পরগাছা |২৫|
ইসরাত_তন্বী
(অনুমতি বিহীন কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ)
ঘড়ির কাঁটা টিকটিক শব্দ তুলে ঘুরে চলেছে। সময় বেলা দ্বিপ্রহর। সকাল থেকে আয়েশা শেখের কক্ষেই আছে চন্দ্রা। পেটে একদানা ভাত ও পড়েনি। এমনিতেই ইদানিং শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। অদিতি এলে একটু রান্নাঘরের দিকে যাবে। খেয়ে তারপর না হয় আবার আসবে। সকালে ডাক্তার এসেছিলেন। ঔষধ দিয়েছেন। তবে একটা ঔষধ গ্রামের ডাক্তারের কাছে পাওয়া যায়নি। সেটা আনতে পাশের গ্রাম শশীদিঘীতে গেছে আরুষ। ফিরবে হয়ত কিছু সময়ের মধ্যেই। আসমান শেখ বেশকিছুক্ষণ ছিলেন মায়ের কাছে। তারপর একপ্রকার বাধ্য হয়েই আড়তে যেতে হয়েছে তাঁকে। ব্যবসায়িক কাজে কয়েকজন এসেছে দূর গ্রাম থেকে। মেজবাহ এসে খবর দিতেই ছুটেছেন তিনি। অদিতি আর রোকেয়া শেখ আছে নিজ কক্ষে। অগত্যা চন্দ্রাকেই থাকতে হয়েছে আয়েশা শেখের নিকট।
আয়েশা শেখ গভীর তন্দ্রাচ্ছন্ন। এতক্ষণে চোখের পাতা একটু নড়ল। হয়ত ঘুমের ঘোর কাটছে আস্তে ধীরে। শীর্ণ শরীর ঘেমে ভিজে গেছে। ললাটে বিন্দু বিন্দু ঘামের কণা দৃশ্যমান। চন্দ্রা আয়েশা শেখের উদরে বসে আছে। পাশ থেকে গামছা তুলে কপালটা আলতো করে মুছে দিল। সময় নিয়ে নেত্রপল্লব মেলে নিভু নিভু চাহনিতে তাকালেন আয়েশা শেখ। চন্দ্রা দুগাল ভরে হাসল। মিষ্টি করে বলল,
“এখন ভালো লাগছে দাদী? আপনি তো আমায় ভয় ধরিয়ে দিয়েছিলেন।”
আয়েশা শেখের দৃষ্টিতে ভয় স্পষ্ট। কিছু একটা মিলেও যেন মিলছে না। সামনে বসা মেয়েটার প্রাণোচ্ছল বদনের সাথে রাতের ওই ভয়ংকর মুখটা তিনি কোনোভাবেই মেলাতে পারছেন না। চন্দ্রা একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। হাসি মুখটা আস্তে ধীরে ম্লান হয়ে উঠল। ঠোঁটের কোণে স্নিগ্ধ হাসি ধরে শুধাল। কণ্ঠস্বর কেমন যেন অদ্ভুত শোনাল,
“রাতে ভয় পেয়েছিলেন দাদী?”
আয়েশা শেখ ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে পড়লেন। সেই সময় কক্ষে প্রবেশ করল অদিতি। মুহূর্তেই চন্দ্রার আননে পরিবর্তন দেখা দিল। আগের মতোই হাস্যোজ্জ্বল হয়ে উঠল। অদিতির দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে প্রশ্ন করল,
“এখন এখানে থাকছ তুমি?”
অদিতি এগিয়ে এসে চন্দ্রার পাশে দাঁড়াল। একটু ঝুঁকে আয়েশা শেখের মাথায় হাত রাখল। না, তাপমাত্রা একটু কম এখন। জবাব দিল,
“আছি আপাতত। তুমি যেয়ে খেয়ে নাও ভাবী। সকাল থেকে না খাওয়া তুমি।”
চন্দ্রা একবাক্যেই মেনে নিল। আয়েশা শেখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল। আয়েশা শেখের চোখের কোণ ঘেঁষে কয়েক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল। সেটা অবশ্য অদিতির তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এড়াল না।
.
চন্দ্রা রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে একপলক সদর দরজার দিকে তাকাল। অমনিই অধর যুগলে মুচকি হাসির রেশ ছড়াল। দেখল সেদিনের সেই ছোট্ট বাচ্চা মেয়েটা কপাট ধরে দাঁড়িয়ে আছে। উচ্ছুক চোখে বাড়ির ভেতরে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। কাউকে খুঁজছে হয়ত। চন্দ্রা স্বেচ্ছায় দাঁড়িয়ে পড়ল। বাচ্চাটার নাম সেদিন শুনেছিল গুঞ্জরিকার মুখ থেকে। সেই নাম ধরেই ডাকল,
“মোনা, কাকে খুঁজছ তুমি?”
মোনা চমকে উঠল। ভয় মিশ্রিত দৃষ্টিতে তাকাল চন্দ্রার দিকে। ভাবটা এমন যে চুরি করতে এসে ধরা পড়ে গেছে। শেখ বাড়ির এই বউটাকে সে ভীষণ ভয় পায়। খুব রাগী তো। সেদিন পুরোনো বউয়ের সাথে কীভাবে কথা বলছিল! মোনা উলটো ঘুরে দৌড় দিবে ঠিক তক্ষুনি চন্দ্রা বলে উঠল,
“পালিও না। কাছে এসো মোনা। ভয় নেই কোনো।”
মোনার শরীরে জড়ানো একটা নোংরা আধছেড়া গোল জামা। দুহাতে জামার দুইপাশ খামচে ধরল বাচ্চাটা। কিছুক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে চন্দ্রাকে দেখে গুটি গুটি পায়ে সম্মুখে এগিয়ে গেল। মুখোমুখি দাঁড়াল। চন্দ্রা একটু ঝুঁকে মোনার নাকে টোকা দিল,
“কাকে খুঁজছ মোনা?”
“পুরোনো বউকে। সে কি বাড়িতে নেই? গল্প করতে এসেছি। আমাকে খুব ভালবাসে পুরোনো বউ।”
কথাগুলো বলেই মোনা জিজ্ঞাসা সূচক চোখে চেয়ে রইল। চন্দ্রা দুদিকে মাথা নাড়ল,
“নেই তো। সে আর নেই এখানে।”
ছোট্ট মোনা কথার অর্থ বুঝল না। বাচ্চা কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল,
“কেন নেই? কোথায় গেছে?”
“সেটাতো জানি না। কিন্তু সে নেই এখানে।”
থামল চন্দ্রা। পুনরায় শুধাল,
“সকালে খেয়েছ তুমি?”
“হ্যাঁ, খেয়েছি তবে অল্প। ঘরে চাল নাই।”
কথাগুলো হাসিমুখেই বলল বাচ্চাটা। যেন তার জন্য খুব স্বাভাবিক বিষয় এগুলো। চন্দ্রার বুকটা ব্যথিত হলো। মোনার মায়াবী মুখে চেয়ে প্রশ্ন করল,
“তোমার কি আর কোনো জামা নেই?”
মোনা এই প্রশ্নের উত্তরে একগাল হাসল,
“আছে তো। পুরোনো বউ নতুন দুটো জামা কিনে পাঠিয়েছিল। আমি রেখে দিয়েছি। ঈদের দিন পরব বলে।”
অজানা কোনো কারণে চন্দ্রার চোখের কোণে জল জমল। অতীত স্মরণ হলো। এরকম একটা জামার জন্য সে কত কেঁদেছে শৈশবে। নিঃশব্দে কোলে উঠিয়ে নিল মোনাকে। মোনা বেশ অবাক হলো। নিষ্পাপ সারল্য চোখ দুটোতে তার আভাস ছড়িয়েছে। সেভাবেই বাচ্চাটা জানতে চাইল,
“কোথায় নিয়ে যাচ্ছ আমাকে?”
চন্দ্রা মোনার দুই গালে চুমু খেয়ে বলল,
“ভাত খাবে আমার সাথে। পেট ভরে খাবে কেমন?”
মোনা আরেক দফা চমকাল। ছোট্ট বাচ্চা যা বুঝল তাতেই কেবল মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। অদিতি ওকে নিয়ে এসে রান্নাঘরে নামিয়ে দিল। থালা হাতে নিয়ে ভাত বাড়তে শুরু করল। অকস্মাৎ মোনা বলে বসল,
“তুমি খুব একটা খারাপ নও নতুন বউ। সেদিন তোমাকে খুব খারাপ ভেবেছিলাম আমি।”
সহজ সরল স্বীকারোক্তি মোনার। ছোট্ট বাচ্চারা নিষ্পাপ ফুলের মতো হয়। তাদের মন ও স্বচ্ছ হয়। তারা অকপটে সত্যই বলে দেয়। এমন কথা কর্ণগোচর হতেই অদিতির ব্যস্ত হাত দুটো থেমে গেল। ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে দেখল। পরপরই মৃদু আওয়াজে হেসে উঠল। হাসতে হাসতেই বলল,
“মানুষ মূলত বহুরুপী। মানুষ মানেই মিথ্যাবাদী।”
.
গুঞ্জরিকা আজও শশী দিঘির বাজারে এসেছে একটা কাজের খোঁজে। বেশ কয়েকজনের দুয়ারে গিয়েছিল। অবশেষে টুকটাক কথা হয়েছে একজন আড়তদারের সাথে। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন। বয়স্ক মানুষটা বলেছেন আগামীকাল থেকে কাজে আসতে। বেতন হিসেবে যা দিতে চেয়েছেন তা দিয়ে আরামছে মাস কেটে যাবে গুঞ্জরিকার। তবুও চোখ কান খোলা রেখে কাজ করতে হবে। দিনকাল ভালো না। কে কোথায় ওত পেতে আছে কে জানে? সুযোগ পেলে আজকাল কেউ তো আর হাতছাড়া করে না। আকাশকুসুম চিন্তা মনে এঁটে গুঞ্জরিকা হেঁটে চলেছে। কিন্তু মনটা বেশ ফুরফুরে। অবশেষে একটা কাজের সন্ধান তো করতে পারল। এইবার ঠিকই জীবনের সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। আর পিছনে ফিরে দেখবে না। কিন্তু চাইলেই বুঝি সব হয়? গুঞ্জরিকা একটু দূরে একটা বটগাছের নিচে আসতেই থমকে গেল চলন্ত পা জোড়া। চোখের পর্দায় ভীষণ পরিচিত একটা মুখমণ্ডল ভেসে উঠল। অদূরে একটা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে আরুষ। রেখে আসা সেই পরিপাটি মানুষটার এ কী অবস্থা! সেই ক্ষত চোখটা গামছার আড়ালে ঢাকা পড়ে আছে। সেটা চক্ষুগোচর হতেই সুক্ষ্ম বুকব্যথা মাথা চাড়া দিয়ে উঠল গুঞ্জরিকার। কীভাবে পেরেছিল মানুষটাকে ওভাবে আঘাত করতে? একবার নিজের ডান হাতটার দিকে চেয়ে দ্রুত পায়ে হাঁটতে শুরু করল। ওই মানুষটা দেখে নিলে বিপদ! কিন্তু শেষ রক্ষা আর হলো কোথায়?
আরুষ অবস্থান করছে শশী দিঘির বাজারে। ডাক্তারের থেকে ঔষধ নেওয়া শেষ। উলটো ঘুরে সাইকেলের হাতলে ঔষধের পলিথিনটা বাঁধিয়ে সামনে তাকাতেই ক্লান্ত দৃষ্টি স্থির হয়ে এল। বুকটা একেবারে শীতল হয়ে গেল। ওই যে কথায় আছে যাদের আমরা হৃদয়ে স্থান দেই তাদের চাল চলন ও ভীষণ পরিচিত আমাদের। রাস্তা দিয়ে হেটে যাওয়া মেয়েটাকে চিনতে একটুও বিলম্ব হলো না আরুষের। ছেলেটা দিকবিদিক ভুলে দৌড়ে গেল সেদিকে। পিছন থেকে ডেকে উঠল,
“গুঞ্জ!”
সেই অতিব পরিচিত ডাকটা শ্রবণেন্দ্রিয়ে প্রবেশ করতেই গুঞ্জরিকা থেমে গেল। না চাইতেও হয়ে গেল এমনটা। পা দুটো আর এক কদম ও চলল না। আরুষ ছুটে এসে গুঞ্জরিকার সামনে দাঁড়াল। একটু ঝুঁকে হাঁটুতে হাত দিয়ে হাঁপাচ্ছে ছেলেটা। ইদানিং শরীরটা চলতে চায় না। গুঞ্জরিকার সহ্য হচ্ছে না কিছু। বুকটা বড্ড খাঁ খাঁ করছে। আরুষ একটু ঝুঁকেই বড়ো বড়ো শ্বাস ফেলল। চোখ সামনে তুলে তাকাল। ঠিক তৎক্ষণাৎ বেনামি এক দমকা প্রভঞ্জনে উড়ে গেল গুঞ্জরিকার মুখের উপরে থাকা ঘোমটাটা। স্পষ্ট হলো পাণ্ডুর বর্ণের আননখানা। এতদিনের তৃষ্ণা মিটিয়ে একচিত্তে দেখে চলল আরুষ। চোখ , বুকটা এতদিনে একটু শীতল হলো। ওই শাণিত চোখটাতে স্বচ্ছ পানি স্বর্ণের মতো চিকচিক করছে। গুঞ্জরিকা দিব্যি দেখল সেটা। আরুষ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ক্ষীণ হাসল। মলিন মুখে হাসিটা একটু বেমানানই দেখাল। নরম কণ্ঠে শুধাল,
“নিজের যত্ন নাও না তুমি? এ কী অবস্থা করেছ নিজের?”
ছেলেটার মুখ থেকে এতটা নমনীয় কণ্ঠস্বর আজ অবধি গুঞ্জরিকা শুনেনি। প্রত্যুত্তরে নিশ্চুপ রইল। কেবল নির্লিপ্ত চোখদুটো তাক করা আরুষের দিকে। আরুষ ফের বলল,
“ফিরে চলো। তোমার সাজানো সংসার তুমি বিনে শেষ হয়ে যাচ্ছে। তুমি বিহীন আমি মরে যাচ্ছি। একটু করুণা করো। বাঁচতে দাও তোমার ছায়ায়। চন্দ্রার সাথে সব সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছি। কেবল পারিনি তার মাথা গোঁজার ঠাঁই কেড়ে নিতে। ক্ষমা করো আমায়।”
এতক্ষণে গুঞ্জরিকার ঠোঁটের কোণ ঘেঁষে একটা সুক্ষ্ম উপেক্ষার হাসি দাগ কেটে গেল। আরুষের দৃষ্টি এড়াল না সেটা। গুঞ্জরিকা এবারও নীরবতাই বেছে নিল। সামনে দাঁড়ানো রমণীকে বড্ড অপরিচিত মনে হলো আরুষের নিকট। অকস্মাৎ হাঁটু মুড়ে গুঞ্জরিকার সামনে মাটির রাস্তায় বসে পড়ল। দুহাতে গুঞ্জরিকার কোমর ধরে অস্ফুট স্বরে কেঁদে ফেলল। অস্পষ্ট স্বরে বলল,
“কিছু তো বলো গুঞ্জ। একটা সমাধান আমাকে দাও।”
সবটা ক্রমশ সহ্যাতীত হয়ে উঠছে। বাতাসে কে যে বিষ ছিটিয়ে দিয়েছে। গুঞ্জরিকার বুকটা জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে। কঠিন রুপ ধীরে ধীরে ধ্বসে পড়ছে। কায়া শক্ত করে এতক্ষণে নিষ্প্রাণ গলায় ছোট্ট করে বলল,
“নীরবতা ছাড়া আমার কাছে আর কোনো সমাধান নেই।”
আরুষের কান্নার বেগ বাড়ল। কে বলে পুরুষ কাঁদে না? এই যে আরুষ দিব্যি কাঁদছে। যেই ছেলে পুরুষ অহমিকার কাছে কখনো মাথা নোয়ায়নি। বুক ফুলিয়ে চলেছে। সমাজের কারোর সাধ্য হয়নি তার সম্মুখে দাঁড়িয়ে দুটো বাজে শব্দ উচ্চারণের। সেই ছেলে আজ মানুষের পরোয়া না করে নিজের সর্বস্ব বিসর্জন দিয়ে এক মেয়ের পায়ের কাছে বসে তাকে ভিক্ষা চাইছে। এও বুঝি হবার ছিল! আরুষ বেশ পরিচিত একটা মুখ আশেপাশের গ্রামগুলোতে। বড়ো ব্যবসার খাতিরে কমবেশি সবাই চেনে। পরিচিত মানুষগুলো অদূরে দাঁড়িয়ে বিস্মিত নয়নে তাকিয়ে আছে। আরুষ ক্রন্দনরত গলায় অনুনয়ের সুরে বলল,
“ফিরিয়ে দিচ্ছ আমায়? একটাবার সঙ্গ দাও গুঞ্জ। কথা দিচ্ছি আর কখনো একফোঁটা চোখের পানি ফেলতে দেব না। শেষ একটা সুযোগ দাও আমায়।”
গুঞ্জরিকার বুকচিরে পাঁজর ভাঙ্গা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। মুচকি হাসল,
“আপনি আর আমার কোথাও নেই শেখ বাবু। না আমার ভালোবাসায়, না আমার অভিমানে-অভিযোগে। এমনকি ঘৃণাতেও আপনি নেই।”
কথাগুলো বলেই আরুষের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল গুঞ্জরিকা। পুনরায় মাথায় ঘোমটা তুলে একঝলক আরুষকে দেখল। পাশ কাটিয়ে সামনে অগ্রসর হলো। আরুষ থমকে বসে রইল। নিজের কান দুটোকে সে বিশ্বাস করতে পারছে না। তার এত কাকুতি মিনতি পারল না মেয়েটার অভিমান ভাঙাতে? পবিত্র চোখের পানিও পারল না মেয়েটার কঠিন হৃদয় ছুঁতে? তার গুঞ্জ এতটা পাষাণ কবে হলো? হঠাৎ কী ভেবে উঠে দাঁড়াল আরুষ। পুনরায় দৌড়ে গেল গুঞ্জরিকার। পিছন থেকে গুঞ্জরিকা হাত ধরতেই থেমে গেল মেয়েটা। আরুষ বলতে নিচ্ছিল,
“গুঞ্জ…”
আরুষ মুখের কথা শেষ করার আগেই এইবার অপ্রত্যাশিত একটা কাজ ঘটিয়ে বসল গুঞ্জরিকা। এক ঝটকায় নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে উলটো ঘুরে দাঁড়াল। পরপরই ডান হাতের পাঁচটা আঙ্গুল জোরাল ভাবে ছুঁয়ে গেল আরুষের বাম চোয়াল। সেই শব্দে চারপাশের সকলে হতভম্ব হয়ে তাকাল ওদের দিকে। কানাঘুষো শুরু হলো। তৎক্ষণাৎ আরুষের কাঁটা চোখটা চিনচিনে ব্যথায় জর্জরিত হয়ে উঠল। বাম পাশটা কেমন ঝাঁঝ ধরে রইল। চোখটাতে ঝাঁপসা দেখল আরুষ। গুঞ্জরিকা তীব্র রাগ, কষ্ট, অভিমানে কেঁদে ফেলল,
“আর কখনো আসবেন না আমার সামনে। আমি কিন্তু তাহলে নিজেকে শেষ করে দেব। আমি বিহীন আপনি ভালো থাকুন। ভীষণ ভালো থাকুন। আমাদের আর কখনো সাক্ষাৎ না হোক।”
আরুষ কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। পরক্ষণেই ব্যস্ত হাতে নিজের চোখের পানি মুছে নিল। মাথা নেড়ে হেসে ফেলল,
“মানুষের শখ, সুখ মরে গেলে আবার ভালো থাকা!”
একটু থেমে আওড়াল,
“তবে তাই হোক গুঞ্জ। আমাদের আর কখনো দেখা না হোক।”
গুঞ্জরিকা ফুঁপিয়ে উঠল। কাঁদতে কাঁদতেই উলটো ঘুরে হাঁটা ধরল। আরুষ কয়েক সেকেণ্ড তাকিয়ে রইল মেয়েটার প্রস্থানের দিকে। একবুক ব্যর্থতাকে সঙ্গী করে পরাজিত সৈনিকের ন্যায় নিজেও উলটো পথে এগোল। চোখটার সময় যে ফুরিয়ে আসছে সেটা দিব্যি অনুভব করল। পা দুটো আর চলছে না। নিজের দেহটা নিজের কাছেই ভীষণ ভারী অনুভব হচ্ছে। দুটো জীবনের গন্তব্য তো এক হওয়ার কথা ছিল। বার্ধক্যে হাতে হাত রেখে সূর্যাস্ত দেখার স্বপ্ন ছিল। কথা ছিল আমৃত্যু একে অপরের সুখ দুঃখের সঙ্গী হবে। তবে কেন শোকাচ্ছন্ন এই অপ্রাপ্তির বিচ্ছেদ?
চলবে
(প্রিয় পাঠক, ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আপনাদের সকলের গঠনমূলক মন্তব্য ও রেসপন্সের আশা রাখি।)
Share On:
TAGS: ইসরাত তন্বী, পরগাছা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
পরগাছা পর্ব ২১
-
পরগাছা পর্ব ১৬
-
পরগাছা পর্ব ৬
-
পরগাছা পর্ব ১৩
-
পরগাছা পর্ব ১৮
-
পরগাছা পর্ব ১২
-
পরগাছা পর্ব ১৯
-
পরগাছা পর্ব ৭
-
পরগাছা পর্ব ১৭
-
পরগাছা গল্পের লিংক