পিদিম জ্বলা রাতে. ২২✍️ #রেহানা_পুতুল
বিচক্ষণ পুলিশ কর্মকর্তা হাসানুল যেন নাস্তানাবুদ হয়ে গেল জাবেদের কথা শুনে। তিনি ও রকিব খুব বিভ্রান্তি নিয়ে একে অপরের দৃষ্টি বিনিময় করলেন।
“রাবেয়া! আই মিন জাহেদের স্ত্রী? ইটস পসিবল?”
জাবেদের মুখের দিকে অবিশ্বাস্য চাহনি নিক্ষেপ করে বলে উঠল রকিব। পাশ থেকে সিনিয়র তদন্ত কর্মকর্তা হাসানুল কাঁধ ঝাঁকিয়ে হতচকিত স্বরে বললেন,
“পসিবল! ইটস মাস্ট বি পসিবল! কারণ রাবেয়া সুন্দরী! সুন্দরীদের আবার ক্ষমতা একটু বেশী”
জাবেদের কথাকে আরো উস্কে দিয়ে বলল হাসানুল। কাঁটা দিয়েই কাঁটা তুলতে হবে। রকিব দ্বিধা নিয়ে হাসানুলের দিকে তাকায়। জাবেদ গোপনে স্বস্তির শ্বাস ছাড়ে। গলার স্বরকে যথাসম্ভব নমনীয় ও বিনয়ী করে বলল,
“আপনি ঠিক বলছেন স্যার। আমাদের পরিবারে তিন বউয়ের মধ্যে বড় ভাবি বেশী সুন্দরী! ভাইয়ের সাথে উনার বয়সের তফাৎ ষোল বৎসর!”
হাসানুল সরু চোখে জাবেদের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আচ্ছা বুঝলাম। ধরুন আপনার কথাগুলো সত্যি। কিন্তু প্রমাণ? আইন প্রমাণ চায়। ল অনুযায়ী আপনি নির্দোষ। এটা আপনাকে প্রমাণ করতে হবে। তারজন্য আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে আপনাকে। আপনি উকিল নিযুক্ত করতে পারেন।”
“আদালতে যাব কেন স্যার? আমাকে থানা থেকেই ছেড়ে দিন। আমি তো আপনাদের কাছে সত্যিটা বললামই। বাকিগুলোও বলছি। আমার ব্যবসা পড়ে যাচ্ছে। যেতে হবে চট্রগ্রামে।”
হাসানুল নড়েচড়ে বসল। বলল,
“বলুন,কেন রাবেয়া মাসের পর মাস তার স্বামীকে ট্যাবলেট খাইয়ে বিছানায় ফেলে রাখতো?”
জাবেদ খুকখুক করে তিনটে শুকনো কাশি দিল। নিরীহ গলায় বলল,
“পাঁচ বছর আগের কথা। ভাবি একদিন আমাকে এই ট্যাবলেটের নাম লিখা একটি ছেঁড়া কাগজ হাতে দিয়ে দরদমাখা সুরে বলল,এই ট্যাবলেটটা যোগাড় করে দিতে। কার কাছে যেন শুনেছে এই ট্যাবলেট সপ্তাহে একটা করে মাসে চারটা খেলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে ও একসময় নির্মূল হয়ে যাবে চিরতরে। তো বড় ভাবি বলেছে, তার কথা কীভাবে ফেলি? তাই আমিও তাকে আর ঘাঁটাঘাঁটি করিনি। কিছু ফার্মেসী খুঁজে জানলাম,এই ট্যাবলেট ইন্ডিয়া পাওয়া যায়। পরে আমার স্ত্রীকে বললাম। সে তার বড় ভাইকে দিয়ে আনিয়ে ভাবিকে দিল। কিন্তু এই ট্যাবলেট যে এত ক্ষতিকারক তা না ভাবি জানতো, না আমি জানতাম। আমি ব্যবসার ব্যস্ততা নিয়ে পড়ে থাকি। প্রতি মাসে গ্রামে একবার আসি। ভাইজানের নরম হয়ে যাওয়া দেখতেছি। ধরে নিলাম দীর্ঘ বছর ধরে ডায়াবেটিস তাই এমন হয়ে যাচ্ছে ভাই।”
“তাহলে আপনি কী চান রাবেয়াকে এরেস্ট করি আমরা?”
জিজ্ঞেস করল রকিব।
“একদম না। গ্রামের পরিবেশে একজন নারীর হাত কড়া পরানো খুবই বাজে বিষয়। আমাদের পারিবারিক ইমেজ একবারে ড্যামেজ হয়ে যাবে তাতে। তাছাড়া এখানে ভাবি নির্দোষ। তিনি তো বুঝতে পারেন নি ট্যাবলেটের প্রতিক্রিয়া যে এতো খারাপভাবে ইফেক্ট ফেলবে বড় ভাইয়ের শরীরে। ভাই এখন ভালোর দিকে যাচ্ছে। দুই ভাতিজা ঢাকায় নিয়ে চিকিৎসা করিয়ে আনছে উনাকে। বরং ভাবির বড় ছেলেটা খুব বেড়ে গিয়েছে। পারলে তাকে কিছু করেন। আমার স্ত্রী তার নামে থানায় অভিযোগ করল বলে সে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য পালটা মিথ্যা মামলা করল আমার নামে। আমাকে জামিন দিন দয়া করে।”
হাসানুল ও রকিবুল কিছু বলল না জাবেদের কথার জবাবে। তারা দু’জন বসা থেকে উঠে দাঁড়াল দ্বিধাগ্রস্ত মুখে। বেরিয়ে গেল ইনভেস্টিগেশন রুম থেকে। রকিব ভাবান্তর মনে হাসানুলকে জিজ্ঞেস করলো,
“স্যার,আপনি মনে হয় আসামির জবান বিশ্বাস করেছেন?”
” একচুলও না। পালে হাওয়া দিয়েছি কেবল। গন্তব্যে পৌঁছাতে হলে স্রোতের সাথেই নৌকার বৈঠাকে চালিয়ে নিতে হয়। বিপরীত দিকে বৈঠা টানলে নৌকা কখনই তার গন্তব্যে পৌঁছাবে না। তুমি কী এর কথার মাঝে কোনো ক্লু পেয়েছো রকিব?”
বিচক্ষণ হাসি দিয়ে বলল হাসানুল।
” উমম…ধরতে পারিনি না স্যার।” রকিবের সরল স্বীকারোক্তি।
“ওকেহ! যেহেতু ধরতে পারনি, চুপচাপ থাকো। ট্রয় নগরী ধ্বংস ও ট্রোজান যুদ্ধ হয়েছে স্পার্টার রাণী হেলেনের জন্য। এটা তো জানো? না-কি?”
“জানি স্যার। আপনি বলতে চাচ্ছেন এই ট্যাবলেট যেই খাওয়াক, তার কারণ বা কেন্দ্রবিন্দু হলো রাবেয়া নামের নারীটি?”
“ইয়েস! কাল সকালেই রাবেয়ার মুখোমুখি হতে হবে আমাদের।”
পরের দিন সকালে হাসানুল ও রকিব তৌসিফদের বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হয়৷ পুলিশ দেখে সবাই ঘাবড়ে যায়। ঘরের সবাই জড়ো হলো পুলিশদের সামনে। রাবেয়া,জাহেদ ও তানভিরও রয়েছে। হাসানুল রাবেয়ার দিকে চেয়ে শক্ত গলায় বলল,
” আমাদেরও মা,বোন,স্ত্রী আছে। নারীদের সম্মান করি আমরা। তাই আপনাকে এরেস্ট করব না। আপনি এমনিতে আমাদের সাথে আসুন থানায়। কিছু জরুরী জিজ্ঞাসাবাদ আছে। আপনার দেবর ব্যাখ্যা করে পুলিশকে বুঝিয়ে বলেছে সব। এই ট্যাবলেট আপনি আনিয়েছেন। এবং আপনার স্বামীকে আপনিই খাওয়াতেন বিছানায় ফেলে রাখার জন্য।”
শুনে সবাই বাকরুদ্ধ! রাবেয়া মড়মড় করে ভেঙ্গে পড়ল শুকনো পাঠকাঠির ন্যায়। গভীর কষ্টে, বেদনায়,ক্ষোভে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন। তার অন্তরটা ফালাফালা হয়ে গেল জাবেদের মিথ্যা অভিযোগ শুনে। তানভির মাকে লেপ্টে নিল বুকের মাঝে। পুলিশদের দিকে চেয়ে বিরক্তিকর গলায় বলল,
“বাহ! চমৎকার! আপনারা আসামির কথা শুনে আমার মাকে ধরতে এসেছেন? এই পৃথিবী উল্টে গেলেও আমি এটা বিশ্বাস করি না।”
“আমরা ধরতে আসিনি তোমার মাকে। উনাকে স্বসম্মানে নিয়ে যেতে এসেছি। কিছু জিজ্ঞাসাবাদ আছে উনাকে।”
“তাইলে এইখানে জিগান। সবাই শুনুক। সমস্যা কী? চোরাচুরির তো কিছু নাই এইখানে।”
অনুরোধ করে বলল মর্জিনা।
তানভির পুলিশদের অনুরোধ করে বলল,
“আপনারা চলে যান। আপনাদের গাড়িতে করে আম্মা গেলে লোকে দেখবে। এতে আমরা একেবারে ছোট হয়ে যাব। কিছুক্ষণ পর আমি আম্মাকে নিয়ে থানায় আসতেছি।”
“ঠিক আছে। নিয়ে আসো।”
তারপর একে একে বাকি সবাই বলল,
“আমি বিশ্বাস করি না। স্ত্রী হয়ে স্বামীকে কষ্টের দিকে ঠেলে দেওয়ার মতো নয় সে।”
তবে মনি মুখ খুলল না। এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে। রকিব তাকে জিজ্ঞেস করল,
“আপনি সাক্ষী দিবেন না এটাই স্বাভাবিক। কারণ তার ছেলের করা মামলায় আমরা আপনার স্বামীকে ধরেছি।”
“সেইটার জন্য না। আমি নিজ চোখে কয়েকদিন দেখছি,ভাবি দুপুরকালে ভাইয়ের গরম ভাতের থালায় কী জানি মাখাইতো। ভাইতো রাতে ও সকালে রুটি খায়। ভাত ওই একবেলাই খাইতো।”
রাবেয়া বিমূঢ় হয়ে গেল মনির কথা শুনে। মানুষ এতটা পারেও?
পুলিশ দুজন চলে গেল। ঘরের পরিবেশ আবারো ভারী হয়ে উঠল মেঘাচ্ছন্ন আকাশের ন্যায়। রাবেয়া তাড়া করে হাতের কাজগুলো সেরে নিল। হাতমুখ ধুয়ে নিল ঘাটে গিয়ে। মুখে একটু ক্রিম মেখে বোরকা পরে নিল শাড়ির উপরে। তানভির একটি রিকশায় করে মাকে নিয়ে রওনা দিল থানার উদ্দেশ্যে।
মিস্ত্রীরা তাদের কাজ করে যাচ্ছে। ঘরে নতুন টিনের চাল দেওয়া হচ্ছে। জাহেদ পেয়ার গাছের ছায়ায় বসে আছে একটি টুলের মধ্যে। হঠাৎ ভূমিকম্পের মতন তার হৃদয়খানি কেঁপে উঠল। এক লহমায় সে চলে গেল বহুবছর আগের এক রাতে। জাবেদ কী সেই #পিদিমজ্বলারাতের বদলা নেওয়ার জন্যই তাকে অচল করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে? এত বছর পর পুরোনো প্রতিশোধ কেউ নেয়? জাবেদের মনে ভাইয়ের জন্য এতো জিঘাংসা! না-কি অন্য কোন কারণ রয়েছে এর নেপথ্যে? কিন্তু কখনো তো জাবেদের আচরণে এমন বিধ্বংসী কিছুই মনে হয়নি। এমন নানামুখী জটিল প্রশ্নবাণে জাহেদের বুকটা ঝাঁঝরা হয়ে যাচ্ছে।
থানায় পৌঁছে গেল তানভির ও রাবেয়া। পুলিশ তানভিরকে বলল,
“তুমি দুই ঘন্টা পর এসে নিয়ে যেও উনাকে। এই ভিতরে আমরা উনাকে জিজ্ঞাসাবাদ করি।”
“আমি এখানে থাকলে কী অসুবিধা?”
ভ্রু কুঁচকে উৎসুক গলায় বলল তানভির।
“কোনো সমস্যা নেই। তুমি যদি এখানে বসে থাকতে পারো, থাকো।”
“আমি এখানে আছি। আম্মাকে নিয়ে একবারে যাব।”
হাসানুল ও রকিব রাবেয়াকে নিয়ে ইনভেস্টিগেশন রুমে নিয়ে গেল। জাবেদকেও আনল। দু’জনকে মুখোমুখি বসালো। পাশে তারা দু’জন বসল। রকিব রুমের দরজা বন্ধ করে দিল ভিতর হতে।
মুঠোফোনে তৌসিফ ও নবনীর ক্ষুদে বার্তা বিনিময় তুলনামূলক হারে বেড়েছে। যদিও তা হবু বর -কনে হিসেবে যথেষ্ট নয়। কিন্তু দু’জন দু’জনের সান্নিধ্যে আসা ও ঘনিষ্ঠতা বাড়ানো,তা আগের অবস্থানেই রয়েছে। নবনী তৌসিফের বউ হবে ভেবেই প্রতিটি মুহূর্তে আগাম সুখের প্রমোদ গোনে। যদিও সে এই নব উম্মাদনা তৌসিফের কাছে প্রকাশ করছে না। তৌসিফের মাঝেও বাড়তি উচ্ছ্বাস নেই নবনীকে বিয়ে করতে যাচ্ছে বলে। মা,বাবা, নতুন ঘর, একমাত্র ছোট ভাইয়ের ভবিষ্যৎ,এসবই তার ভাবনার বিষয়বস্তু! তার সাথে বাড়তি উদ্বেগ ও বিড়ম্বনা যোগ হয়েছে ছোট চাচাকে নিয়ে। তাকে পুলিশ ধরিয়ে নিয়েছে। এখন কী হয় দেখা যাক।
তানভির থানা থেকে বেরিয়ে গেল। থানার একপাশে দাঁড়িয়ে বড় ভাইকে ফোন দিল। বাগানের বিষয় ও আজকের বিষয় অবগত করল। বাগানের বিষয়ের চেয়ে তৌসিফের কাছে মায়ের বিষয় অধিক গুরুত্বপূর্ণ! তার মাথার মগজ উত্তপ্ত হয়ে গেল মায়ের নামে মিথ্যা অভিযোগ শুনে। হতাশাগ্রস্ত কণ্ঠে বলল,
“দেখছিস! কত বড় জোচ্চর আর ধূর্ত এই জাবেদ! চাচা বলতেও ঘেন্না হয় তাকে। স্ত্রী কেন স্বামীকে ভুল ঔষধ খাওয়াবে? কী কেচ্ছা বানাল চৌদ্দশিকের ভিতর বসে বসে৷ আমি তো আসতেও পারছি না। আল্লাহ কেন এতরকম জটিলতায় ফেলে দিল আমাদের?”
“ভ্রাতা,শান্ত হও। আমি তো রহিয়াছি জননীর জন্য। তুমি কর্ম করো মনোযোগের সহিত। মাতাকে নিয়া বাড়ি ফিরিয়া যাইব আমি। ঘটনার ইতিবৃত্ত তোমাকে অবগত করিতে কোনোপ্রকার ত্রুটি হইবে না এই অধমের।”
হাসানুল, রাবেয়া ও জাবেদকে কথা বলার জন্য নির্দেশ দিল। অনুমতি পেয়ে রাবেয়া জ্বলে উঠল দাউদাউ করে। তার চোখজোড়া যেন একশো চুল্লী। সে ঘৃণা মিশ্রিত স্বরে জাবেদকে বলল,
“তুমি মানুষ নামের অমানুষ! ট্যাবলেট আমি আনাইছি? আমি ভাতের লগে মাখতাম সেইটা? কোনো স্ত্রী তার স্বামীকে অসুস্থ কইরা বিছানায় ফালায়া রাখতে চায়?”
জাবেদ ক্রুর চোখে চায় রাবেয়ার দিকে। ধীর গলায় বলল,
“চায়। একশোবার চায়। তোমার মতো সুন্দরীর নারীর স্বামী যদি হয় বয়স্ক! শারীরিকভাবে অক্ষম! বুঝলা। আমি যদি প্রমাণ করতে পারি এটা তাহলে কী হবে? তুমি যে কত কড়া খেলোয়াড় আমাদের পরিবারে,তা আর কেউ না জানুক আমি তো জানি!”
রাবেয়া স্থির থাকতে পারল না। থরথর করে কাঁপতে থাকল। জাবেদের গলা টিপে ধরল দুইহাত দিয়ে। রকিব রাবেয়ার হাত ছাড়িয়ে নেয় জোর করে।
হাসানুল কণ্ঠে উষ্মা ঢেলে বলল,
“আপনাদের দু’জনের মধ্যে কে মূল অপরাধী, তা এতক্ষণে পুলিশ বুঝে গিয়েছে।”
চলবে..২২
#সামাজিক #storytelling #writer #bengalistory #lifelessons #genre #lovestory #twist #loveyourself #mystery #twist
Share On:
TAGS: পিদিম জ্বলা রাতে, রেহানা পুতুল
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৬
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৭
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ২১
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৬
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৯
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১২
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৯
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১১
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৫
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৪