমিও চইলা যাইতাম দুইচোখ যেইদিকে যায় সেদিকে। তুই বিয়া কইরা জুদা হইয়া বউ নিয়া আরামে থাকিস! বজ্জাত ছেলে কোথাকার! আমার তো মনে হয় তোর মানসিক সমস্যা দেখা দিছে। নইলে তোরে আলগায় ধরছে। ফকির দেখাইতে হইবো তোরে।”
তৌসিফ দাঁতে দাঁত পিষে নিঃশ্চুপ থাকে। মায়ের কথার কোনো প্রতিউত্তর দিলনা। তানভির ছাড়া জাহেদসহ উপস্থিত বাকিরা মনে মনে খুশী হলো রাবেয়ার উপর। তাদের কথাই রাবেয়া বলল ছেলেকে। তানভির ক্ষেপে উঠলো মায়ের উপরে।
গলা উঁচিয়ে বলল,
“আম্মা থামো বলছি। নইলে এক্ষুনি বাড়ি ছেড়ে চলে যাব। ভাইয়া কী তোমার মতো অন্ধ না-কি? অন্যায়,অবিচার সব সহ্য করে যাবে ধৈর্য ধরে? তোমার বোঝা উচিত নিশ্চয়ই কোনো বড়সড় কারণ আছে। নয়তো ভাইয়া কেন এমন কিছু বলবে? আগে কখনো বলছে? বলো? সংসারে তুমি গাধার মতো খাটতে খাটতে নিজেই একটা গাধাতে পরিণত হয়েছ। ভালো-মন্দ,ন্যায়-অন্যায়,উচিত-অনুচিত কিছুই বুঝনা। রোবট একটা তুমি। সবার হুকুম ও নির্দেশনাবলী পালন করাই যেন তোমার কাজ। “
রাবেয়া হই হই করে উঠলেন। হাত বাড়িয়ে ছোট ছেলের গালে সপাটে চড় বসিয়ে দিলেন। গজগজিয়ে বললেন,
“আমি যদি এখন তোর ভাইরে না শাসাতাম,তোর দাদা,দাদী,চাচীরা আমারেই ভুল বুঝতো। বলতো আমি মা হয়ে ছেলেকে শাসন করলাম না। তারা তো তোর সামনেই আছে। জিগা তাদের।”
তানভির বেরিয়ে গেল রুম থেকে। উঠানে গিয়ে টিনের খোয়াড়ের মধ্যে সজোরে লাথি মারল। এবং তৎক্ষণাৎ বাড়ির পাঙ্গণ ত্যাগ করল!
অসুস্থ জাহেদ আহত মনে দুর্বল শরীর নিয়ে শুয়ে আছেন। দু-চোখ গড়িয়ে অশ্রু ঝরছে তার। জীবনের পাক্কালে এসে তার নিজের কাছে নিজেকে একজন ব্যর্থ পিতা,ব্যর্থ স্বামী,ব্যর্থ মানুষ মনে হচ্ছে। তবে সে ব্যর্থ ছেলে নই কিছুতেই। পরিবারে তার দানের কমতি নেই। ঘাটতি নেই।
সলিমুল্লা বললেন,
“বহুত হইছে। কেউ আর হাউকাউ কইরো না। তৌসিফ আমার বড় ছেলের ঘরের বড় নাতি। দাদা দাদির আদরের। সেদিন তো কইতে গিয়া সব কইতে পারল না। এই ছোট বউ, জাবেদ রে মোবাইল কইরা আমারে একটু ধরারা দিও। সে বাড়িতে আসুক। খুকীও আসুক। তৌসিফের সব কথা শুনমু সবাই।”
“আচ্ছা বাবা,কালকেই আপনার সাথে কথা বলায়া দিব অভ্রের আব্বুর।”
নোয়ানো স্বরে বলল মনি।
সবাই এদিক সেদিক চলে গেল।তৌসিফও নিরব রইলো। থমথমে মুখে চলে গেল নিজের রুমে। বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে কেবল। রাবেয়াও স্বামীর পাশে বসে বোবা কান্না জুড়ে দিল। স্বামী, স্ত্রী মিলে আলোচনা করতে লাগল তৌসিফের বিষয়ে। তারা দ্বিধাদ্বন্ধে ভুগছে তৌসিফকে নিয়ে। জাহেদ স্ত্রীকে বলল,
“তৌসিফ ভিন্ন হতে চায় কেন? তোমার কী মনে হয়?”
“আপনার কী মনে হয়, আগে সেইটা কন?”
“বুঝতেছি না। কিছুটা মনে হয় সে যে সামনে বিয়ে করবে,তাই আগে থেকেই ভিন্ন হতে চায়৷ যেন তার বউ এসে অনেক কাজ করতে না হয়।”
“আমারো খালি এইটাই মনে হয়। আর একটু মনে হয় আমি এত কাজ করি কেন,সেই বিষয়টা। কিন্তু আমি তো এই সংসারে কাজ সারাজীবনই করে আসলাম। এতদিন তো ওই কিছু কইল না, হঠাৎ এমন বেয়াড়াপনা করতাছে ক্যান? ওই যে ঘরে বই আইব। তাই। আবার নাও হইতে পারে।”
রাবেয়া পুরোনো সুতি শাড়ির আঁচলখানা টেনে নিজের নাক মুখ মুছে নিল। উঠে গেল রোজকার মতো তার কাজগুলো করার জন্য। তানভির কিছুক্ষণ পর বাড়ি ফিরে এলো। রুমে ঢুকল। এই রুম, খাট তাদের দুই ভাইয়ের। মধ্যবিত্তের জীবনে রুম,বিছানা শেয়ার না করে উপায় নেই। তানভির ভাইয়ের পাশে দু পা সোজা করে শুয়ে পড়ল। উপুড় হয়ে ছিল বলে তৌসিফের ভেজা চোখজোড়া তার অদেখাই রয়ে গেল।
রাবেয়া মেজো জায়ের রুমে গেল মলিন মুখে। সিমা বলল,
“ভাবি,মন খারাপ কইরেন না। তৌসিফ ভিন্ন হইতে চাইলে হইব। আমাদের কারো কোনো আপত্তি নাই। মনির মোবাইলে আপনার দেবর যখন ফোন করল,তখন তারেও জানাইলাম সব। সেও তৌসিফের কথায় সায় দিল।”
পাশ থেকে সাথী বলে উঠল,
“হ্যাঁ বড় আম্মু,আম্মার কথাই আমার কথা। তৌসিফ ভাইয়ার থেকে বিস্তারিত না শুনে উনাকে ভুল বোঝা ঠিক না।”
রাবেয়ার কোনো মেয়ে সন্তান নেই বলে মেজো দেবরের বড় মেয়ে সাথীকে নিজের কন্যাসম স্নেহ করে। কিন্তু এই মূহুর্তে সাথীর কথায়ও তিনি ভ্রুক্ষেপ করলেন না। হতাশ কণ্ঠে ক্ষোভ ঝেড়ে নিদারুণ সুরে সিমার দিকে চেয়ে বললেন,
“কী মুসিবতে পড়লাম এই ছেলে নিয়া আমি। ওর কী হইছে,কিছুই ব্রেনে আসে না। এক চিংড়ি মাছ আর শাড়ির জন্য তো এতো বড় সিদ্ধান্ত সে নেওয়ার কথা নয়। আল্লায় আমার মরণ দেক।”
জাবেদের মোবাইলে মনি মিসকল দিল। সে কিছুক্ষণ পর ব্যাক করল। মনি ফোন এনে সলিমুল্লার কাছে দিল। মর্জিনা তার হাত থেকে মোবাইল নিয়ে নিলেন। বললেন,
“দেন আমি আগে কই কেচ্ছা। পরে আপনে কইয়েন।”
মর্জিনা ছোট ছেলেকে সবিস্তারে বলে বাড়ি আসতে বলল। একই কথা সলিমুল্লাও বলল। জাবেদ তাদের আশ্বাস দিল সে অতিসত্বর বাড়ি আসবে৷ তৌসিফ এখন চলে যাক ঢাকায়। সে গেলে তখন তৌসিফ আবার আসলেই হবে। তৌসিফকে সলিমুল্লা ডেকে জানালেন।
তৌসিফ শান্ত সুরে বলল,
“ঠিক আছে দাদা। সমস্যা নেই।”
তৌসিফ ছোট চাচীর দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছে। তাই তার চোখে ধরা পড়ে গেল, মনি চুপিচুপি কিছু একটা খুঁজছে ঘরের এদিক সেদিক। তৌসিফ নিজের কৌতুহল সংবরণ করতে পারল না। জিজ্ঞেস করে বসল,
“চাচী কী খোঁজেন? হারালো না-কি কিছু?”
“হরে বাপ। আমার একটা জিনিস পাইতাছি না।”
“কখন থেকে পান না চাচী? কী সেটা।”
” একটু ব্যক্তিগত জিনিস। নজরে পড়ল ভাইকে নিয়ে তোমরা যখন ঢাকায় গেলে তার পরদিন। মনে হয় অনুষ্ঠানের দিন কেউ নিয়া গেছে। কতজনই তো তখন ঘরের ভিতর ছিল।”
“ওহ আচ্ছা! ভালো করে খোঁজেন। পাইতেও পারেন।”
বলে তৌসিফ মনে মনে ক্রুর হাসে।
তৌসিফ সবার থেকে বিদায় নিয়ে ঢাকায় চলে যায়। তার পূর্বে মাকে ভালো করে বলে যায় পিতার দিকে বিশেষ খেয়াল রাখায় জন্য। রাবেয়া নির্লিপ্ত চোখে বড় ছেলেকে বিদায় দেয়। তানভিরও চলে যায় তার হলে।
প্রসঙ্গত জাহেদের বলা কথাটা নবনীর বাবা গিয়ে বাসায় বলল। নবনী পাশ থেকে শুনেও চুপ রইলো। তার মা দম্ভের সুরে বলল,
“উনাদের সাথে আমাদের পুরোপুরি ম্যাচ হয় না। আত্মীয়তার সম্পর্ক করতে হয় সমানে সামনে। নয়তো দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। তাছাড়া নবনীর তো কোন ছেলেকে যেন পছন্দ।”
নবনীকে তার মা ডাক দিল। জিজ্ঞেস করলো,
“তোর আব্বুর কথা তো শুনলি। এটা মানায়? হয়? কোথায় তারা কোথায় আমরা। তুই যে ছেলেকে পছন্দ করিস সময় করে এই ভিতরে তাকে বাসায় নিয়ে আয়। আমরা তাকে দেখি।”
“আচ্ছা আম্মু। দেখি সে কবে আসতে পারবে।”
তৌসিফ মেসেজ পায় নবনীর।
“জরুরী কথা আছে। পারলে মেডিক্যালে এসো।”
তৌসিফ পরেরদিনই চলে যায়। নবনী তার পিতার জন্য যা করল তা মনে রাখার মতো। সুতরাং দেরী করা যাবে না যেহেতু জরুরী শব্দটা উল্লেখ করেছে। নবনী ও তৌসিফ মুখোমুখি মুখোমুখি নয় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। নবনী অভিমানী মুখে চুপ হয়ে আছে। তৌসিফ আলতো হেসে বলল,
“বিষয়টা এমন, কাউকে ইনভাইট করে নাস্তা না দেওয়া। বললা,জরুরী কথা। এলাম। বাট তোমার দুঠোঁট মিলে আছে। আমি চলে যাব?”
নবনী বাসার বিষয়টা জানাল নরম সুরে। তবে মায়ের কথাগুলো হাইড রাখল। তৌসিফ ধুম করে হেসে ফেলল। তার পুরোপুরি বিশ্বাস হল না নবনীর কথা। বলল,
“বাবা অসুস্থতার ভিতরে ছেলের বিয়ের প্রস্তাব দিল? তাও তোমার বাবাকে? তোমার জন্য? ওহ সিরিয়াসলি? মজা পেলাম। আচ্ছা এমনিতেই ক্লাস ফ্রেন্ড হিসেবে তোমাদের বাসায় যাওয়া যায়। অনেক আগেওতো একবার গিয়েছি মনে হয়। তাই না?”
নবনীর বেশ রা* গ হলো তৌসিফের উপরে৷ আর একটি শব্দও উচ্চারণ করল না। গটগট পায়ে হাঁটা ধরল সামনের দিকে। একটি ভাঙা ইটের টুকরোয় হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল। তৌসিফ জোর পায়ে এগিয়ে এসে নবনীর দুবাহু ধরে দাঁড় করালো।
“মন কোথায়? চোখ কোথায়? পড়লে কীভাবে?”
“চলে যাও তৌসিফ৷ ভুলেও আর তোমার সাথে যোগাযোগ করব না৷ আমি বানিয়ে বলছি? তোমার তাই মনে হলো? আমি মরে গেলেও তুমি আসবা না। যাও।”
ধরা গলায় বলল নবনী। তার চোখ দিয়ে টপটপ করে অশ্রু ঝরতে লাগল। তৌসিফ তার আঙুলের ডগা দিয়ে নবনীর গালের অশ্রু মুছে দিতে গেল। নবনী তৌসিফের হাত ঝাড়া দিয়ে মেডিক্যালর ভিতরে চলে গেল।
তৌসিফ গম্ভীর চোখে নবনীর চলে যাওয়া দেখল। রিকশা নিয়ে সেও তার কর্মস্থলে চলে গেল। সেদিনই প্রথম তৌসিফের ভুবনে,কল্পনায়,ভাবনায় নবনী স্থান পেল।
পনেরো দিন পর জাবেদ চট্রগ্রাম হতে এসেছে। তৌসিফ এসেছে ঢাকা হতে। তানভিরও এসেছে। খুকীও এসেছে। তাকে লোক মারফতে খবর দেওয়া হলো। পূর্বেকার দিনের মতো সবাই বসার ঘরে উপস্থিত রয়েছে। তবে আজ আর সন্ধ্যার পরে নয়। মধ্যাহ্ন ভোজের পরপরই সবাই জড়ো হয়েছে তৌসিফের অনুরোধে। তৌসিফ আগেই ঠিক করে নিল ভিন্ন হওয়ার কথা প্রথমে বলবে না। এতে আবার কথা কাটাকাটি শুরু হবে। আগে ট্যাবলেটের পাতার কথা তুলবে। ধরাশায়ী করবে সবাইকে। তবেই পানির মতো সহজ হয়ে যাবে ভিন্ন হবার বিষয়টা। তখন আর তার মা,বাবাও আপত্তি করার পথ খুঁজে পাবে না।
তৌসিফ ছোট চাচীর দিকে চেয়ে বলল,
“চাচী সেদিন যে জিনিসটা
খুঁজলেন,সেটা পেয়েছেন?”
মনির পেটের ভিতর কামড় শুরু হলো। কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এল। মুখের স্বতঃস্ফূর্তভাব উবে গেল। মরা বিকেলের মতো নিস্তেজ হয়ে এল।
জাবেদ বুঝতে পারল না। সে মনির দিকে জিজ্ঞাসু চাহনি নিক্ষেপ করল। তৌসিফ প্যান্টের পকেট হতে সেই বড় ট্যাবলেটের পাতাটি বের করল। সবার সামনে বাড়িয়ে ধরল। তেজস্বী গলায় জাবেদকে বলল,
“চাচ্চু,চাচীর দিকে চেয়ে লাভ নেই। জবাব আমার কাছে। এদিকে তাকান।”
জাবেদ শুকনো ঢোক গিলতে লাগল। বাকরুদ্ধ হয়ে ট্যাবলেটের পাতাটির দিকে চেয়ে রইলো। জাহেদ রাগান্বিত হয়ে গরম চোখে ছেলেকে বলল,
“চাচার থেকে চোখ নামিয়ে কথা বল বলছি। সামান্য একটা ট্যাবলেটের পাতা নিয়ে তোর কী সমস্যা?”
“সমস্যা আমার নয় বাবা! সমস্যা আপনার হতো। প্রাণে মরে যেতেন। এই ট্যাবলেট খাইয়ে দিনের পর দিন আপনাকে কাবু করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে!”
মুহূর্তেই গোটা রুমজুড়ে শুনশান নিরবতা নেমে এল জনমানবহীন বিরানভূমির মতো! “
চলবে…৮
Share On:
TAGS: পিদিম জ্বলা রাতে, রেহানা পুতুল
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৬
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৭
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ২
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৯
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৪
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১১
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৩
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৬
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৫
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৭