পরগাছা |২৪|
ইসরাত_তন্বী
(অনুমতি বিহীন কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ)
পূর্ব আকাশের কোণ ঘেঁষে একটা সফেদ রঙা রেখা দাগ কেটে গেছে। গৃহপালিত পশু সহ পাখিদের কলকাকলিতে মুখরিত প্রাতঃকাল। একটু একটু করে আলোর অস্তিত্ব বাড়ছে। শেখ বাড়ির দোতলায় নিজ কক্ষের বারান্দায় বসে আছে অদিতি। সম্মুখেই রাজা-রানীও আছে। তাদের জন্য বেশ মোটা তার এবং কাঠ দিয়ে মাঝারি আকারের একটা ঘর করা হয়েছে। আসমান শেখ নিজ দায়িত্বে শ্রমিক দিয়ে বানিয়ে দিয়েছেন। বাবার এমন কাজে ভীষণ খুশি হয়েছিল অদিতি। সেখানেই থাকে রাজা-রানী। অদিতির সর্বক্ষণের সঙ্গী তারা দুজন। সুখ-দুঃখের একমাত্র সাথী। মেয়েটা চোখের পানি ফেললে ওরাও মায়া ভরা চোখে তাকিয়ে থাকে। যেন নিজেরাও মালকিনের দুঃখের অথৈ সাগরে ভেসে যায়। মাঝেমধ্যে নিজেদের মুখ দিয়ে দুর্বোধ্য শব্দ করেও সান্ত্বনা দেয়। কিন্তু এতে বুঝি অদিতির যাতনা কমে? যেই যন্ত্রনা স্বয়ং প্রকৃতি তাকে দিয়েছে সেটা এত সহজে কমার নয়।
কক্ষের দক্ষিণ দিকের খিড়কি গলিয়ে প্রবেশ করছে মুঠো মুঠো শীতল হাওয়া। দুলছে কক্ষের চারপাশে থাকা সাদা রঙের পর্দা গুলো। দরজার সামনে লাগানো বড়ো পাথরের মালাটা একে অপরের সাথে ধাক্কা খেয়ে টুংটাং শব্দ তুলছে। নিস্তব্ধ পরিবেশে বেশ লাগছে শুনতে। বারান্দায় উপর দিয়ে বয়ে চলেছে ঝিরিঝিরি পবন। প্রভাতের প্রথম ক্ষণে প্রকৃতির সবুজ স্বচ্ছ রুপে একদৃষ্টে চেয়ে আছে অদিতি। নিজেকে খুইয়েছে ওই স্বচ্ছতায়। একমনে কী যেন ভেবে চলেছে। হয়ত জীবনের হিসাব নিকাশ কষছে খুব করে। কিন্তু সুরাহা করতে পারছে না। রাজা-রানী অপলক চোখে দেখে চলেছে। এতক্ষণে অদিতি একটু নড়েচড়ে দাঁড়াল। মন গহীন থেকে ব্যথিত দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে দেখল। ম্লান হেসে বলল,
“ছোট্ট একটা জীবন আমাদের অথচ হারানোর শেষ নেই। কখনো পছন্দের কিছু খুইয়ে বসি কখনো বা জলজ্যান্ত একটা মানুষকে। সৃষ্টিকর্তার বানানো নিয়মে কত বৈচিত্র্য।”
পাশের টুলের উপরে রাখা লাল রঙের কৌটাটা হাতে তুলে নিল অদিতি। একটু ঝুঁকে কৌটা থেকে ধান বের করে রাজা-রানীকে খেতে দিল। রাজা-রানী ঠোঁট দিয়ে ঠকঠক শব্দ করে খেতে লাগল। অদিতি একমনে কিছুক্ষণ দেখল ওদের খাওয়া। কাজ শেষে উঠে দাঁড়াল। কৌটাটা যথাস্থানে রাখা অবস্থাতে বলল,
“আজ বিকালে ছাদে যাব আমরা, কেমন? সামনে রোযা আসছে। লেবু গাছে লেবু হয়েছে কি-না দেখব। তোরাও থাকবি আমার সাথে ঠিক আছে?”
রাজা-রানী কী বুঝল কে জানে? অদিতির কথায় রাজা ডেকে উঠল। মেয়েটা জবাব পেয়ে মুচকি হাসল। ভাগ্যিস অবলা পাখি দুটো ছিল। যাদের কাছে দুঃখ উজার করলেও ফিরতি আঘাত পাওয়ার সুযোগ নেই। তাই তো নির্দ্বিধায় মনের সব কিছু উগরে দিতে পারে ওদের কাছে। ভয় থাকে না কোনো। মানুষের থেকে শতগুণে ভালো ওই অবুঝ বাকহীন জীবগুলো।
.
“অদিতি ওঠো। চৌধুরী বাড়ি থেকে মানুষ এসেছে।”
অদিতি নিজ কক্ষে এসে পালঙ্কে শরীর ছুঁইয়েছিল। কখন যে নেত্রপল্লব এঁটে এসেছে কে জানে? তবে গভীর নিদ্রায় মশগুল নয়। চন্দ্রার ডাক কর্ণগোচর হতেই দ্রুত শোয়া থেকে উঠে বসল। দেখল দরজার সম্মুখে চন্দ্রা দাঁড়িয়ে আছে। কপাট একটুখানি ফাঁকা করে উঁকি দিচ্ছে। অদিতি ঘুমু ঘুমু চোখে চেয়ে শুধাল,
“কে এসেছে ভাবী?”
চন্দ্রা সেভাবেই জবাব দিল,
“সেদিনের ছেলেটা। চৈতন্য নাম সম্ভবত। এসো তাড়াতাড়ি। বসার ঘরে বসতে দেওয়া হয়েছে তাকে।”
অদিতি একটু ভাবুক হলো। নামটা বেশ পরিচিত মনে হলো। ওহ, হ্যাঁ, চৌধুরীদের বাজার সদয় এই ছেলেটাই করে দেয়। এছাড়াও টুকটাক কাজেও সাহায্য করে। বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াল,
“তুমি নাস্তা পানির ব্যবস্থা করো ভাবী। আমি চোখে মুখে পানি দিয়ে আসছি।”
চন্দ্রা বাধ্যের মতো মাথা নেড়ে চলে গেল। কিছু সময়ের ব্যবধানে অদিতি নিচে নেমে এল। সরাসরি হাঁটা ধরল বসার ঘরের দিকে। ঘরের ভেতরে প্রবেশ করল। তৎক্ষণাৎ নমনীয় কণ্ঠে সালাম ভেসে এল,
“আসসালামুয়ালাইকুম ভাবী।”
সোফায় বসে আছে চৈতন্য। সামনের গোল টেবিলে নানান পদের রাস্তা রাখা আছে। সেখানে অবশ্য এখনো হাত ছোঁয়ায়নি ছেলেটা। অদিতি মৃদু হেসে উত্তর দিল,
“ওয়ালাইকুমুস সালাম ভাইয়া। ভালো আছেন?”
চৈতন্য চোখ নামিয়ে রেখেই মাথা নাড়ল। যার অর্থ ভালো আছে। মুখে বলল,
“ভাবী আপনার জন্য একটা চিঠি আছে। বড়োমা পাঠিয়েছেন।”
অদিতি একটু অবাক হলো। পরক্ষণেই মুচকি হাসল। চৈতন্য ততক্ষণে চিঠির খাম খানা এগিয়ে দিয়েছে। অদিতি নিঃশব্দে নিল সেটা। চৈতন্য বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। অমনিই অদিতি ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলে উঠল,
“উঠে দাঁড়াচ্ছেন যে? কিছুই তো মুখে দিলেন না ভাইয়া।”
চৈতন্য এতক্ষণে দৃষ্টি তুলে একবার অদিতির দিকে তাকাল। স্মিত হেসে বলল,
“যেদিন আপনি ওই বাড়ির একটু পানি মুখে দিবেন সেদিন আমিও শেখ বাড়িতে খাব ভাবী। আজ নয়। আসি তবে। ভালো থাকবেন।”
মুখের কথা শেষ করে হনহনিয়ে বসার ঘর থেকে বেরিয়ে গেল চৈতন্য। অদিতি নেত্র জোড়া ছোট ছোট করে ছেলেটার প্রস্থান দেখল। সহজ কথাগুলো একটু অদ্ভুত, একটু দুর্বোধ্য মনে হলো ওর নিকট। নাকি নিজেই জটিল করে ভাবছে? তাই হবে হয়ত! সময় বিলম্ব না করে চিঠির খাম খানা খুলে চিঠিটা বের করল। চোখ বুলাল শুভ্র রঙা পৃষ্ঠার উপর লেখা কালো কালির শব্দগুলোতে,
আমার স্নেহের অদিতি,
আমি জানি আমার অদিতি ভালো নেই। সে কেবল সুন্দর অভিনয়ে পারদর্শী। তাই চিঠির প্রথমেই চিঠির সৌন্দর্য খণ্ডন করতে হলো। তোমার কাছে আমি একখানা আবদার নিয়ে চিঠি লিখতে বসেছি অদিতি। খোকাকে খুইয়ে এই জীবনের অর্থ হারিয়েছি আমি। এই জনজীবনের প্রতি জন্মেছে আকাশসম বিতৃষ্ণা। একদিন চৌধুরী নিবাসে এসো অদিতি। একটা রাত আমার বুকে মাথা রেখে সময় কাটিয়ে যাও। এই লোকালয় ছেড়ে আমরা মা-মেয়ে প্রকৃতির সান্নিধ্যে আশ্রয় নেব। এক জীবনের স্বল্প সময় তাদের মাঝে অতিবাহিত করব। তোমার বাবা জানেন এই কথা। আমাকে আশ্বাস দিয়েছেন, তিনি সব ব্যবস্থা করে দিবেন। আর হ্যাঁ, আগামীকাল চৌধুরী পরিবার থেকে অনেকজন যাবে তোমাদের বাড়িতে। নতুন চমক দিতে। আমার আশ্বাস আছে তোমার উপরে। সেটুকু হয়ত কখনোই ভাঙবে না। ফিরতি চিঠি পাঠাতে হবে না তোমাকে। স্বয়ং তুমি এসে একটু দর্শন দিও। অপেক্ষায় থাকব।
ইতি
লাবণ্য চৌধুরী
ছোট্ট একখানা চিঠি। দুই ফোঁটা জল টপটপ করে চিঠির উপরে পড়ল। ভিজে গেল চিঠির একাংশ। অদিতি ছলছল চোখে চেয়ে রইল চিঠিটার দিকে। বুকের মধ্যিখানে ভর করল সুক্ষ্ম একটা ব্যথা। শেষের বাক্যগুলো নিয়ে সেভাবে ভাবল না। আসুক তারা, এলেই বোঝা যাবে কেন এসেছে। কাঁপা কাঁপা হাতে চিঠিটা পুনরায় খামে পুরে নিল। গটগট পায়ে হেঁটে বসার ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
.
চন্দ্রা সকালের খাবার দিয়ে এল রোকেয়া শেখের কক্ষে। অসুস্থতার পর থেকে নিজ কক্ষেই খেয়ে থাকেন তিনি। চন্দ্রা খেয়াল করেছে আজ সকাল থেকে এই অবধি আয়েশা শেখকে একবারও দেখেনি। নিজ কক্ষ থেকে বের হয়নি মানুষটা। কিছু হয়েছে কি? এদের তো আবার মান-অভিমানের শেষ নেই। কী যেন ভেবে রান্না ঘরের দিকে যেতে নিয়েও আয়েশা শেখের কক্ষের দিকে হাঁটা ধরল। কক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে বড়ো একটা শ্বাস ফেলল। ভিড়ানো কপাট ঠেলে গুটি গুটি পায়ে পালঙ্কের দিকে এগিয়ে গেল। পালঙ্ক সংলগ্ন জানালা দিয়ে মৃদু গতিতে হাওয়া প্রবেশ করছে। বেশ ঠাণ্ডা পরিবেশ। চন্দ্রা দেখল আয়েশা শেখ গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছেন। চন্দ্রা আস্তে করে বারকয় ডাকল। কিন্তু না কোনো হেলদোল দেখা গেল না আয়েশা শেখের ভেতরে। চন্দ্রা আলতো করে ওনার কপালে হাত ছোঁয়াতেই চমকে উঠল। জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে বয়সের ভারে নুইয়ে পড়া জীর্ণশীর্ণ দেহটা। আরেকটু খেয়াল করতেই বুঝল জ্ঞান হারিয়েছে জ্বরে পিষ্ট হয়ে। আঁতকে উঠল মেয়েটা,
“হায় আল্লাহ!”
জোরে একটা চিৎকার দিয়ে ব্যাকুল পদযুগলে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল।
বাড়িতে আসমান শেখ এবং আরুষ দুজনেই ছিল। আসমান শেখ ছিলেন বসার ঘরে আর আরুষ গুঞ্জর কক্ষে। চন্দ্রার চিৎকার শুনে সবাই ছুটে এসেছে। অদিতি সবে রান্নাঘরে এসেছিল নিজের জন্য খাবার নিতে। দিকবেদিক ভুলে দৌড়াতে যেয়ে অদিতির সাথে ধাক্কা খেল চন্দ্রা। দুজনেরই লেগেছে বেশখানিকটা। আপাতত সেদিকে পাত্তা না দিয়ে অদিতি জানতে চাইল,
“কী হয়েছে ভাবী? এভাবে চিৎকার করে কোথায় ছুটছেন?”
চন্দ্রার চোখমুখ শুকিয়ে এসেছে। মলিন মুখে কম্পিত গলায় কোনোরকমে বলল,
“দ…দাদী জ্ঞান হারিয়ে পড়ে আছে। ভীষণ জ্বর দাদীর গায়ে।”
অদূরে দাঁড়িয়ে ছিল আরুষ, আসমান শেখ সহ কয়েকজন কাজের খালা। আরুষ আর কিছু শুনল না। বড়ো বড়ো পা ফেলে ওদের পাশ কাটিয়ে আয়েশা কক্ষে প্রবেশ করল। আসমান শেখ ও ছেলের পিছু ছুটলেন। আরুষ একটু ঝুঁকে আয়েশা শেখের মাথায় হাত দিয়ে ডাকল,
“দাদী শুনছেন? দাদী?”
না, কোনো প্রত্যুত্তর এল না। জ্বরের মাত্রাটা অনুভব করতেই আরুষ সোজা হয়ে দাঁড়াল। আসমান শেখের দিকে তাকিয়ে ব্যস্ত গলায় বলল,
“ডাক্তার আশা আবশ্যক বাবা। আপনি থাকুন এখানে। অদিতিকে বলুন মাথায় পানি দিতে।”
আসমান শেখ মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন। তবে অদিতিকে বলার প্রয়োজন হলো না। অদিতি আর চন্দ্রা দুজন মিলে এক বালতি পানি আর মগ নিয়ে এল। আরুষ সবটা একপলক দেখে কক্ষ থেকে প্রস্থান করল। মেজবাহ আড়তে আছে। সে আসতে আসতে আরুষ ডাক্তার নিয়ে চলে আসবে। সময় অপচয়ের সুযোগ নেই আপাতত। আসমান শেখ জলভর্তি চোখ নিয়ে কক্ষের এক কোনায় দাঁড়িয়ে রইলেন। অদিতি আর চন্দ্রা আয়েশা শেখের মাথায় পানি দিচ্ছে। ভালো মানুষ রাতে শুতে এল। আসমান শেখের সাথে ভালো মন্দ দুটো কথাও বলল। তাহলে হঠাৎ করে কী এমন হলো? এতটাই জ্বর এল যে অবচেতন হয়ে পড়ল? এর কারণই বা কী? বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে মাথায় পানি দেওয়ার ফলস্বরূপ আয়েশা শেখ একটু নড়লেন। উপস্থিত সকলে খানিকটা চিন্তামুক্ত হলো। আয়েশা শেখ জোরের ঘোরে অধর নাড়িয়ে অস্ফুট স্বরে কেবল একটা নামই উচ্চারণ করলেন,
“নবনীতা তালুকদার।”
নামটা অস্পষ্ট কিন্তু সকলে দিব্যি শুনল। আয়েশা শেখের মাথায় থাকা চন্দ্রার ব্যস্ত হাত দুটো থমকে গেল। শরীর শক্ত হয়ে এল। অদূরে দাঁড়ানো আসমান শেখ বড়ো বড়ো চোখে তাকালেন। নামটা শুনলে তাঁর অদ্ভুত রকমের অনুভূতি হয়। অদিতির মসৃণ কপালে ভাঁজের সৃষ্টি হলো। স্পষ্টভাষী অদিতি ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে বসল,
“জ্বরের ঘোরে তার নাম নিচ্ছেন কেন দাদী? ভূত হয়ে আপনার ঘাড় মটকাতে এসেছে নাকি?”
চলবে
(ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। প্রিয় পাঠক আপনাদের সকলের রেসপন্স ও গঠনমূলক মন্তব্যের আশা রাখি। আর হ্যাঁ, নবনীমালা নামটা চেইঞ্জ করে নবনীতা রাখা হয়েছে। কারণ ইতোমধ্যে নামটা আমি অন্য একটা গল্পে ব্যবহার করেছি।)
Share On:
TAGS: ইশরাত জাহান জেরিন, পরগাছা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
পরগাছা পর্ব ১৩
-
প্রেমতৃষা সমাপ্ত পর্ব (১ম অংশ+ শেষাংশ)
-
পরগাছা পর্ব ৬
-
প্রেমতৃষা ৪২ ( শেষ অর্ধেক)
-
পরগাছা পর্ব ১৬
-
প্রেমতৃষা পর্ব ১৫+১৬
-
পরগাছা পর্ব ২১
-
প্রেমতৃষা সারপ্রাইজ পর্ব
-
প্রেম আসবে এভাবে পর্ব ৭
-
প্রেমতৃষা ৪২ (প্রথম অর্ধেক)