Golpo কষ্টের গল্প পিদিম জ্বলা রাতে

পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ২৬


পিদিম জ্বলা রাতে. ২৬ ✍️ #রেহানা_পুতুল

তবুও সে বিজ্ঞের ন্যায় তানভিরের দিকে চেয়ে টনটনে সুরে বলল,
“আমি যদি তোর স্বপ্নের হেতু বলতে পারি,যা চাইব তা দিবি আমাকে? নইলে বলে কী লাভ?”

তানভির বুক টানটান করে দাঁড়ায়। কাঁধ ঝাঁকিয়ে ছল করা হাসি দিয়ে বলে,
“তোর সাধ আর আমার সাধ্যের মাঝে যদি সাদৃশ্য থাকে,নিশ্চিন্তে পাবি। যা কথা দিলাম।”

“আমি তোর স্বপ্নের হেতু জানি না। আর কিছু চাইবও না। চলে যাচ্ছিস যা।”
রিনরিনিয়ে হেসে জবাব দিল সাথি।

“তাহলে আমাকে ঘাঁটালি কেন? চতুরামি? নাহ?” বিরক্তি নিয়ে বলল তানভির।

“চালাকি নয় এটা ইয়ার্কি। তোর সাথে আমি ইয়ার্কি করতে পারি না?”

বাক্য দুটো আওড়ে আবারো খিলখিল হাসিতে ফেটে পড়ল সাথি। তানভির সাথিকে কপট রাগ দেখিয়ে বাড়ির প্রাঙ্গন ত্যাগ করল। সাথি আপন মনে হাসতে হাসতে অন্যদিকে চলে গেল। তানভির সিএনজিতে উঠেই ফোন দিল তৌসিফকে। বাড়ির সব খবরাখবর জানাল। জাবেদের খবর বলল। পুলিশ এখনও তার মুখ থেকে সঠিক তথ্য উদঘাটন করতে পারেনি তাও জানাল ভাইকে। যেটা বলল তা গ্রহনযোগ্য নয় পুলিশ ও তাদের কাছে। এবং আরো বলল,
“ভ্রাতা,আমি বিদ্যালয়ে ফিরিয়া যাইতেছি। পিতামাতা সহি সালামতে আছে। আমাদের নব্য গৃহ প্রায় প্রস্তুত হইয়া গিয়াছে। মোদের জননী বলিল,তাহার বড় পুত্র মানে তুমি আসিলে, আমিসহ একসঙ্গে নব্য গৃহে প্রবেশ করিবে। সেইদিন মসজিদ হইতে মৌলবি ডাকিয়া মিলাদ, কোরান খতম ও বিশেষ দোয়ার আয়োজন করিবে। ইহাই না-কি প্রচলিত নিয়ম। তবেই না-কি গৃহে বাস করা মানুষগুলোর উপরে কোন অশুভ কিছুর কুদৃষ্টি পড়ে না। তুমি সময় করিয়া আসিও।”

“ঠিকআছে। আমি ছুটি নিয়ে একদিনের জন্য হলেও আসব। আমার সাথে সব সময় এমন সাধু ভাষায় কথা বলিস কেন তুই? সমস্যা কী তোর?”
মুঠোফোনের ও-প্রান্ত হতে উষ্ণ হেসে জিজ্ঞেস করলো তৌসিফ।

“আমার কোনো সমস্যা নাই ভ্রাতা। সমস্যা তো তাদের রহিয়াছে যারা আমার প্রাণের ভাষা বুঝিতে অক্ষম! তুমি বুঝো,তাই তোমার সাথে সাধু ভাষা আওড়ে বড্ড আনন্দ পাই ভ্রাতা।”
নিরঙ্কুশ জবাব দিয়ে বলল তানভির।

দুই ভাইয়ের ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলো। বাড়িতে সবকিছু ঠিক আছে শুনে তৌসিফের মনটা অনাবিল প্রশান্তিতে ভরে উঠল।

তারপর একরাতে তৌসিফকে ফোন দিল নবনীর বাবা। বললেন,
“তৌসিফ, আমরা তোমার পরিবারের সাথে যোগাযোগ করার জন্য কোনো পথ পাচ্ছি না। তাই তোমাকে বলতে হচ্ছে। আমরা মেয়েপক্ষ হিসেবে একবার তোমাদের বাড়িতে আসতে চাই। যদি তোমাদের কোনো আপত্তি না থাকে?”

তৌসিফ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল হঠাৎ নজরুলদের যাওয়ার কথা শুনে। হবু শ্বশুর। মানা করার বা বেশি পেছানোর সুযোগ নেই। তৌসিফ বিনয়ী গলায় বলল,
“আংকেল,গ্রামে আমাদের যৌথ ফ্যামেলি। আমরা নতুন ঘর করতেছি এখন। তাই আমাদের একটু সময় দিলে ভালো হয়।”

“ওহ! আচ্ছা আচ্ছা! এতো খুবই ভালো খবর। কোনো অসুবিধা নেই। তুমি আমাকে জানিয়ে দিও।”
প্রাণোচ্ছল হাসি ছড়িয়ে বলল নজরুল।

“অবশ্যই জানাব আংকেল। দোয়া করবেন।”

নজরুল ফোন রাখলে তৌসিফের মাথায় হাত পড়ল। এবার! গ্রামে তাদের একটা ডাইনিং টেবিলও নেই। ভালো চেয়ার নেই। কতকিছু যে কিনতে হবে। পরেরদিন তৌসিফ অফিস শেষে হাতিরপুল মোতালেব প্লাজায় চলে গেল। একটি নকিয়া মোবাইল সেট কিনল তার বাবার জন্য। নবনীর বাবা যখন বলল, তার পরিবারের সাথে যোগাযোগ করতে পারছে না,তখন তৌসিফ একদম ছোট হয়ে গেল নিজের কাছে। সে আরো আগেই কিনে দিতে চেয়েছে। কিন্তু তারা বাবা জোরবাক্যে ছেলেকে নিষেধ করে দিয়েছে। তৌসিফ বাসায় চলে গেলো। চাচী সিমার মোবাইলে ফোন দিয়ে তার মায়ের সাথে কথা বলল। নবনীর পরিবার আসবে তাদের বাড়ি এটা জানিয়ে দিল। রাবেয়া খুশী হলো বেশ।

ব্যস্ত গলায় বলল,
“মায়েরে জানাইয়া খুব ভালো করছত বাবা! বহুত কাম আছে। দেখি মাইজ বাড়ির আফিয়াকে ডাক দিয়ে নিব কাজের জন্য। ঘর, ঢেলা লেপছেপ করতে হইবো। ম্যালা কাম। ম্যালা। কাপসেট কিনতে হইব চা দেওনের জন্য। আর কী আছে না আছে দেখতে হইব। নিজেগো টানাটানি সারাবছরই থাকব। তাই বইলা কী নয়া আত্মীয়ের সামনে সেটা বুঝাইয়া নিজেগোরে ছোট করমু? বাবা,ডাইনিং টেবিল?”

“তোমার শখের টেবিল জহিরকে বলে বানাতে দিয়ে দিব আজই। চিন্তা করো না। আর তোড়জোড় করে কাজ করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ো না মা। আফিয়ারে হাতে নিয়ে আস্তে আস্তে তুমি প্রস্তুতি নিতে থাকো। এজন্যই তো তোমাকে জানাতে লেট করলাম না।”
হেসে বলল তৌসিফ।

মায়ের থেকে বিদায় নিয়ে তৌসিফ গ্রামে তার বন্ধু জহিরকে ফোন দিল। বিশদ বলে কাঠের দোকানে চেয়ারসহ আট জনের একটি ডাইনিং টেবিল বানাতে দিতে বলে দিল। জহির আপত্তি তুলল না তার পেরেশানি হবে ভেবে। একবাক্যে সম্মতি জানাল করবে বলে। শুনে ওপাশ হতে স্বস্তির দম ছাড়ল তৌসিফ।

তৌসিফ নবনীকে ফোন দিল। নবনী রিসিভ করলে হৃদ্যতাপূর্ণ স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
“কনে পক্ষ যাবে পাত্রের পরিবার ও ঘরবাড়ি দেখতে। ভালো কথা। এটাই নিয়ম। তাই আমি তোমাকে ফোন করেছি উনারা ঝাল,লবন,মসলা কেমন খায়? তুমি পারসোনালি আমাকে একটু হিন্টস দিলে ভালো হতো? শহর ও গ্রামের পরিবারের রান্নার প্যাটার্ন ভিন্ন।”

“জিজ্ঞেস করার জন্য ধন্যবাদ। লবন,ঝাল এভারেজ। নয় কম নয় বেশী। আমরা শহরে বাস করলেও গ্রামের সাথে এটাচড! সো অতো প্যাড়া নেওয়ার কিছু নেই। গ্রামের আঞ্চলিক খাবারগুলো আমাদের সবার বেশ পছন্দ। সাথে পিঠাপুলিও!”

মোলায়েম স্বরে বলল নবনী।
দুজনেরই কর্মমুখর ব্যস্ত জীবন। তাই স্বল্প আলাপের ইতি ঘটল দুজনের সম্মতিতেই।

সেদিন জাবেদ অনেক চেষ্টা করেও হাসানুল বা রকিবের মুখ দর্শন করতে পারেনি। বড় ভাইয়ের চোখে সে কীভাবে চোখ রাখবে? থানায় তার আসা বন্ধ করাতে হবে যে করেই হোক। সে তো চেয়েছিল ভাইয়ের অগোচরে, অজানাভাবে খুব সূক্ষ্মতার সাথে কাজটি করতে। কিন্তু হিতে বিপরীত হয়ে গেল। কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে অজগর সাপ বেরিয়ে আসলে যেমনটি হয়,ঠিক তেমনই হয়ে গেল সবকিছু। তার পরেরদিন থানায় জাবেদকে আটকে রাখা রুমে গেল রকিব। তাকে দেখেই জাবেদ নরম হয়ে গেল।

কাতর গলায় আর্তির সুরে বলল,
“স্যার,আমার বড় ভাইকে থানায় ডাকবেন না দয়া করে। উনি অসুস্থ মানুষ। আমি উনার মুখোমুখি হতে চাই না স্যার। আমি সব স্বীকার করব। তখন কী আমি জামিন পাব স্যার?”

“নাহ। পাবে না। তবে অপরাধ স্বীকার করলে দশ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড থেকে চার বছর মওকূফ হতে পারে। আর কায়িক শ্রমও কমে যেতে পারে। না স্বীকার করলে রিমান্ড আছে। জরিমানা হবে।”

রিমান্ড শব্দটি শুনে এবার জাবেদ ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে যায়। মনে মনে ছয় বছর শব্দটা উচ্চারণ করে সে। তাও তো কম নয়। ব্যবসা লাটে উঠবে। মান,সম্মান তো শেষ হয়ে যাবেই। তবে তাকে আল্লায় যদি বাঁচিয়ে রাখে, সে তৌসিফকে দেখে ছাড়বে। রাবেয়াকেও ছাড়বে না। পরক্ষণেই তার চোখেমুখে গ্রাস করে আতংক! মনে পড়ে যায় তার একমাত্র ছেলে অভ্রের কথা।

রকিব থম মারা মুখে জিজ্ঞেস করে,
“কী ঠিক করেছো? স্বীকার করবে না করবে না?”

“স্বীকার করব স্যার। আমি আপনাদের কাছে সব স্বীকার করব। কিন্তু দয়া করে তা যেন আমার পরিবারের কেউ না জানে। বিশেষ করে আমার স্ত্রী,বাবা ও মা। আমার এই ফরিয়াদটুকু রাখেন স্যার। আমি ছয় বছর কারাবাস করতে রাজী আছি। তবুও এই মানুষগুলো থেকে এটা লুকিয়ে রাখতে চাই।”

“তাদের কী বলব আমরা?”

“বলবেন,আমি স্বীকার করেছি সব। ভাইয়ের ভালো করতে গিয়ে খারাপ হয়ে গিয়েছে। মেয়াদোত্তীর্ণ ট্যাবলেট ছিল। যেটা কি-না আমি জানতামই না। তাই ভাইয়ের শরীরে বাজেভাবে ইফেক্ট পড়েছে।”

“তোমার শেখানো বুলি না হয় আমরা তাদের শোনালাম। কিন্তু বাকিরা এটা বিশ্বাস করবে?”

“আপনারা বুঝিয়ে বললে করবে স্যার।”

“আমরা কেন তোমার হয়ে তাদের বানোয়াট গল্প শোনাব?”

“তাওতো কথা। আপনারাতো…মানে…ইয়ে…”
জাবেদের মুখের কথা কেড়ে নেয় রকিব। তিক্ত মেজাজে বলল,
“সব পুলিশ ঘুষ খায় না। এটা আগেই তোমাকে বলা হয়েছে। যাই, হাসানুল স্যারকে জানাই। দেখি উনি কী বলেন।”

“জি, স্যার।”
বিড়ালের মতো মিনমিন স্বরে বলল জাবেদ।

বিকেল ঘনিয়ে এসেছে। সূর্য ডুবে যেতে লাগল বর্ণিল মেঘের আড়ালে। মুক্ত বিহঙ্গরা উড়ে উড়ে নীড়ে ফিরে যাচ্ছে আকাশের বুক চিরে। জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষে জাবেদকে নিয়ে যাওয়া হলো। ঘটনার নেপথ্যের ঘটনা জানতে হাসানুল ও রকিব গুরুগম্ভীর মুখে বসে আছে। শোনায় অপেক্ষায় তাদের মন ও মস্তিষ্ক! জাবেদ এবারও একটি রেডিমেড গল্প শোনানো আরম্ভ করল। জীবনের কলংকিত অধ্যায় সবাই আড়াল করতে চায়। চিরদিনের জন্য ঢেকে রাখতে চায় নিজের সমস্ত দুর্বলতা!

হাসানুল নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলেন না এবার। তার তেজের উত্তাপ সারা রুমে ছড়িয়ে পড়ল বারুদের ন্যায়। বন্য বাঘের ন্যায় তার গর্জন শুনে এগিয়ে এলো আরো দুজন পুলিশ। হাসানুলের অনুমতিক্রমে তারা জাবেদের দু’হাত পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলল। দু পায়ের পাতা মিলিয়ে নিয়ে বেঁধে ফেলল। তারা বেরিয়ে গেল। কক্ষের পুরু কাঠের দরজাটি ভিতর হতে বন্ধ হয়ে গেলো। রকিবের হাতে মোটা একটি লাঠি। সে জাবেদের পায়ের তালুতে প্রহার করতে লাগল। জাবেদ মার হজম করে যাচ্ছে। তবুও ঠোঁট ফাঁক করছে না। রকিব ক্লান্ত হয়ে তার চেয়ারে গিয়ে বসে পড়ল। হাসানুল উঠে এল। রুদ্রমূর্তি তার। হাতে একটি বলপেন। সে বলপেনটি জাবেদের দুই আঙুলের মাঝে রেখে দু’পাশ থেকে চাপ দিল। তাতেও সত্য বের হলো না। পরে যৎকিঞ্চিত বিদুৎ শক দেওয়া হলো জাবেদের পায়ে। সে আর্তচিৎকার করে উঠলো।
হড়হড় করে বলল,
“আমি ভাইকে স্বইচ্ছায় সেই ট্যাবলেট খাইয়েছি। মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছি আমার স্ত্রীকে। আমার যতো ক্রোধ সব ভাইয়ের উপরেই। তার উপর প্রবল আক্রোশ থেকেই আমি এটা করেছি। বলা যায় আমি প্রতিশোধ নিতে চেয়েছি কোন এক রাতের।”

পায়ের তালুর ব্যথায় জাবেদ আর কিছু বলতে পারল না। কড়া রোদের তেজে ঝিমিয়ে আসা প্রকৃতির মতো সে হেলে পড়ে যেতে লাগল। হাসানুল ও রকিব তাকে ধরে সোজা করে বসিয়ে দিল।

চলবে..২৬

#সামাজিক #storytelling #writer #bengalistory #lifelessons #genre #lovestory #twist #loveyourself #

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply