Golpo কষ্টের গল্প পিদিম জ্বলা রাতে

পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ২০


পিদিম জ্বলা রাতে. ২০✍️ #রেহানা_পুতুল

বলেই জাবেদ তৌসিফের গলা টিপে ধরল। কিল ঘুষি মারতে লাগল দানবীয় শক্তিতে। তৌসিফের দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কোনো কথা বলতে পারছে না।
ব্যথা সহ্য ক্ষমতার বাইরে চলে গেলে জাবেদের হাত ধরে প্রতিহত করার চেষ্টা করল সে। তবুও চাচার গায়ে হাত তুলল না সচেতনভাবেই। কারণ এর পূর্ববর্তী ঘটনা থেকে সে কঠিন শিক্ষা নিয়েছে। মুরুব্বীদের গায়ে হাত দেওয়া খুব খারাপ। যতকিছুই হোক এটা করা যাবে না। মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে৷ মেজাজকে চড়ায় উঠতে দেওয়া যাবে না। জাবেদ টান মেরে নিজের হাতকে মুক্ত করে নিল।

আচম্বিত ঘটনায় সবাই বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। ওমাগো! আল্লাগো! বলে রাবেয়া হাউমাউ করে চিৎকার করে উঠলো। উড়ে গিয়ে ছেলেকে ঝাপটে ধরল। তাতে করে জাবেদের দু-চারটা কিল-ঘুষি রাবেয়ার পিঠের উপরেও পড়ল। জাহেদসহ বাকিরা এসে জাবেদকে টেনে সরাতে চেষ্টা করল৷ কিন্তু পারল না। সে এলোপাতাড়িভাবে তৌসিফকে লাথি উষ্ঠা দিতে লাগল। সলিমুল্লা তড়িতেই উঠানে থাকা একটি আধভেজা লাকড়ি হাতে নিলেন। জাবেদের পিঠের উপর পটাপট লাঠি দিয়ে দুটো আঘাত করলেন। ব্যথায় জাবেদের হাত পা থেমে গেল এবার। তার হাত চলে গেলে নিজের পিঠের উপর। র ক্ত চক্ষু নিয়ে উগ্র কণ্ঠে পিতাকে বলল,
“এই অসভ্য নাতির জন্য আপনি নিজের ছেলের গায়ে হাত তুললেন বাবা?”

“না তুললে কী তোর মতো আজরাইলরে দমান যাইতো? কবে থেইকা তুই এমন পশু হইলি? বউর কথা শুইনা পুলিশ পাঠাস ভাতিজারে ধরনের লাইগা? জালিম? বাড়ির,ঘরের,বাপ মায়ের ইজ্জতের কথা চিন্তা করলি না? নিজের নাক কাইটা অন্যের যাত্রা ভঙ্গ করার কোনো মানে হয়? বাইর হইয়া যা তুই বাড়ি থেইকা।”
ক্রোধান্বিত স্বরে গলা হাঁকিয়ে বলল সলিমুল্লা।

“তোর বউর কাছে তো ওই গিয়া এখন মাফ চাইলই। মাফের উপরে আর কিছু আছে? আল্লাগো! এইসব কী শুরু হইলো আমার সংসারে। কোন কুফার নজর পড়ল আমাগো উপরে।”
গলার স্বরকে যথাসম্ভব উঁচু ও তেজী করে বলল মর্জিনা।

তৌসিফ মাটিতে বসে পড়ল মাথায় হাত দিয়ে। তার ঠোঁট ফেটে র * ক্ত ঝরে পড়ছে। সবাই তাকে ঘিরে আছে। রাবেয়া শাড়ির আঁচল দিয়ে ছেলের ঠোঁটের র * ক্ত মুছে ফেলার চেষ্টা করছে।

জাবেদ উঠানের মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখাকৃতি হিংস্র! বিধ্বংসী! আগ্রাসী! আক্রমনাত্মক!

ঠিক তখনই তিনজন পুলিশ বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করল। তাদের সাথে ছিল তানভির। পুলিশদের দেখেই মর্জিনা,সলিমুল্লা,সীমা আশ্চর্য হলো। তাদের খবর দিল কে আবার? প্রায় দৌড়ে ঘরের পিছনে চলে গেল জাবেদ। উদ্দেশ্য পালিয়ে যাবে। পিছন দিয়ে পুলিশ একজনও লম্বা লম্বা পা ফেলে তার পিছনে ছুটল। তা দেখে জাবেদ ঘরের পিছনের ক্ষেত দিয়ে পালিয়ে যেতে লাগল। পুলিশ দৌড়ে তার শার্টের কলার চেপে ধরে ফেলল। টানতে টানতে তাকে উঠানের মাঝে নিয়ে এল। বাকি দুজন পুলিশ উঠানে দাঁড়িয়ে বৃত্তান্ত শুনল। তারা জাবেদের হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে নিল। কেউই বাধা দিল না পুলিশদের। সবাই নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করল।

মনি অনুনয় করে তাদের বলল,
“ঘরোয়া ভেজাল। মিটমিট হইয়া যাইবো। উনারে নিয়েন না আল্লার ওয়াস্তে। সেদিন তো ওরে ধরতে আইসাও ধরেন নাই। অথচ এর চাইতে জঘন্য বিষয় ছিল। ভাতিজা চাচীর গলা টিপে ধরল। আর আইজ চাচা ভাতিজার গায়ে হাত দিল বইলা ধইরা নিতাছেন। এইটা ক্যামন আইন আপনাগো? ক্যামন অন্যায় বিচার?”

“বেশীরভাগ ভেজালগুলোর উৎস তো ঘর থেকেই হয়। আইন চলে প্রমাণের ভিত্তিতে। যেটার চাক্ষুষ প্রমাণ আমরা এখন পেলাম। এমন পরিপাটি পোশাক পরে কেউ চাচার সাথে মারামারি করতে যায়? এবং উনার পক্ষে আপনি ছাড়া আর কাউকেই তো পেলাম না। সেদিন তো তৌসিফের পক্ষে আপনি ছাড়া সবাই ছিল। এবং আপনি কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণও দিতে পারেন নি পুলিশকে। আমরা উনাকে এরেস্ট করতে এসেছি অন্য একটি কারণে। এসে তো আরেকটা কারণ পেয়েই গেলাম।
আপনাদের ঘরে একটি ট্যাবলেটের পাতা পাওয়া গিয়েছে। যেটা মরনঘাতী! এটা ঘরে আসল কীভাবে এই সন্দেহে উনাকে নিয়ে যাচ্ছি। নির্দোষ হলে অনায়াসেই জামিন পাবে উনি।”

মোটা গলায় কথাগুলো বলেই পুলিশ জাবেদকে নিয়ে থানায় চলে গেল। তৌসিফকে ধরাধরি করে তারা বড় ঘরে নিয়ে গেল। তার রুমে নিয়ে শুইয়ে দিল। তানভির ছুটে বাজারে চলে গেল। ফার্মেসীতে তারমতো করে কিছু বলে ব্যাথানাশক ট্যাবলেট নিয়ে এল। আসল কথা বললে তৌসিফ একেবারে ছোট হয়ে যাবে। এতবড় ছেলে চাচার হাতে মার খেল। এটা বড় লজ্জার বিষয়। তানভির বাড়ি ফিরে এসে তৌসিফকে ট্যাবলেট খাইয়ে দিল। তৌসিফ আহতবস্থায় শুয়ে আছে।

জাহেদ বিমূঢ় হয়ে আছে। এই ভাই জাবেদের জন্য সে যে কত কি করল। অথচ সেই ভাই তার বিয়ের উপযুক্ত ছেলের গায়ে হাত তুলতে পারল? তাও এতটা নারকীয়ভাবে? রাবেয়া ছেলের মাথায় হাত বুলাচ্ছে আর কেঁদে যাচ্ছে। তার পিঠটাও ব্যথায় টনটন করছে। তৌসিফকে ঘিরে সবাই দাঁড়িয়ে বসে আছে।
এদিকে মনি তার রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে হাউকাউ করে সারা বাড়ি মাথায় তুলে ফেলছে। তার তীব্র অভিযোগ শ্বশুর শাশুড়ীর দিকে। তানভিরকেও ঝাড়তে লাগল ইচ্ছেমতো৷ বিষাক্ত গলায় বলল,
“তুইও দেখি আরেক হারামীর হারামী! এক বা* লে * র ট্যাবলেটের পাতার লাইগা পুলিশ নিয়া আইলি বাড়িতে। মশা মারতে কামান দাগা। ভিন্ন হইয়া যাওয়াতে তোগো দুই ভাইয়ের ভাবসাব এমন,যেন প্রাসাদ কইরা ফালাইছস তোরা। তোগো অমন আ * চো * দা ঘরের চাইতে আমার বাপের বাড়ির গরু,ছাগলের ঘরও আরো ভালো।”

নিমিষেই তানভির জ্বলে উঠল মনির কথা শুনে। মারমুখী স্বরে বলল,
“এইই, আপনি মুখে লাগাম টেনে কথা বলুন বলছি। ভাষা সংযত করুন। নইলে ওর চেয়ে ডাবল মন্দ ভাষা আমিও স্টার্ট করব। আমি ভাইয়ার মতো অতো ভদ্র নই বললাম। হুঁশিয়ার!
পুলিশকে আমি কিছুই বলিনি। বাড়ির সামনে তাদের সাথে আমার দেখা হলো। মা,বাবা আলাদা ঘরে একা বলেই আমি আসলাম। আমাকে কাল ফোন করে ভাইয়া আসতে বলছে।”

সলিমুল্লা বসা থেকে উঠে গেলেন। রুমের বাইরে গিয়ে বাঘের ন্যায় গর্জে উঠলেন। মনির দিকে চেয়ে অচেনা কণ্ঠে বললেন,
“জাবেদ যখন তৌসিফের গায়ে হাত তুলল,তুমি তখন ঘর হতে বাইর হইছ? কইছ গিয়া,যে তৌসিফ মাফ চাইছে তোমার কাছে? তুমি চাইলে কী তোমার স্বামীরে আটকাইতে পারতা না? অবশ্যই পারতা। কিন্তু তুমি তা করনি। তুমি চাইছই তৌসিফ মাইর খাওক। তাই
ইঁন্দুরের মতন রুমে ঘাপটি মাইরা বইসা ছিলা। বাড়িতে পুলিশ আওনের পথ তো তোমরা স্বামী, স্ত্রী-ই শুরু করলা। বড়রা পথ দেখাইছো। এখন ছোটরা সেই পথে হাঁটতাছে,ঠিকই ত আছে।”

রাবেয়া তানভিরকে বলল,
“তুই ওর কাছে থাক। এখন আর শহরে যাইতে হইব না ওর। আমি গিয়া রান্ধন বসাই।”

“না মা, আমি সন্ধ্যায় চলে যাব। তখন পর্যন্ত শরীর ঠিক হয়ে যাবে। কালকের অফিস ধরতেই হবে। মিস দেওয়া যাবে না।”
আকুতিমাখা স্বরে বলল তৌসিফ।

রাবেয়া নিরুত্তর! বেরিয়ে গেল বিদীর্ণ মুখে। এই মূহুর্তে তার ভীষণ ইচ্ছে করছে জাবেদকে মেরে ফেলতে। সে নিজ হাতে প্রতিশোধ নিতে চায় জাবেদ থেকে।

ঔষধ খাওয়া ও সারাদিন বিশ্রামের ফলে তৌসিফের শরীরের ব্যথার কিছুটা উপশম হয়েছে। সে সন্ধ্যায় চলে গেল ঢাকায়। যাওয়ার সময় মা,বাবাকে অনুরোধ করে বলল, যেন সতর্কতার সাথে চলাফেরা করে সবসময়।

তানভিরকেও বলল,
“তুই আরেকটু বাড়িয়ে থাকিস মা,বাবার কাছে। বুঝলি। আমাদের শ* ত্রু তৈরি হয়ে গিয়েছে। প্রকাশ্য শত্রু! ঘরের শত্রু বিভীষণ! খুব সজাগ থাকতে হবে আমাদের! ট্যাবলেট রহস্য এবার পুলিশই উদঘাটন করবে। সেই ঝামেলা আর আমাদের নেই।”

তানভির ভাইকে আশ্বস্ত করল। তৌসিফ চলে গেল ঢাকায়। তানভিরের মোবাইলে রোজ ফোন করে মা,বাবার সাথে কথা বলে। বাড়ির খবরাখবর নেয়। জানল বাড়ির পরিবেশ শান্ত আছে। তবে মনি স্বামীকে জামিন নেওয়ার জন্য ছোটাছুটি করছে। প্রতিদিন বাড়ির বাইরে যায়। কোথায় যায় তা কেউ জানে না। সে বলে যায় না কিছুই।

রাবেয়া ছেলেকে ফোনে মনে করিয়ে দিয়ে বলল,
“বাবা, নবনীর সাথে ও তার পরিবারের লগে যোগাযোগ করিস। জীবন তো টাইনা নিতে হইব। এক কাসুন্দি নিয়া পইড়া থাইকলে হইব না। শুভ কাজে পিছলাপিছলি করা ঠিক না। বিশেষ কইরা বিবাহাসাদীর কাজে।”

“ভালো কথা মনে করেছ তুমি। আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম।”

“ওই দেখ। হারামজাদা কয় কী?”

মায়ের কথা শুনে তৌসিফ মুঠোফোনের ওপ্রান্তে উচ্ছ্বল হেসে উঠল।
মনি থানায় গিয়ে জাবেদের সাথে দেখা করল থানার নিয়ম মেনে। জাবেদ মনিকে ফিসফিসিয়ে কিছু কথা শিখিয়ে দিল। মনে সুবোধ বালকের ন্যায় ঘাড় হেলিয়ে স্বামীর কথায় সায় দিল।

তৌসিফ নবনীকে ফোন না দিয়ে মেসেজ দিল।
“হাসপাতালের বাইরে কোন একটা কফিশপে দেখা করতে চাই। তোমার সময় ও লোকেশন জানিয়ে দিও অবশ্যই!”

নবনী মেসেজ সিন করল। কিন্তু ফিরতি মেসেজ দিল না। ভেবেচিন্তে লোকেশন ঠিক করে তবেই জানিয়ে দিবে মেসেজে। ফোন কলে নয়। বোবা ভাষার জবাব বোবা ভাষা দিয়েই দিবে সে। নবনী তৌসিফের ছোট্ট মেসেজটিও বার কয়েক পড়ল। মুখস্থ হয়ে গেল তার। সাদামাটা একটি ক্ষুদে বার্তা। তাতে কোনো আবেগ নেই। কাব্যতা নেই। রসবোধ নেই। নেই তার প্রতি কোন নিবেদন ও আকুলতা। তবুও নবনীর কোমল চিত্তখানি দুলে উঠলো। ব্যক্তিত্বসম্পন্ন তৌসিফের এতটুকু কথাতেও সে গভীর টান খুঁজে পেল। হয়তো তার কল্পনা ভুল। তবুও। নবনীর অধর কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে হাসি ভোরের মিষ্টি রোদ্দুরের মতো।

নিশুতি রাত! সবাই গভীর নিদ্রায় বিভোর! তানভির ঘর হতে বেরিয়ে গেল মুঠোফোন হাতে নিয়ে। তার এক বন্ধুকে ফোন দিতে হবে। এক রুমের ঘরে কথা বললে মা,বাবা শুনে যাবে। তানভির ঘর ফেলে কয়েক হাত সামনে গেল। আবছায়ার মাঝে একটি নিরিবিলি স্থান বেছে নিল। সেখানে গিয়ে গাছের আড়ালে দাঁড়ালো সে। মুহূর্তেই তার চোখে পড়ল, বাগানের ভিতরে দুজন মানুষের অবয়ব। তারা বসে বসে যেন কিছু করছে মাটিতে।

তানভির আতংকিত ও স্তম্ভিত হয়ে গেল! তার সারাশরীর শীতল হয়ে গেল বরফখণ্ডের ন্যায়। এরা কারা? কী করছে রাতের অন্ধকারে তাদের বাগানে? সে কী মা,বাবা, দাদা,দাদীকে ডেকে তুলবে? না-কি অন্য পন্থা অবলম্বন করবে? সে খুব সাবধানী হয়ে অনুসন্ধিৎসু চোখে সেদিকে অপলক চেয়ে রইলো।

চলবে..২০

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply