পিদিমজ্বলারাতে. ৬ ✍️ #রেহানা_পুতুল
সবাই স্তম্ভিত! বাকরুদ্ধ! সবার অদ্ভুত ও অবিশ্বাস্য চাহনি তৌসিফের দিকে তাক হয়ে আছে অ-চেনা মানুষের মতন। তারা একে অপরের মুখের অভিব্যক্তি লক্ষ্য করছে। কারো মুখে ভাষা নেই। সবার নিরবতা ভাঙল উঠানে থাকা একটি কুকুরের বিদঘুটে আওয়াজে।
সলিমুল্লা ঝেড়ে কাশলেন। বড় ছেড়ের দিকে চেয়ে বলিষ্ঠ গলায় বললেন,
“কিরে, তৌসিফ হঠাৎ এমন কথা কইল ক্যান? নাকি তোগো দুইজনের বদলে সে কইলো?”
পিতার পশ্নটি জাহেদের অন্তরে কাঁটার মতো বিঁধল। যেখানে সে নিজেই কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে গেল তৌসিফের কথা শুনে সেখানে সে পিতাকে কী বলবে। তবুও জাহেদ মরা বিকেলের মতো নিস্তেজ গলায় বলল,
“বাবা, আমি কিছুই জানি না। মাত্রই শুনলাম। আপনাদের মতো আমিও অবাক হয়েছি তৌসিফের কথা শুনে। আমি একদমই চাই না ভিন্ন হতে।”
সলিমুল্লা বড় পুত্রবধূ রাবেয়ার দিকে দৃষ্টিপাত করলেন। রাবেয়া মোলায়েম স্বরে বলল,
“বাবা, আমার দিকে কোনো অভিযোগের আঙুল তুলবেন না দয়া করে। ওর কী হইছে আল্লায় জানে। আমিও চাই না ভিন্ন হইতে।”
জাবেদ গলায় কাঠিন্যতা এনে বড় ভাই,ভাবির উদ্দেশ্যে বলল,
“তাহলে কী এই হঠকারী সিদ্ধান্ত সে একাই নিয়েছে মা,বাবার সাথে পরামর্শ না করে? ভাগ হতে চাইলে ভাগ হয়ে যাক। আমার আপত্তি নাই।”
জাবেদের কথাগুলো যে কেবল মুখের কথা, তা অন্যরা না বুঝলেও তার স্ত্রী মনি ঠিকই বুঝতে পারল। সে অবুঝের মতো চুপচাপ বসে রইলো একপাশে। তার মতো করে নির্বোধ সেজে আছে প্রবাসী জামালের স্ত্রী সিমা ও তার মেয়ে সাথী। তাদের কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ নেই বড় ভাসুরের পরিবারের সাথে। বরং তারা পছন্দ করে তাদের।
সলিমুল্লা একে একে সবাইকে জিজ্ঞেস করলেন,
“তৌসিফ যা কইল,তাতে তোমরা রাজী আছো?”
সিমা বলল,
“বাবা,তৌসিফ এই ঘরের বড় ছেলে। শিক্ষিত জ্ঞানী ছেলে। সে হয়তো অনেককিছু চিন্তা কইরা এই সিদ্ধান্ত নিছে। তাই আমার কোনো আপত্তি নাই বাবা।”
মনি বলল,
“বাবা,আপনি যা ভালো বুঝেন করবেন। তাই আমরা মেনে নিব।”
তানভির বলল,
“আমি চাই আমরা সবাই এভাবেই থাকি সারাজীবন। কিন্তু ভাইয়া যেহেতু চাচ্ছে না তাই আর কিছুই বলার নেই আমার। আপনারা যা ভালো মনে করেন তাই করবেন।”
জাবেদ বিরক্তিকর স্বরে বলল,
“আমি চাই না আমরা এখনই ভিন্ন হই। মানুষ কী বলবে শুনলে? তারপরেও বাকিটা আপনারা বুঝেন।”
সবার কথা শুনে মর্জিনা মনে বেশ জোর পেল। তিনি থমথমে গলায় বলে উঠলেন,
“ওই এখন সব কাজের কাজি। ঘরের বিষয়ে মাতব্বরি শুরু কইরা দিছে দাদা,দাদি,বাপ,চাচারা বর্তমান থাকতে। আমি চাই সবাই মিলামিশা একলগে থাকুক! হাসুক! খাওক! বাঁচুক! ও কইলেই হইল না-কি?”
সলিমুল্লা পাংশুটে মুখে তৌসিফের কাছে জানতে চাইলেন,
“আচ্ছা, আচমকা তুই ক্যান আলগা হইতে চাস মা,বাপ নিয়া, ক তো?”
তৌসিফ ম্লান অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“দাদা,দাদী,সবকিছুর পিছনে কারণ থাকে,কেন থাকে। আমি সেই কারণ ও কেন’র জবাব অবশ্যই আপনাদেরকে অবহিত করতে পারি। ভিন্ন হতে চাই,এই বাক্যটি বলতে আমার খুব খারাপ লেগেছে। কিন্তু না বলে আর উপায় নেয়। দেয়ালে যখন পিঠ ঠেকে যায় কোনো মানুষের,তখন মানুষটি বাঁচার জন্য সামনের বাধা দেওয়া মানুষটাকে আঘাত করতে বাধ্য হয় নিজেকে বাঁচানোর জন্য।”
তৌসিফের কথাগুলো সবার কাছে দুর্বোধ্য ঠেকল তামস যুগের আলো আঁধারির মতন। জাহেদ ও রাবেয়া মনে মনে লজ্জিত,বিরক্ত ও অনুশোচিত ছেলের এমন কথাবার্তায়। তারা বারবার ভেবেও বুঝতেছে না; কী বললে তৌসিফকে তার সিদ্ধান্ত থেকে সরানো যায়।
সলিমুল্লা হতবাক কণ্ঠে বললেন,
“বুঝলাম না। আমার সংসারে কার দেয়ালে পিঠ ঠেইকা গ্যাছে? কে তারে আঘাত করতে চায়? আর সে বাঁচার জন্য এখন আলগা হইতে হইবো?”
“দাদা,আমি পূঙ্খানুপুঙ্খ বলে নতুন করে কারো মনে কষ্ট দিতে চাই না। সবাই সবার সাথে ভালো ছিল। ভালো থাকুক সম্পর্ক। আপনি তো বাইরের ধানি জমি ও বাড়ির সম্পত্তি এমনিতেই ভাগ করে দিতেন। সেসব যেহেতু ভাগ হবে তাহলে সবার সংসারও ভাগ হয়ে যাক। হাঁড়িও ভাগ হয়ে যাক।”
সলিমুল্লার গলা ধরে এলো নিষ্ঠুরের মতো বড় নাতির কথাগুলো শুনে। তিনি বললেন,
“তোর মুখে এমন কথা শুনুম এইটা আমার চিন্তার বাইরে ছিল। বাইরের সম্পত্তি ভাগ আর ঘরের হাঁড়ি ভাগ এক হইলো? জানি না কোন জালিম এমন কুবুদ্ধি দিয়া তোর মাথাটারে খাইছে আর বিগড়াইয়া দিছে।”
পিতার কথা শেষ হতে দেরি, কিন্তু খুকির মুখ খুলতে দেরি হল না। সে কণ্ঠে এক ঝাঁপি ঝাঁঝ ঢেলে বলল,
“এতক্ষণ চুপ কইরা সবার কথা শুনলাম। আমি এই ঘরের একমাত্র মাইয়া। আমারও কথা বলার অধিকার আছে। দশ কথার এক কথা হইলো, তৌসিফ সামনে বিয়া করব। ঘরে নতুন বউ আইব। তার বউ যেন এতজনের কাজ না করতে হয়,তাই সে আগে থেকেই ভিন্ন হইয়া যাইতে চায়। এইটাই একমাত্র কারণ। আমরা কেউই চাই না ভিন্ন হইতে। মেজো ভাবি তাদের পক্ষে। তিনি ক্যান তাদের পক্ষে তাও আমি বেশ জানি। তবে তৌসিফ যেহেতু চায়,তাইলে ভিন্ন হইয়া যাওনই ভালো। এতো অশান্তির আর দরকার নাই। ঘরে এখন অকারণে রোজ রোজ ঝামেলা করতাছে সে। শহরে থাইকা ওই মানুষ থেইকা অ-মানুষ হইয়া গ্যাছে।”
মুহুর্তেই তৌসিফ হুংকার দিয়ে উঠলো দাঁড়িয়ে। তর্জন গর্জন শুরু করলো।
” কী! আমি অ-মানুষ! আর আপনারা খুব মানুষের বাচ্ছা? নাহ? আপনারা তো আমার চেয়েও বড় অ-মানুষ! আপনাদের কর্মকাণ্ডে তো আমার মনে হয় মানুষে জন্ম না দিয়ে কোনো পশু জন্ম দিছে আপনাদের!”
বলেই সে পাশে থাকা কাঠের চেয়ার তুলে ছুঁড়ে মারল উঠানের মাঝ বরাবর। ঘরে সবার মাঝে পিনপতন নিরবতা নেমে এলো শীতের মধ্যরাতের ন্যায়। সে উত্তেজিত গলায় খুকীর দিকে তাকিয়ে বলল,
“এই চিনলেন ভাতিজাকে ফুফু? আমি বিয়ের জন্য,বউয়ের জন্য ভিন্ন হতে চাই? একদম না। আমার কাছে আমার পরিবার ইম্পর্ট্যান্ট!”
“ক্যান? তোর কথায় তো সেই প্রমাণ মিলে। গতকাইল তুই তো কইলি, তোর মার বিয়ের শাড়ি দিয়া তোর বউরে ঘরে তুলবি।”
ক্ষুব্ধ গলায় বলল খুকী।
“তার মানে কী এটা বোঝায় ফুফু? বিয়ে তো একদিন করতেই হবে। যখন করব তখনকার কথা বলছি আমি। সবসময় আপনারা মা,মেয়ে উলটা বুঝেন। উলটা কাজ করেন।”
কর্কশ গলায় বলল তৌসিফ।
জাহেদ ও রাবেয়া মাথা হেঁট করে বসে আছে। তাদের স্বামী স্ত্রীর মরে যেতে যেতে ইচ্ছে করছে এই মূহুর্তে। এতটা বছর তাদের স্বামী, স্ত্রীর উপরে ভালো মানুষীর তকমাটা বুঝি আর রইল না ছেলের জন্য। অথচ পরিবারে, বাইরে সবাই জানে ও বিশ্বাস করে, সলিমুল্লার বড় ছেলে জাহেদ যেমন কাদামাটির মতো নরম মানুষ, সাদা দিলের মানুষ, ঠিক তেমনি তার স্ত্রী টাও ভালো মানসিকতার। জগতের সমস্ত পংকিলতা ও জটিলতা থেকে গা বাঁচিয়ে চলে তারা। আজ সব ধূলিসাৎ করে দিল তৌসিফ।
মর্জিনা হই হই করে উঠলেন নাতির উপরে। হায় হায় সুরে তাকে বলে উঠলেন,
“এই তুই কী কইলি? কী কইলি তুই? কিসের আমরা,মা,মাইয়া বেবাককিছু উলটা বুঝি? এক্ষনই তুই পই পই করা সব হিসাব দিবি। কী সমস্যা? কী করছি আমরা কারে? তোর বাড়া ভাতে ছাঁই ঢালছি? তোরে কত যত্ন কইরা,পালছি। জীবনে এইদিন দেখতে হইবো,এমন জাইনলে আঁতুড়ঘরে তোরে নুন খাওয়াই মাইরা ফালাইতাম আমি। তুই বেশী বাইড়া গেছত। আমাগো অভিশাপে তুই ধ্বংস হইয়া যাইবি কইলাম। কয়টা ট্যাকা কামাস শহরে থাইকা। তাই শইরলের রক্ত গরম তোর। হের লাইগাই তোর মুখ দিয়া অমন গরম গরম কথা বাইর হয়। যা অহনই জুদা হইয়া যা। বাইর হইয়া যা। তোর মতন পোলারে ত্যাজ্য করন দরকার।”
তড়িতেই শশব্যস্ত হয়ে তৌসিফ মায়ের রুমে চলে গেল। একটি ঔষধের ফাইল ও এক্সরের রিপোর্ট নিয়ে নিয়ে এলো সবার সামনে। তাদের সামনে ছুঁড়ে মারল। উত্তেজিত গলায় খুকী ও দাদীর দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি আগেই বলছি কী ও কেন’র জবাব আছে আমার কাছে। দিতে গেলে বেইজ্জতি হবেন। কিন্তু যেহেতু আপনাদের শোনার এতো সাধ, তাই বলতে বাধ্য হচ্ছি, এক্সরেতে দেখেন আমার মায়ের কোমরের হাড় ক্ষয় হয়ে গিয়েছে বেশ পরিমাণ। এই ঘরে তো বয়স চল্লিশ অতিক্রম করা আরো নারী আছে,তাদের হাড় অক্ষত আছে। কেন দাদী কেন? জবাব চাই আমার।”
সবাই পাহাড়সম বিতৃষ্ণা নিয়ে তৌসিফের দিকে চেয়ে আছে। সে তার মায়ের বাম হাত ধরে টান দিয়ে সবার সামনে আনল। বলল,
“আমার মায়ের এই আঙুল বেঁকে গেছে কেন? ঢেঁকিতে কার পাড়ায় আমার মায়ের আঙুল চলে গেল? আমার মা অপুষ্টিতে ভোগে কেন?কে দায়ী?”
তৌসিফের মুখে যেন খই ফুটেছে। সে আরো বলতে গিয়েও পারেনি পিতার শোচনীয় অবস্থা দেখে। জাহেদের পচন্ড বুক ব্যথা আরম্ভ হলো আরো আগেই। এতক্ষণ অনেক কষ্টে সহ্য করে রয়েছেন। আর পারছেন না ব্যথা সহ্য করতে। তাই তিনি বসা থেকে কাত হয়ে পড়ে গেলেন।
তানভির বড় ভাইয়ের উপর ক্ষোভ ঝাড়তে ঝাড়তে বাজারে ছুটে গেল প্রায় দৌড়ে। সি এন জি নিয়ে এলো ঘরের সামনের উঠানে। তৌসিফ ও তানভির বাবাকে ধরাধরি করে নিয়ে গেল একটি প্রাইভেট হাসপাতালে। ঘরের পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করলো। রাবেয়াসহ সবাই তৌসিফকে গালমন্দ দিতে লাগল। হাসপাতালে উপস্থিত চিকিৎসা দিয়ে চিকিৎসক নির্দেশ দিল দ্রুত ঢাকায় নিয়ে যেতে জাহেদকে।
দুইভাই মিলে বাবাকে শহরে নিয়ে যাচ্ছে এম্বুল্যান্সে করে। তারা জানে না হাসপাতালে গেলে আরো ভয়ংকর কিছু শুনতে হবে তাদের। উন্মোচিত হবে সেই ট্যাবলেটের পাতার রহস্য!
চলবে…৬
Share On:
TAGS: পিদিম জ্বলা রাতে, রেহানা পুতুল
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১১
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১২
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৫
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ২
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৮
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৭
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৩
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৩
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৮
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৫