পিদিমজ্বলারাতে. ২৫ ✍️ #রেহানা_পুতুল
“তুমি সত্যিটা বলবে। এবং তোমার স্ত্রীর সামনেই বলবে। তোমার সম্পর্কে তার জানার রাইট আছে। নয়তো বাড়ি থেকে সবাইকে আনাবো। এবং সবার সামনেই বলতে বাধ্য করবো ডিম থেরাপি দিয়ে।”
র* ক্তচক্ষু নিয়ে নির্দেশ করে বলল হাসানুল।
আসামির থেকে সঠিক জবানবন্দি নেওয়ার জন্য পুলিশ এভাবেই কথা বলে, এটা জাবেদ বেশ ভালো করে জানে। তাই ডিম থেরাপি শব্দটা তার মাঝে বাড়তি কোনো আতংক সৃষ্টি করল না। তার মন তখন আর পালাতে চাইল না। ছুটে গেল না দরজার দিকে। সে মনে মনে সত্য মিথ্যা মিলিয়ে আরেকটি গল্প বানিয়ে নিল। যেটা কি-না বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে পুলিশের। বৃহত্তম স্বার্থের জন্য যেমন ক্ষুদ্রতম স্বার্থ ত্যাগ দিতে হয়,তেমনি বড় সত্য ঢাকতে হলে কিছু ছোট সত্য তাকে স্বীকার করতেই হবে। তেতো রস খাওয়ার মতো করে একটি ঢোক গিলে নিল সে। অতঃপর দৃষ্টি দেয়ালে তাক করে নীরিহ গলায় বলল,
“স্যার, মনি আপনাদেরকে তাই বলেছে,যা আমি তাকে বলেছি। কিন্তু সত্যি বলতে এই ট্যাবলেট কী এবং এর ক্ষতিকারক দিকগুলো কী কী আমি জানতাম। আমাদের পরিবারে যেহেতু ভাই সবার বড়,তাই সবার কাছে উনার কদর ও গুরুত্ব ছিল অন্যরকম। সব কিছুতে জায়গা জমি থেকে শুরু করে ঘরের যেকোনো বিষয়ে উনার মতামত গ্রহণযোগ্য হতো। একটা সময় আমি আর এটা নিতে পারছিলাম না। এটা আমাকে পীড়া দিতে শুরু করল। নিজেকে তৃতীয় ব্যক্তি মনে হতো। ক্ষুদ্র মনে হতো। নিজের কাছে নিজেই ছোট হয়ে যেতাম। মনিও আমাকে উপহাস করে কথা শোনাতো এই নিয়ে। সব মিলিয়ে এক কথায় বলতে গেলে বড় ভাইয়ের প্রতি আমি ঈর্ষান্বিত ছিলাম। ক্রমশ আমার মন কুটিল রূপ ধারণ করতে লাগল। চিন্তা করলাম মেজো ভাই বিদেশে। কোনভাবে যদি বড় ভাইকে নিষ্ক্রিয় করা যেত,যদি শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল করা যেত তাকে,তাহলে নিশ্চিন্তভাবে ঘরে আমার কতৃত্ব ও গুরুত্ব বেড়ে যেত। তখনই আমার মাথায় আসে উনার ডায়াবেটিসের কথা। এই রোগকে কেন্দ্র করেই আমি ট্যাবলেট খাওয়ানোর পথ খুঁজে পাই। এবং ওর ভাইকে দিয়ে আনাই। ওকে দিয়ে খাওয়াই। আইনমতে এর শাস্তি যা হয় আমি মাথা পেতে নিতে রাজী আছি স্যার।”
মনির অন্তর কেঁপে উঠল। নির্বাক দৃষ্টি নিক্ষেপ করল স্বামীর মুখের দিকে। শব্দ করে তাকে কিছু বলতে গিয়েও পারল না সে। গলায় আটকে গেল। রুমটাকে বেশ ভার মনে হচ্ছে তার কাছে। যেন কোন বাতাস প্রবেশ করছে না রুমের ভিতরে। সে মনে মনে বোবা ভাষায় উচ্চারণ করলো,
“মানুষ এতটা নীচ হইতে পারে! আমারে বুঝাইল ভাইয়ের ভালো হইব। আর এখন নিজেই স্বীকার গ্যালো ভাইয়ের ক্ষতি করার জন্য এই ট্যাবলেট খাওয়াই তো আমারে দিয়া। আল্লাগো! এতো ভয়ংকর মানুষ দেখি। যে নিজের স্বার্থের জন্য মায়ের প্যাটের আপন বড় ভাইয়ের এমন ক্ষতি করতে পারে,সেইতো আমি পরের মাইয়ার ক্ষতি করতেও দুইবার ভাবব না।”
হাসানুলের চোয়াল শক্ত হলো। কপালে ভাঁজ পড়ল। মুখের অভিব্যক্তি বদল হলো। ঠান্ডা গলায় মনির দিকে তাকিয়ে বলল,
“শুনলে তো তোমার স্বামীর কথা?”
“স্যার, আমারে যাইতে দেন। উনার সামনে থাকার কোনো অভিরূচি আমার নাই। আমার খুব খারাপ লাগতাছে স্যার। মাথা ঘুইরা পইড়া যামু স্যার।”
ভেঙ্গে আসা কণ্ঠে মিনতি করে বলল মনি।
রকিব বলল,
“স্যার। মনি চলে যাক। পরে ডাকা যাবে আবার।”
মনিকে যেতে দিল হাসানুল। তারপর জাবেদকে শান্ত গলায় বলল,
“তোমার স্ত্রীর গল্প বিশ্বাস করলাম। তোমার গল্পটাও সত্যি। কিন্তু আরো বড় সত্যি গল্পটা যে আমাদের শুনতেই হবে মিস্টার জাবেদ।”
হাসানুলের শান্ত অথচ ধারালো কথাগুলোর ওজন জাবেদ হজম করতে পারল না এবার। তার রুহ বেরিয়ে আসতে যায় যেন। সে অস্ফুট স্বরে বলল,
“আবার কোন সত্য স্যার? এর বাইরে আর কিছুই নেই।”
“আছে। অবশ্যই আছে। তুমি এবং তোমার স্ত্রী যা বলল,মাত্র এসবের জন্য কোনো ভাই ভাইয়ের এতবড় সর্বনাশ করতে পারে না। বুঝছি তোমার থানায় থাকার বড় শখ। ঠিক আছে থাকো। পরেই না হয় জানব জাহেদকে নিয়ে তোমার পরিকল্পনা ও প্রতিশোধের বাকি ফিরিস্তি!এবার জাহেদকে থানায় ডাকাব।”
জাবেদ আবারো ‘স্যার’ বলে উঠল। কিন্তু তার ডাক তারা না শোনার ভান করল। তাকে অন্যরুমে নিয়ে যাওয়া হলো হাসানুলের নির্দেশে। রাখা হলো পুলিশ হেফাজতে।
হাসানুল ও রকিব বাইরে গিয়ে দাঁড়াল। দু’জনে দুটো সিগারেট জ্বালিয়ে নিল। রকিব সিগারেট শেষ করে হাসানুলকে জিজ্ঞেস করলো,
“স্যার আপনি সেদিন বললেন, এইসবের কেন্দ্রবিন্দু রাবেয়া। এটা কীভাবে বুঝলেন?”
হাসানুলের চৌকস জবাব। রোমাঞ্চিত হেসে বলল,
“রাবেয়ার কথায় ও জাবেদের কথায়। আপাতত এটাই জেনো রাখো। চলো লাঞ্চ করি। ক্ষুধায় পেটে আগুন ধরে যাচ্ছে।”
মনি অসাড় হয়ে আসা শরীর নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ রুম হতে বেরিয়ে গেল দেয়াল ধরে ধরে। একাই একটা রিকশা নিয়ে বাড়ি চলে গেল। সলিমুল্লা নেই। তিনি মনিকে থানার গেটে পৌঁছে দিয়েই চলে গেলেন। তার মতো ইজ্জতধারী লোক যতক্ষণ থানায় থাকবে ততক্ষনই গ্লানিতে পুড়বে। মনি বাড়িতে গেলে সবাই এগিয়ে এল তার সামনে।
মর্জিনা তাকে জিজ্ঞেস করলো,
“কী জিগাইলো তোমারে? কী অবস্থা সেইদিকের?”
মনি পুলিশের কাছে তার বলা কথাগুলো সবাইকে শোনাল। তবে কিছু পয়েন্ট স্কিপ করে গেল খুব সচেতনভাবে। আর জাবেদের বলা কথাগুলো গোপন রাখল বুদ্ধি করে। তার ভাবনা হলো,এমনিতেই জাবেদকে সবাই অপছন্দ করে ফেলেছে তৌসিফের গায়ে হাত তোলা নিয়ে। এখন আসল কাহিনী শুনলে পরিস্থিতি আরো ক্ষিপ্ত হয়ে যাবে। তাদের বিপক্ষে চলে যাবে। তার কথাগুলো শুনে মর্জিনা ছেলের জন্য আফসোসে ভেঙ্গে পড়ল।
কণ্ঠে খেদ ঢেলে বলল,
“আহহারে! আমারে পোলায় তো ভাইয়ের ভালোই করতে চাইল। কিন্তু হইয়া গ্যালো খারাপি। ভেজাল ঔষধ আছিলো। নইলে ভালো হওয়ার উলটা ফল হইল ক্যান?”
কিন্তু জাহেদ, রাবেয়া ও তানভির বিশ্বাস করল না মনির কথাগুলো। তারা বুঝে নিল স্বামীকে সেইফ করতে তৈরি গল্প শুনিয়েছে মনি। আসল সত্য জানা যাবে সময় হলে পুলিশের কাছ হতেই।
মনি নিজের রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। বোরকা খুলে খাটের স্টান্ডে ঝুলিয়ে রাখল। তার মস্তিষ্কে পাহাড়সম চিন্তা ভর করল। সামনে কী শাস্তি হতে পারে জাবেদের? তার অবর্তমানে চট্রগ্রামের তাদের কারখানাটা কতদিন সচল থাকবে? কারিগররা ঠিকঠাকভাবে কাজ করবে তো? ম্যানেজার তাদের খরচ দিবে? শত চিন্তায় মনির চোখেমুখে ঝিমুনিভাব চলে এলো। অবসাদগ্রস্ত শরীরখানা সে বিছানায় এলিয়ে দিল।
জাহেদ, রাবেয়া ও তানভিরকে নিয়ে এক আলাপে বসলেন। পিতার দায়িত্ব নিয়ে বললেন,
“আমাদের নতুন ঘরটা কমপ্লিট হয়ে যাক। এদিকে জাবেদের বিষয়টারও একটা ফয়সালা হোক। তারপর নবনীর বাবাকে আমি টেলিফোন করব। আমার ফোনের অপেক্ষায় আছে তারা। উনাদের সুবিধামতে আমরা ঢাকায় যাব। মেয়েকে আংটি পরিয়ে আসব। শুভ কাজ দেরী করা উচিত নয়। যত সম্ভব দ্রুত সেরে ফেলাই মঙ্গলজনক। নাকি বল তোমরা?”
রাবেয়া বিপরীতমুখী একটি লম্বা শ্বাস ফেলল। একদিকে নতুন ঘর ও ছেলের বিয়ে নিয়ে আনন্দ! অপরদিকে পারিবারিক কোন্দল! সে কোমল কণ্ঠে বলল,
“নাহ,আপনের কথাই ঠিক আছে। শহরের ডাক্তার মাইয়া আমার ঘরের বউ হইবো। যা তা কথা নয় এইটা। আল্লাহর রহমত মনে কইরতে হইব এইটারে। আমাদের আগের ফার্নিচারগুলা বার্নিস কইরা নতুন রঙ করাইয়া নিতে হইব। নতুন ডাইনিং টেবিল কিনতে হইবো। আর রেডিমেট সুন্দর সুন্দর আংটি কিনতেই পাওয়া যায়।”
“বাবা,আপনি আমাদের অভিভাবক। আপনি যেটা ভালো মনে করবেন,সেটাই হবে। আমি কাল চলে যাব। সামনে পরিক্ষা। প্রাইভেট পড়া মিস যাচ্ছে।”
বলল তানভির।
“হ্যাঁ যাইস। সমস্যা নেই। মিস্ত্রীরা তো কাজ করছেই। আমরা দুজন তো আছিই। রেজাল্ট খারাপ করা যাবে না। থানার বিষয় এখন পুলিশের হাতে। আমাদের কাছে নয়।”
তৌসিফ ও নবনী একই শহরে বাস করে। তবুও তাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ হয় না। হয় না রোজ ফোনালাপ। কিংবা অনুভূতি জাগানিয়া বার্তা বিনিময়। দু’জনেই কর্মময় জীবনে অতি ব্যস্ত। তবে তার ফাঁকে মুঠোফোনে যতটুকু আলাপ হয়,যতটুকু ভাব বিনিময় হয়,
তাতে থাকে দু’জনের প্রতি দুজনের অমোঘ টান! গভীর প্রণয়! অসীম শ্রদ্ধা! অফুরন্ত ভালোবাসা! এক আকাশ নির্ভরতা ও এক পাহাড় বিশ্বাস। কেউ কাউকে ছেড়ে যাবে না।
তানভির কলেজে চলে যাওয়ার আগে সাথীর সাথে দেখা হলো। ঠিক দেখা হওয়া নয়,সে নিজেই সাথির সাথে দেখা করলো সুযোগ করে। সাথির পড়াশোনার খবর নিল। কোনো প্রসঙ্গ না টেনেই ঠোঁটের কোণে দুর্বোধ্য হাসি ছড়িয়ে তানভির বলল,
“তোকে নিয়ে আমি একটা দুঃস্বপ্ন দেখেছি সাথী! দেখি গভীর নির্জন রাত! অন্ধকার গলাগলি করছে আমাদের উত্তরের বাগানে। সেই বাগানে তুই বসে বসে কী যেন করছিস ঝুঁকে ঝুঁকে। তোর পাশে আরো একজন নারী ছিল। তিনি তোর মা। হঠাৎ করে তোকে নিয়ে এমন স্বপ্ন দেখার হেতু কী? বলতে পারিস?”
নিমিষেই সাথীর সারামুখ বিবর্ণ হয়ে গেল। একরাশ ভয় জমে গেল তার মাঝে। তবুও বিজ্ঞের ন্যায় তানভিরের দিকে চেয়ে টনটনে সুরে বলল,
“আমি যদি তোর স্বপ্নের হেতু বলতে পারি,চা চাইব তা দিবি আমাকে? নইলে বলে কী লাভ?”
চলবে..২৫
#সামাজিক #storytelling #writer #bengalistory #lifelessons #genre #lovestory #twist #loveyourself #mystery #twist
Share On:
TAGS: পিদিম জ্বলা রাতে, রেহানা পুতুল
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৭
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৯
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৫
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৩
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ২৬
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৮
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১২
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১১
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ২৭
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ২