Golpo কষ্টের গল্প পরগাছা

পরগাছা পর্ব ২৬


পরগাছা |২৬|

ইসরাত_তন্বী

(অনুমতি বিহীন কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ)

শরতের বাতাসে ভেসে থাকে শিউলী ফুলের ঘ্রাণ। হেমন্তের ভোরে প্রকৃতি সজ্জিত থাকে শুভ্র রঙা শিউলির সমাহারে। ঘাসের উপর জমে থাকা বিন্দু বিন্দু শিশির কণা স্বর্ণের মতো চকচক করে। সেথায় পদযুগল ছোঁয়াতেই সম্পূর্ণ কায়া শিরশির করে ওঠে। স্বচ্ছ নীলাভ আকাশে ভেসে থাকে সফেদ রঙা মেঘেদের ভেলা। যেন সম্পূর্ণ ধরিত্রী নীরদের রাজ্য। চারপাশ জুড়ে থাকে সাদা রঙের কাশফুলের ঢেউ। শরৎ মানেই যেন সাদার মেলা। শরৎ মানেই চোখের প্রশান্তি, আত্মার প্রশান্তি।

সেদিন একটু ভোর থাকতেই ঘুম ভেঙে যায় গুঞ্জরিকার। এর অবশ্য কারণ ও আছে। রাতভোর ভেবেছে চৌধুরীদের বাড়িতে শিউলি ফুল কুড়োতে যাবে। অন্যদের আগেই যেতে হবে নয়ত ফুল পাবে না। ফুলের মালা গেঁথে নিজেই একটু সাজুগুজু করবে। তন্দ্রাচ্যুত হতেই চৌকি থেকে নেমে দাঁড়ায় গুঞ্জরিকা। আব্বা-মা হয়ত উঠেই নিজেদের কাজে ছুটেছে। ভাইজান ওঠেনা এত সকালে তাই তো যেতে পারবে ফুল কুড়োতে। নয়ত কখনোই ভাইজান যেতে দেয় না ওই বাড়িতে। বরাবরই বড়ো লোকদের একটু পাশ কাটিয়ে চলে তো।

গুঞ্জরিকা আকাশ কুসুম ভাবনার মাঝেই ঘরের দাওয়ায় এসে দাঁড়ায়। অমনিই নেত্র যুগল বড়ো বড়ো হয়ে যায়। ওর থেকে একটু দূরেই তাইমুর দাঁড়িয়ে আছে। পিছন ফিরে আছে গুঞ্জরিকার দিকেই। গুঞ্জরিকা হতভম্ব হয়েই দাঁড়িয়ে রয়। তার সব আনন্দে যে ভাটা পড়তে চলেছে সেটা বুঝতে আর বাকি নেই। সেই মুহূর্তে শুনতে পায় তাইমুরের গলা,
“তোর সময় হবে একটু? কথা ছিল আমার।”
তাইমুরের কণ্ঠস্বরে অদ্ভুত রকমের বিষাদের ছাপ স্পষ্ট। গুঞ্জরিকা এইবার অবাকের শীর্ষে পৌঁছায়। পিছনে না ফিরেই ভাইজান তার উপস্থিতি বুঝে গেছে? কী হয়েছে ভাইজানের? গলাটা ওমন শোনাচ্ছে কেন? মনে প্রশ্ন এঁটেই গুটি গুটি সম্মুখে এগিয়ে যায় গুঞ্জরিকা। তাইমুরের দিকে তাকাতেই বুকটা ধ্বক করে ওঠে। ছেলেটার চোখ দুটো রক্তিম হয়ে ফুলে আছে। সারারাত যে নির্ঘুম কেটেছে তার সাক্ষী দিচ্ছে ওই দুটো নিষ্পাপ নেত্র। সব সয়ে নিলেও ভাইজানের দুঃখ মেয়েটা সইতে পারে না। গুঞ্জরিকার চোখের কোণে জল জমে। তবুও নিজেকে সামলিয়ে নেয়। মৃদু হাসে,
“বলো ভাইজান। তোমার জন্য এই জীবন হাজির আর তুমি কি-না আমার থেকে সময় চাইছ।”

আজ হাসে না তাইমুর। ঘাড় ঘুরিয়ে বোনের দিকে তাকায়। কিছুক্ষণ চুপ থেকে নির্লিপ্ত গলায় বলে,
“আমি বিয়ে করব গুঞ্জ।”
গুঞ্জরিকা আকাশ থেকে পড়ে। আঁখি জোড়া কপালে উঠে যায়। যেই ছেলে বই ছেড়ে কখনো মুখ তোলে না সে নাকি বিয়ে করবে! এ যেন সপ্তম আশ্চর্যের একটা বিষয়। ভাইজান পাগল হলো নাকি? গুঞ্জরিকা বিস্মিত হয়ে শুধায়,
“তুমি ঠিক আছ ভাইজান? এটা কী বলছ? আব্বার যে অনেক স্বপ্ন তোমাকে নিয়ে।”
একটু থেমে জানতে চায় গুঞ্জরিকা,
“কাকে বিয়ে করবে ভাইজান?”
তাইমুর কথাগুলো শোনে। বড়ো একটা শ্বাস ফেলে উত্তর দেয়,
“চন্দ্রা, তোর সখীকে। গতকাল বিকালে ওর মামী ওকে মেরে আধমরা করে রেখেছে। কথাটাও বলতে পারছে না। আমার পক্ষে এইসব দেখা আর সম্ভব নয়।”
গুঞ্জরিকার কণ্ঠস্বর রোধ হয়ে আসে। সে সবটা জানে তাই তো ভয় বেশি। ভালোবাসার চাইতে সেই ভালোবাসার পূর্ণতা দেওয়া বড়ো কষ্টের। সেখানে এই ভালোবাসার পূর্ণতা দেওয়া যে এত সহজ হবে না। ওই পরিবারের মানুষগুলো তো ভালো না। আর আব্বার স্বপ্ন! যার জন্য মাথার ঘাম পায়ে ফেলে পরিশ্রম করে সামান্য রোজকারের উপর দিয়ে ভাইজানকে পড়াচ্ছে সেই স্বপ্নের কী হবে? গুঞ্জরিকা অনুরোধের সুরে বলে,
“ভাইজান আর একটা বার ভেবে দেখলে হতো না? চন্দ্রার মামার পরিবার শেষ করে ছাড়বে আমাদের। ওদের সাথে আমরা পারব না ভাইজান। এই বিয়ে কীভাবে সম্ভব হবে? আব্বা মরেই যাবে।”

মানুষ নাকি ভালোবাসলে উন্মাদ হয়ে যায়। ঠিক-ভুলের পার্থক্য করতে পারে না। মস্তিষ্ক অচল হয়ে পড়ে। তাইমুরের অবস্থাটাও ঠিক তাই। অকপট বলে বসে,
“পালিয়ে যাব। আজ রাতে চন্দ্রাকে নিয়ে পালিয়ে যাব। থাকব না আর এখানে। আব্বাকে দেখে রাখার দায়িত্বটুকু তোর বোন। ভাইজানের এতটুকু আবদার রাখবি না? শেষ আবদার।”
গুঞ্জরিকা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তৎক্ষণাৎ মুখ ফুটে কিছু বলতে পারে না। বেশ কিছুটা সময় নিয়ে রয়ে সয়ে জানতে চায়,
“কোথায় যাবে তুমি? মাথা গোঁজার ঠাঁই ছাড়া আর কী আছে তোমার?”
তাইমুর এতক্ষণে হাসে,
“থাকব পথে, ঘাটে। একটা ব্যবস্থা ঠিক হয়ে যাবে।”
“চন্দ্রা যাবে বলেছে তোমার সাথে?”
“হুঁ, সে নিজেই আবদার করেছে আমার কাছে।”
গুঞ্জরিকা আর কিছু বলতে পারে না। মূলত মন সায় দেয় না। কী হবে এই ভালোবাসার শেষটা? ভাইজান সত্যিই শেষ পর্যন্ত এমনটা করবে? আব্বা সমাজে মুখ দেখাবে কী করে? আর মা? কলিজার টুকরো ছেলের শোকে সে নির্ঘাত শয্যাশায়ী হয়ে যাবে। গুঞ্জরিকা সবকিছু কীভাবে সামলাভে একা হাতে? একের পর এক চিন্তা এসে ছোট্ট মস্তিষ্কে বাসা বাঁধতে থাকে। মস্তিষ্ক খুবলে খেতে থাকে। গুঞ্জরিকা খেয়াল করে তাইমুরের ছলছল লোচনদ্বয়। শত চেয়েও ভাইজানকে কিছু বলতে পারে না। মস্তিষ্কে শব্দ শূন্য অনুভূত হয়। কেবল ভাইজানের প্রতিটা দীর্ঘশ্বাসে অন্তর ব্যথিত হয়।

একটা ভুল সিদ্ধান্তের হাত ধরেই চার চারটা জীবন ধ্বংস হয়ে গেল। এর দায়ভার কার? কে নিবে? মাগরীবের নামাজ পড়ে মাদুরে শরীর ছুঁইয়েছে গুঞ্জরিকা। আজ দিনটা ওর জন্য বিষাক্ত বিষের মতোই। বুকটা জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে। চোখদুটো বারেবারে ঝাঁপসা হয়ে আসছে। মানুষটার করা শেষ আবদারগুলো মস্তিষ্কের প্রতিটা নিউরনে বিদ্যুতের গতিতে ছুটছে। একদণ্ড শান্তি পাচ্ছে না। কেন আবার দেখা হলো ওই মানুষটার সাথে? কেন আবার পুরোনো ক্ষত তরতাজা হয়ে উঠল? কেন? ভাগ্য আর কত খেলবে ওকে নিয়ে? এর শেষ কোথায়? মৃত্যুর আগ অবধি কি একটুও শান্তি মিলবে না? আর পাঁচজনের মতো ভাগ্য কেন ওর হলো না? আর কত খোয়াতে হবে? নিজেকে খুইয়ে বসলেই বোধহয় এইবার ষোলোকলা পূর্ণ হবে। নিজেকে অবশ্য খুইয়েছে অনেক আগেই। মন মৃত অথচ দেহটা জীবিত। তাইতো কষ্টের ভার ও অনেক বেশি। ভাইজানের উপর খুব অভিমান হলো গুঞ্জরিকার। ভাইজান যদি সেদিন ভুল সিদ্ধান্ত না নিত আজ সবাই থাকত গুঞ্জরিকার সাথে। এমন একাকী জীবন পার করতে হতো না। আর না শেখ পরিবারের সাথে জুড়ত নিজেকে। ম্লান বদন, অশ্রুসিক্ত নয়ন নিয়ে বিড়বিড় করে আওড়াল গুঞ্জরিকা,
“ভাইজান তোমার নেওয়া একটা ভুল সিদ্ধান্ত আমাদের সবাইকে ধ্বংস করে দিল। তোমাকে হারাতে হলো। তুমি ভুল মানুষকে ভালোবেসেছিলে। দেখোনা, সেই একই ভুল নিজের অজান্তেই আমিও করে বসলাম। যার ফলস্বরূপ নিজেকেই হারিয়ে বসেছি। নিশ্চয় তোমার থেকেই এই গুণ পেয়েছি আমি। সব নষ্টের মূল তুমি। তোমাকে আমি আর কখনোই ভালোবাসব না ভাইজান।”

গুঞ্জরিকা ফুঁপিয়ে উঠল। চোখের কার্নিশ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। ঝাঁপসা চোখে দেখল ঘরের দুয়ারে ভাইজান দাঁড়িয়ে আছে। চোখে মুখে তার আকাশসম মায়া! ব্যথিত চোখদুটোতে স্পষ্ট কতশত অব্যক্ত কথা! গুঞ্জরিকার কান্নার বেগ বাড়ল,
“আমি গলব না তোমার ওই মুখ দেখে। চলে যাও তুমি। তোমাকে তোমার গুঞ্জ ভুলে যাবে ভাইজান।”
সত্যিই আস্তে ধীরে সেই ছায়াটা মিলিয়ে গেল। গুঞ্জরিকার এইবার রাগ হলো ভাইজানের উপর। বেশ উঁচু গলায় ক্রন্দনরত গলায় বলল,
“সত্যিই চলে গেলে? আমাকে একা রেখে চলে গেলে? তুমিও শেখ বাবুর মতোই পাষাণ ভাইজান। তোমরা কেউ কখনো আমাকে ভালোবাসোনি।”
তক্ষুনি চারপাশ মুখরিত করে হাসির শব্দ ভাসমান হলো। সঙ্গে শোনা গেল একটা বাক্য,
“পাগলী একটা। তোর সঙ্গ এত সহজে ছাড়ছি না রে, শাকচুন্নী।”
.

এশার নামাজ শেষ হয়েছে। মুসল্লিরা মসজিদ ছেড়েছে ইতোমধ্যে। কেবল মসজিদের এক কোনায় একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের অবয়ব স্পষ্ট। যে মোনাজাতে বসে আছে দীর্ঘ সময় ধরে। হাত তুলেছে আল্লাহর দরবারে। যেখান থেকে খালি হাতে ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই। সব পাপ ত্যাগ করে আল্লাহর দরবারে নিজেকে সমর্পণ করেছে সে। জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটাই হারিয়ে সে এখন মধ্যনদীর মাঝি। না পারছে দীর্ঘ নদী পাড়ি দিয়ে নৌকা নিয়ে এই পাড়ে আসতে, না পারছে নদীর ওপাড়ে যেতে। মানুষে কানাঘুষা করছে, শেখ বাড়ির একমাত্র ছেলে তার বড়ো বউয়ের শোকে পাগল হয়েছে। রাস্তা ভর্তি মানুষের সামনে বউয়ের হাতে থাপ্পড় খেয়েছে। ব্যক্তিত্ব নেই ওই ছেলের। পুরুষত্বহীন একেবারে। নয়ত কে বউয়ের হাতে মার খায়? ফিরতি দু ঘা লাগানোর সাহস থাকে না? অথচ আরুষ সবটা মুখ বুজে সহ্য করছে। মানুষ আজ বলবে, পাঁচদিন বলবে একসময় হাঁপিয়ে থেমে যাবে। কিন্তু তার তাজা ক্ষত? সেটা যে আমৃত্যু বইতে হবে। সেটার ভাগ তো কেউ নেবে না। এই পর্যায়ে ডুকরে কেঁদে উঠল আরুষ। কাঁদতে কাঁদতেই মোনাজাতে আওড়াল,
“তুমি তো আমার মনের অবস্থা জানো, আল্লাহ। আমি নিরুপায়। আমাকে পথ দেখাও। আমার গুঞ্জনের অন্তরে শিথিলতা এনে দাও। শেষ বারের মতো আমার করে দাও। আমার একটা জীবন যেকোনোভাবে কেটে যাবে কিন্তু ভালো থাকাটা হবে না। পবিত্র কাবা শরীফ ছুঁয়ে তাকে চাওয়ার সুযোগটা তাড়াতাড়ি এনে দিও আল্লাহ। আল্লাহ, আমি তোমার অসহায় এক বান্দা। খালি হাতে ফিরিয়ে দিও না আমায়। এই প্রথম কিছু চাইছি তোমার দরবারে। করুণা করো ইহজীবনের এই অসহায় পথিককে। জান্নাতে আমি আমার গুঞ্জনের সাথেই থাকতে চাই আল্লাহ। আমার সব ভুল ক্ষমা করো। আমি তোমার অসহায় গুনাহগার বান্দা।”
একটু থামল আরুষ। বিড়বিড় করে পড়ল তওবা,

أَسْتَغْفِرُ اللهَ رَبِّي مِنْ كُلِّ ذَنْبٍ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ، لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللهِ الْعَلِيِّ الْعَظِيمِ

উচ্চারণ:
আস্তাগফিরুল্লাহা রব্বি মিন কুল্লি জাম্বিওঁ ওয়া আতুবু ইলাইহি; লা হাওলা ওয়া লা কুওয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিয়্যিল আজিম। [১, ৬]।

অর্থ:
আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই আমার সব পাপের, আমি তাঁর কাছে ফিরে আসি। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া গুনাহ থেকে বাঁচার ও নেক কাজ করার কোনোই শক্তি নেই।

শেষের দিকে গলা ধরে এল আরুষের। আর কিচ্ছুটি উচ্চারণ করতে পারল না। কেবল নিঃশব্দে গাল বেয়ে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়ল। মহান আল্লাহ তার অব্যক্ত কথাগুলোও ঠিকই বুঝে নিবেন। আজ অঝোরে কাঁদল আরুষ। আল্লাহর কাছে সমর্পণ করা প্রতি ফোঁটা চোখের পানি মূল্যবান। আরও ঘণ্টা খানেক একাকী অবস্থান করল মসজিদে।
.

রাত গভীর। আরুষ বসে আছে সেই অতিব পরিচিত নদীর চরে। সাঁকো অবধি যাওয়ার শক্তি টুকুও তার মাঝে অবশিষ্ট নেই। মাথাটা ভীষণ ভার হয়ে আছে। জীবনের এই মারপ্যাঁচে সে অতিষ্ঠ, ক্লান্ত। কেন যে এতটা মা-ভক্ত সে হলো। এযাবৎ সবসময় একপাক্ষিক বিবেচনাই করে এসেছে। তাই তো এখন তার শাস্তি কড়ায়গণ্ডায় পাচ্ছে। হঠাৎ পাশে কারোর উপস্থিতি অনুভব করল আরুষ। ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে দেখল। শাহরিয়ার এসে বসেছে। চেয়ে আছে ওর দিকে। শাহরিয়ার মিনিট দুই নীরবে আরুষকে পর্যবেক্ষণ করে বলল,
“জানতাম তুই এখানেই থাকবি তাই আর তোর বাড়িতে যাইনি। এ কী অবস্থা তোর? ঘুমাস না কতদিন?”
আরুষ জবাবে নিরুত্তর রইল। মুখ ফিরিয়ে নিল। দূরাকাশে নক্ষত্রদের মেলায় নিজেকে খুইয়ে বসল। এক দমকা শীতল হাওয়া খেলে গেল জায়গাটার উপর দিয়ে। নিশ্চুপতায় পেরোল কিয়ৎসময়। চারপাশ আঁকড়ে আছে অদৃশ্য এক নীরবতা। মৌনতা ভেঙে আরুষ বলল। কণ্ঠস্বরে বিমর্ষতা ঠিকরে পড়ছে,
“একই আকাশের নিচে থেকেও কত দুরত্ব আমাদের মাঝে? হয়ত একজীবনে এই দুরত্ব শেষ হওয়ার নয়।”
শাহরিয়ার প্রত্যুত্তরে কী বলবে বুঝে উঠতে পারল না। তাই এই বিষয়ে চুপ থাকাকেই প্রাধান্য দিল। আরুষ নিজেও আর কিছু বলল না। প্রসঙ্গ পালটে শাহরিয়ার নমনীয় কণ্ঠস্বরে বলল,
“ভাবীর সাথে তো কথা বলেছিস আজ। হয়ত কিছুই আর ঠিক হওয়ার নয়। নিজের জীবনটা গুছিয়ে নে নিজের মতো করে।”
শাহরিয়ার চন্দ্রার বিষয় নিয়ে আরও কিছু বলতে চাইছিল কিন্তু ইতস্ততবোধের জন্য পারল না। আরুষ অবশ্য বুঝল সবটাই। ক্ষীণ হাসল,
“সংসার আর আমার দ্বারা হবে না রে দোস্ত। তোর ভাবী যদি কখনো ফিরে আসে তবেই সংসার জীবনে ফিরব নচেৎ নয়। হজের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। সব প্রস্তুতি নিয়ে আড়াই থেকে তিন মাস সময় লাগবে হয়ত যেতে। এত খারাপের মাঝে কিছু তো ভালো কাজ করি। আমি কখনো কল্পনাতেও ভাবিনি গুঞ্জন আমাকে ত্যাগ করে শেখ বাড়ি থেকে প্রস্থান করবে। আমি যেই ভীতু নরম গুঞ্জনকে ভালোবেসেছিলাম আর আজ সাক্ষাৎ হওয়া এই গুঞ্জনের মধ্যে বিস্তর ফারাক।”
শাহরিয়ার এর একটু মন খারাপ হলো বটে তবে ভীষণ খুশিও হলো বন্ধুর জবাবে। দুহাতে জড়িয়ে ধরল আরুষকে। পিঠে দুটো থাবা মারল,
“আমি সবসময় পাশে আছি। যেকোনো প্রয়োজনে আমাকে স্মরণ করিস।”
আরুষ শাহরিয়ার বুকে মাথা রেখে ঠায় বসে রইল। কিছুসময় পরে নিজ থেকেই বলল,
“ভয় পেতাম পর মানুষে অথচ দিনশেষে আপনজনদের থেকে ঠকে গেলাম।”

শাহরিয়ার তাচ্ছিল্য হাসল। এটা আর নতুন কী? কাছের মানুষেরাই তো রং ঢং করে আমাদের ঠকায়। মুখে বলল,
“দোস্ত, আমাদের জীবন সংক্ষিপ্ত এক ভ্রমণকাল। এখানে সব চেনা গেলেও মানুষ চেনা যায় না। সবচেয়ে কঠিন কাজ এটাই।”
.

বিষন্ন দীর্ঘ রাতটা পেরিয়েছে। সময় বেলা এগারোটা। আজ চৌধুরীদের বাড়ি থেকে কয়েকজন মানুষ আসার কথা ছিল। ইতোমধ্যে এসে পৌঁছেছে তারা। তৈয়ব চৌধুরী, আফিয়া খন্দকার, আহনাফ এবং চৈতন্য এসেছে। আপাতত একটু জিরিয়ে বসার ঘরে আসমান শেখ এবং আরুষের সাথে বসে কথা বলছেন তাঁরা। তাদের আগমনে বাড়িতে রান্নাবান্না নিয়ে ইলাহি কাণ্ড। রান্নাঘরের দায়িত্বে আছে চন্দ্রা এবং বাড়ির কাজের খালারা। অদিতি আয়েশা শেখের কাছে থাকছে কিছুক্ষণ আবার কিছুক্ষণ এটা সেটা তদারকি করছে।

এই তো বাইরে থেকে মাত্রই আয়েশা শেখের কক্ষে এসে বসল অদিতি। এতক্ষণ মায়ের কক্ষে ছিল। রোকেয়া শেখের সাথে টুকটাক কথা বলছিল। আজ আয়েশা শেখের জ্বরটা একটু কম। রাতে অদিতি নিজেই ছিল এখানে। চন্দ্রা থাকেনি। অদিতি হাত উঠিয়ে আরেকবার আয়েশা শেখের কপালে ছোঁয়াল। এখন ঠাণ্ডা কপাল। আয়েশা শেখ গভীর ঘুমে তলিয়ে আছেন। তাই আর ডাকল না অদিতি। রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারেনি বৃদ্ধা দাদী।

এই পর্যায়ে অদিতির ডাক পড়ল বসার ঘরে যাওয়ার জন্য। ঘটনা অনেকটাই আঁচ করতে পেরেছে অদিতির তীক্ষ্ণ মস্তিষ্ক। বড়ো একটা শ্বাস ফেলে কাজের খালার পিছু পিছু কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল। বসার কক্ষে প্রবেশ করেই সালাম বিনিময় করল সকলের সাথে। খেয়াল করল বাবার মুখটা শুকিয়ে আছে। এইবার যেন নিজের আন্দাজ সম্পর্কে নিশ্চিত হলো অদিতি। তবুও অপরপক্ষের মুখ থেকে শোনার অপেক্ষায় রইল। নয়ত নিজ থেকে কিছু বলাটা বেয়াদবি হয়ে যাবে। যেটার শিক্ষা সে পায়নি। আফিয়া খন্দকার অদিতিকে দেখে একগাল হাসলেন। কাছে ডেকে পাশে বসালেন। তৈয়ব চৌধুরী হাসিমুখে বললেন,
“কথা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে না বলে সোজাসাপ্টাই বলি অদিতি মা।”
অদিতি কেবল মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। অনুমতি পেতেই তৈয়ব চৌধুরী বললেন,
“আফিয়ার তোমাকে খুব পছন্দ হয়েছে মা। আমাদের আহনাফের জন্য তোমাকে পছন্দ করেছে আফিয়া। তোমার থেকে ভালো কাউকে হয়ত আমরা আহনাফের জন্য পাব না। তোমার বাবাকে জানিয়েছি ইতোমধ্যে সবটা। তিনি অবশ্য তোমার মতামতের উপরে ছেড়ে দিয়েছেন সবকিছু।”

অদিতি মুচকি হাসল। জবাবে বলল,
“আপনারা বড্ড দেরি করে ফেলেছেন চাচ্চু।”

তৈয়ব চৌধুরী ঠিক বুঝলেন না। না বোঝার মতো করে শুধালেন,
“মানে? ঠিক বুঝলাম না মা।”
“আমার নামের আগে এখন একটা নতুন শব্দ যুক্ত হয়েছে চাচ্চু। আমি এখন বিধবা অদিতি শেখ। শুধু অদিতি শেখ হলে ভেবে দেখা যেত বিষয়টা।”
অদিতির উচ্চারিত প্রতিটা শব্দে কী যেন একটা আছে। যেই ‘বিধবা’ শব্দটা সমাজ নিচু চোখে দেখে, সমাজের মানুষেরা অবহেলা করে সেটাকে এই মেয়ে গর্বের সাথে বলছে। কী আশ্চর্য! আফিয়া খন্দকার বললেন,
“বিধবাদের সমাজ ভালো চোখে দেখে না মা। তুমি নতুনভাবে একটা জীবন শুরু করার সুযোগ পাচ্ছ। এটা তো তোমার জন্য সৌভাগ্যের।”

আফিয়া খন্দকার শেষের কথাটা এখটু খোঁচা মেরেই বললেন। উপস্থিত সকলেই সেটা বুঝল। আহনাফ বেজায় বিরক্ত হলো। এখনো চোখ তুলে তাকায়নি ছেলেটা। বাবা-মায়ের থেকে সে পুরোপুরিই বিপরীত স্বভাবের। এখানে এসেছেও একপ্রকার মায়ের জোরজবরদস্তিতে। অদিতির ঠোঁট জোড়া দুদিকে প্রসারিত হলো। শক্ত কণ্ঠে প্রত্যুত্তর করল,
“আমি খাচ্ছি বাবার টাকাতে, থাকছি নিজের বাড়িতে তাই সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ভাবার মতো অতখানি সময় হাতে নেই। এখন আমার সাথে যা হচ্ছে সেটা আমার জন্য আসলেই দুর্ভাগ্যের। আমি একজন মেয়ে। হাতে বানানো পুতুল নই। আমার বাবা খুব আদরে আমাকে লালন পালন করেছেন এবং এখনো করছেন। আমি একজন ভাইয়ের আদুরে বোন। শেখ পরিবারের একমাত্র মেয়ে। যেই বাড়িতে একবার বধূবেশে পদযুগল রেখেছি সেখানে দ্বিতীয়বার একই বেশে যাওয়া মানে আমার মৃত স্বামীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা।”
কথাগুলো বলেই অদিতি উঠে দাঁড়াল। চৌধুরীদের উদ্দেশে বলল,
“আপনারা এসেছেন বিশ্রাম নিন। খাওয়া দাওয়া করুন, গ্রাম ঘুরে দেখুন। সুস্থ স্বাভাবিক সম্পর্কটাকে আমরা অসুস্থ না করি। সেদিকে আর না এগোয়। আমার কাজ আছে। আমাকে যেতে হবে।”
কথাগুলো বলেই দরজার দিকে হাঁটা ধরল অদিতি। আরুষ পুরোটা সময় একেবারে নীরব দর্শক ছিল। ঠোঁট দুটো বাম পাশে কিঞ্চিৎ উঁচু হলো। আহনাফ এতক্ষণে মেঝেতে নিবিষ্ট দৃষ্টি তুলে সামনে তাকাল। দেখল হালকা আকাশি রঙা একটা শাড়ির আঁচল দরজা পেরিয়ে গেল। ক্ষোভ জমল মা-বাবার উপরে। সে জানত এমন কিছুই হবে। এই অপমানের ভার কেবল অদূরে বসা বাবা-মায়ের। চোয়াল শক্ত হয়ে এল আহনাফের। তৈয়ব চৌধুরী এবং আফিয়া খন্দকার স্থির হয়ে বসে আছেন। এমনটা তাদের কল্পনাতীত ছিল। তীব্র অপমানে মাটিতে মিশে যেতে মন চাইল তাদের।

চলবে

(আজ রিচেক নেই। ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে। প্রিয় পাঠক, আপনাদের সকলের গঠনমূলক মন্তব্য ও রেসপন্সের আশা রাখি।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply