Golpo কষ্টের গল্প পিদিম জ্বলা রাতে

পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ২৪


পিদিম জ্বলা রাতে. ২৪ ✍️ #রেহানা_পুতুল

গল্প? বিশ্বাস করাইছে? মানে বুঝলাম না স্যার? উনি ক্যান আমার সাথে মিথ্যা বলব আরেকজনের ট্যাবলেটের বিষয় নিয়া?”
দ্বিধাগ্রস্ত মুখে নিষ্পলক চাহনি ফেলে করুণ কণ্ঠে জানতে চাইল মনি।

জাবেদ কিছু বলতে গিয়েও পারল না। তার দৃষ্টি উদভ্রান্ত! ঘামে কপাল ভিজে চুপচুপ। চোখে কেবল রাশি রাশি ভয়। মুখাবয়ব ভয়ার্ত! যেই মা,বাবা তাকে এতো ভালো জানে, তারা যদি জেনে যায় বহু বছর আগের সেই এক রাতের কথা,তাহলে কী হবে তার? যদি স্ত্রী মনি জেনে যায়, তবে কী হবে এতটা বছরের মধুর দাম্পত্যের? যদি আত্মীয় স্বজন জেনে যায়,তারা ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিবে। যদি পাড়া-প্রতিবেশী জেনে যায়,তাকে এড়িয়ে চলবে। জাবেদ চেয়ার থেকে নেমে গেল। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসল।

হাসানুলের চোয়াল শক্ত হলো। তিনি বিচক্ষণ চোখে সহকর্মী রকিবের পানে তাকালেন। রকিব একটি কাঠের টুল রুমের কোণার পাশে নিয়ে রাখল। নিজের চেয়ারটিও টেনে রুমের এক কোণায় নিয়ে গেল। পায়ের উপর পা তুলে বসল। একই কায়দায় সামান্য দূরত্ব বজায় রেখে হাসানুলও বসল।

“আপনি আমার মুখোমুখি এসে বসুন।”
ভরাট কণ্ঠে মনিকে আদেশ করে বলল রকিব।

জাবেদ ও মনির দৃষ্টিকে আড়াল করাই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য। স্বামীর চোখে চোখ পড়ে গেলে স্ত্রী মায়ার পড়ে যাবে। আর সেই মায়া সত্যকে লুকিয়ে ফেলতে সাহায্য করবে। এবং মনির মুখ দিয়ে মিথ্যা গল্প বের করাবে। মনি গিয়ে বসল। রকিব মনিকে দৃঢ়তার সঙ্গে বলল,
“লুকানোর,বানানোর কোনো সুযোগ নেই। রহস্য প্রায় উন্মোচিত। আমরা তৌসিফের,রাবেয়ার,জাবেদের ভাষ্য শুনেছি। এবং আপনার ভাসুরের মেডিক্যাল রিপোর্ট, প্রেসক্রিপশন ও বাকি তথ্যাদি পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি। সুতরাং চল-চাতুরীর চেষ্টা না করে সহজ স্বীকারোক্তি দেন। এটা আপনাদের সবার জন্যই ভালো হবে। রিমান্ড কী জিনিস তাতো নিশ্চয়ই জানেন আপনি। এবার বলুন।

মনির সারামুখ পাংশুটে রূপ ধারণ করলো। গলা শুকিয়ে এলো। গোলাপি ঠোঁটের রঙ বদলে ফ্যাকাসে হয়ে গেল। সে মিনমিনে স্বরে বলল,
“একটু পানি হবে স্যার?”

“নিশ্চয়ই হবে।”
বলে রুমের বাইরে গেল রকিব নিজেই। বড় একটি স্টিলের গ্লাসভর্তি পানি এনে দিল মনিকে।

“নেন পানি। গলা ভেজান। কাজে লাগবে।”

মনি গ্লাসের অর্ধেক পানি খেয়ে নিল। হাত নামিয়ে গ্লাসটি মেঝেতে রাখল। হাসানুল ও রকিবকে আকুতি করে বলল,
“আমি কী উনার সাথে একটু কথা বলতে পারি স্যার?”

“নোও। এটা আপনার নানার বাড়ি নয়। এটা থানা। এখানে সব চলে আইনের নিয়মে। আপনার আমার নিয়মে নয়। সুতরাং শুধু কথা নয় ; আপনি উনার চোখের দিকেও তাকাতে পারবেন না। নইলে আপনাকে একপাশ করে আনলাম কেন? শুরু করেন বলছি। কুইক!”
মৃদু ধমকে উঠে বললেন রকিবুল।

“কী বলব স্যার?”
মনির বোকা প্রশ্ন।

“প্রথমে বলবে, ট্যাবলেট কীভাবে আনা হলো। এবং ট্যাবলেট নিয়ে তোমাকে ও কী আদেশ দিয়েছে? তারপর বলবে দুপুরে জাহেদের গরম ভাতের প্লেটে তুমি কীভাবে ট্যাবলেট মিশাতে?”
মনির তুলনায় হাসানুল বেশ সিনিয়র বলে তিনি মনিকে তুমি সম্বোধন করে কথা বলছেন। আর রকিব তেমন সিনিয়র নয় বলে মনিকে আপনি সম্বোধন করে কথা বলছেন।

মনি পুনরায় ঢোক গিলতে লাগল। তার প্রাণ বেরিয়ে যায় যেন। সত্য বললে কী তার স্বামী আরো কঠিন বিপদে পড়ে যাবে না-কি, এই আশংকায় মনি নাস্তানাবুদ। কাবু হয়ে যাচ্ছে গোপনে।
“সময় লাগাচ্ছেন কেন? রিমান্ড শুরু করব নাকি? ডাকব নারী পুলিশদের? সত্য না উন্মোচন করলে এই চারদেয়াল থেকে আপনার মুক্তি নেই। ভালোর ভালো দ্রুত বলুন। নিরাপদে বাড়ি ফিরে যান আপনার সন্তানের কাছে৷”
শ্রেনী শিক্ষকের ন্যায় চোখ গরম করে শাসনের সুরে বলল রকিব।

সন্তান শব্দটি শুনে মনি গলে গেল। সবকিছুর উর্ধ্বে সে একজন মা। অভ্রের কথা তার মনে পড়ল। মনি মুখ খুলল এবার। নোয়ানো স্বরে বলতে লাগল,

“কয়েকমাস আগে উনি আমারে বলল, ভাইর মেজাজটা ইদানীং খিটখিটে হই যাইতাছে। ভালো কথা বললেই চ্যাত করে উঠে। বাবার পরে উনিই ঘরের প্রধান। উনার আচরণ এমন হইলে হইব? রোগের জন্য অনেক ঔষধ খায় বইলা ভাইয়ের মেজাজ তাল হারাইয়া ফালাইছে। আমার এক বন্ধু একটা ট্যাবলেটের নাম বলল। এই ট্যাবলেটটা দেশের কোথাও নাই। বহু ফার্মেসীতে খবর নিছি। সেটা খাইলে মানুষের মন, মস্তিষ্ক ধীরস্থির থাকে। শরীরের অন্য কোনো সাইড়ে ক্ষতি হয় না। আর তখন কথায় কথায় ভাইও উত্তেজিত হইব না। নইলে বড় ভাবি যে এতো খাটে সংসারে এটাও তার চোখে পইড়া যাইব। উনি এক কথা বললে,আমিও এক কথা বলে ফেলব। কিন্তু বড় ভাইয়ের মুখের উপর আমি তর্ক করি, কথা বাড়াই, এইটা আমি একদমই চাই না। ভাবির কোন মেয়ে না থাকাতেও সুবিধা হইছে। মেয়ে থাকলে এতদিনে মায়ের এতো খাটুনি নজরে পড়তো আর প্রতিবাদ করতো। তোমার ভাই তো ইন্ডিয়া যায় ব্যবসার কাজে। উনারে এই ট্যাবলেটটা পাঁচপাতা এনে দিতে বলবা আপাতত। উনি আমারে অগ্রিম টাকা দিতা দিল ভাইরে দেওয়ার জন্য। স্বামীর কথা ফেলতে পারি নি স্যার। আর সে যে কইল, তা সত্যই। আমার বড় ভাসুরের মেজাজ চড়ায় থাকে কিছু হইলেই। পরে আমার ভাই ট্যাবলেট এনে দেয়।

আমি কিন্তু ট্যাবলেট ভাবিরে বুঝায়া দিতে চাইলাম। উনি মানা করল। কইল,ভাবি ভুল বুঝব। সন্দেহ করব। নিব না। তার চাইতে আমি তোমারে উপায় বইলা দিতাছি, সেইভাবেই খাওয়াইবা। খুব মনোযোগী হইতে হবে। আমাদের কাজ হইল,ভাইয়ের মেজাজ শান্ত রাখা। ভাবিরে বইলা কোনো কাজ নাই। উনি বলে দিল সব বুঝাইয়া। সেই অনুপাতে আমি কাজ শুরু করি। ট্যাবলেটটা গোপন স্থানে ছিল। আমার ছেলে কোনভাবে পাইয়া ড্রেসিং টেবিলে রাখছে। আর তৌসিফ পাইয়া গেলো। ভাবি যখন রান্নাঘরে ভাইজানের জন্য ভাত নিতো থালায়,আর বাটিতে সালুন বাড়ার জন্য বড় ঘরের মিটসেফের সামনে যাইতো, তখন আমি আগে থেকে রেডি করে রাখা ট্যাবলেটের গুঁড়া খুব দ্রুত ভাতে মিশায়া দিতাম। ভাবি আসার আগে কয়েক সেকেন্ডেই এইটা হই যাইতো।”
মনি থামে। ঘন ঘন শ্বাস ছাড়ে।
“এক মিনিট। সে ভাতের প্লেট নিয়ে যেতনা সাথে?”
প্রশ্ন রকিবের।
“নাহ স্যার। আমাদের রসুই ঘরে ভাতের বড় হাঁড়ি মাটির নিভানো চুলার উপরে থাকতো। ভাবি গরম ভাত নিয়ে হাঁড়ির উপরেই রাখতো গরম থাকার জন্য। ভাই আবার সবকিছু গরম খাইতে পছন্দ করে। ভাবি বড় ঘরে গিয়ে একে একে সব সালুনের বাড়ি,ঝুটা ফেলার বাটি,পানি তাদের রুমে নিয়া টেবিলে রাখতো। ওই সুযোগেই আমি কাম সাইরা ফালাইতাম।”

“বুঝলাম। তখন আপনাদের যৌথ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা কে কোথায় থাকতো। কারো চোখেই পড়েনি আপনার এই দুই নাম্বারি কাজ?”
জানতে চাইল রকিব।
“নাহ স্যার। কখনোই কেউ দ্যাখেনি। এইটাতো ভর দুপুরের কথা। আমার শ্বশুর থাকতো মসজিদে। শাশুড়ী থাকতো নামাজের চৌকিতে। মেজো ভাবি থাকতো পুকুরে। সাথী থাকতো কলেজে। আমার ছেলে থাকতো আমাদের রুমে।”

” ঘরের আর কেউ জানতো এই বিষয়ে?”
“নাহ স্যার।”
“কেন? রাবেয়ার বিষয় না হয় বুঝলাম। স্ত্রী বলে সে ডাউট করবে। কিন্তু ঘরের অন্যরা?
” স্যার উনি কইল, দরকার কি বলার অন্যগোরে? যেটা শুনলে নানা প্রশ্ন উঠব,সেইটা বলা বোকামী। মা,বাবা,মেজো ভাবি মুরুক্ষ মানুষ। কিছুই বুঝব না। আরো কথা বাড়ব।”

“হুম। কিন্তু তোমার স্বামী যখন তোমার বড় জাকে ট্যাবলেটের পাতাটি দিতে নিষেধ করল একবাক্যে। তোমার কোনো সন্দেহ হয়নি?”
প্রশ্ন করলো এতক্ষন ধৈর্য ধরে চুপ করে থাকা হাসানুল।
“নাহ স্যার। একটুও সন্দেহ হয় নি। হইব ক্যান। উনি আমার স্বামী। নিশ্চয় আমাগো ভালোর জন্যই মানা করছে।”
“সত্য গল্প বলার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ।”
রুদ্ধ গলায় বলল হাসানুল।

মনি আবার দম ফেলল। মেঝে হতে গ্লাসটি তুলে নিল হাতে। বাকি পানিটুকু খেয়ে নিল তৃষিত পথিকের ন্যায়।
হাসানুল ঘাড় ঘুরিয়ে নিলেন জাবেদের দিকে। দৃষ্টি তাক করলেন। তার দৃষ্টি গভীর! তীক্ষ্ণ! সন্দেহপ্রবণ! ধারালো! সূঁচালো! ছুরির ফলার ন্যায়। তিনি জাবেদকে বললেন,
“তোমার স্ত্রীর গল্প মোটামুটি বিশ্বাসযোগ্য। তুমি আনিয়েছ মেডিসিন। এটা সত্য। তুমি তাকে দিয়ে সবার অগোচরে এই ট্যাবলেট জাবেদকে খাইয়েছ,তাও সত্যি। তবে প্রশ্ন হলো তুমি যদি বড় ভাইয়ের এতই অনুরক্ত হও,তাহলে তার ছেলের সাথে এতো ঝামেলা কেন করেছ? কেন অতিরিক্ত জমিটা ভাইকে না দিতে বলে নিজে চেয়েছ? অথচ জাহেদের অবদান তোমার লাইফে অধিক। যেই ট্যাবলেট দেশের কোথাও নেই, সেই ট্যাবলেট নিয়ে তোমার কেন ডাউট হল না?”

“স্যার কেন ডাউট হবে? অনেক সময় অনেক ধরনের ট্যাবলেট সব ফার্মেসীতে পাওয়া যায় না। আপনারা খবর নিয়ে দেখেন।”

“অনেক সময় পাওয়া যায় না। কিন্তু এই ট্যাবলেট তো কখনই পাওয়া যায় না? তো ট্যাবলেট খাইয়ে কী কাজ হয়েছে?”
“হ্যাঁ স্যার। খুব হয়েছে। ধীরে ধীরে ভাইয়ের মন মেজাজ পানির মতো হয়ে গেল। ভাইয়ের মাঝে ব্যাপক পরিবর্তন আসতে লাগল।”
মুহূর্তেই হাসানুল বসা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। রুম কাঁপিয়ে অট্রহাসিতে ফেটে পড়লেন। তীর্যক স্বরে বললেন,
“ইয়েস! তার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। মেজাজ পড়ে গিয়েছে। তার কন্ঠ নিচু হয়ে গেল। বিছানায় পড়ে গেল লম্বাচওড়া দেহটা। এসব দেখে তোমার মনে কী একবারও প্রশ্ন জাগেনি,এই ট্যাবলেটটা খাওয়ার পর হতে ভাই এমন রুগ্ন হয়ে যাচ্ছে কেন? তার চেয়ে ট্যাবলেট খাওয়া অফ করি। হোক ভাইয়ের মেজাজ চড়ায়। তবুও আমার ভাইটা হাঁটাচলা করুক আগের মতো।”
জাবেদ নিজের অপরাধী মুখটা লুকানোর চেষ্টায় ব্যর্থ হচ্ছে। রকিব তাকে বলল,
“মিস্টার জাবেদ,তিনজনের বলা গল্প শুনলাম। এবার আপনার পালা। সত্যি গল্পটা বলে ফেলুন।”
“সত্যি গল্প আর কী স্যার? আমার স্ত্রী যা বলল তাই সত্যি। এর বাইরে কিছুই নেই স্যার।”

“তুমি সত্যিটা বলবে। এবং তোমার স্ত্রীর সামনেই বলবে। তোমার সম্পর্কে তার জানার রাইট আছে। নয়তো বাড়ি থেকে সবাইকে আনাবো। এবং সবার সামনেই বলতে বাধ্য করবো ডিম থেরাপি দিয়ে।”
র* ক্তচক্ষু নিয়ে নির্দেশ করে বলল হাসানুল।

চলবে..২৪

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply