পিদিমজ্বলারাতে.২৭ ✍️ #রেহানা_পুতুল
কড়া রোদের তেজে ঝিমিয়ে আসা প্রকৃতির মতো সে হেলে পড়ে যেতে লাগল। হাসানুল ও রকিব তাকে ধরে সোজা করে বসিয়ে দিল। হাসানুল কপালে জমে উঠা চিকচিক করা ঘামগুলো মুছে নিল হাতের রুমাল দিয়ে।
জাবেদকে বলল,
“ঠিক আছে। থানায় আর কোনো স্বীকারোক্তি দিতে হবে না তোমার। এবার আদালতে যা বলার বলবে। আদালত যদি মনে করে তোমাকে কারাগারে প্রেরণ করার প্রয়োজন রয়েছে, তারা করবে। আমাদের কাজ শেষ।”
“স্যার,আদালত,কারাগার কেন? আমি তো সব স্বীকার করার জন্য প্রস্তুত!”
স্তম্ভিত,নিদারুণ গলায় জানতে চাইল জাবেদ।
“এটা আইন। পুলিশ আসামিকে এরেস্ট করে আনার পর আদালতে প্রেরণ করতে হয়।”
“স্যার,আসামি প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সত্য স্বীকার করলে থানা থেকেও তো জামিন দিয়ে দেয়।”
হাসানুল জাবেদের কথার প্রতিউত্তর দিল না। ভারি ভারি পা ফেলে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল। জাবেদ বিপন্ন চোখে রকিবের দিকে চাইল। রকিব তাকে বলল,
“আপনি তো প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার যাননি। এবং বারবার মিথ্যা বলে পুলিশকে হয়রানিতে ফেলেছেন। আপনার অপরাধ হত্যা মামলার কাছাকাছি। একজন মানুষকে জেনে বুঝে স্বইচ্ছায় স্বজ্ঞানে ক্রমশ অসুস্থ করে বিছানায় ফেলে রেখেছেন। এভাবে তার মৃত্যুও হতে পারতো। বুঝতে পারছেন আপনি, কতটা জঘন্য, নারকীয় কাজ করেছেন? কেন এত ক্রোধ ও জিঘাংসা বড় ভাইয়ের প্রতি?”
জাবেদ কিছু বলতে চায়,কিন্তু রকিব শুনতে চাইল না। বেরিয়ে গেল কক্ষ হতে। তারপর জাবেদকে আদালতে পাঠানো হলো।
তৌসিফদের ফুলটিনের চারচালার নতুন ঘরটি সম্পূর্ণ হয়ে গেল। ঘরের সামনের ও পিছনের বসার দরজার সিঁড়ি পাকা হলো। বিদুৎ সংযোগ দেওয়া হলো। মিটার বসানো হলো। আগের ঘর থেকে লাইন টানা যেতো। কিন্তু তৌসিফের কড়া নির্দেশ এটা করা যাবে না। ভিন্ন মানে সবকিছুই ভিন্ন। পুরাতন সব আসবাবপত্রগুলো বার্নিশ করে কাঠ রঙ দেওয়া হলো। হয়ে গেল নতুনের মতো।ফার্নিচারের দোকানে অর্ডার দেওয়া টেবিলও রেডি হয়ে গেল। জহির ভ্যানে করে টেবিল তাদের বাড়িতে পৌঁছে দিল। নতুন ঘর,শখের টেবিল পেয়ে রাবেয়ার খুশীর অন্ত নেই। আনন্দে আত্মহারা সাত রাজার ধন কুড়িয়ে পাওয়ার মতো। এই ভিতরে সে লিস্ট করে ফেলেছে,অতিথি আসা উপলক্ষে ঘরের কী কী কিনতে হবে। তাই কেনাকাটা করার জন্য সে ও জাহেদ মিলে বড় মার্কেটে চলে গেল। জাহেদ আগের চেয়ে সুস্থ। শারীরিক শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে। মনোবল দ্বিগুণ হয়েছে। ফিরে পেল জীবনীশক্তিও। আর তাই রাবেয়া মানা করার পরেও আগ্রহান্বিত হয়ে সে নিজেই গেল যেচে। বহু সময় ঘুরে ঘুরে রাবেয়া লিস্টের অনেক কিছুই কিনল। এক সেট নাস্তার পিরিচ। এক সেট চায়ের কাপ। চারটি তরকারির বাটি। একটি কাঁচের পানির জগ। এক সেট বিছানার চাদর। নতুন একটি বড় গামছা ইত্যাদি। তাও বাকি রয়ে গেল আরো কিছু।
জাহেদ বলল, “বাকিগুলো নিবে না?”
“নাহ। আইজ আর না। ক্লান্ত লাগতাছে।”
“আসো মিষ্টির দোকানে। তোমার প্রিয় দই আর রসগোল্লা খাওয়াই।”
রাবেয়া খাবে বলে সম্মতি জানায়। স্বামীর পাশাপাশি হেঁটে এগিয়ে যায় মার্কেটের জন সমাগমের ভীড় ঠেলে। এটা জাহেদের পরিচিত মিষ্টির হোটেল। লক্ষী নারায়ন মিষ্টান্ন ভান্ডার নাম। সেই সুবাদে রাবেয়া একটু বেশীই খাতির পেল হোটেল বয়দের কাছ হতে। ফ্যানের নিচে আরাম করে বসল রাবেয়া। এক পিরিচ মিষ্টি দইয়ের মাঝখানে বড় একটি রসালো সাদা রসগোল্লা। রাবেয়া চামচ দিয়ে মিষ্টি কেটে দইয়ের সঙ্গে মিশিয়ে মুখে দেয়। এভাবে দই মিষ্টি খেতে তার কাছে দারুণ স্বাদ লাগে। খাওয়া শেষে বাড়ি ফিরে গেল তারা।
পরেরদিন পাশের বাড়িতে গিয়ে আফিয়াকে ডেকে আনল রাবেয়া। আফিয়া আজন্ম গরীব! অন্যের ফুট ফরমায়েস খাটাই তার দৈনন্দিন রুটিন। আফিয়াকে সাথে নিয়ে বড় ঘর, রান্নাঘর, ঢেলা লেপা হলো। ঘরের অন্যান্য কাজগুলোও একে একে সামলে নিলো। জিনিসপত্রগুলো হাতে হাতে নিয়ে গুছিয়ে রাখল। তবে ঘরে রাত্রি যাপন করা হবে মিলাদের পরেই।
পরের সপ্তাহে তৌসিফ গ্রামে এল। তানভিরও চলে এল। তৌসিফ বাবার হাতে নতুন মোবাইল তুলে দিল। জাহেদ ছেলের উপর সন্তুষ্ট হলো বেশ। সে আসলেই একটা যোগ্য পুত্র জন্ম দিয়েছে। ঠিক তার মতো। মোবাইল দেখে জাহেদের চেয়ে রাবেয়া অনেক বেশী খুশী হলো ছেলের উপর। রাত পর্যন্ত বাবা,মা ও দুই ছেলে মিলে গল্প করল। রাবেয়া বাড়ির সব খবর বলল। প্রসঙ্গত তৌসিফ তাদের বলল,
“বাবা, ঘরের বসার রুমটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। তাই ভাবছি, একসেট সোফা নিয়ে আসব। নবনীদের বাসায় গিয়ে দেখলাম, ওদের ড্রয়িংরুমে ফোমের দুই সেট সোফা রয়েছে৷ সেখানে আমাদের যদি অন্তত কাঠের এক সেট সোফাও না থাকে,মাথা হেঁট হয়ে যাবে। না-কি বলেন?”
“তা একদম ঠিক। কিন্তু টাকা কই পাবি বাবা? এমনিতেই তো অনেক খরচ হয়ে গেছে।” নীরিহ সুরে বলল রাবেয়া।
“মা,আমি লোন নিয়েছি না ঘর করার জন্য? সেই টাকা আছে। হিসেব করেই খরচ করতেছি। চিন্তা করো না। এটা জহিরের পরিচিত দোকান। বাকিতে নিব। ছয়মাস পরেও টাকা শোধ করা যাবে।”
রাবেয়া প্রসন্ন চিত্তে ছেলের মুখপানে চাইল। তৌসিফ মাকে জড়িয়ে ধরলো পুত্রস্নেহে।
পরের দিন তৌসিফ বড় মার্কেটে চলে গেল তানভিরকে নিয়ে। বন্ধু জহিরকে সাথে করে ফার্নিচার দোকানে গেল। তাকেও দাওয়াত দিল শুক্রবারে তাদের বাড়িতে দুপুরে থাকার জন্য। মেহগনি কাঠের থ্রি ইন ওয়ান সোফা সেট বানাতে দিয়ে দিল। যেন নবনীর পরিবার আসার আগেই রেডি হয়ে যায়। তারপর দুই ভাই মিলে কাঁচা বাজারগুলো করে নিল।
মসজিদের হুজুরদের দাওয়াত দিল জাহেদ নিজে গিয়ে। তার বাবা মা থেকে শুরু করে ঘরের বাকি সবাইকে বলল। বোন খুকিকেও দাওয়াত দিল। রাবেয়া তার ভাই,বোনদেরও দাওয়াত দিল। তার বাবা,মা নেই। তারা গত হয়েছেন কয়েক বৎসর পূর্বেই। খুকী এলো। যত যাই হোক এখন আর বড় ভাইয়ের পরিবারের বিপক্ষে গিয়ে লাভ নেই। তারা শক্তিশালী হয়ে উঠছে। তাদের দুইই ছেলেই বেশ বড়। একজন ভালো আয় করে। আরেকজন ভালো কলেজে অধ্যায়ন করে। নতুন ঘর তুলেছে। শহরে থাকা পরিবারের সাথে আত্মীয়তা করতে যাচ্ছে। বউ ডাক্তার। তবে জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে মনি। সে তৌসিফদের নতুন ঘরের ছায়ায়ও পা রাখল না। মিলাদেও খেতে এল না। নিজেকে আড়ালে রেখেছে। অভ্রকেও চোখ রাঙিয়ে বলে দিয়েছে যেন না যায় তৌসিফদের নতুন ঘরে। কিন্তু অভ্রর বেয়াড়া মন মায়ের কথার অবাধ্য হলো। সে চলে গেল সেদিকে। এবং দুপুরে সবার সাথে বসে ভরপুর খেল।
মিলাদ পড়িয়ে, খাওয়া শেষে হুজুরেরা চলে গেল। সবাই নতুন ঘরে প্রবেশ করল বিসমিল্লাহ বলে আল্লাহর নাম নিয়ে। রাবেয়া ঘরের চারপাশে ও ভিতরে গোলাপ পানি ছিটিয়ে দিল ঘরকে পবিত্র করার উদ্দেশ্যে। মশার উপদ্রপ বেড়ে গেল বলে সে ধূপ জ্বালিয়ে দিল সন্ধ্যায়। ধূপের ধোঁয়া ও গন্ধে মশা ও কীট-পতঙ্গ চলে গেল।
তৌসিফ সবাইকে নিয়ে বসল তাদের নতুন ঘরে। তার নির্দেশে আফিয়া সবার জন্য মসলা চা তৈরি করে নিয়েছে রান্নাঘরে গিয়ে। সে এই তিনদিন ধরে একটানাই আছে তৌসিফদের বাড়ি। রাবেয়া নিজ হাতে চা ঢেলে দিল সবাইকে। চায়ের সঙ্গে টা হিসেবে রইলো নিজেদের ক্ষেতের চালের ঘরে ভাজা মুড়ি,বাজার থেকে আনা গরম গরম পুরি ও সুপার বিস্কুট। এগুলো তানভির গিয়ে নিয়ে এসেছে। যার যেটা মন চাচ্ছে নিয়ে খাচ্ছে।
তৌসিফ সবার উদ্দেশ্যে নম্র অথচ দৃঢ় গলায় বলল,
“শুরুতেই বলে নিচ্ছি, মানুষ মাত্রই ভুল। আমি আগে পরে বা এখনও কথার মাঝে কোনো ভুল করে থাকলে ক্ষমা করে দিবেন। শুধরে দিবেন। দাদা,দাদীর আপত্তি না থাকলে সবসময় আমাদের ঘরেই খাবেন। আমাদের সামর্থ্যনুযায়ী আপনাদের দু’জনকে দেখব। আমরা আলাদা হয়েছি উপর দিয়ে। কিন্তু মন থেকে আলাদা হই নি। যেদিন আপনারা আমাকে সেইফ করেছেন পুলিশের হাত থেকে,সেদিনই আমার ও আমার পরিবারের সবার সমস্ত রাগ,অভিমান, অভিযোগ আপনাদের দুজনের উপর থেকে চলে গিয়েছে। আমার মায়ের সাথে করা আপনাদের ছোট বড় ভুল,অনাদর,উপেক্ষা,অসম্মানগুলো, এই এককাজেই অনেকটা কাবার হয়ে গিয়েছে। এটা আমি মনে করি। নয়তো সেদিন আমার হাতে হ্যান্ডকাফ পরালে,জীবনের অর্জিত সকল মর্যাদা মিশে যেত মাটিতে। বদলে যেতো অনেককিছুই। কেননা আমরা গ্রামের, সমাজের চোখে একটি মধ্যবিত্ত পরিবার হলেও মর্যাদাপূর্ণ পরিবার।
আর ফুফু, আপনি আমার একমাত্র ফুফু। যেমন আদরের তেমনই শ্রদ্ধারও। আপনার সাথে অনেক রূঢ় ব্যবহার করেছি। মাফ করে দিবেন আমাকে। আপনি যখন মন চাইবে, বাবার বাড়িতে চলে আসবেন। আপনার অধিকার নিয়েই চলবেন, ফিরবেন,খাবেন। আবদারের সাথে ভাবিদের উপর কর্তৃত্ব ফলাবেন। এই বাড়ি আপনার,আমার,আমার মায়ের, আমাদের সকলের।
আমি আবারও বলছি,ভিন্ন হওয়ার অন্যতম কারণ আমার মা। আমার বিয়ে নয়। বিয়ে করতে হবে বলে করব। এইই। স্পেশাল কিছুই না। শুনতে আপনাদের তেতো লাগলেও বলতে আজ আর দ্বিধা নেই,এই সুযোগটাও আপনারা লুফে নিয়েছেন যে,একটা মেয়ে যেমন মায়ের গা ঘেঁষে ঘেঁষে থাকে, মায়ের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়গুলো চোখে পড়ে,কিন্তু আমার মায়ের কোনো মেয়ে নেই। আমরা দুভাই ছেলে। মায়ের এসব চোখে পড়বে না। কিন্তু না। তানভির এসব খেয়াল না করলেও আমি কয়েক বছর ধরেই মেয়ের মতো এসব খেয়াল করে আসছি আর নোট করছি। আর আমার বাবা তো আপনাদের সহজ সরল আলাভোলা নাদান পুত্র। দিনশেষে স্ত্রীর মলিন মুখ, রাত শেষে কালি পড়া চোখ দেখত না।”
বলতে বলতে তৌসিফের গলা রুদ্ধ হয়ে এল। ঘরের উচ্ছ্বল পরিবেশ নিরব হয়ে গেল দিঘির শান্ত জলের মতো। রাবেয়ার ফর্সা গাল বেয়ে অঝোরে অশ্রু ঝরতে লাগল।
মর্জিনা মায়া ভরা কণ্ঠে বলল,
“ভাই আর এইসব কই আমাগোরে কষ্ট দিস না। তুই তো কইলি মানুষ মাত্রই ভুল। মনে আর দুঃখ পুইষা রাখিস না, তোর দাদা,আমি, তোর ফুফুর উপরে। অন কই কি হুন,ছোট বউ কইল, তোর চাচায় স্বীকার গ্যাছে। সে ভালোর লাইগা তোর আব্বারে ট্যাবলেট খাওয়াতে চাইছে। কিন্তু মেয়াদ শ্যাষ হইয়া গ্যালো বইলা রিয়েকশন করছে। তুই কাইল তানভিররে হাতে কইরা থানায় যা। তারে গিয়া ছাড়াইয়া আন।”
“দাদী, থানা তো আর আমার কথায় চলে না। আমরা দুই ভাই এমনিতেই সকালে থানায় যাব। বিষয় কী এটাই না অন্যকিছু জানতে হবে।”
এরপর সবাই গল্পগুজব করে উঠে যায়। পরেরদিন তৌসিফ ও তানভির থানায় যায়। জানতে পারল কাহিনী এটা নয়। অন্যকিছু। যেটার সাথে কোন এক রাত জড়িত। জাবেদকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে৷ দুই ভাই চিন্তিত ও কৌতুহলী মন নিয়ে বাড়ি ফিরে এলো। অন্যদেরকে অন্য কথা বলল বানিয়ে।
ঘরে এসে তৌসিফ বাবাকে উৎসুক ও গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“বহু বছর আগে কোনো এক রাতে কী ঘটেছিল বাবা? যার জন্য এতো বছর পরে এসেও সে আপনার উপর প্রতিশোধ নিতে চাইল?”
জাহেদ একরাশ বিভ্রান্তি নিয়ে ছেলের মুখপানে তাকালো। রাবেয়ার মুখজুড়ে ভর করলো গভীর আতংক! এবার!
চলবে..২৭
#সামাজিক #storytelling #writer #bengalistory #lifelessons #genre #lovestory #twist #loveyourself #✍️ #রেহানা_পুতুল
Share On:
TAGS: পিদিম জ্বলা রাতে, রেহানা পুতুল
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ২৯
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৩১
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৫
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৮
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ২০
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১১
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ২২
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ২৩
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৩২
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৫